০২ জুন ২০২০

অ্যাটর্নি অফিসের কৈফিয়ত

কারো জামিন পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে বলার কিছু নেই। এটি সম্পূর্ণরূপে আদালতের এখতিয়ার। আইনসিদ্ধ হলে যে কেউ জামিন পাওয়ার অধিকার রাখেন। গুরুতর কারণ ছাড়া আইন কারো জামিন দেয়াকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে এ জামিন নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। পিরোজপুরকাণ্ডের রেশ না কাটতেই ‘জামিন’ শব্দটি আবার শিরোনামে। পিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আওয়াল ও তার স্ত্রী এবং যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের কারণে এই আলোচনা। ক্যাসিনোকাণ্ডে আটক স্কুলশিক্ষকের পুত্র থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া, আলোচিত যুবলীগ নেতা শামীমের জামিন পাওয়া এবং তা প্রত্যাহারের পর এ আলোচনা আরো গতি পেয়েছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমসহ গোটা সমাজের সংবেদনশীলতা এখন জামিন ঘিরেই। গত কয়েক বছরে এটা নানাভাবে বেড়েছে।

আইন অনুসারে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করলেই যে তিনি ‘অপরাধী’ হয়ে যাবেন, এমন নয়। আদালতে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয় আগে। জামিন দেয়া বা না দেয়া যেভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করে, বিচার না হওয়ার বিষয় কিন্তু সেভাবে আলোড়ন তোলে না। রাষ্ট্র এভাবে জয়ী হতে চায়; গ্রেফতার, জামিন নামঞ্জুর করা এবং রিমান্ড দিয়ে বিচার করতে না পারার অসামর্থ্যকে আড়াল করতে চায়। অনেকসময় পুলিশ বলে থাকে, তারা আসামি ধরে আদালতে চালান দেয়। তারপর আসামি জামিন পেয়ে বিদেশে পালিয়ে যায়। মামলার অভিযোগপত্র দেয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অনেক মামলা। অস্ত্র ও মাদক মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে; কিন্তু এ অভিযোগ কতটা গুরুতর, সেটিই বিচার্য।

অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা পৃথক দু’টি মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত ৪ ও ৬ ফেব্রুয়ারি জামিন পান জি কে শামীম। পরে গত ৮ মার্চ তার জামিন প্রত্যাহার করেছেন আদালত। তার জামিন পাওয়ার বিষয় জানাজানি হলে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে বড় খবর হলো অ্যাটর্নি জেনারেলের মন্তব্য। তিনি বলেছেন, তারা জানতেন না; কিন্তু জামিনদানের আদেশ সত্য হলে অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতরের না জানার কারণ নেই। কারণ, হাইকোর্টে যখন জামিনের দরখাস্ত করা হয়, তখন তার কপি বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতরে জমা দিতে হয়। ২০০৮ সালের আগে এই কপি দেয়ার বিষয় একটি শিথিল ব্যাপার ছিল; কিন্তু এখন প্রতিটি জামিন আবেদনের ক্ষেত্রেই অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে কপি দিতে হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভবনের নিচতলায় একটি ডেস্ক আছে। সেখানে কর্তব্যরত ব্যক্তিরা কপি রাখেন। সিল দিয়ে প্রাপ্তিস্বীকার করেন। সিল দেয়া সেই কপি দেখেই বেঞ্চ অফিসাররা আবেদন জানান। জামিনের আদেশ দেয়ার আগে বিচারপতিরাও সেটি পরখ করে নেন। এটাই প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ।

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেফতার হন জি কে শামীম। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মোট চারটি মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে র‌্যাব। অস্ত্র মামলাটি ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মাদক মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। অস্ত্র মামলায় ২ জানুয়ারি শামীম ও তার সাতজন দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছেন আদালত। অস্ত্র মামলায় দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘জি কে শামীম একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, অবৈধ মাদক এবং জুয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তার সহযোগীরা উচ্চ বেতনভোগী দুষ্কর্মের সহযোগী। তারা অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে এসব অস্ত্রশস্ত্র বহন ও প্রদর্শন করেছেন। এর মাধ্যমে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে বিভিন্ন ধরনের টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসাসহ স্থানীয় বাস টার্মিনাল ও গরুর হাটবাজারে চাঁদাবাজি করে আসছিলেন। আসামি শামীম অস্ত্রের শর্ত ভঙ্গ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাদক ব্যবসা ও মানিলন্ডারিং করে আসছিলেন।’

শামীমের কাছে পাওয়া অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। তাহলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কথা, বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার। এই অবৈধ ব্যবহার কতটা নির্দিষ্ট ও মারাত্মক, সেটিই আসল ব্যাপার। তবে অনেকের মতে, এমন মামলায় জামিন স্বাভাবিক এবং তা নিম্ন আদালত থেকে দেয়ার কথা। দ্বিতীয়টি হলো মাদক। যদি বিষয়টি তার বাসা বা ডেরা থেকে কয়েক বোতল বিদেশী মদ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জামিনের বিরোধিতা করাটা দুর্বল হয়ে যায়। অস্ত্র ও মাদক মামলায় শামীমের জামিনের আদেশ গত ৮ মার্চ হাইকোর্ট প্রত্যাহার করে নেন। দুই মামলায় এক মাস আগে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন শামীম।

অস্ত্র মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মো: ফজলুর রহমান খান আদালতে বলেছেন, ‘অস্ত্র মামলায় জামিন আবেদনকারীর নাম লেখা আছে এস এম গোলাম কিবরিয়া; কিন্তু আদালতের ওই দিনের (৬ ফেব্রুয়ারি) কার্যতালিকায় নাম ছিল এস এম গোলাম।’ অন্য দিকে জি কে শামীমের আইনজীবী মেহেদী আদালতকে বলেছেন, ‘জামিন আদেশের দিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এফ আর খান আদালতেই ছিলেন না।’ জামিন আদেশ প্রত্যাহার হওয়ার পর জনাব খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নাম নিয়ে বিভ্রাটের কারণে রাষ্ট্রপক্ষ হয়তো ওই দিন বুঝতে পারেনি।’ মাদকের মামলায় আদালত জামিন আদেশ প্রত্যাহারের পর ওই বেঞ্চের ডিএজি জান্নাতুল ফেরদৌসি বলেন, ‘তথ্য গোপন ও নামের ত্রুটির কারণে জামিন হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।’

জি কে শামীমের জামিন বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এই রাষ্ট্র বর্তমানে অকার্যকর রাষ্ট্র হয়ে গেছে; এটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানে এখন কোনো শৃঙ্খলা-জবাবদিহির জায়গা নেই। এ কারণে আজ একজন কুখ্যাত আসামি, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং যার কাছে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গেছে, বেআইনিভাবে তাকে জামিন দেয়া হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র জানে না। এতে প্রমাণিত হয়েছে, এই রাষ্ট্র একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বেগম খালেদা জিয়াকে আটক করে রাখা হয়েছে, যেখানে একজন সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্ত আসামিকে এভাবে জামিন দেয়া হয়’ (প্রথম আলো অনলাইল সংস্করণ, ০৮ মার্চ ২০২০)।

দেশের বর্তমান বাস্তবতায় কখন এই সমাজ-সংসারে আমরা দায়িত্বশীলদের মুখে ‘জানতাম না’ শুনি, সেটি এখন দেশের সাধারণ নাগরিকরাও জানেন। কেউ জামিন পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না। আইন একটিই। আদালতের রীতি-নীতি একই। কিন্তু ব্যক্তিভেদে তার প্রয়োগ বদলে যাচ্ছে। আবদুল আউয়াল বা জি কে শামীম, এ রকম নাম অতীতেও সংবাদমাধ্যমে এসেছে, আগামী দিনেও আসবে। তবে এটা সন্দেহজনক যে, রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে ‘বিস্মৃতিপ্রবণ’ হওয়া থেকে নিজেকে সামলে রাখবে কি না। কারণ, জি কে শামীম ‘দুষ্ট হলেও নিজেদের লোক’।

[email protected]


আরো সংবাদ