২৬ মে ২০২০

ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও সামাজিক ঋণ শোধ

-

করোনাভাইরাস মহামারীতে গোটা বিশ্বই এখন বিপর্যস্ত। এ সময়ে সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়েছে সমাজের একেবারে নিম্নস্তরে থাকা জনগণ, যারা জনসংখ্যার বড় অংশ। এদের রক্ষায় সরকার ত্রাণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই ত্রাণ তাদের পরিত্রাণ দিতে পারছে না। পত্রিকার পাতা খুললেই ত্রাণ বিতরণে নানা অনিয়মের খবর চোখে পড়ছে। অনিয়ম করতেই যেন সবাই উৎসাহী। এই দুর্যোগে গরিব মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সমবেদনা জানানো এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াই ছিল মুখ্য বিষয়। কিন্তু সার্বিকভাবে সেটা হয়নি। আমরা যে দুর্যোগ মোকাবেলা করছি সেখানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মূল ভূমিকা তো সরকারকেই পালন করতে হবে।

ফলে সরকারি ত্রাণ বিতরণের কাজে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা জনপ্রতিনিধিরাই মূল দায়িত্ব পালন করবেন, এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে সব দায়বদ্ধতা যেন প্রধানমন্ত্রীর একার। যারাই যেখানে কথা বলছেন সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নাম বলছেন। মনে হয় যেন প্রধানমন্ত্রী না বললে ওই কাজটি যত ভালোই হোক তিনি তা করতেন না। যিনি মন্ত্রিসভায় আছেন তিনি নিজের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থেকে সৎ নিয়তে ও সচেতনভাবে কোনো কাজ করলে সেই ভালো কাজের ভাগিদার কি প্রধানমন্ত্রী হবেন না? জনকল্যাণমূলক কাজ করতে তাকে কেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে? তিনি যদি নিজেকে জনপ্রতিনিধি দাবি করেন তা হলে জনগণের ভালো-মন্দ দেখার দায়ভার তো তার উপরেও বর্তায়। প্রধানমন্ত্রী আছেন সবার উপরে ছাতার মতো। কিন্তু সেই ছাতার নিচে জনপ্রতিনিধিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও পত্রিকাগুলো খবর প্রকাশ করছে।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে আমরা স্বাধীন হতে চেয়েছিলাম একটি শোষণ, বঞ্চনামুক্ত ও দরদি সমাজ পাওয়ার জন্য। পাকিস্তান আমলে সেটা না পাওয়ার কারণেই আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। কিন্তু সেই বঞ্চনামুক্ত প্রকৃত দরদি সমাজ কি আমরা গঠন করতে পেরেছি? আমরা পশ্চিমাদের ত্যাগ করেছি, কারণ আমাদের প্রতি তাদের দরদ ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠনের সময় কেন তাদের সাথে ছিলাম? আমরা ভেবেছিলাম আমরাও মুসলমান ওরাও মুসলমান। ওরা আমাদের ভাই। আমরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একত্র থাকব।

আমরা মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলাম। কিন্তু যখন এক ভাই আরেক ভাইকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তখন অধিকারবঞ্চিত ভাইটি একসময় বিদ্রোহ করবেই। তখন সেটাই হয়েছিল। ওরা সংখ্যালঘু হওয়ার পরও বাঙালি মুসলমানকে শোষণ করতে শুরু করে। আমরা চেয়েছিলাম ভাইয়ের কাছ থেকে সহানুভূতি পাবো। সহানুভূতি দূরের কথা, উল্টো শোষণ করতে শুরু করল। স্বাধীনতার অন্যতম মূলমন্ত্র ছিল ন্যায্য অধিকার। শেখ মুজিব কিন্তু সেই দরদি সমাজই গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় তিনি পাননি। আসলে আমরাই খারাপ ছিলাম। পচা আপেলের মতো। আপেল পচে গেলে সেটি আর খাওয়া যায় না। আমের এক দিক পচলেও আরেক দিক খাওয়া যায়। কারো জন্যই আমাদের দরদ নেই। আমাদের এখানে জনপ্রতিনিধির অভাব নেই। হাজারে হাজারে জনপ্রতিনিধি। কিন্তু যারা নিজেদের জনপ্রতিনিধি দাবি করছেন তাদের কয়েকজন এই করোনা দুর্যোগের সময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমি তো পত্রিকায় শুধু ফটোসেশনই দেখি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তারা আসলে প্রধানমন্ত্রীরই ক্ষতি করছেন। এটা খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। মানুষের প্রতি দরদ আমি কোথাও দেখি না। এমনটি কেন হলো? এর জবাব নিহিত জবাবদিহির মধ্যে। এসব কথিত জনপ্রতিনিধির যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা দায়বদ্ধ থাকলে এসব দৃশ্য আমাদের দেখতে হতো না। এই জবাবদিহি শুরু হতো যদি জনপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার আগেই তাদের চরিত্র সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হতো। এর জন্য ক্ষমতাসীন দলের দলীয় সদর দফতরে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করার দরকার ছিল। যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের পাশাপাশি যারা মনোনয়ন পাননি তাদের তালিকা করেও যাচাই করে দেখা উচিত ছিল আসলেই তাদের মধ্যে কে যোগ্য ছিল। এখানে বয়সেরও বিবেচনা থাকা উচিত। যাদের বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে তাদের কাছে কিছু আশা না করাই ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছয় হাজার নির্দেশনার মধ্যে একটি হলোÑ যাদের বয়স ৭০-এর বেশি তাদের বিশেষ যতœ নেয়া প্রয়োজন।

এটি শুধু সরকারি দলের জন্য নয়, বিরোধী দলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। এ দেশে বিরোধী দলগুলোর প্রবণতা হয়ে গেছে যে সরকার যাই করুক সেটিই খারাপ। আবার সরকারি দলেও একই প্রবণতা বিরোধী দল যে কথাই বলুক সেটাই মূল্যহীন। এটা হয় না। সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব হলোÑ ‘কোনো কিছুই নিরঙ্কুশ সত্য নয়, আবার কোনো কিছুই নিরঙ্কুশ মিথ্যা নয়’। ইসলামী শরিয়তও মাঝামাঝি পন্থা বেছে নিতে বলে। সরকারি-বেসরকারি উভয়পক্ষের ভালো-মন্দ আছে। বিএনপিও তো নির্বাচনে ৩০০ প্রার্থী দিয়েছিল, তারা কোথায়। পরাজয়ই তো জয়ের সোপান। তারা কি করছেন সেটি আমি মাঠে নেমে অনুসন্ধান করিনি ঠিক। আমি সংবাদপত্র, সামাজিক গণমাধ্যমের কারণে যে খবরগুলো জানতে পারছি তার ভিত্তিতেই এসব কথা বলছি। আমার মনে হয় এখন সময় এসেছে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে একটি গবেষণা সেল খোলার। এর কাজ হবে কারা জনপ্রতিনিধি হতে পারবে তার মানদণ্ড (criteria) নির্ধারণ। প্রথমে তার শিক্ষা থাকতে হবে... সেটা প্রাতিষ্ঠানিক (formal), অপ্রাতিষ্ঠানিক (non-formal) বা অনানুষ্ঠানিক (informal) হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও দেশ ও জাতিকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন এমন ঘটনা ভূরি ভূরি রয়েছে। বাংলাদেশেও আছে। স্কুলে গেলেই শিক্ষিত হবে এমন কোনো কথা নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কোনো মানদণ্ড না হলেও এ ধরনের ন্যূনতম শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কারণ প্রশাসন চালাতে গেলে তাকে এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে হবে। আইনকানুনের বিষয়গুলো বুঝতে হবে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কাউকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বসিয়ে দিলে তিনি সেটি চালাতে পারবেন না। জনপ্রতিনিধি হলেও প্রশাসন চালানোর জন্য ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তার থাকতে হবে। আর সে কারণেই আমি জনপ্রতিনিধির মানদণ্ড ঠিক করতে গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের কথা বলছি। এটি আমাদের গণতন্ত্রের জন্যও দরকার। গণতন্ত্র সফল হওয়ার জন্য কিছু পূর্বশর্ত আছে, যেগুলো আমাদের গণতন্ত্রে নেই।

গণতন্ত্র সফল করার জন্য জনগণকে ইস্যু বুঝতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকায় জনগণের প্রায় শতভাগ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তারা ইস্যু বোঝে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের মতামত দিতে পারে। তাই আমরা দেখি সরকার কোনো ইস্যুর সমাধান করতে ব্যর্থ হলে জনগণ সেই সরকারকেই পরিবর্তন করে ফেলছে। ব্রিটেনের উইন্সটন চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দেন। তিনি ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির লোক। কিন্তু ১৯৪৭ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান। মানুষ তাকে ভোট দেয়নি। এর মানে হলো তুমি যুদ্ধে জিততে পারলেই যে জনগণকে সুখে রাখতে পারবে সেটি ঠিক না। তাই জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

তাই বলছি, গণতন্ত্র সফল করতে হলে এর পূর্বশর্তগুলো পূরণ করতে হবে। কে দরদি আর কে দরদি নয়, কে জনজীবনকে বিপন্ন করবে আর কে করবে না সেটা খুঁজে বের করার সময় এসেছে এখন। এই করোনা দুর্যোগের সময় পত্রিকায় দু-একটি ঘটনা দেখেছি যেখানে কোনো জনপ্রতিনিধি নিজের জীবন বিপন্ন করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ধর্ম-বর্ণও সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কারণ ১৬ কোটি মানুষের দেশে দু-একটা ঘটনা কোনো ফ্যাক্টর না। এগুলো ফলাও করে প্রচারেরও কিছু নেই। যদি হতো যে এমন এক শ’ ঘটনা ঘটেছে তা হলে বোঝা যেত সমাজ কিছুটা হলেও দরদি হয়েছে। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করব, যেন তিনি জনপ্রতিনিধির সংজ্ঞা ঠিক করে দেন।

অন্য দিকে বিএনপি তো নির্বাচনের জন্য ঐক্যফ্রন্ট করেছিল। এখন সেই ফ্রন্ট কোথায়? এই করোনা মহামারীর সময় কেন তারা কোনো ঐক্যফ্রন্ট করতে পারছে না। তারাও তো বলেছিল, নির্বাচিত হলে দেশকে সমৃদ্ধ করবে। কিন্তু এখন লাখ লাখ মানুষ বেকার, আয় রোজগার হারিয়ে পথে বসেছে, তাদের জন্য তারা কী করছে? আমার মতে, করোনা মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করা গেলে সেটি সবচেয়ে সময়োপযোগী হতো। প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগ নিতে পারতেন। উদ্যোগ গ্রহণের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এই মহামারীর বিনাশ কিভাবে হবে কেউ তা জানে না। এখনো এর কোনো প্রতিষেধক পাওয়া যায়নি। প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হলেও তা আমাদের মতো গরিব দেশের হাতে পৌঁছতে কত সময় লাগবে তাও আমরা জানি না। তাই এই বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি আমাদেরই নিতে হবে। ঐক্য থাকলে প্রস্তুতি মজবুত হবে, তা না হলে হবে না।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলোÑ আমলাদের দিয়ে ত্রাণ বিতরণ। তারা নাকি ত্রাণ বিতরণের কাজ সমন্বয় করছেন। এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, কথিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর খোদ সরকারেরও আস্থা নেই? এটি আমাদের দেশের জন্য লজ্জার। এটা আমাদের গণতন্ত্রের জন্যও লজ্জার। আমলা তো চাকরি করেন। তার চাকরির ভয় আছে। তিনি আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ত্রাণ দেবেন। তিনি বিবেচনা করবেন কোন দলকে দিলে সুবিধা হবে, কোন দলকে না দিলে অসুবিধা হবে, সেটা। ক্ষমতাসীন দলকে না দিলে চেয়ারে থাকা যাবে না। আবার বিরোধী দলকে না দিলে তারা তার নাম কালো তালিকাভুক্ত করবে। আমলা তো থাকবেন উভয় সঙ্কটে। মাঝ থেকে দেশের সাধারণ ও যারা সত্যিকারে ত্রাণ পাওয়ার উপযুক্ত তারা বঞ্চিত হবে।

আমাদের সমাজে যারা বিত্তশালী, ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন তারা কোনো না কোনোভাবে সমাজের কাছে ঋণী। এই উপলব্ধি থেকেই ৩৩ বছর বিদেশে অনেক উচ্চ পদে চাকরি করার পরও আমি দেশে ফিরে আসি, যদি সমাজের কাছে আমার এই ঋণ থেকে কিছুটা মুক্ত হওয়া যায়। এই সমাজে যে বেড়ে উঠছে, আমরা যাকে জনপ্রতিনিধি বানাচ্ছি তারও, কিন্তু সামাজিক ঋণ রয়েছে। নানাভাবে এই সামাজিক ঋণ সৃষ্ট। সে যে প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে তার পেছনে সরকার যে ভর্তুকি দিয়েছে তার বড় অংশ এসেছে গরিব চাষি, দিনমজুর, কিংবা রিকশাচালকের কাছ থেকে। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ করের মাধ্যমে। কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর সেই ঋণ পরিশোধের আরো বেশি সুযোগ ছিল তার সামনে। সে তো সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। জনপ্রতিনিধি করার আগে এদের ওরিয়েন্টেশন হওয়ার দরকার ছিল। আমরা সবাই সামাজিক ঋণে ডুবে আছি। আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী যদি এ কথাগুলো বলতেন তাহলে অনেকের মধ্যে আত্মোপলব্ধি ঘটত।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা

[email protected]


আরো সংবাদ

সকল