০৬ এপ্রিল ২০২০

ইউএন করপোরেট ব্ল্যাকলিস্ট এবং এরপর

-

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় ১১২টি বড় বড় বিজনেস করপোরেশনের ডাটাবেজ প্রকাশ করেছে। এগুলো বরাবর ইসরাইলের দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনে সহায়তা জুগিয়ে আসছে। এ রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়েছে মূলত জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনে (ইউএনএইচসিআর) ২০১৬ সালে গৃহীত ৩১/৩৬ নম্বর প্রস্তাবের সূত্র ধরে। এই প্রস্তাবে তাগিদ ছিল, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের সাথে নানা ধরনের ব্যবসায়ে জড়িত সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি ডাটাবেজ প্রকাশ করতে হবে। উল্লেখ্য, এসব বিজনেস কোম্পানির মধ্যে ৯৪টিই ইসরাইলি। বলা যায়, সম্প্রতি প্রকাশিত এই ডাটাবেজ একটি বিলম্বিত রিপোর্ট। জাতিসঙ্ঘ বলেছে, তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানি এমন সব কাজে নিয়োজিত, যা বিশেষ করে মানবাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে। এরা ইসরাইলকে সহায়তা করছে এসব অবৈধ বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও সহায়সম্পদ ধ্বংসের কাজে।

এই তালিকা প্রকাশের বিষয়টি প্রশংসা পেয়েছে অনেক মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে। এরা বিষয়টি দেখছে ইসরাইলবিরোধী বিডিএস (বয়কট, ডাইভেস্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশন) আন্দোলনের একটি বিজয় হিসেবে। বিডিএস এই তালিকা প্রকাশকে স্বাগতম জানিয়ে একে অভিহিত করেছে, ‘জাতিসঙ্ঘের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে। এই বিডিএস আন্দোলনের লক্ষ্য হচ্ছে, এসব অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধে ইসরাইলের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ মনে করে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জোর করে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বিডিএস বৈধ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এসব বসতি স্থাপন বন্ধ করাসহ ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। এই আন্দোলনের প্রচুর সমর্থক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে। কিন্তু ইসরাইল মনে করে, বিডিএস হচ্ছে একটি ইহুদিবিরোধী ষড়যন্ত্র।

এই তালিকা প্রকাশের ঘোষণা এসেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনার নিন্দা জানানোর ঠিক এক দিন পর। মাহমুদ আব্বাস সম্প্রতি এই নিন্দা জানান নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘে দেয়া এক ভাষণে। উল্লেখ্য, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত হবে পশ্চিম তীরের সব বসতিসহ ফিলিস্তিনি ৩০ শতাংশ ভূখণ্ড। অপর দিকে ফিলিস্তিনিদের দেয়া হবে এমন কিছু ভূখণ্ড, যা সংযুক্ত থাকবে কিছু টানেল ও সেতু দিয়ে, আর সেটিকে বলা হবে ফিলিস্তিন নামের একটি রাষ্ট্র।

এই তালিকা সঙ্কলনের দায়িত্বে থাকা জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারসংক্রান্ত হাইকমিশনারের অফিস বলেছে, তারা ২০১৬ সালে মানবাধিকার কাউন্সিলের নির্দেশনা মেনেই এই তালিকা তৈরি করেছে। এর রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার বিষয়টি বিবেচনা করে এই অফিস বলেছে, এই তালিকার কোনো বিচারিক বা বৈধতার মর্যাদা নেই। এরপরও এই তালিকা নিয়ে প্রবল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমাদের যারা বয়কট করবে, আমরা তাদের বয়কট করব।’ বিবৃতিতে তিনি মানবাধিকার কাউন্সিলকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে বর্ণনা করে বলেন, এর কোনো প্রভাব নেই। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই তালিকা প্রকাশের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি একে ইসরাইলবিরোধী দেশ ও সংগঠনগুলোর কাছে জাতিসঙ্ঘের একটি ‘শেমফুল সারেন্ডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা দীর্ঘ দিন ধরে মানবাধিকার কাউন্সিলের সমালোচনা করে আসছিল, একে একটি ইসরাইলবিরোধী এজেন্ডা হিসেবে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র এই মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয় ২০১৮ সালের জুনে। তখন যুক্তরাষ্ট্র বলে, এই কাউন্সিল এমন সব প্রস্তাব পাস করে চলেছে, যা ইসরাইলবিরোধিতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। আর এই কাউন্সিল রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, মানবাধিকারের ব্যাপারে নয়। ইসরাইলের কিছু কিছু প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনার ও চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেলি ব্যাচেলেকেও (Michelle Bachelet) পর্যন্ত আক্রমণ করা হয়েছে। ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা বেনি গানটজ এই তালিকা প্রকাশের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ব্যাচেলের অফিস বাস্তবতার ছোঁয়া হারিয়ে ফেলেছে। ব্যাচেলের অফিস রয়েছে জেনেভায়। জেনেভার ইসরাইল মিশন থেকে বলা হয়েছে, ব্যাচেলে চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই ‘ডিফেমেটরি ব্ল্যাকলিস্ট’ প্রকাশ করে তার বিশ্বস্ততা হারিয়েছেন। সেই সাথে হারিয়েছেন এ এলাকায় মানবাধিকার উন্নয়নের সক্ষমতাও। ইসরাইলের জেনেভা মিশন আরো বলেছে, এই তালিকা প্রকাশের ফলে ইসরাইলি মিশনের সাথে হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সম্পর্কে বড় ধরনের পরিণতি ডেকে আনবে।

কিন্তু এর বিপরীতে ফিলিস্তিনি নেতারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। পিএরও’র মহাসচিব সায়েব এরিকেত বলেছেন, এই পদক্ষেপ মানবাধিকার কাউন্সিলের বিশ্বাসযোগ্যতা আরো জোরদার করবে। তা ছাড়া, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রবল সমালোচনা ও চাপের মুখে এটিকে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন তারা। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আশাবাদ ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

প্রকাশিত এই তালিকায় যেসব কোম্পানির নাম এসেছে তার মধ্যে রয়েছে ইসরাইলি কয়েকটি ব্যাংক, পরিবহন সেবা, ক্যাফে, সুপার মার্কেট, জ্বালানি, ভবন নির্মাণ ও টেলিযোগাযোগ কোম্পানি। এ ছাড়াও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারবিএনবি, ট্রিপ অ্যাডভাইজার, মটোরোলা ও জেনারেল মিলস। আছে যুক্তরাজ্যের গ্রিনকোট ও ফ্রান্সের অ্যালস্টম। স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার মিশেল লিঙ্ক মনে করেন, এসব কোম্পানি ইহুদি বসতিগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ‘অপরিহার্য উপাদান’। এসব কোম্পানির বিনিয়োগ ছাড়া অনেক বসতিতেই মদ উৎপাদন, বিভিন্ন কারখানা, করপোরেট সাপ্লাই, ব্যাংক সেবা, সহায়তা সেবা ও ক্রয়চুক্তি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না। আর এসব বসতি না থাকলে ইসরাইলের এই দখলদারিত্ব শিথিল হয়ে পড়ত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই তালিকা প্রকাশের ব্যাপারে এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, এসব বসতি নির্মাণ করে ইসরাইল জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এসব কোম্পানি যুদ্ধাপরাধে ইসরাইলকে সহযোগিতা করছে। এসব কোম্পানির ভাবনায় নেই- আন্তর্জাতিক ঐকমত্য রয়েছে ইসরাইলের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তোলার ব্যাপারে।

এই তালিকা সঙ্কলনের কাজ শুরু হয়েছিল চার বছর আগে। তখন থেকেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই জাতিসঙ্ঘের ওপর চাপ দিতে থাকে, যাতে এই তালিকা কখনোই দিনের আলো দেখতে না পারে। জাতিসঙ্ঘের এই বিলম্বিত পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে এ মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার একটি তিরস্কার হিসেবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরাইলকে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হয় পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সাথে একীভূত করার।

এই ডাটাবেজ প্রকাশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তার দেশের হস্তক্ষেপ জোরদার করার ব্যাপারে। তিনি উল্লেখ করেন, তার কর্মকর্তারা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ রাজ্যে আইন তৈরি করাতে সক্ষম হয়েছেন, যে আইনের বলে জোরদার ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে, যারা ইসরাইলকে বয়কটের চেষ্টা করবে। তাকে সমর্থন জুগিয়েছেন ইসরাইলের মূল ইহুদি পার্টিগুলো। মধ্য-বাম লেবার পার্টির নেতা আমির পেরেজ জানিয়েছেন, তিনি এই সিদ্ধান্ত বাতিলে সব ফোরামে প্রয়োজনীয় সব কিছু করবেন। নেতানিয়াহুর মূল বিরোধী ব্লু অ্যান্ড হোয়াইটের জনৈক নেতা ইয়াহির ল্যাপিড ব্যাচেলেকে অভিহিত করেছেন ‘কমিশনার ফর টেররিস্টস রাইটস’ অভিধায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই পদক্ষেপকে ইসরাইলবিরোধী পক্ষপাতদুষ্টতা ও বিডিএসের সহায়ক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

দুর্ভাগ্য, প্রকৃতপক্ষে জাতিসঙ্ঘ এই কালো তালিকাভুক্ত ১১২ কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না কিংবা এটি অন্য কাউকেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করবে না। এই তালিকা প্রকাশ করে এসব কোম্পানিকে কিছুটা লজ্জার মুখে ফেলা ছাড়া আর তেমন কিছুই করা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, যেসব কর্মকাণ্ডের কারণে কোম্পানিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হলো, সেসব কাজ থেকে তাদের অন্তত দূরে রাখার ব্যবস্থা না করা গেলে কেনই বা এটা প্রকাশ করা হলো।

এই তালিকা প্রকাশে জাতিসঙ্ঘ পুরোপুরি সাহস দেখাতে পেরেছে, তেমনটিও বলা যাবে না। উদাহরণ টেনে বলা যায়, ফিফার মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এই বসতি নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলেও এ সংগঠনকে এ তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। ফিফার ছয়টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এই বসতি টিমে। আরো জানা গেছে, বিখ্যাত অনলাইন রিটেইল কোম্পানি অ্যামাজনও সহায়তা করছে এসব বসতি নির্মাণে। এ কোম্পানির নামও নেই এ তালিকায়। এই বিখ্যাত কোম্পানি পশ্চিম তীরের বসতির ঠিকানায় পণ্য সরবরাহ করে বিনামূল্যে, অথচ এসব বসতির কাছের ফিলিস্তিন এলাকায় পাঠানো পণ্য সরবরাহের ওপর বড় অঙ্কের চার্জ আদায় করে।

ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা এতটাই পক্ষপাতদুষ্ট যে, তা কার্যত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের কোনো আশারই অবশেষ রাখেনি। পশ্চিমা শক্তিগুলো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন সম্প্রসারণে যেভাবে অব্যাহত সহযোগিতা দিয়ে আসছে, তা-ও কার্যত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের আশাকে শেষ করে দেয়। আজকের এই সময়ে প্রায় সাত লাখ ইসরাইলি ইহুদির বসবাস গড়ে তোলা হয়েছে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে। কিন্তু তারা এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২ মার্চের ইসরাইলি নির্বাচন পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর একটি অংশ আগের চেয়ে এখন আরো জোরেশোরে কথা বলতে শুরু করেছে ইসাইলের পক্ষ নিয়ে। চেক রিপাবলিকের পর জার্মানি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে একটি পিটিশন দাখিল করেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক আদালত এখন উদ্যোগ নিয়েছে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। তা ছাড়া, ইহুদি বসতি স্থাপনের ব্যাপারে আদালত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাচ্ছে। জার্মানি অবশ্য স্বীকার করে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন একটি যুদ্ধাপরাধ। এর পরও জার্মানি এ মামলাটি আটকে দিতে চায় এই কারণ দেখিয়ে যে, ফিলিস্তিন রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষর করলেও এটি এখনো পরিপূর্ণ কোনো রাষ্ট্র নয়। উল্লেখ্য, এই রোম স্ট্যাটিউটের সূত্রেই গঠিত হয় হেগের আন্তর্জাতিক আদালত।

মনে হচ্ছে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিল একই পথে হাঁটবে। তবে ফিলিস্তিন যদি রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা না পায়, সেজন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর সাথে আছে জার্মানিও। এ দেশটিও ফিলিস্তিন প্রশ্নে বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এসব দেশ ‘টু-স্টেট সলিউশন’ পরিকল্পনা রক্ষায় হস্তক্ষেপ করতে শুধু অস্বীকারই করেনি, উপরন্তু ইসরাইলের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করে কার্যত ইসরাইলকে পুরস্কৃত করেছে। জার্মানি বাকি ইউরোপীয় দেশগুলোর মতোই হাইপোক্রিটিক্যাল। এক দিকে এরা কথা বলছে ইসরাইলের অন্তহীন অবৈধ ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে এবং এখন কথা বলছে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে, অপর দিকে এরা কাজ করে চলেছে এমনভাবে, যাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিম তীর ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত করা যায়।

গত বছর নভেম্বরে ইউরোপীয় কোর্ট অব জাস্টিস রুল জারি করে বলে, পশ্চিম তীরে অবৈধভাবে আটক করা ফিলস্তিনি সম্পদ ব্যবহার করে ইসরাইল যেসব পণ্য উৎপাদন করে, সেগুলোতে ‘মেড ইন ইসরাইল’ লেবেল লাগানো যাবে না। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন আটকে রেখেছে। উপরন্তু কিছু ইউরোপীয় দেশ আইন করে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ইহুদি বসতি বয়কটের অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিচ্ছে। একইভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা অব্যাহত রেখেছে ‘জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ডে’ সহায়তা জোগানো।

ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রচুর খবর প্রকাশ হয়, কিভাবে জেএনএফ সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে ইসরাইলি চরমপন্থী সেটেলার গোষ্ঠীকে। এই গোষ্ঠী পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের জোর করে তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ থেকে উৎখাত করে। কিন্তু ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশ আইনিভাবে বাধা সৃষ্টি করছে জেএনএফের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের উদ্যোগে।

মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের ইচ্ছেমতো পশ্চিম তীরের বসতিগুলো ইসরাইলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে গেলে ইউরোপও এসব বসতিকে ইসরাইলি ভূখণ্ড বলে অভিহিত করতে শুরু করবে। ঠিক যেমনটি করা হয়েছে পূর্ব জেরুসালেমের বেলায়। জাতিসঙ্ঘের এই কালো তালিকা যতই প্রকাশ করা হোক না কেন, এক সময় দেখা যাবে, জাতিসঙ্ঘের এই ১১২ কোম্পানির লজ্জা-তালিকার ফাইলে ধুলো জমতে শুরু করবে, যেমনটি আগে জমেছে ফিলিস্তিন সম্পর্কিত জাতিসঙ্ঘের অসংখ্য ফাইলের ওপর। প্রশ্ন হচ্ছে- বিশ্ববিবেকের এই অবক্ষয়ের কি কোনো শেষ নেই?


আরো সংবাদ