০৭ জুলাই ২০২০

গরিবের ‘অভিনয়’, ধনীর বদভ্যাস

গরিবের ‘অভিনয়’, ধনীর বদভ্যাস - ছবি : নয়া দিগন্ত

 

 


গরিবের ‘অভিনয়’, ধনীর বদভ্যাস

লকডাউনের প্রথম দিকে অন্তত রাজধানীর বহু জায়গায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ধুম পড়েছিল এবার। কয়েক দিনেই তা বিদায় নিয়েছে। একদিন দেখি, বাসার পাশের স্কুলটার গেটে লোকজন, নারী-পুরুষের ভিড়। রোদের মধ্যে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একসময় হতদরিদ্র মানুষগুলো খালি হাতেই একে একে বিদায় নিতে বাধ্য হলো। ব্যাপার কী? না, খাদ্য অধিদফতরের ওএমএস কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফ আসেনি; তাদের চালবোঝাই ট্রাকেরও খবর নেই। অতএব, যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। জানা গেল, ১০ টাকার চাল নিয়ে এর বহু গুণ দুর্নীতি হওয়ার কারণে সরকার চাল বেচাই বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু মাথাটাকে কেটে ফেলা তো মাথাব্যথার ওষুধ নয়। যারা সুচিকিৎসা করতে পারে না, কিংবা যাদের কাছে ভালো ওষুধপত্র নেই, তারাই এমন পদক্ষেপ নেয়। বর্তমান সরকারেরও কি সে দশা?

তদুপরি, টিসিবির নিত্যপণ্য বিক্রির সুবাদে নগরীতে অনেক জায়গায় লম্বা লাইন দেখা গিয়েছিল। ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে হলেও এবং এতে লম্বা সময় লাগলেও মানুষ তবু তেল, আটা, চিনি, ছোলা ইত্যাদি পাচ্ছিল। ঈদের পরও তা পাওয়ার কথা। তবে এ সুবিধা ক্রমে ক্রমে বিদায় নিয়েছে। টিসিবির ‘ন্যায্য’মূল্যে বিক্রি নিয়ে অনেক ‘অন্যায্য’ কাজের অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। নির্ধারিত সময়ে তারা আসে না, ওজনে কম, মান ভালো না, ইত্যাদি ইত্যাদি। কোথাও দেখা যেত, পুলিশ ক্রেতাদের লাইনে পারস্পরিক দূরত্ব ঠিক করে দিচ্ছে। কোথাও পুলিশ নেই তো শৃঙ্খলাও নেই। লোকজন আগের মতো গা ঘেঁষে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছে। মনে উদ্বেগ, না জানি দাঁড়াতে দাঁড়াতে পায়ে ধরে গেলে অবশেষে হয়তো টিসিবির ট্রাক থেকে বলে দেয়া হবে, ‘আজ আর দেয়া হবে না।’ কিংবা ‘আর আটা বা তেল নেই’। হয়তো রোজার ইফতারির আইটেম ছোলা-খেজুরও একটু কম দামে এখানে আর পাওয়া যাবে না। ট্রাকের বিক্রেতারা একবার ‘না’ বলে দিলে, ক্রেতাদের কার সাধ্য ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারে? ঘোষণামাফিক বিত্তহীন ও নিম্নবিত্তের লাইনে অসহায় মধ্যবিত্তদেরও দেখা গেছে। মানে, ফকিরের সাথে মিসকিনদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আত্মসম্মান বিসর্জন না দিয়ে উপায় নেই এই দুর্দিনে। লকডাউনে শিক্ষিত মধ্যবিত্তেরও রোজগার বন্ধ। তাই খালি টিন-ব্যাগ-ভাণ্ড নিয়ে টিসিবির ট্রাকের আশায় লাইন বেঁধে রোদে পুড়তে হয়। কিন্তু বগডাউন, শকডাউন বা নকডাউন হওয়ার উপায় নেই।

এবার আমাদের অফিসের সামনের রাস্তায় পরপর কয়েক দিন টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। একদিন দেখলাম, নারী-পুরুষ ও জোয়ান-বুড়া মিলে লোকজন লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ। কিন্তু শেষাবধি টিসিবির ট্রাক আসেনি।
অতএব, হতাশ মানুষের নতমুখে প্রত্যাবর্তনই নিয়তি। একদিন একজন ক্রেতা আটা আছে কি না জানতে চাইলেন। জবাব এলো- ‘নেই’। তবে অনেকেই সেদিন আটা পেলেন। মাজেজা বোঝা গেল না। প্রসঙ্গত একটা ঘটনা। কয়েক মাস আগে সেখানে রাস্তায় টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল। লোকজনের আগ্রহ নেই ৩৫ টাকা দরেও তা কেনার। অথচ দিন কয়েক আগে পেঁয়াজ সঙ্কটের পিক আওয়ারে সে পেঁয়াজ বেশ কয়েক গুণ বেশি দামেও কেনার জন্য মানুষ পাগল হয়ে গিয়েছিল। সরবরাহ অতিরিক্ত হওয়ায় দাম পড়ে যাওয়া ছাড়াও এর আরেক কারণ- এক ভদ্রলোক টিসিবির তিন কেজি পেঁয়াজ (ঝাঁজ না থাকলেও আকারে ছিল বড়) কিনলেন ৩৫ টাকা দরে। পরে দেখা যায়, এর মধ্যে এক কেজিই পচা।

অন্য দিকে সমানে চলছে রাজনীতির ক্যাঁচাল আর প্যাঁচাল। মহাবিপদেও আমাদের বদভ্যাস গেল না। কয়লার ময়লা যায় না। তাই এক মন্ত্রী বললেন, সরকারের সমালোচনা করা বড় বিরোধী দলটির চিরায়ত ভাইরাস। আসলে সবচেয়ে বড় ভাইরাস হলো অপরাজনীতি।

আমাদের ক্রীড়াজগতের একজন ‘তারকা’ বলেছেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে জীবনযাত্রা ও মানুষের অভ্যাস অনেকটা বদলে যাচ্ছে; বদলাতে হবেও। এর একটি হলো ‘সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার সময় রেলিং না ধরা।’ অর্থাৎ সিঁড়ি সরু হলেও মাঝপথে চলতে হবে। একপাশে থাকে দেয়াল, অন্য পাশে রেলিং। কিন্তু এমনভাবে ওঠা-নামা করা চাই যেন দেয়ালে ধাক্কা কিংবা রেলিংয়ে ঘেঁষা না লাগে। রেলিংয়ে হাত দিলে এর পরই সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে ভালো করে। এর থেকে অনেকে মনে করছেন, ‘মধ্যপন্থী’ জাতি হওয়ার প্রেরণাই দেয়া হচ্ছে সবাইকে।

আজকাল টিভির কোনো কোনো আন্তর্জাতিক চ্যানেলে ভেসে ওঠে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা : Spread to prevent the spread of corona virus. এখানে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা প্রতিরোধে অনুপ্রেরণা দিতে সবাইকে বলছে, ‘আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একজন ছোট বীর আছেন।’
এ দিকে, করোনাকালে প্রচলিত প্রবাদও বদলে যাচ্ছে মানুষের অনেক অভ্যাস ও আচরণের মতো। এত দিন আমরা শুনে এসেছি ঈশপের একটি গল্পের নীতিকথা বা moral হলোÑ United we stand, divided we fall. এবার একটি ইংরেজি পত্রিকায় কোয়ারেন্টিনের কল্যাণকর দিক তুলে ধরে লেখার শেষে বলা হয়েছে, 'Beware and say, united we fall, divided we stand.'

বাংলাদেশে একটা জনপ্রিয় লোকগানের প্রথম কলি- ‘লাইন ছাড়া চলে না রেলগাড়ি।’ কিন্তু করোনা তাণ্ডবে আমরা শিখতে বাধ্য হচ্ছি, শুধু রেলগাড়ি নয়, জীবনের বহু কিছুই এখন থেকে লাইনেই চলবে। লকডাউনের কারণে টিসিবির পণ্য কেনার লাইনে দাঁড়ালেই হবে না, কেনাকাটা, লেখাপড়া, চাকরি, কাজকর্ম ইদ্যাদিও ‘লাইন মোতাবেক’ বা অনলাইন করা ছাড়া উপায় নেই। তাই এখন কিছু অনলাইন কোম্পানির রমরমা ব্যবসায় পোয়াবারো। এ দিকে, কোনো কোনো বেসরকারি ভার্সিটি প্রচারণায় নেমেছে- অনলাইন পড়ালেখার সুযোগ-সুবিধা এবং উপকারিতা তুলে ধরে।

লকডাউন ও কোয়ারেন্টিন
করোনাকালের দু’টি সবচেয়ে প্রচলিত পরিভাষা হলো- ‘লকডাউন’ আর ‘কোয়ারেন্টিন’। আগে এ দু’টি যথাক্রমে কলকারখানা এবং নির্ধারিত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার অর্থে ব্যবহার করা হতো। তবে এখনকার মতো এত ব্যাপক কিংবা বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত হয়নি।

লকডাউন মানে, করোনা মহামারীতে আক্রান্ত কিংবা এর সম্ভাব্য আক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, স্থাপনা, এলাকা, জনপদ প্রভৃতি সম্পূর্ণ বন্ধ বা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। কোয়ারেন্টিন মানে ঝুঁকিপূর্ণ এক বা একাধিক ব্যক্তিকে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা তাদের বাড়িতে পুরোপুরি আলাদাভাবে অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য থাকতে বাধ্য করা। প্রাচীনকালে এই ল্যাটিন শব্দের অর্থ ছিল আক্ষরিকভাবে ‘৪০’। বর্তমানে এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, ১৪ দিন। সাধারণত জীবাণুমুক্ত করার লক্ষ্যে সঙ্গনিরোধ করা বুঝায় ‘কোয়ারেন্টিন’ দ্বারা। এর উচ্চারণ সচরাচর ‘কোয়ারেন্টাইন’।
‘লকডাউন’ করার বাধ্যতামূলক নিয়ম ইসলামের স্বর্ণযুগে হজরত ওমর রা:-এর আমলে সিরিয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তখন সেখানে মহামারীরূপে ভয়াবহ প্লেগ সংক্রমণে ইসলামের ইতিহাসের একজন বিজয়ী ও শ্রেষ্ঠ সেনাপতি হজরত আবু উবায়দাহ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সিরিয়ার লকডাউনের কারণে রাজধানী মদিনা থেকে সুদূর দামেস্কের কাছাকাছি গিয়েও খোলাফায়ে রাশেদিনের দ্বিতীয় মহানায়ক ওমর রা:কে সে সময়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। আর এই লকডাউন বা টোটাল আইসোলেশনের নির্দেশনা ছিল মহানবী সা:-এর হাদিসেই। তিনি যে কত দূরদর্শী ছিলেন এবং তাঁর অনুসৃত জীবনাদর্শ ইসলাম যে, কত বেশি বাস্তবভিত্তিক, এর একটি প্রমাণ হলো এটা।

আজকের সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্যের পাদপীঠতুল্য ইউরোপে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনের প্রচলন হয়েছে ইসলামের অনেক পরে- চতুর্দশ শতকে। ১৩৪৭ সাল থেকে চার বছরে Black Death নামের প্লেগ মহামারী প্রাণ হরণ করেছিল মহাদেশটির তিন ভাগের দু’ভাগ মানুষের। মহামারী থেকে বাঁচতে তখন ইউরোপে কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের সূচনা।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান ভাইরাস’!
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে গোটা দুনিয়া দিশেহারা। এ দিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাকযুদ্ধ চলছে আগের মতো। এর পাশাপাশি, সুযোগ পেয়ে চীনবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রোগাগান্ডা চলছে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল থেকে। তার অংশ হিসেবে কেউ কেউ বলছেন, চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগ পর্যবসিত হয়েছে ‘ওয়ান বেল্ট’ ওয়ান ভাইরাস’-এ। চীন উহানে করোনা মহামারীর শঙ্কা কিছু দিনের মধ্যে মোটামুটি সামলিয়ে উঠেছে। তার এই সাময়িক ব্যর্থতা আর বিশ্বজুড়ে করোনা তাণ্ডবের পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচনার প্রচণ্ড ধাক্কা চীনের প্রাচীরে এসে লাগছে। তবে, করোনায় মৃত্যুর সংখ্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তালিকায় চীন ৩, ৪, ৭ নম্বর হয়ে একাদশে নেমে যাওয়ায় এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খোদ আমেরিকা করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণের দিক দিয়ে সর্ব শীর্ষে থাকায় চীনের সমালোচকরা পড়ে গেছেন বিষম বেকায়দায়।

মাসখানেক আগেই চীন কোয়ারেন্টিন তোলার সময়ে ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধের শিরোনাম ছিল One Belt One Virus : Spread of Covid-19 and OBOR. নিবন্ধটিতে চীনের Belt and Road Invitiative-কে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক পলিসির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, চীন এই উদ্যোগ নিয়ে একটি স্থানীয় রোগকে বিশ্ব বিপর্যয়রূপে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি আরো অন্তত ২.৫ জনকে সংক্রমিত করছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিমত। অবশ্য, অনামী লেখক স্বীকার করেছেন, উহানে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই চীনা কর্তৃপক্ষ উহান এবং আশপাশের নগরগুলোকে কোয়ারেন্টিনের আওতায় নিয়ে আসে। এখানে হুবেই প্রদেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের অধিবাস।

চীনের লকডাউনের লক বা তালা ক্রমেই খুলছে। জীবনযাত্রা তাই হয়ে আসছে স্বাভাবিক। কিন্তু উহানের বেআইনি প্রাণিবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে এবং সাপ-ব্যাঙ-বেজি-বাদুড় ইত্যাদি অখাদ্য খাওয়া অব্যাহত থাকলে বারবার মহামারী দেখা দিতে পারে। তখন গোটা দুনিয়া ক্ষুব্ধকণ্ঠে গালি দেবে যে দেশকে, তার নাম চীন।

সামাজিক দূরত্ব ও অসামাজিক কাজ
এখন ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে চলাই সব দেশে ‘সামাজিক প্রাণী’ মানুষের বড় দায়িত্ব। তবে অবস্থা ভালো মনে করে যেসব দেশ লকডাউন কিঞ্চিৎ শিথিল করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। যেমন- ভারতে শত শত মানুষ করোনায় মরলেও তাদের লকডাউন অনেকটাই উঠে গেছে। এই সুযোগে ‘রসিক’জন পানাভ্যাসের তাগিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে যে অপকর্মে মেতে উঠতে চাচ্ছে তা এককথায় ‘অসামাজিক’।

৫ মে’র খবর, ‘ভারতে করোনা ভাইরাস ঠেকাতে লকডাউনে অনেক দিন বন্ধ থাকার পর রাজধানী দিল্লিতে মদের দোকান খোলা মাত্রই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ায় বাধ্য হয়েই ফের বন্ধ করে দিতে হয়েছে অনেক দোকান। মদের দোকান খোলার পরই সকালের দিকে সামাজিক দূরত্ব বিধি উপেক্ষা করে মানুষ মদ কিনতে ভিড় জমায়। দোকানের সামনে ভিড় করাতে পুলিশকে লাঠিচার্জও করতে হয়েছে। মদখোরদের লাইনে থাকা সবার মুখে ছিল মাস্ক। পুলিশ ধাওয়া করে লোকজনকে সেখান থেকে হটিয়ে দেয়। গত সপ্তাহে ভারতে দু’সপ্তাহের জন্য লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সংক্রামক এলাকা ছাড়া অন্যত্র মদের দোকান চালু করা যাবে। বলা হয়েছিল, ক্রেতারা পরস্পর ছয় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে মদ কিনতে পারবেন; কোনো দোকানে একসাথে পাঁচজনের বেশি ঢুকতে পারবেন না এবং মাস্ক পরে না এলে মদ পাওয়া যাবে না।

এসব নিয়ম মেনেও যদি কেউ মদ কেনে, তা হলে সেই চুটকি বলতে হয়, দুই মদখোর সুরা পান করছে। একজন বলছে, ‘তুই মদ খেতে জানিস না। দেখ, আমি কত বেশি মানি আমার ধর্মকে। তাই গোঁফজোড়া তুলে মুখের ভেতর মদ পাচার করে দিই।’

দু’টি বিষয়
ক. ২ মে দুপুরে অফিস থেকে ফিরছি। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে, সার্ক ফোয়ারার কাছে পশ্চিম দিক থেকে একটি বাইসাইকেল আসছিল। মুহূর্তের মধ্যে কী ঘটল, আল্লাহ জানেন। দেখা গেল, আরোহী তার পড়ন্ত সাইকেল সামলাতে ব্যস্ত। সামনেই এক মহিলা রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। মনে হচ্ছিল, তার হাত-পা ভেঙে গেছে। আমার সহযাত্রী বললেন, ‘মেয়েলোকটা কিছু টাকা আদায়ের জন্য মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ভান করছে।’ আসল ব্যাপার কী, জানা যায়নি। তবে কথাটা সত্য হলে বলতে হয়, দরিদ্র মেয়েলোকটি বাইসাইকেলের বদলে মোটরসাইকেল বা কোনো বড় গাড়ি টার্গেট করলে ‘বুদ্ধিমানের কাজ হতো’।

লকডাউনের দুর্দিনে যেখানে অনেকে নিরুপায় হয়ে ভিক্ষুক সেজেছে, তখন বাঁচার তাগিদে গরিবের আঘাত পাওয়ার ‘অভিনয়’ করা কি অস্বাভাবিক?

খ. করোনা মহামারীর কবল থেকে বাঁচতে মদ বা ধূমপান বাদ দেয়া, ব্যায়াম, প্রার্থনা ও ধ্যান করা, ফেসবুক বেশি না দেখা, ইত্যাদি পরামর্শ এসেছে বারবার। ধূমপায়ী ব্যক্তিরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি হলেও মুখের মাস্ক সরিয়ে সিগারেটে সুখটান দেয়ার দৃশ্য এখন পরিচিত। এক নেতার পানাভ্যাস-সংক্রান্ত চুটকি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো।

বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ, একটি দৈনিকের খোদ সম্পাদক তার লেখা শুরু করেছেন ওই রাজনীতিকের এ সময়েও ‘একটু আধটু পান করা’ নিয়ে। নেতাজী হোম কোয়ারেন্টিনে। দিনকাল খারাপ বলে তিনি এখন ‘সংযমী’। তাই প্রত্যহ মদ খেলেও পরিমাণে কম। তার কাজের ছেলেটা খায় কম দামের ‘বাংলা মদ’। এখন তার অভাবে সাহেবের বোতল থেকে নিয়ে ‘সামান্য’ খায়। ছেলেটা সত্যিই কাজের। কেননা, সে নেতার সমর্থনে মিটিং ও মিছিলে গিয়ে রাজনীতিও করে। লকডাউনে মদ্যপান করতে গিয়ে একদিন নেতা দেখেন, ‘মদটা কেমন জানি পানসে। অ্যালকোহলের নামগন্ধও নেই। হাঁক দিলেন কাজের ছেলের নাম ধরে। বললেন, ‘হুইস্কিতে কেন পানি দিলি?’ কিন্তু জবাব নেই। তদুপরি ছেলেটা বলে, ‘শুধুু নামের ডাকটা শোনা যায়। পরের কথাগুলো শুনতে পাই না।’ এটা সত্য কি না যাচাই করতে লিডার নিজেই কিচেনে গেলেন ছেলেটার জায়গায়। আর সে ড্রয়িংরুম থেকে নেতাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ত্রাণের বরাদ্দ চুরি করেছে কেডা? পাঁচতারা হোটেলে পাপিয়ার আমন্ত্রণে গেছিল কে? সরকারের প্রকল্পের টাকায় ভোটের খরচ কেডা উঠাল?’ কোনো জবাব নেই নেতার। বরং তিনিও বললেন, ‘ঠিক কথা, কিচেন থেকে কেবল ডাকটাই শোনা যায়। পরের কোনো কথা শোনা যায় না।’ এ ধরনের নেতার রাজনৈতিক পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন আছে কি?


আরো সংবাদ