৩০ মে ২০২০

মানবসমাজ ও মানসিক দাসত্ব

-

মানুষ একটি মুক্তচিন্তক প্রাণী, তবুও ধর্মীয় বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও পারিপার্শ্বিক আবহ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। আইন ভঙ্গ করাই অপরাধ এবং অপরাধ করলেই শাস্তির বিধান রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হচ্ছে শাসকদের মর্জিমাফিক। কেনো কোনো ঘটনা রয়েছে, যা আইনগত অপরাধের আওতায় না এলেও সমাজ, পরিবার কর্তৃক শাস্তি পেতে হয়, হতে হয় তিরস্কৃত। এ শাস্তি হতে পারে মানসিক, আর্থিক বা শারীরিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যায়ন অবমূল্যায়নে মানুষ পুরস্কার বা শাস্তি পেতে পারে। এর পরও মানুষের অধিক্ষেত্র অনেক বড়, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই, অধিকন্তু অনেক পরিশ্রমের বিনিময়ে বিভিন্ন গবেষণায় মানুষ নিজেকে অনেক অভিজ্ঞ করে তুলেছে। পাঁচ হাজার বছর আগের চিন্তার সাথে ৫০০ বছরের আগের চিন্তার অনেক তফাৎ রয়েছে। আবার ১০০ বছর আগের চিন্তার সাথে ১০ বছর আগের চিন্তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। কালকের চিন্তা ও আজকের চিন্তাভাবনা ক্ষেত্রবিশেষে এক হয় না। বিভিন্ন ব্যক্তি বা সমাজ একই বিষয়ে ভিন্নতর মনোভাব প্রকাশ করে। আর এটাই স্বাভাবিক। এখন গবেষণার পর গবেষণা, পরীক্ষার পর পরীক্ষা, নিরীক্ষার পর নিরীক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ দিন দিনই তার চিন্তার পরিশোধন করে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছতে চেষ্টা করছে, যা ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করছে। এমনও বিষয় রয়েছে যা আগের সব ধ্যান ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে নতুন ধ্যান ধারণার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এত কিছুর পরও মানুষ মানসিক দাসত্বে ভুগছে। এর মূল রহস্য কোথায়?

প্রতিটি মানুষের চাহিদা রয়েছে, যথা- জৈবিক চাহিদা, অর্থনৈতিক চাহিদা, উচ্চপদে আসীন হওয়ার চাহিদা, অধিকন্তু একটু সুখের আশায়, একটি পদোন্নতির জন্য দাসত্বের আড়ালে-আবডালে নিজেকে উজাড় করার নৈতিকতাবিবর্জিত মানসিকতা। মানসিক দাসত্ব ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু উপলব্ধি করা যায়। নীতির প্রশ্নে আপস করা থেকেই মানসিক দাসত্বের উৎপত্তি। এতে সম্মান হারানোর ভয় থাকলেও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটানোর একটি নিশ্চয়তা থাকে বৈকি? একজনের মানসিক দাসত্বের কারণে ভুক্তভোগী জনগণ তার ন্যায্য অধিকার থেকে হয় বঞ্চিত। স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন পেশা এবং আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে শপথ গ্রহণ-পূর্বক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও মানসিক দাসত্বের শিকার হচ্ছেন, কেউ জ্ঞানত আবার কেউ অবচেতন মনে, শুধু একটু নিরাপদে ও সুখে শান্তিতে থাকার প্রত্যাশায়। তবে এদের কোথাও সফল বা কোথাও ব্যর্থতার গ্লানি দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কোথাও কোথাও ‘প্রকৃতির’ নিয়মেই বাধাগ্রস্ত হয়ে সে প্রত্যাশা বুমেরাং হয়ে যায়।

‘মানবধর্ম’ বলতে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের অনুসারী নন, এমন মানুষও মানবধর্মের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে অনেক কথা প্রচার করেছেন ও করছেন যা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু এর বাস্তবতা ভিন্ন। আধুনিক চিন্তামগ্ন ব্যক্তিরা ‘মানবধর্মের’ গুরুত্ব দিয়ে কিছু বক্তব্য সামনে নিয়ে আসছেন, যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। অন্য দিকে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকেই মানবধর্মের অর্থাৎ মানবিক হওয়ার জন্য তাগিদ দিয়ে এক শ্রেণীর লোক সত্যি সত্যিই মানবসেবা করে যাচ্ছেন, যাদের কাছে দল, মত ও ধর্মের কারণে কারো প্রতি বিভেদ সৃষ্টি করে না বা নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম অন্য ধর্মের অনুসারীদের নির্যাতন করার জন্য ‘ধর্মকে হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে না। তবে কুরআনিক ভাষ্যমতে, By nature and character ‘মানুষ অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ’। যার ফলে সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হচ্ছে অনাচার, অশান্তি, বিপর্যয়, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হচ্ছে কৃত্রিম (মানব সৃষ্ট), কোথাও প্রাকৃতিক উৎস থেকে। উল্লেখ্য, মানুষ মানুষকে নির্যাতন করে আনন্দ উপভোগ করে। রুচির বিকৃতির ওপর একজন মানুষের আনন্দ পাওয়ার পরিসীমা নির্ভর করে। নির্মল আনন্দ ও বিকৃত আনন্দ জনে জনে তার রুচির ওপর নির্ভরশীল।

একজন মানুষ যখন নিজের ওপর নিজের বিশ্বাস বা আস্থা বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তখনই সৃষ্টি হয় আস্থাহীনতা। এ ‘আস্থাহীনতার’ গতি যত দ্রুত, একজন ব্যক্তির বিপথগামিতার রাস্তা ততই প্রশস্ত। একজন মানুষ যখন আস্থাহীন হয়ে পড়ে তখন সে নিজেই বুঝতে না পেরে অবচেতন মনে অন্যের ওপর পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং যার ওপর ‘নির্ভর’ করে সে-ও যদি নিজেই ‘আস্থাহীন’ হয়ে থাকে, তখনই শুরু হয় বিপর্যয়, যার ফলে মানুষ ভিত্তিহীন বা মিথ্যা বা মূল্যহীন বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়, ফলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। কুরআনিক ভাষায়, ‘অসার বাক্যের তুলনা এক অসার বৃক্ষ যা মূল ভূপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৬)।’

ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, অনেক স্বনামধন্য দার্শনিক আস্থাহীনতার কারণে অনেক উদ্ভট দর্শন ব্যক্ত ও প্রচার করেছেন, যা বাস্তবায়ন হলে সুন্দর সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে একটি ব্যাপক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হতো। যেমন- ‘সোয়া দুই হাজার বছর আগে প্লেটো তার পরিকল্পিত আদর্শরাষ্ট্রে, প্রভুশ্রেণীতে (Masters), স্ত্রী ও সন্তানদের কমিউনিজম চেয়েছিলেন। প্রভুশ্রেণীতে তিনি চেয়েছিলেন এমন ব্যবস্থা যাতে পুরুষ ও নারীদের স্বাধীনভাবে মিলনের ব্যবস্থা থাকবে, সব নারীই হবে সব পুরুষের স্ত্রী আর সব পুরুষই হবে সব নারীর স্বামী। সন্তানদের বড় করার ও গড়ে তোলার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা ভেবেছিলেন তিনি। অন্য সব চিন্তার মতো প্লেটোর এ চিন্তাও ইউটোপিয়ান হয়েই আছে’ (সূত্র : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক ২৩-৬-২০১৫ প্রকাশিত স্মারক)।

অনেক বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তির ভারী ভারী জ্ঞানসম্মত বক্তব্য জাতি, সমাজ, গ্রহণ করেনি। মুক্তচিন্তায় যদি মানসিক দাসত্বের ছোঁয়া থাকে তবে তা মুক্তচিন্তা হতে পারে না। মুক্তচিন্তার ধারক-বাহকদের স্মরণ রাখা দরকার, বিবেকবিবর্জিত কোনো চিন্তা বা মতবাদ ‘প্রকৃতির’ নিজস্ব গতিধারা বা বিবেকবহির্ভূত হলে তা কার্যকর হতে পারে না। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্রনায়ক বা সেনাপ্রধান যুদ্ধবিগ্রহ করে অগণিত মানুষের রক্তে স্নান করে ‘বীরের’ উপাধি ধারণ করেছেন বটে, কিন্তু এ রক্তস্নানের পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণ নিহিত ছিল না। এগুলো ছিল নিছক কল্পনাপ্রসূত মানসিক দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

রাষ্ট্রীয় অনেক বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ হয় বা কখনো প্রকাশিত হয় না। যেমন- শেয়ার কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। কারণ যিনি শাসন ক্ষমতায় থাকেন তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হবে কি হবে না। যদি প্রকাশিত হয়, তা পক্ষে যাবে, না বিপক্ষে তাও নির্ভর করে যিনি ক্ষমতায় আছেন তার দিকনির্দেশনার ওপর। তদন্তকারী কর্মকর্তা তার ‘মানসিক দাসত্ব’ দিয়ে প্রভাবিত হয় বলেই তদন্তের প্রতিবেদন কর্তার ইচ্ছামাফিক হয়ে আসছে, যার দৃষ্টান্ত নিচ থেকে উপর পর্যন্ত রয়েছে।

‘সত্য’ বলার সংস্কৃতির অপমৃত্যু হচ্ছে। সত্য বলার দায়বদ্ধতা থেকে মানবসমাজ দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষ মনে করে যে, কাক্সিক্ষত কাজটি আদায় করা দরকার, তা যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন? সত্যকে পরিহার করা এখন কোনো বিষয় বা পাপ বলে সাধারণত মানবসমাজ মনে করে না, ফলে পৃথিবী দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে, প্রতিরোধের জন্য নানাবিধ আইন করেও তার কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ যিনি আইন প্রণয়ন করেন, তিনি নিজেই সত্যের বরখেলাপ করে ‘মিথ্যার’ আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন।

‘শপথ’ একটি বিবেকের দায়বদ্ধতা। শপথ ভঙ্গ করা পাপ বা মহাপাপের উপলব্ধি বিবেক থেকে না এলে ভঙ্গকারীর কাছে শপথ ভঙ্গ একটি অতি সাধারণ ঘটনা মাত্র। শপথ ভঙ্গকারী যখন সাংবিধানিক আসনে বসে সত্যের অপলাপ করে মিথ্যার পক্ষে সাফাই গাইতে থাকেন, তখন মনে হয় ‘সত্য’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়ে আদর্শলিপি বইতে স্থান করে নিয়েছে। ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ এ কথাগুলো কোনো ধর্মসভায় বা আদর্শলিপি জাতীয় কিছু বইপুস্তকে নিরাপদ অবস্থান নিয়েছে। মানুষের বিবেকভাণ্ডারে ‘সত্য কথার’ এখন আর কোনো স্থান বা অবস্থান নেই।

সরকারের প্রতি আনুগত্য থাকলে শপথ ভঙ্গের দায়ে সাংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কোনো শাস্তি বা বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। বরং সরকারের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিতে শপথ ভঙ্গ করলে তার প্রমোশনসহ সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়। ‘দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার’ আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থায় দুর্বলের পক্ষে ন্যায্য বা ‘হক কথা’ বলার মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ এখানেও সেই মানসিক দাসত্বের প্রভাব রয়েছে। দুর্বলের সমর্থনে ‘হক কথা’ নিজে কোনো নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে চায় না, দেখেও না দেখার ভান করে, শুনেও না শোনার ভান করে। ফলে দেশ ও সমাজ এখন প্রভাবশালী বা সবলদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এ নীতি যারা অনুসরণ করেন তারাও মানসিক দাসত্বে ভোগেন। অনেকেই আছেন যারা ‘সত্য’ বলতে দ্বিধাবোধ করেন বা বলতে চান না এ কারণে যে, সত্য বললে তিনি যদি সমালোচিত হন বা তাকে যদি কেউ সমর্থন না করেন- এ ধরনের মানসিকতাও ‘মানসিক দাসত্বের’ বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

‘মানসিক দাসত্বের’ রোগে আক্রান্ত নয় এমন মানুষও সমাজে রয়েছেন, যারা যা ‘সত্য’ জেনেছেন তা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনবাজি রাখেন। তবে তাদের সংখ্যা খুবই বিরল। বিবেক যাদের জাগ্রত তারাই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত রয়েছেন। প্রতিটি মানুষের বিবেক জাগ্রত থাকুক প্রতিটি ক্ষেত্রে, তাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপকৃত না হলেও উপকৃত হয় সমাজ, দেশ ও জাতি।

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ