০১ জুন ২০২০

ঢাকার বায়ুদূষণ ও করোনার বিস্তার

-

বিশ্বের অধিক বায়ুদূষণ মাত্রার শহরগুলোতে দূষণ কমে এলেও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকা শীর্ষে উঠে এসেছে। বায়ুদূষণ শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসও বায়ুদূষণের কারণে দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করতে পারে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। এ ছাড়াও বায়ুদূষণ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ ও অ্যালার্জির অন্যতম অনুষঙ্গ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১২ সালে বায়ুদূষণে বিশ্বে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পরে এই মৃত্যু হার প্রতি বছর গড়ে ৯ মিলিয়নে পৌঁছেছে। আর এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

সম্প্রতি করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই টালটামাল অবস্থা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, করোনা মহামারী প্রকট আকার ধারণ করছে। চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে গত ডিসেম্বর মাসে প্রাদুর্ভাব হয় করোনাভাইরাসের। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। আমাদের দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুধু দেখা দেয়নি, বরং তা রীতিমতো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার এটি নিয়ন্ত্রিত বললেও বেসরকারি সূত্রগুলো অবশ্য এ বিষয়ে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করছে। সরকারি হিসাব মতে, এ পর্যন্ত আমাদের দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন পাঁচজন। মৃতের সংখ্যা তিন। করোনার বৈশ্বিক পরিসংখ্যান হলো মোট আক্রান্ত দেশ ১৭৩, আক্রান্ত মানুষ তিন লাখ ৬০ হাজার ৬৯৭ জন এবং প্রাণহানি ১৫ হাজার ৪৮৮ জন। (সূত্র-প্রথম আলো, ২৪/৩/২০)

করোনা আতঙ্কে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে গণমানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় লকডাউনসহ সরকারি অফিস বন্ধ ও সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকার নগরজীবনেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। করোনা আতঙ্কে গোটা বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ নিজ ঘরে অবরুদ্ধ। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় রাস্তাঘাট ও কলকারখানাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের ব্যস্ততা কমে যাওয়ায় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে জানা গেছে। একই সাথে কার্বন নিঃসরণ কমেছে ব্যাপক হারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম দূষিত বায়ু ও কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বায়ুর মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু আমাদের ঢাকা নগরী। স্রোতের বিপরীতে এখানে বায়ুদূষণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ঢাকা এখন বিশ্বের শীর্ষ বায়ুদূষণের শহরের তকমা পেয়েছে। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়াল ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা নাসার পর্যবেক্ষণে এই অনাকাক্সিক্ষত চিত্রই উঠে এসেছে।

সম্প্রতি এয়ার ভিজ্যুয়ালের প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, গত ২২ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ঢাকা শহর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে। কিন্তু কোনোভাবেই এ অবস্থার উন্নতি ঘটছে না। বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে ধুলোবালু। এর মধ্য দিয়ে করোনাভাইরাসের জীবাণু সহজে ছড়িয়ে পড়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ধূলিকণা মুখে গেলে মানুষ যত্রতত্র থুথু ও কফ ফেলে। আর তা ধুলার সাথে মিশে হাতসহ নানা মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। ঢাকার বায়ুদূষণ মাত্রা যেভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে করোনাভাইরাস যেকোনো মহূর্তে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) সম্প্রতি ঢাকার ধুলাদূষণ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, ঢাকা শহরের গাছপালায় প্রতিদিন ৪ দশমিক ৩৬ মেট্রিক টন ধূলিকণা জমছে। সে হিসেবে মাসে ১৩ হাজার মেট্রিক টন ধুলা জমা হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এই জমে থাকা ধুলা দিনের বেলা বাতাসের সাথে মিশে যেমন দূষণ বাড়ায়, তেমনিভাবে রাতে গাড়ির অতিরিক্ত গতির সাথে বাতাসে উড়তে থাকে। সঙ্গত কারণেই দিনের বেলা থেকে রাতের বেলা বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায় আশঙ্কাজনকভাবে। ঢাকার চারটি উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির ৭৭টি গাছের পাতা সংগ্রহের পর ফেব্রুয়ারি মাসে এই গবেষণা পরিচালনা করে ক্যাপস।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ধুলার মাধ্যমে ঢাকায় যাতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে না পড়তে পারে, দ্রুত সেই ব্যবস্থা নিতে তারা সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ গত সপ্তাহ থেকেই ঢাকার বায়ুদূষণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রধান শহরগুলোর বায়ুদূষণের সূচক ২০০-এর নিচে হলেও ঢাকায় বায়ুর মানের সূচক প্রায় ৩০০। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতিতে ঢাকায় যানবাহন ও গণজমায়েত কমলেও এখনো ইটভাটাগুলো চালু রয়েছে। বড় অবকাঠামো ও অন্যান্য নির্মাণকাজও চলছে যথারীতি। সেগুলো থেকে বিপুল পরিমাণে ধুলা এসে রাজধানীতে জমা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের উল্লেখ করার মতো কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হচ্ছে ইটভাটা। এর পরই রয়েছে নির্মাণকাজের ধুলা, পরিবহন ও শিল্পকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া। বর্তমানে সারা দেশে আট হাজার ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৮৩৭টি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করেনি। আর পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই দুই হাজার ৫১৩টির। এই দুটি শর্তই পালন করেনি এমন ইটভাটা রয়েছে তিন হাজারেরও বেশি।

আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের হিসাব অনুযায়ী, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার দিকে বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা ছিল এক নম্বরে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল নয়াদিল্লি।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট এবং এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চÑ চলতি মাসে তাদের পৃথক দুটি গবেষণাপত্রেও ঢাকায় বায়ুদূষণের মারাত্মক ঝুঁকির কথা প্রকাশ করেছে। জানুয়ারি মাসের পর ঢাকার বায়ুদূষণমাত্রা কিছুটা ওঠানামা করলেও এখন শুধু শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেনি বরং তা এখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বলেই পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, তীব্র যানজট, মেয়াদোত্তীর্ণ মোটরযান ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ভারী ধাতু ধুলার সাথে যোগ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে রাস্তাঘাট বা খোলা স্থান ছাড়াও বাড়িঘর, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠেও বাতাসে ক্ষতিকর অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় ঢাকার রাস্তার ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাটিতে যে মাত্রায় ক্যাডমিয়াম থাকার কথা, ধুলায় তার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আর নিকেল ও সিসার মাত্রা দ্বিগুণের বেশি। খুব সহজেই এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ত্বকের সংস্পর্শে আসছে; শ্বাসপ্রশ্বাস, খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁঁকির মধ্যে পড়ছে নগরবাসী, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে শরীরে বাসা বাঁধছে ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগবালাই।

গবেষকরা বলছেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে বায়ুদূষণের মাত্রা আরো ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছবে। আর পানিদূষণ, মাটিদূষণ, বায়ুদূষণও চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
মূলত তিন কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে বলে সরকার পক্ষে দাবি করা হচ্ছে। সেগুলো হলোÑ ইটভাটা, মোটরযানের কালো ধোঁয়া এবং যথেচ্ছ নির্মাণকাজ।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ঢাকার বায়ু ও শব্দদূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে একটি সভাও করেছে বলে জানা গেছে। সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো, বিভিন্ন কাজ এবং ইউটিলিটি সার্ভিসের কাজের জন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে সভায় সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেস-হাইওয়েসহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি শহরের বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণের সময় পানি ছিটানো, যন্ত্রপাতি যত্রতত্র ফেলে না রাখা ও নির্মাণের ক্ষেত্র নির্ধারিত বেষ্টনীর মধ্যে আছে কি না তা দেখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো খুবই চমৎপ্রদ ও ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় গোটা দেশই এখন ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে পড়েছে।

উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের কারণে ঢাকায় করোনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস ঢাকা নগরীতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে।হ
[email protected]

 


আরো সংবাদ