১১ জুলাই ২০২০

জাতিসঙ্ঘের ভেটো সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা

-

শুধু খায়েশ বা আকাঙ্ক্ষা থাকলেই কিছু হয় না, স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, সেইসাথে সামর্থ্য আর বিস্তর ইতিবাচক ও পুরাপুরি জানাশোনা থাকতে হয়। শুধু ক্ষোভ থাকলে যে কিছুই পাওয়া যাবে না তা আগেই বলা যায়। সৈয়দ আকবর উদ্দিন, ভারতের একজন পেশাদার আমলা ডিপ্লোম্যাট, গত ৩০ জুন অবসরে গেছেন। জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে থাকা অবস্থায় তিনি অবসরে গেলেন। আমলা চাকরিজীবীর দিকে তাকালে যত উপরের পদে আসীন হতে থাকেন ততই অশান্তি-অনিশ্চয়তা, কনুই মারামারিতে দিন কাটে তাদের। সেইসাথে একটা কথার সাথে ততই তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে, এটা হলো ‘কপাল’। সব প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের উপরে ভেসে থাকে এই ‘কপাল’। কপালে না থাকলে পোস্টিংয়ের ভাগ্যের চাকা ফিরবে না, তাই এসব বাক্যে ততই গভীর আস্থাভাজন হয়ে পড়তে থাকেন আমলারা।

এসব সমস্যা অন্যদের মতো আকবরের ভাগ্যেও ঘটেছিল ব্যাপকভাবেই। গত ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সর্বশেষ যখন ‘তিস্তাচুক্তি না হওয়া-খ্যাত’ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন আকবর ছিলেন, ভারতের ফরেন অফিসের নিয়মিত মুখপাত্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক আমলার লালিত স্বপ্ন থাকে শেষে বিদেশমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার। অনেকে হয়েছেনও। আর সেটি না হলেও অবসরে যাওয়ার আগে যদি সচিবও না হতে পারেন তবে ‘জীবনই বৃথা’- ধরনের অনুভূতি হয় তাদের। গত ২০১৩ সালের কংগ্রেসের দুই টার্মের সরকার সমাপ্তিপর্বে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতিতে সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠেছিল। পরের বছরে মোদি জামানার শুরুতে আমেরিকা ও ভারত উভয়েই প্রবল আগ্রহে দ্রুত সেটি কী করে মিটমাট করে নেয়া যায়, ফেরা শুরু করা যায় তা করতে উদগ্রীব থাকায় তা হয়েই গিয়েছিল। এ দিকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কও জটিল কন্ট্রাডিক্টরি ফ্যাক্টরে প্রায় সবসময়ই পরিপূর্ণ থাকে। দেখা যায়, এই দুই দেশের ক্ষেত্রেই ভারতের বেস্ট অবস্থান কী হতে পারে তা নিয়ে সবচেয়ে ভালো হোমওয়ার্ক করা ছিল সেকালের রাষ্টদূত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্করের। সেই সূত্রে তিনি মোদির চোখে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় ছিলেন। তাই তিনি পররাষ্ট্র সচিব হয়ে যান। আর অবসরের পর মোদির দ্বিতীয় টার্মের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। আর এসবের ঝাপটা লেগে ততই আকবর উদ্দিনের কপাল ঢলে পড়া। সচিব তিনি হতে পারেননি, তবে জাতিসঙ্ঘের ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে পেরেছিলেন; আর সেটিই ছিল তার শেষ পদবি।

ভারতের দক্ষিণের প্রাচীন ও বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’, ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে এর জন্ম। এই ‘দ্য হিন্দুর’ আমেরিকায় স্থায়ী সংবাদদাতা রাখার সামর্থ্য আছে, তিনি হলেন শ্রীরাম লক্ষ্মণ। আকবর উদ্দিনের অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে শ্রীরাম এক বড় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে প্রসঙ্গের ফোকাস জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া এবং এর সম্ভাবনা।

জাতিসঙ্ঘ কী? কেন এবং ইতিহাসের কোন পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিতে এর জন্মচিন্তা এসেছিল বা জন্ম দেয়া দরকার হয়েছিল ও এর জন্ম হতে পেরেছিল, তা জানা ও ব্যাখ্যা করতে পারা খুবই জরুরি। ভারতে এই কাজটা রাজনীতিবিদ তো বটেই, কোনো একাডেমিকও সম্যক বুঝেছেন ও এর তাৎপর্য বোঝাতে পারেন এমন খুব কমই দেখা যায়। এমনকি জাতিসঙ্ঘের ভবিষ্যৎ কী, তাতে আসন্ন কী অথবা এর সম্ভাবনা এবং লিমিটেশন কী, এসব নিয়ে কথা বলার মতো একাডেমিকও খুব বেশি পাওয়া যায় না। বলা যায়, ইউরোপের লেখা ইতিহাস এ ব্যাপারে আমেরিকার চেয়ে সবসময় পিছিয়েই থাকবে। এর মূল কারণ, ইউরোপের নেতাগিরি-কলোনিগিরি হারানোর দাসখত লিখে নিয়েই জাতিসঙ্ঘের জন্ম। তাই এর জন্মকে বেশি গ্লোরিফাই অন্তত আমেরিকার স্তরে করা সম্ভব ছিল না। আর এসব কিছুর প্রভাব পড়েছিল ব্রিটিশ কলোনি ভারতেও। ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা একাডেমিকও তাই জাতিসঙ্ঘের বৈশিষ্ট্য, তাৎপর্য, সম্ভাবনা ও লিমিটেশন সম্যক বুঝেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এমনকি নেহরু থেকে মোদি পর্যন্ত (ফাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রণব মুখার্জিও) ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা জাতিসঙ্ঘ নিয়ে কী বুঝেছেন, কী ধারণা রাখেন এর প্রমাণ জাতিসঙ্ঘের কাছে তারা কী চেয়েছেন, আশা করেছিলেন এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়ে আছে। এর সবচেয়ে ভালো আর স্থায়ী ও পোক্ত উদাহরণ হলো কাশ্মির ইস্যু, যা ভারতের কপালে অবুঝ বা না বুঝের লজ্জা হয়ে রয়েছে।

আলোচ্য সাক্ষাৎকারে আকবর উদ্দিনও ভারতকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ দেয়ার দাবি করেছেন, যুক্তি তুলে ধরেছেন। কিন্তু কার কাছে? স্থায়ী সদস্যপদ কী কারো কাছে দাবি করতে হয়? অথবা খোদ সদস্যপদ জিনিসটাই কী কারো থেকে দাবি করে নেয়ার বিষয়? তাহলে আরো গোড়ার প্রশ্ন, জন্মের শুরুতে জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্যপদ যারা পেয়েছিলেন তারা কার কাছে দাবি করে পেয়েছিলেন? এমনকি তাদের সদস্যপদ অর্জন করার ভিত্তি কী ছিল? সেটি কি একালের আকবরসহ সেকালের নেহরুরাও জানতেন?

প্রণব মুখার্জির কথা জুড়ে দিলাম এ জন্য যে, তিনিও ভারতের জাতিসঙ্ঘের ইতিহাসবোধ কোন পর্যায়ে এর মস্ত উদাহরণ। গত ২০০৯ সালে শুরু হওয়া আওয়ামী রাজত্বের বর্ষপূর্তিতে পরের বছর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী প্রথম ভারত সফরে গেলে সেটি ছিল প্রধান ‘বাংলাদেশ ডিলার’ মন্ত্রী প্রণবের ফসল বোনার লাভালাভ বুঝে নেয়ার সময়। তখন প্রায় ৫০ দফার এক যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল- ‘বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ দাবি সমর্থন করছে’। তবে আজো জানি না আমরা কেন সমর্থন করেছিলাম, কী পেতে। তার চেয়ে বড় কথা, আমরা যেন হলাম ‘ঘরে বেঁধে রাখা প্রিয় মুরগি’, যখন খুশি যাকে খাইয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমাদের এই সমর্থনের ওজন আর কতটা? কাজেই এটাতে ভারতের লাভ কী হয়েছে আমরা জানি না। তবে জাতিসঙ্ঘ সম্পর্ক প্রণব মুখার্জির জানাশোনা কেমন এতে তা প্রকাশ পেয়েছিল। এর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের মাত্রা ছড়িয়েছিলেন।

জাতিসঙ্ঘ হলো গত শতকের চল্লিশের দশকে বসে ‘আমেরিকান সেঞ্চুরি কায়েম’- এমন এক হবু দুনিয়া সম্পর্কে আমেরিকার স্বপ্ন, আইডিয়া ও ইমাজিনেশনের প্রকাশ; আর বিশেষ করে তা ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আইডিয়া। আর ইউরোপের সাথে এই আইডিয়ার সম্পর্ক হলো- ইউরোপ এর সাথে একমত হয়ে গেলে, মানে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিলে হিটলারের হাতে বেঘোরে মারা যাওয়া এবং সমূলে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার একটা পথ হতে পারে। এ কারণে জাতিসঙ্ঘ জন্মের প্রধান তাৎপর্য হলো, মার্কিন নেতা ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সাহায্য পাওয়ার লোভে ইউরোপ হিটলারকে পরাজিত করার পরবর্তী দুনিয়াতে নিজেদের কলোনি দখল-ব্যবসা ত্যাগ করবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু জওয়াহের লাল নেহরুসহ ভারতীয় রাজনীতিবিদরা না এই ফ্যাক্টস জেনেছিলেন বা এর তাৎপর্য বুঝেছিলেন। এ নিয়ে এখনো কোনো মহলের স্টাডি আছে বলে জানা যায় না। তবে অজানা থাকার বড় প্রমাণটা হলো- ভারতের এখনো কাশ্মিরকে ভারতের বলে দাবি করার ভিত্তি তদানীন্তন রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর, তিনি অ্যাকসেশন (ভারতে অন্তর্ভুক্তি হতে দলিলে স্বাক্ষর) চুক্তিতে স্বাক্ষর দেয়া। জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি যে নীতি বা বাক্যের ওপরে দাঁড়ানো সে মূলনীতি অনুসারে, রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর মূল্যহীন বা কাশ্মিরের হয়ে কথা বলার আসল বা বৈধ কোনো অথরিটিই তিনি নন। কারণ, নীতি অনুসারে- যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগোষ্ঠী সম্মিলিত মতামতই একমাত্র অথরিটি যারা বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করবে তারা কিভাবে শাসিত হতে চান, কোথায় যুক্ত হতে চান অথবা আলাদা থাকতে চান কিনা।

সার কথাটা হলো- কলোনিমুক্তিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘের ভিত্তিনীতি জানে না বা সে অনুসারে আমল করেনি। তাই, ১৯৪৮ সাল থেকে কাশ্মির দখল করে আছে অথচ প্রধানমন্ত্রী নেহরু নিজেই জাতিসঙ্ঘের কাছে মীমাংসা করে দিতে ইস্যুটা নিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ জাতিসঙ্ঘ নিজের জন্মভিত্তি অনুসারে কাশ্মির ইস্যু মীমাংসার জন্য গণভোট করার রায় দিয়েছিল। অর্থাৎ, জাতিসঙ্ঘ যে এমন রায়ই তো দেবে, নেহরু এটা জানতেনই না। মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মনীতি তার জানা ছিল না বলেই তো তিনি জাতিসঙ্ঘে গিয়েছিলেন। সেই থেকে জাতিসঙ্ঘ সংক্রান্ত ‘বুঝাবুঝি’ সারা ভারতের একাডেমিক, রাজনীতিবিদসহ সবার কাছে ‘নিজের চায়ের কাপ নয়’ হয়ে আছে। অর্থাৎ, কথিত দেশপ্রেম যেটা আসলে হিন্দু-জাতিপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া, গড়াগড়িতে ডুবে আছে বা বলা যায়, সব চিন্তাভাবনা তলায় চাপা পড়ে আছে। কারণ জাতিসঙ্ঘের ভিত্তি বুঝতে গেলে নিজ দেশের কাশ্মির নীতি ভুল এবং তা জাতিসঙ্ঘের মূল নীতিবিরোধী বলে অবস্থান নিতে হবে।

মজার কথা হলো- ওই জাতিসঙ্ঘেরই স্থায়ী ভেটো সদস্যপদ লাভের জন্য ভারত প্রবল আকাঙ্ক্ষী। যত তীব্র তার আকাঙ্ক্ষা, ততই তীব্র ও গভীর তার অজানা হলো- ভেটো সদস্যপদ পাওয়া যায় কী করে! জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ওই পাঁচ রাষ্ট্র তা পেয়েছিলই বা কী করে, তা কখনো জানা হয়নি।

‘সরি আকবর উদ্দিন! আপনিও ফেল করলেন’। কারণ তিনি ওই সাক্ষাৎকারে দাবি করছেন, যেহেতু ভারত দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ, তাই তাকে ভেটো ক্ষমতা বা স্থায়ী সদস্যপদ দিতে হবে। বোঝা গেল, হোমওয়ার্ক করেননি। তাই ফেল করলেন। সবার আগে জানতে হবে, ওই পাঁচ রাষ্ট্র স্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছিল ঠিক কিসের ভিত্তিতে। আপাতত আকবরের কথা ভারতের কারো কাজে লাগবে না, হিন্দুত্বের মোদির কাছেও না। সুতরাং তার কপাল আর খুলবে না।
আসলে যদি কখনো আবার দুনিয়ার নেতৃত্ব চেঞ্জ হয়, কখনো নতুন করে বা সংস্কারে আর একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়, সর্বোপরি গ্লোবাল পলিটিক্যাল নতুন কিছু কমন ভিত্তি তৈরি হয়, তবেই এমন কোনো পরিবর্তন হতে পারে। এর আগে কিছুই ঘটবে না। আর তত দিনে ক্রমেই ভারতের সংহতি টিকে থাকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকবে। সেটি সামলে ভারত টিকে থাকতে পারবে কি না, এটাই তার চ্যালেঞ্জ। মুরোদ থাকলে নতুন করে ভারতের সবাইকে ইনক্লুসিভ এক রাজনৈতিক ভিত্তি খাড়া করে ভারত গড়তে পারে কি না দেখা উচিত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ