০১ জুন ২০২০

তালেবান-মার্কিন চুক্তি : একটি পর্যালোচনা

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে অনেক শক্তিধর বিজেতার আনাগোনা হয়েছে। আশপাশে অনেক শক্তিশালী সাম্রাজ্য ও শাসকের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু এই ভূমি কখনোই স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতছাড়া হয়নি। কেউই নিরঙ্কুশভাবে আফগানদের পদানত করতে পারেনি। ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি ফের ঘটতে চলেছে। আফগানদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রকেও একই পথে হাঁটতে হচ্ছে। বলা চলে, অন্যদের আফগাননীতি অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। তাই তো আফগান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে তালেবানের সাথে দোহায় গত শনিবার শান্তিচুক্তি করতে হলো যুক্তরাষ্ট্রকে। এই চুক্তিকে উভয়পক্ষই ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছে এবং নিজেদের ‘বিজয়ী’ দাবি করে শান্তির পথে একধাপ অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্তানে সব সন্ত্রাসীকে দমন করার তথ্য দিয়ে বলেছেন, তালেবানরা চুক্তি মেনে চলবে এবং সন্ত্রাসীদের আর জায়গা দেবে না। অন্য দিকে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম বলেছেন, শান্তির পথে একধাপ অগ্রগতি হলো।

বহির্বিশ্বে মার্কিন যুদ্ধগুলো বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় বসেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া পরাজয় মেনে নেয়ার নামান্তর জেনেও যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করেছে। ওবামার পথ অনুসরণ করে ট্রাম্পও সেনা সরিয়ে আনার চেষ্টায় অবিচল আছেন। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের জুন থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করে তালেবান। তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র দফায় দফায় বৈঠক করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে ‘কখনোই শেষ হবে না এমন’ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের লাশ বানানোর মতো রাজনৈতিক অবস্থানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে নেই। নইলে আফগানিস্তান কিংবা ইরাকে ‘কয়েক লাখ মানুষকে’ হত্যার ব্যাপারে ট্রাম্প কিংবা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই অনাগ্রহী হতেন না। ইতিহাস সেটিই বলে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে কিছু সৈন্য হলেও ফিরিয়ে আনতে মরিয়া। তা ছাড়া আফগান যুদ্ধ আরো প্রলম্বিত করে সেখানে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়তে চায় না মার্কিন প্রশাসন।

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক প্রস্থান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ রক্ষা, উভয়টির জন্যই আফগানিস্তান থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার জরুরি। তালেবানরা অবশ্য আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার চায়। আর নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ট্রাম্প হয়তো শিগগিরই কিছু সেনা আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু এটাও সত্য যে, আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাহার করতে চাইবে না মার্কিন প্রশাসন। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের অবস্থানের ভূরাজনৈতিক ও যুদ্ধকৌশলগত গুরুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধ ফ্যাক্টরি’ কখনোই আপসে আফগানিস্তান পুরোপুরি ছাড়তে চায় না।

তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তানের যুদ্ধ মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। মার্কিন হামলায় তালেবান সরকারের পতন ঘটলেও আফগানিস্তানের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের যে ঝামেলা সোভিয়েত আমল থেকে ছিল, তা রয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। একপর্যায়ে তালেবান ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তায় তারা গৃহযুদ্ধ থামিয়ে একধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল; তবে তা বিশ্ব মোড়লদের তেমন খুশি করতে পারেনি। আফগান যুদ্ধ শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ, পরে ক্ষমতায় ওবামা এসেও যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন, এখন ট্রাম্পও যুদ্ধ শেষ করতে পারেননি। বরং তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আফগানিস্তানে বোমা ফেলার সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে মার্কিন সেনারা।

আফগান যুদ্ধে সরাসরি তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো লিপ্ত থাকলেও অন্যান্য দেশ পরোক্ষে জড়িত। বড় শক্তি হিসেবে রাশিয়া, চীন, ইরান ও ভারতের স্বার্থও, আফগানিস্তানে কারা ক্ষমতায় থাকবে তার ওপর নির্ভরশীল। চীন ও রাশিয়া আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যিক কারণে আফগানিস্তানের বিষয়ে আগ্রহী হলেও ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থও এখানে বিবেচ্য। বর্তমান চুক্তি যেমন তালেবানকে লাভবান করবে; তেমনি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে। সে জন্য চুক্তি সম্পাদনে ইসলামাবাদের ‘জানি দুশমন’ নয়াদিল্লি ক্ষুব্ধ।

আফগানিস্তানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ২০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে ভারত। এখন সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাহিনী সরে গেলে ভারতই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর পাকিস্তানের সাথে সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক এবং কাশ্মির সঙ্কটে আফগানিস্তানের ভূরাজনীতিতে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। আফগান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক এই মুহূর্তে খুবই উষ্ণ; আফগানিস্তানকে ২০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করছে। বিভিন্ন স্থানে কনসুলেট খুলেছে। আফগান পুলিশ, সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আদর্শ বা মানবিক জায়গা থেকে ভারত আফগানিস্তানকে সহায়তা করছে না; বরং কাবুলে ইসলামাবাদের প্রভাব হ্রাসে নয়াদিল্লি সহায়তা বাড়িয়েছে। তবে তালেবানরা কখনো ভারতের উপস্থিতি মেনে নেয়নি। আফগানিস্তানে ভারতের বেসামরিক অপারেশন নির্বিঘ্ন ছিল না মোটেও। ২০০৫ সালে ভারতের উন্নয়নকর্মীদের অপহরণ, দূতাবাস ও কনসুলেটে হামলা করেছে তালেবানরা।

মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি বোমা ফেলা হয়েছে। গত বছরে দেশটিতে সাত হাজার ৪২৩টি বোমা ফেলেছে মার্কিন বাহিনী। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৩৬২। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ সরকারি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৭১৭ জন প্রাণ হারায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে এবং সৈন্যদের জীবন হারিয়ে। আফগানিস্তানে নিজেদের প্রত্যেক সৈন্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বছরে খরচ প্রায় ১০ লাখ ডলার। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে, আফগানিস্তানে ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটনের যুদ্ধ খরচ প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার, যা এখনো অব্যাহত। এই খরচ আফগান যুদ্ধে সহায়তার জন্য পাকিস্তানকে দেয়া সাহায্যের অতিরিক্ত। যুদ্ধে তাদের অন্তত দুই হাজার ৩০০ সৈন্য মারা গেছে এবং ২০ হাজার সৈনিক আহত হয়েছে।

বর্তমানে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার সৈন্য রয়েছে বলে প্রচারিত। একসময় আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যসংখ্যা ছিল এক লাখের বেশি (২০১১)। কিন্তু তালেবানকে পরাজিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ক্রমে তারা বুঝেছে এই যুদ্ধে বিজয় লাভ করা অসম্ভব। ফলে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এবং এখন প্রতিপক্ষের হাতেই দেশটিকে দিয়ে যেতে হচ্ছে। তালেবানকে একসময় ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তাদের নেতাদের অনেকেরই ‘মাথার মূল্য’ ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে আফগানিস্তানের কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুর পর সেই তালেবানের পাশে বসেই এখন যুক্তরাষ্ট্র শান্তির ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছে। শান্তি আলোচনার শুরু থেকেই তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রেখেছে। তালেবানরা ক্যাম্প ডেভিডে আলোচনায় বসতে চায়নি এবং কাবুলের সরকারকেও আলোচনায় নিতে চায়নি। আলোচনা চলাকালেই হামলা করে মার্কিন সেনাকে হত্যা করেছে। ট্রাম্প প্রথমে বাতিল ঘোষণা করেও ফের আলোচনা শুরু করেন। এখন আফগানিস্তানকে আবার তালেবানের হাতেই সঁপে দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, চুক্তি অনুসারে ১৪ মাসের মধ্যে ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহার করা হলে কাবুলের বর্তমান সরকারকেও দেশ ছাড়া হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় আরো একটি মর্মবেদনা হলো- ভিয়েতনাম, ইরাকের পর আরো একটি যুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর আরো একটি পরাজয় ঘটল দরিদ্র ও পশ্চিমের ভাষায় অশিক্ষিত ‘মোল্লা’দের কাছে। দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে শেষ মার্কিন হেলিকপ্টার উড়াল দেয়ার মতো অপমানকর দৃশ্যের অবতারণা আফগানিস্তানে কিভাবে এড়ানো যায়; সেটিই এখন মার্কিন প্রশাসনের দুর্ভাবনার বিষয়। আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিজয়ীর বেশে নয়; বরং এরপর ওয়াশিংটনকে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, কী অর্জন করতে তারা আফগানিস্তানে গিয়েছিল? আলজাজিরার বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফল পরাজয়’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে সব কিছুর পরেও বলা যায়, এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আফগানিস্তানে শান্তির সুবাতাস বইবে বলে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আশা করছেন।

[email protected]


আরো সংবাদ

সকল