৩০ মে ২০২০

চলছে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মহামারী

-

“বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ”, লিখেছিলেন কবি। এটি এক চরম বাস্তবতা আমাদের সমাজের। দেশে আইনের শাসন নেই- এ অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। চলছে ব্যক্তির শাসন এবং ব্যক্তিটি যাদের দ্বারা দেশব্যাপী শাসনকার্য পরিচালনা করেন তাদের ক্ষমতা এখন আকাশছোঁয়া যা প্রয়োগে তারা প্রায়ই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সীমা লঙ্ঘন এখন চরম পর্যায়ে চলে গেছে। ক্ষমতা প্রয়োগের সীমারেখা এখন পাবলিক পারসেপশনের ধার ধারে না। গণমানুষ ক্ষমতাধারীদের এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগকে সমর্থন করুক বা না করুক, এতে ক্ষমতাধারীদের কিছু আসে-যায় না। কিন্তু ক্ষমতাধারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার যার অ্যাকাউন্ট থেকে গণ-আস্থা ডিডাক্ট হওয়ার কথা তা সঠিকভাবেই ডিডাক্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে ব্যালান্সশিট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত যার নামে অ্যাকাউন্ট তিনি টের পাচ্ছেন না, টের যদি পেয়েও থাকেন, তার বোধোদয় হচ্ছে বলে মনে হয় না। জনগণ যদি গোপন কক্ষে স্বাধীনভাবে ব্যালটে সিল মারার সুযোগ পায় তবেই ব্যালান্সশিট চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পাবে, যা এর আগে অনেক স্বৈরশাসকের বেলায়ই হয়েছে।

বিরোধী দলের নেতাকর্মীর পক্ষে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত বা রায় দিলে দুদক তৎক্ষণাৎ সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেটা যেকোনো আদেশই হোক, শুধু বিরোধী দলের পক্ষে গেলেই হলো। অতি সম্প্রতি দুদকের দায়ের করা মামলায় সরকারি দলের সাবেক এমপি এবং পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তার স্ত্রী জেলা মহিলা লীগ সভানেত্রী জামিন না দেয়ায় জেলা জজকে বদলি করে একই দিনে ভারপ্রাপ্ত জজকে দিয়ে জামিন করার ব্যবস্থা নিলেন আইন ও বিচারমন্ত্রী এবং এ মর্মে মন্ত্রী যে সাফাই দিয়েছেন তা শিশুদের মন ভুলাতে পারে, কিন্তু কোনো বিবেকবান মানুষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে না। এটি আমার নিজস্ব ধারণা, যা জোরগলাতেই আমি বলতে চাই। দুদকের মামলায় সস্ত্রীক আওয়ামী লীগ এমপিকে জামিন না দিয়ে পিরোজপুর জেলা জজ কী ভুলটি করেছে তা কিন্তু আইনমন্ত্রীর সাফাই গাওয়া পূর্ণ বক্তব্যে পাওয়া যায় না। দুদকের মামলায় বিএনপি নেতাদের অহরহ জামিন বাতিল হচ্ছে, মানহানির মতো জামিনযোগ্য মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিনের জন্য হাইকোর্ট পর্যন্ত আসতে হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগ নেতার জামিন হলেও দুদক এ জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। এখানেই দুদকের পক্ষপাতিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সরকারি দলের জন্য আইনের প্রয়োগ একভাবে এবং একই আইন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ ভিন্নভাবে হলে, এটা কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? অন্য দিকে জেলা জজ যদি এমপি-মন্ত্রীদের ক্রীড়নক বা গিনিপিগের মতো ব্যবহৃত হয় তবে বিচার বিভাগের মানসম্মান থাকে কোথায়? বিচার বিভাগের একজন অভিভাবক রয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। এ ছাড়াও তাদের অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। প্রসঙ্গে বর্ণিত বিষয় নিয়ে অভিভাবক বা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্রতিবাদ করা হয়নি। তবে কি আসামি সরকারি দলের এমপি হওয়ার কারণেই এ হীনম্মন্যতা!

সরকারি আমলাদের এখন একমাত্র কাজ হলো সরকারপ্রধানের গুণকীর্তন এবং জনগণকে শোষণ শাসন। স্বদেশী আন্দোলনের নায়ক সুভাষ বোসকে রিমান্ডে নিয়ে ব্রিটিশ কর্মচারী ভারতীয় পুলিশ যে আচরণ করেছে, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি কর্মচারী বাঙালি পুলিশ রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি করে যে ভাষায় আইনি সাফাই গেয়েছে, সে একইভাবে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই সংগ্রাম করা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর বাংলাদেশী পুলিশ একই আচরণ করেছে। রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয়েছে, সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের আচরণগত নির্যাতন থেকে গণমানুষ রক্ষা পাচ্ছে না। ফলে স্বাধীনতার সুফল আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাই খেয়ে ফেলছে।

ক্যাসিনো সমাচার, টাকার গোডাউন আবিষ্কার, হোটেল ওয়েস্টিন কেলেঙ্কারির ঘটনা ধামাচাপা পড়তে না পড়তেই গাজীপুরের সরকারি দলের নারীনেত্রী কর্তৃক প্রকাশ্যে নারী পুলিশকে চড় মারার কাহিনী প্রকাশিত হলো। সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠিন কঠিন আইন প্রণয়ন করলেও সরকারি দলের বিরুদ্ধে এ আইন প্রয়োগ নহে মানসিকতার কারণেই নারীনেত্রীর এ ক্ষমতার দাপট, যা দেখে দেখে পুলিশ অভ্যস্ত হলেও ভাগ্যদোষে প্রকাশ্যে রাজপথে হওয়ার বিধিবামের কারণে নারীনেত্রীকে জেলে যেতে হয়েছে, নতুবা চড় খাওয়া সে দুই পুলিশকেই বদলির আতঙ্কে থাকতে হতো। এর আগেও সরকারি দল কর্তৃক অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নাজেহাল এমনকি পিটুনি পর্যন্ত খেয়েছে, কিন্তু সে নেতাদের জেলে যেতে হয়নি, যেমনি হয়েছে নারীনেত্রীর ক্ষেত্রে। হোটেল ওয়েস্টিনের এ ঘটনা এক দিনের নয়, বরং দীর্ঘ দিনের প্র্যাকটিস। ঘটনার নায়িকা নরসিংদীর ওই মহিলা নেত্রী ও তার স্বামী যদি সরকারি দলের না হতো তবে নিশ্চয় ওই নষ্টা নারীর পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে ক্ষমতার এত দাপট দেখানো সম্ভব হতো না। এ ধরনের ঘটনার জন্য একজন নষ্টা নারী যেমন দায়ী, তেমনি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা একই দোষে দোষী হলেও অদ্যাবধি কোনো সরকারি আমলাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। এখানেই আইন প্রয়োগে পক্ষপাতিত্ব করে ক্ষমতার অপব্যবহার। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় কুড়িগ্রামের বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে এনে মাদক মামলায় এক বছরের বিনাশ্রম সাজা দেয়া হয়েছে। এ সাজা দিতে আইনের ব্যত্যয় তো ঘটেছেই, অধিকন্তু জেলা প্রশাসক ও আরডিসিসহ অন্য কর্মকর্তারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এমনিভাবে অর্থের বিনিময়ে পুলিশ অনেককেই মাদক দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে। দেশে মাদকের মহামারী চলছে, অভিযোগ আছে, কিছু পুলিশও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, মাদক বিষয়ে সরকারের মুখে জিরো টলারেন্সের কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছে এর ভিন্নতা। মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ এবং দেশে মাদক উৎপাদন বন্ধ করতে না পারলে মাদকের মহামারী ঠেকানো যাবে না, অন্য দিকে মাদক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর লোকের যেহেতু হাত রয়েছে সেহেতু মাদকের মহামারী ঠেকানো সম্ভব নয়। সরকারি আমলারা ক্ষমতার অপব্যবহারে কোন পর্যন্ত যেতে পারে, এটাই এর অন্যতম উদাহরণ। মধ্যরাতে ৪০ জনের একটি বাহিনী একজন সাংবাদিককে ধরতে যাওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মো: আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো: রশিদ জাহাঙ্গীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। মহামান্য উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই যে, এ ঘটনা শুধু নিছক কুড়িগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশে এ চিত্র বিরাজমান। ক্ষমতা অপব্যবহারের ব্লাংক চেক থেকেই এ মানসিকতার উৎপত্তি, যার জন্য জনগণ হয়রান হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ।

সরকারি আমলাদের পক্ষপাতিত্বের কারণে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনির্বাচিত এই সরকারের নির্বাচন কাহিনী এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য সরকারের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য আমলাদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত হচ্ছে। গত ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ‘কান্ট্রি রিপোটার্স অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিসেস’ (Country Repoters on Humen Right Practices) শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ‘২০১৮ সালের নির্বাচন অবাধ ও মুক্ত বলে বিবেচিত হয়নি। ব্যালট বাক্স ভরা, বিরোধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিরোধীদলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের হয়রানি, নির্বিচারে গ্রেফতার ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে এবং এগুলোও সম্ভব হয়েছে ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারীর কারণে।’

করোনাভাইরাস, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতির মহামারীর পাশাপাশি ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারীতে সরকারি দল ভিন্ন সবাই নির্বিচারে আক্রান্ত। ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারী থেকে বাঁচার জন্য গণমানুষ কোন হাসপাতালে ভর্তি হবে?

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী
E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ