৩১ মার্চ ২০২০

ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল

-

দিল্লির হত্যাযজ্ঞ রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে যেন কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হারÑ এর বদলা প্রতিশোধ নিতে মোদি-অমিত বেপরোয়া বলে প্রতীয়মান। দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

বৈষম্য বা রাগবিরাগের মোদি
মোদি-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। যেমন : জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল থেকে এক মুসলমান রোগীকে চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে- ‘এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই।’ এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওই বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে প্রেসিডেন্ট তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদির এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।

মোটেও তা নয়। বরং মোদি সরকারই আসল দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।

অনুমান করি, আসলে মোদি সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে পুলিশের সহযোগিতায় দিল্লির মুসলমানদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই ওই আদালতের দ্বারস্থ হয়ে যেতে পারে। কারণ ইতোমধ্যে ওই রাতেই ওই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ওই বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করেছে মোদি সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন?

নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য ও বৈশিষ্ট্য। অথচ বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ

এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
লক্ষণীয় যে, এই হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরো মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করে।

দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে এর পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। কিন্তু দিল্লি রাজ্যে বিজেপি হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়েককে। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে পট্টনায়েক হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনাদের নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

গঙ্গাজল
নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন। নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী তিন বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল। এ দিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।

এ সময়টা মোদি-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেখে মোদি-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারি। ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী হওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক এমএলএ। তাই অমিত শাহ নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি কাজটা করিয়েছেন।

উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতোই অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। ‘পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল এখানে এসে অন ক্যামেরা হুমকি দেন যে, পুলিশ এই স্থানীয় সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন।’ এর ভিডিও ক্লিপ এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ওই সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।

অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া শ্রেয় মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তাকে প্রটেক্ট করতে পারবেন। আর নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদিও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন। এসব বিবেচনা থেকেই মোদি ও অমিত দিল্লি ইস্যুতে পাবলিকের সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের লোকদের সামনে আনছেন।

এ দিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদি (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ধারণা থেকে মোদি ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা প্রকাশ করেননি দোভাল ঠিক কী হিসাবে দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা অমিতের ওপর মোদির অনাস্থার প্রকাশ? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লির ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করে গেছেন। এ দিকে দোভালের বিপদ হলো, যদি বলেন মোদি তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন।

দোভালের দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া আবার পদ-পদবিতেও মেলে না। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু কোনো ‘বাহিনীর’ ওপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদি-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় ‘বেনামি সূত্র’ থেকে পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদি নাকি খুবই আপসেট। মোদি মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ এর সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদি-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হলো, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এ দায় তাদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বশীল এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলছেন দু’জনই। কিন্তু এর আবার বিপদ হলো, বাজারের বয়ান বা কানাঘুষার বিরুদ্ধে নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক হাজির করার সুযোগ নিতে পারছেন না।

অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদি-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হলো আদালত। ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মামলায় মামলা রুজু করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি। এবার যদি সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদি-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে চলেছেন।

তাহলে কি মোদি-অমিত হেরে যেতে পারেন? এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের। অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদির পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন- এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। এই অনুমান ভিত্তিহীন।

এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়ার লক্ষ্যে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রবাসীরা তাকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। মোদির লাভ হলো Ñ মোদির বিরুদ্ধে তার বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, বন্ধুশূণ্য করেছেন ইত্যাদি; এসবের বিরুদ্ধে একটা ভালো জবাব হবে মোদির সপক্ষে। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। এ ছাড়া ট্রাম্পেরা প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে, বাণিজ্যে ভারত ‘ভাল আচরণ করে না’। আসলে এটা মূলত উভয়েই বাড়তি ট্যারিফ আরোপে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে সবকিছু সেখানেই স্থবির হয়ে আছে বলে। এ ছাড়া মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে ‘ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প’ এমন শিরোনামে রিপোর্ট করা হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন। শেষে মোদি একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটিই বজায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই ‘দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

ভারতীয় মিডিয়া
ভারতীয় মিডিয়া সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদি-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হলো, ‘গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ’।

রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে ওই ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই চলছিল দিল্লিতে মোদি-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটিকে ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল। আর এই মোদি-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যার কারণ। তাদের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনাম করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’। আনন্দবাজারের মতো পত্রিকাও ছবিতে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি সক্রিয়। আর সব রিপোর্টে দাবি করে বলেছে, ‘এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ঘটেছে। এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ইনডিপেন্ডেন্ট তদন্তের কথা ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। ২৮ তারিখের দ্য প্রিন্টে দিল্লির বিজেপি সভাপতির বরাতে রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানো তা মূল্যায়ন করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার।’

এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ