০৭ জুলাই ২০২০

কোভিড-১৯ ও ‘এলজিবিটি’

কোভিড-১৯ ও ‘এলজিবিটি’ - সংগৃহীত

কোভিড-১৯ মহামারী মানবসভ্যতার জন্য এক মহাবিপদ সঙ্কেত। পশ্চিমা দেশগুলোতে জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো সমকামী ও হিজড়া এলজিবিটি কমিউনিটি-সদস্যদের সতর্ক করছে। বলছে, তারা এ ভাইরাসের আক্রমণের প্রথম শিকার হবে। এলজিবিটি গোষ্ঠীর বেশির ভাগ সদস্য ধূমপান করে; এ জন্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বেশি উদ্বিগ্ন। ১০০টি জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে যে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রথমেই আক্রান্ত হবে, এটা এক প্রকার নিশ্চিত। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তারা জানিয়েছে, এলজিবিটি সদস্যরা ৫০ শতাংশ বেশি হারে ধূমপান করে; তাই কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের খুব তাড়াতাড়ি মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওই গোষ্ঠীর ভেতর এইচআইভি ও ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্য বেশি। অতএব নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক বিপজ্জনক হবে। এলজিবিটি ক্যান্সার নেটওয়ার্ক জানায়, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ৩০ লাখ এলজিবিটি। এরা সবাই যথেচ্ছ যৌন জীবনযাপনের ইস্যু নিয়ে জীবনযাপন করে। এদের ভোগবাদী সুবিধা প্রদান, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ, পছন্দমতো বেড়ানোর জায়গা, পছন্দের পোশাক সরবরাহ করার জন্য সার্ভিস প্রোভাইডাররা নিয়োজিত আছে।

এলজিবিটি সদস্যরা দেখা হলেই বিশেষ করে কোনো অনুষ্ঠান বা জমায়েতে চুমো খাওয়াটা ঐতিহ্যগত বা ‘বাধ্যতামূলক’। এখন আওয়াজ উঠেছে এটা বন্ধ করার জন্য। বলা হচ্ছে, দূরে থাকলে করোনা ছড়ানোর মাধ্যম নষ্ট হয়। ‘হু’ কর্মকর্তারা চুম্বন বা লা বাইস, হাইফাইভ ও হ্যান্ডশেক না করার জন্য সতর্কতা জারি করেছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশবাসীকে এসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। করোনাভাইরাস কমিশনার ‘একে অপরের সংস্পর্শে না আসা’র নির্দেশনা জারি করেছেন। এই নির্দেশ মান্য করা এলজিবিটি সদস্যদের জন্য বড় কঠিন। কেননা এসব কিছু পশ্চিমা সমাজের সংস্কৃতির বাহন ও সামাজিক নিয়ামক। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব নিয়ম গে বা সমকামী সংস্কৃতি থেকে সাধারণের মাঝে বেশি সংক্রমিত হয়েছে। এ জন্য সমাজের অভিভাবক শ্রেণী উদ্বিগ্ন।
চিকিৎসক স্কট নাস কয়েক মাস ধরে তার এলজিবিটি রোগীদের ওপর নজর রাখছেন, বিশেষ করে কোভিড-১৯ কিভাবে এই রোগীদের ওপর বা পুরো গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে তার উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। তিনি দেখেন যে, এই কমিউনিটিতে এইচআইভি ও ক্যান্সার আক্রান্তের হার বেশি।

কোভিড-১৯ ছড়ানো শুরু করলে কর্তৃপক্ষ দূরত্ব রক্ষা করে চলার, বাড়িতে বা পৃথকভাবে থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে যাতে ছোঁয়াচে এই রোগ সহজে বিস্তার লাভ করতে না পারে। কিন্তু এলজিবিটি অনেকটা বেয়াড়া ধরনের। যারা সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে চায় না। ফুর্তির জীবনযাপনে অভ্যস্ত এসব লোক বিধিবিধানকে তেমন তোয়াক্কা করছে না।
প্রাইড প্যারেড যা প্রাইড মার্চ ও প্রাইড ফেসটিভাল নামে পরিচিত। লেসবিয়ান, গে, উভকামী, বহুগামীসহ নানা ধরনের মানুষ এলজিবিটিতে রয়েছে। এরা সম্মিলিতভাবে আগামী জুনে প্যারেডের আয়োজন করবে। প্যারেডে গোষ্ঠীর আইনি অধিকার ও সম্মানের দাবিও প্রচার করা হয়। বার্ষিক এ প্যারেড বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। নতুনদের অনুষ্ঠানে ঘটা করে স্বাগত জানানো হয়। চলতি বছর জুনে লন্ডনেও প্যারেড হওয়ার কথা। এসব অনুষ্ঠান জুন মাসেই হয়ে থাকে। লাখো মানুষের পদচারণায় এই প্যারেডে নাচ, গান, উলঙ্গ নৃত্যের ছড়াছড়ি। যৌনতাহীন লোকজনেরও কমতি নেই। তারা ইংরেজি ‘এ’ চিহ্ন লাগিয়ে রাখে যেন ‘টানাটানির শিকার’ না হয়।

ইতালিকে ‘এলজিবিটির স্বর্গরাজ্য’ বলা হয়। ইতালির দ্বীপ সিসিলিতে জাঁকজমকভাবে প্যারেড উদযাপিত হয়। প্যারেডগুলো তিন দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। কিন্তু সিসিলির প্যারেড পুরো গ্রীষ্মকালব্যাপী। এই আমোদফুর্তির গরমে পুরো ইতালিতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ইতালির পালেরমোকে ‘গে-ফ্রেন্ডলি’ শহর বলা হয়। এলজিবিটি পর্যটনের জন্য এর আলাদা বৈশিষ্ট্য। এখানে আলাদা গে ভিলেজ রয়েছে যার আকর্ষণে পুরো ইউরোপের লোকজন ছুটে আসে।

রোম গে প্যারেডও বেশ নাম করা। যদিও এখানে ভ্যাটিকান রয়েছে, ধর্মকর্মও করা হয়, তার পরও প্রতি বছর জুনে আড়ম্বরপূর্ণ সমকামী প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর ৬ জুনের নানা অনুষ্ঠানমালাসহ প্যারেডকে ঘিরে এটা মেলার নগরে পরিণত হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ১৯৯৪ সালে এখানে প্রথম প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে থেকে ফি বছর অনুষ্ঠানের আকৃতি ও আয়োজন বাড়ছেই। ২০০০ সালে বিশ্ব প্যারেড রোমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা সপ্তাহখানেক চলেছে। বিশ্বের ৪০টি দেশ থেকে এখানে গে অ্যাকটিভিস্টরা ভিড় জমায়। তখন ৭০ হাজার এলজিবিটি অনুষ্ঠানকে ‘মোহময়’ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। রোমের প্যারেড ২০১১ সালে আবারো সাড়া ফেলে। তখন ইউরোপ্রাইড এই শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। লেডি গাগা গান ও ‘বিরল দেহ ভঙ্গিমা’ করে অনুষ্ঠান মাতিয়ে তোলে। এ বছর রোম প্যারেডের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জুনের ৮ তারিখ পিয়াজ্জা ডেল্লা রিপাবলিকা থেকে জমকালো র্যালি বের করা হবে। ড্যান্স, গান, কান ফাটানো মিউজিকের আয়োজন করা হয়। একটি রাস্তা আছে, নাম রোম গে স্ট্রিট, যেখানে নাচ-গানের মাত্রা তীব্রতর। প্লাস্টিক কাপে মদের ককটেল সরবরাহ করা হয়।

জার্মানির বড় বড় শহরে প্যারেড হয়। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, কলোন গে উৎসবের জন্য উল্লেখযোগ্য। বার্লিনে ২৫ জুলাই প্যারেডের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী ২৭ জুন ও জুনের শেষ দিকে এসব শহরে ‘গে প্যারেড’ হবে। প্যারিস প্যারেডের তারিখ ২৭ জুন। জার্মানিতে এই অনুষ্ঠানকে সিএসডিও বলা হয়। ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে। এখানেই সর্বাধিক সমাবেশ ও হই চই হয়ে থাকে। সমাবেশকে ঘিরে গে হোটেল, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, বার, ক্লাব ও পার্টি, ক্রুজিং, সিনেমা হল, গানের আড্ডা, শপিং প্রভৃতির প্রয়োজন হয়।
নিউ ইয়র্ক ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় সেন্ট প্যাট্রিক ডে প্যারেড। এটা গে প্যারেড নয়। শুধু নিউ ইয়র্কে ২০ লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হয় প্যারেড দেখতে। এক লাখ ৫০ হাজার নৃত্য-গীতে অংশ নেয়। নানা রঙের পোশাক পরিধান করলেও সবুজের সমাহার বেশি। মূলত এটি খ্রিষ্টানদের একটি অনুষ্ঠান। করোনার প্রভাবে দেশে দেশে এই দিবস উদযাপন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১৭৬২ সালের পর এবারই প্রথম দিনটি উদযাপিত হলো না।

বছরের পর বছর এলজিবিটির লোকজনকে সব দুর্যোগ ও মহামারীর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে। সেটি প্রাকৃতিক হোক বা মানুষের সৃষ্ট হোক। এখন করোনা মহামারীর জন্যও এই গোষ্ঠীকেই দায়ী করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ধর্মীয় নেতা এবং ইসরাইলের ক্ষমতাধর যাজক ঘোষণা দিয়েছেন যে, সমকামিতার অপরাধ ও পাপের দরুণ স্রষ্টা এই ভাইরাস পাঠিয়েছেন। নভেল করোনাভাইরাসের উৎস ও উৎপত্তি কিভাবে হলো তা নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করলেও ধর্মপ্রচারকগণ ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছেন। পাদ্রী স্টিভেন অ্যান্ডরু এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টান চার্চের পাদ্রী বলেন, ‘ঈশ্বরের ভালোবাসা পেতে হলে অনুতপ্ত হতে হবে।’ ‘বাইবেল বলেছে, সমকামিতায় আত্মা মরে যায়। ঈশ্বর এলজিবিটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করবেন।’ গত সপ্তাহে এক শোতে প্রোটেস্ট্যান্ট মন্ত্রী আর্ল ওয়াকার জ্যাকসন বলেন, ‘সমকামী মুভমেন্ট’ না বলে এদের ‘সমকামী ভাইরাস’ বলা উচিত। বিশ্ব ইতিহাসে এরা সব সময়ই ধিকৃত। এরা সমাজব্যবস্থার শত্রু এবং পরিবারব্যবস্থার শত্রু।’ তারা যুক্তি দেখান, আমেরিকায় ২০১২ সালে হ্যারিকেন স্যান্ডি আঘাত করেছিল এবং ওই বছরেই নিউইয়র্কে ‘গে ম্যারেজ’ বৈধতা পায়। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ‘রাব্বি’ তখন মারাত্মক হ্যারিকেনের আক্রমণকে ‘ঐশ্বরিক বিচার’ বলে প্রচার করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় সমকামিতার প্রতি নমনীয়তার কারণে ১৯৭৮ সালে খরার তাণ্ডব হয়েছে বলে রাব্বীরা প্রচার করেছেন। ইসরাইলের রাব্বী মীর মাজুজ বলেন, ‘মানুষের খারাপ কর্মফলের কারণে করোনার বিস্তার ঘটেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রাইড মার্চ প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ। কেউ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি তার ওপর প্রতিশোধ নেয়।’ মাজুজের এ বক্তব্য ইসরাইলি দৈনিক পত্রিকা ‘ইসরাইল হাইউমে’ ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। জুনে সানফ্রানসিসকোতে ২০২০ সালের প্যারেড ঘটা করে অনুষ্ঠানের চিন্তা করছেন আয়োজকরা। নিউ ইয়র্ক সিটিতেও আয়োজন করা হবে এমন প্যারেড। ১৯৭০ সাল থেকে মূলত নিউ ইয়র্কে ও ইউরোপের বড় বড় শহরে প্রাইড প্যারেড চলে আসছে। ডেনমার্ক ও সুইডেনে আগামী বছর জাঁকজমকভাবে প্যারেড হওয়ার কথা। তবে পশ্চিমাদের অনেকে এই সমাবেশকে বড় পাপের সমাবেশ মনে করেন। এরা রঙধনুর সাত রঙের পতাকাকে নিজেদের পতাকা হিসাবে বেছে নিয়েছে।

মার্চের ২৫ তারিখ থেকে গত ১৫ দিন পাশ্চাত্যের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ১২ শতাংশ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ। এখনো কোনো ওষুধ এই মহামারী রোধে সফল হয়নি। বড় বড় শহর-নগরগুলো আস্তে আস্তে যেন ঘুমিয়ে পড়ছে। তবে মৃত্যু, যন্ত্রণা ও উদ্বেগ নিয়েও আশার আলোকবর্তিকার সন্ধানে মানুষ ছুটছে। হ
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ