৩১ মার্চ ২০২০

ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক হওয়ার এখনই সময়

-

ডেঙ্গু জ্বরের মৌসুম আসছে আবার। শীতের পর মার্চ মাসে এই রোগ দেখা দেয়। বর্ষাকালে বাড়ে প্রাদুর্ভাব । গত বছর ডেঙ্গু নিয়ে খুব ভুগতে হয়েছে পুরো জাতিকে। তখন ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার দেশজুড়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। প্রথমে রাজধানী ঢাকায় এবং পরে ক্রমেই প্রায় সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে গত বছর সারা দেশে আক্রান্ত হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ। আর মারা যায় অন্তত ৩০০ জন। ২০১৮ সালে রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল চিকুনগুনিয়া। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ দু’টির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মূলত বর্ষা মৌসুমে। মার্চ থেকে রোগের প্রকোপ শুরু হয়। জুন-জুলাই-আগস্টে বিস্তার লাভ করে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সামনের মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া কখন কিভাবে হানা দেয় তা নিয়ে উদ্বেগে আছে নগরবাসী। এর কারণ ২০১৯ সালের অভিজ্ঞতা। বছরটি ছিল ব্যতিক্রমী। কারণ, সারা বছরই ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। সদ্যসমাপ্ত শীত মৌসুমেও মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

গত বছর ডেঙ্গু এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, সারা দেশে মানুষ চরমভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কোনোভাবেই প্রতিরোধের উপায় করতে না পেরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে একপর্যায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সিঙ্গাপুর সফরে যান। তারা মশার বন্ধ্যত্বকরণের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি আমদানি করবেন বলে তখন শোনা গিয়েছে। একটি পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মেয়রের সেই উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। তাই আর কোনো অগ্রগতি নেই। আসলে ওটা জণগণের সমালোচনা থেকে বাঁচা এবং দায় এড়ানোর কোনো কৌশল ছিল কি না, সেটাই প্রশ্ন। হন্যে হয়েছিলেন ডিএনসিসির মেয়রও। তিনি সফরে যাননি। তবে ঢাকায় বসেই কলকাতার ডেপুটি মেয়রের সাথে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। কলকাতার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যিনি কাজ করেছেন, এমন একজন বিশেষজ্ঞের সাথেও কথা বলেন। দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কলকাতার একটি বিশেষজ্ঞ দলকেও ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। পরে এ বিষয়ে আর কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়নি। সরকার বা সিটি করপোরেশনের নেয়া উদ্যোগ, আয়োজন, পদক্ষেপের কারণে ডেঙ্গু কমেনি। কমেছে প্রাকৃতিক নিয়মে। তার আগে আগ্রাসী থাবায় তিন তিন শ’ প্রাণ সাথে করে নিয়ে গেছে।

গত বছরের ওই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর এখন জনমনে আতঙ্ক থাকলেও নগর কর্তাদের সম্ভবত সেই স্মৃতি লোপ পেয়েছে। যে কারণে ডেঙ্গু রোধে যেসব সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর কথা, সেগুলোও চালানো হয়নি বা হচ্ছে না। নালা, পুকুর, ডোবা, জলাশয় পরিষ্কার করার তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। শুকনো মৌসুম শুরু হওয়ার পর খালগুলো প্রায় পানিশূন্য। ফলে বদ্ধ জলাশয়গুলো মশার উৎকৃষ্ট প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় মশার দৌরাত্ম্য বেড়েছে।

এমনই এক প্রেক্ষাপট পেছনে রেখে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা গত রোববার এক কর্মশালার আয়োজন করে। এতে তাদের পরিচালিত ‘এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির’ ডেঙ্গু মৌসুম-পরবর্তী জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। কর্মশালায় বলা হয়েছে, এখনই জরুরি ব্যবস্থা নেয়া না হলে এ বছরও রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির ৪১টি ও দক্ষিণ সিটির ৫৯টি ওয়ার্ডে জরিপ চালায় অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। এতে দেখা যায়, দুই সিটি করপোরেশনের ১১টি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এই উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। সামনেই আসছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মৌসুম। আরো আগে নগরবাসীকে সতর্ক করা জরুরি ছিল। কারণ, এ ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়া রোধের সাথে জনসচেতনতার অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক সব সময়ই থাকে। যা হোক, কর্মশালায় জরিপের যে ফল প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০ শতাংশ ওয়ার্ডে এডিসের ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জরিপে প্রতি এক শ’ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টি বা তার বেশিতে যদি এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি’ বলা হয়। জরিপে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুগদা, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মায়াকানন, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের শাজাহানপুর ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগান এলাকা এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাফরুল, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম আগারগাঁও এলাকা ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোড এলাকায় এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় দেখা গেছে। দক্ষিণের বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার এলাকা এবং উত্তরের টোলারবাগ এলাকায় ঝুঁকি খুব বেশি।

গত বছর তবু দুই সিটিতে নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। তারা কিছুটা হলেও দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন। এবার কিন্তু সে সুযোগ নেই। এখন যে দু’জন মেয়র নির্বাচিত হয়ে আছেন তারা দায়িত্ব নেবেন, আগামী মে মাসের মাঝামাঝি। তখন ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম। সুতরাং বিদায়ী মেয়রদের ওপর এবারো ভরসা করতে হবে নগরবাসীকে। তারা বিদায়বেলায় দায়িত্ব নিয়ে কতটা আন্তরিকভাবে তা পালন করবেন আল্লাহ মালুম। দুই সিটি করপোরেশন যদি মশক নিধনে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, তাহলে মে মাসের শেষ দিকে রাজধানীতে মশার দৌরাত্ম্য চরমে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক প্রফেসর ডা: বেনজির আহমেদ বলেছেন, জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে এ বছরও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতে পারে; বিশেষ করে মশার প্রজনন ক্ষেত্র যদি সমূলে ধ্বংস করা না যায়। কর্মশালায় স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা: আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মশার উৎস ধ্বংস না করা হলে, শুধু লার্ভিসাইডিং করে মশা কমানো যাবে না। নাগরিকদের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’ কিন্তু সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। অবশ্য একটি কার্যক্রম তারা ঠিকই চালাচ্ছেন। মশার ওষুধ ছিটাচ্ছেন। নগর কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলছে, ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কাজ চলছে। ওষুধেরও কোনো ঘাটতি নেই। কাজেই মশা এবার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ তবে তাদের কথায় নাগরিকরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানান, আগের বছরগুলোয় শীতের সময় মশার দৌরাত্ম্য লক্ষ করা যায়নি। কিন্তু এবার শীত মৌসুমেও মশার দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম যে মোটেও কার্যকর ফল দিচ্ছে না, সেটা মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসীর চেয়ে ভালো আর কে জানে? একটি দৈনিকের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৪ দিনব্যাপী বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম উদ্বোধন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি। পত্রিকাটির এসংক্রান্ত রিপোর্টে বলা হয় : ‘উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেশে প্রথমবারের মতো জার্মানি থেকে আমদানি করা ভেহিকল মাউন্টেড ফগার মেশিন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু মেশিন চালু করতেই ভেহিকল মাউন্টেড ফগার মেশিনের ব্যারেলের মুখ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকে। অনেক সময় চেষ্টা করে একটি মাত্র মেশিন চালু করতে সক্ষম হন ডিএনসিসির মশক নিধন কর্মীরা। আরেকটি মেশিন চালুই করতে পারেননি। এ অবস্থার মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা ওই মেশিন দিয়েই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম উদ্বোধন করেন।’

নগরীর মশক নিধন কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এর চেয়ে আর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। শুধু বলতে চাই, নগরবাসীর জীবন নিয়ে এ রকম ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না। হয় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে, না হলে দায়িত্ব ছেড়ে সরে যেতে হবে। আমরা আশা করব, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সংস্থা, কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তারা সচেতন হবেন এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। নগরবাসীর জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ার অধিকার কারো নেই।


আরো সংবাদ