০৬ এপ্রিল ২০২০

সোনা-রুপার কাহিনী

-

সোনা-রুপার কাহিনীর সাথে জড়িয়ে আছে টাকা-কড়ির ইতিহাস। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, কখন এবং কেন অর্থের প্রচলন হয়েছিল? এটা সত্য, মানুষের নিজের প্রয়োজনে আদান-প্রদান ব্যবস্থা চালু হয়। সব মানুষেরই কোনো-না-কোনো জিনিস অন্য একজনের কাছ থেকে নিতে হয়। এরই পথ ধরে শুরু হয় ‘বিনিময় প্রথা’। তাই অর্থনীতিবিদরা এটাকে বলেন ‘অর্থ উদ্ভাবনের প্রথম পথ’। বিনিময়ের মধ্যে ছিল গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের পরিবর্তে খাদ্য জমি ইত্যাদি। কিন্তু এটা ছিল কষ্টসাধ্য পরিশ্রমের বিষয়। সে জন্যই খোঁজ করা হলো অন্য কোনো মাধ্যমের যা এমন পরিশ্রমের কারণ হবে না, অথচ হবে আকর্ষণীয়। ইতিহাস অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালে ভারত মহাসাগরের দেশগুলোতে কড়ি দিয়ে জিনিস কেনাবেচার তথ্য পাওয়া যায়। তবে এর আগে ৯০০০ খ্রিষ্টপূর্ব মিসরের আশপাশের দেশগুলো তাদের উদ্বৃত্ত জিনিস প্রতিবেশী বা অন্যদের সাথে বিনিময় করে নিজেদের প্রয়োজন মেটাত। তবে খাদ্যশস্য এবং গৃহপালিত জন্তুই বিশেষ করে বিনিময় করা হতো।

ইতিহাসে দেখা যায়, লিডিয়াতে (বর্তমানে তুরস্ক) মুদ্রার প্রচলন হয়েছে ৫৪৬ খ্রিষ্টপূর্ব। আর চীনে সোনার মুদ্রা চালু হয় কিং রাজত্বের আমলে ২২১ থেকে ২০৭ খ্রিষ্টপূর্বের মধ্যে। এরপর হানদের রাজত্বকালে হরিণের চামড়া দিয়ে প্রথম কাগুজে মুদ্রার প্রচলন। সবাই এটাকে গ্রহণ করে এ জন্য যে, এগুলো ভারী ছিল না এবং ছিল সহজে বহনযোগ্য। তবে সত্যিকারের কাগুজে মুদ্রার প্রচলন হয় সপ্তম শতাব্দীতে চীনে। বিখ্যাত ইটালিয়ান ভূ-পর্যটক মার্কো পলো সর্বপ্রথম এই কাগুজে টাকা চীন থেকে পাশ্চাত্যে নিয়ে যান। চীনে এর অনুকরণে সুইডেন ১৬৬৭ সালে ব্যাংক নোট ছাপতে শুরু করে।

কাগুজে টাকা সোনা-রুপার তৈরি ভারী টাকা বহন করা থেকে বাঁচালেও প্রশ্ন ওঠে- কে, কখন এবং কেন এই কাগুজে নোট ছাপবে? আরেকটা সমস্যা হলো, বেশির ভাগ দেশে এই টাকার ব্যাপারে ধারণা না থাকায়, আইনও ছিল না বা কোনো সংস্থাও ছিল না।

এ সময়ই জার্মান স্বর্ণকার জোহানেস গুটেনবার্গ ছাপাখানা তৈরি করে তা ফ্রান্সের স্ট্রসবুর্গে নিয়ে আসেন। তখন ছাপাখানা বাড়তে শুরু করে। ফলে যার ছাপাখানা ছিল, সেই কাগুজে টাকা ছাপতে শুরু করে দেয়। ধারণা করা যায়, কী অবস্থাটা সৃষ্টি হয়েছিল।

তখন সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সৃষ্টি করল। আইন তৈরি করা হলো এবং শুরু হলো নিয়ন্ত্রণ। ফলে কাগুজে টাকা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় হলো। আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও পরিণত হলো। বিশ্বের সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন করেছিল ব্রিটিশ সরকার ১৬৯৪ সালে। কিন্তু আজকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থায় পৌঁছতে আরো তিন শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। যেমন, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সৃষ্টি হয় ১৯০৭ সালের তিন সপ্তাহব্যাপী আর্থিক গোলযোগের পর। সে সময়ের ঘটনাবলির ফলে ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ তৈরি হয় এবং সব নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা হয়। ফলে জনগণের আস্থা এই মুদ্রাব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো। ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাক্ট-১৯১৩ এই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

তবে এর আগে ১৯০০-এ প্রথম গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্ট-১ চালু হয়েছিল। এর অধীনে, কাগুজে টাকার পেছনে থাকে সোনা-রুপার সহায়তা। এক আউন্স সোনার মূল্য ২০.৬৭ ডলারে নির্র্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যান্য দেশও এই পন্থা অনুসরণ করতে থাকে। তবুও সমস্যা দেখা যায়। তা হলো- একটি দেশের মানুষ পরিশ্রম করে নিজেদের জীবনকে সুস্থ এবং সুন্দর করল। অথচ এর মূল্যায়ন হয় না। মূল্য দেয়া হয়, দেশটির কাছে কত সোনা-রুপা আছে, সে বিষয়কে। ১৯৩৩ সালের মধ্যে সব ব্যাংক সোনা জমিয়ে তাদের ভল্টে রাখতে শুরু করলে ডলার মূল্য হারাতে থাকে। তখন এফডিআর হুকুম দেয়, সব ব্যাংক তাদের সোনা-রুপা এফডিআরে রাখতে হবে। তার পরিবর্তে এফডিআর ১১ বিলিয়ন ডলারের কাগুজে নোট বাজারে ছাড়ে। তবে সোনার প্রভাব ১৯৭১ পর্যন্ত চলেছিল বলে অনুসন্ধানীরা বলে থাকেন। এর আমূল পরিবর্তন হয় ১৯৭১-এ যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ঘোষণা করেন, সোনার বিপরীতে ডলারের সৃষ্টির প্রয়োজন নেই। ফলে ‘সোনার স্ট্যান্ডার্ড’ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

তাই প্রশ্ন উঠল, কাগুজে মুদ্রার পেছনে যদি সোনার উপস্থিতি না থাকে, তাহলে এর মূল্য কী? তখন সরকার ঘোষণা করল এবং আইনও তৈরি হলো, ডলারই কেন্দ্রবিন্দু এবং এর বিপরীতেই বেচাকেনা, আয়-ব্যয় হবে। রাষ্ট্র থাকবে দায়ী। এভাবেই কাগজে মুদ্রার শক্তি স্থাপন করা হয়।

মার্কিন সরকার তখন ডলার ছাপতে শুরু করে তাদের ‘প্রয়োজন’ অনুসারে। ২০০৮ সালে সাড়ে চার মাসে তারা এক কোটি লাখ ডলার নোট ছেপে ফেলে। এই বিপুলসংখ্যক ডলার নোট ছাপার ফলে ডলারের বিনিময় মূল্যেও প্রভাব পড়ে।

যদিও সাধারণ মানুষ কাগুজে টাকায় আস্থা রাখছে, তবে সোনা-রুপার আকর্ষণ এবং গুরুত্বে তা কোনো প্রভাব ফেলেনি। ফলে সবাই কিছু না কিছু সোনা-রুপা সংগ্রহে রাখতে চেষ্টা করে। তবে এ চেষ্টা রাষ্ট্রপর্যায়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রের কোষাগারে সোনা-রুপা সংরক্ষিত থাকে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুসারে, ১০টি দেশে বিশ্বের বেশির ভাগ সোনা-রুপা আছে। মনে রাখতে হবে, এই দু’টি মূল্যবান ধাতুর সঠিক হিসাব কখনোই সম্ভব হবে না। কারণ এর তথ্য সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করা হয় অথবা যেটুকু তথ্য প্রকাশ করা হয়, তাতে বেশির ভাগ সময় বিভ্রান্তি সৃষ্টির ইচ্ছা থাকে। যেমন, বলা হয় এক-দুই মিলিয়ন টন সোনা ইয়ামাসিটার সিন্দুক, নাৎসি বাহিনীর সিন্দুক, হাওয়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিন্দুক ইত্যাদি স্থানে লুকানো আছে। এসব দাবি কখনো কখনো ‘সরকারি দাবি’ বলেও প্রচারিত হয়।

যা হোক, মোটামুটি যে বিষয়টি সাধারণত গ্রহণ করা হয়, তা হলো বিশ্বে ১৪৯৩ সাল এবং ২০১৬ সালের মধ্যে এক লাখ ৭৩ হাজার টন সোনা এবং ৪৮.৫ বিলিয়ন আউন্স রুপা উত্তোলন করা হয়েছে। (এক মেট্রিক টন = ৩২ হাজার ১৫০ আউন্স)। ৯১ শতাংশ সোনা উত্তোলন করা হয় ১৯০০ সাল পর্যন্ত। ১৯৫০ সালের পর এই উত্তোলনের গতি ৭০ শতাংশ বেড়ে যায়।

এ তথ্যে জানা যায়, রুপা এবং সোনার উত্তোলনের হার ৯:১। অর্থাৎ রুপা ৯ ভাগ উত্তোলনের বিপরীতে সোনার উত্তোলন এক ভাগ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, স্পেন ১৪৯৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকা দখলের পর বিশাল রুপার খনির সন্ধান পায়। এই খনিগুলো থেকে ৭৪৭ মিলিয়ন আউন্স রুপা এবং ৭১৪ মেট্রিক টন সোনা (২৩ বিলিয়ন আউন্স) উত্তোলন করা হয়েছে। অন্য কথায়, রুপা সোনা থেকে ৩২ গুণ বেশি উত্তোলন করা হয়। এই হার ১৭০০ শতাব্দীতে আরো বেড়ে যায়। এ সময়ে রুপা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৭২ মিলিয়ন আউন্স এবং সোনার পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৭২ মিলিয়ন আউন্স এবং সোনার উৎপাদন ছিল ৮৯৭ মেট্রিক টন (২৯ মিলিয়ন আউন্স)। এই হিসাব অনুসারে, ১৪৯৩ থেকে ১৬০০ সালে ৮৫ মিলিয়ন আউন্স সোনা উৎপাদিত হয়েছে। ১৬০০-১৭০০ সালে উৎপাদিত হয় ১৪১ মিলিয়ন আউন্স। ১৭০০-১৮০০ সালে সোনা উৎপাদিত হয়েছিল ২০৯ মিলিয়ন আউন্স। ১৮০০-১৯০০ সালে ৫৬৬ মিলিয়ন আউন্স। ১৯০০-২০১৬ সালে পাঁচ হাজার ৭৭ মিলিয়ন আউন্স। এই পাঁচ শতাব্দীতে ছয় হাজার ৭৬ মিলিয়ন আউন্স বা এক লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন সোনা উৎপাদিত হয়।

প্রাচীন মিসরে প্রথমে সোনা উৎপাদন শুরু হয়েছিল। জিইএমএস গোল্ড সার্ভের হিসাব অনুসারে, বিশ্বের ১০টি দেশের সোনার মজুদ সবচেয়ে বেশি। কার কাছে কত সোনা তার হিসাব হলো- ১. যুক্তরাষ্ট্র আট হাজার ১৩৩.৫ টন (যা ফোর্ট নক্সসহ সাতটি সিন্দুকে রক্ষিত) ২. জার্মানি তিন হাজার ৩৬৬.৮ টন (যার প্রায় ৬৭৭ টন অন্য দেশের ব্যাংকে গচ্ছিত) ৩. ইতালি দুই হাজার ৪৫১.৮ টন ৪. ফ্রান্স দুই হাজার ৪৩৬.১ টন ৫. রাশিয়া দুই হাজার ২১৯.২ টন (রাশিয়া সোনা ক্রয়ের দিক দিয়ে সবার আগে। ২০১৭ সালে ২২৪ টন সোনা কিনেছে) ৬. চীন এক হাজার ৯৩৬.৫ টন (চীনও প্রচুর সোনা কেনে যেমন- ২০১৮ সালে ১০০ টন সোনা কিনেছে) ৭. সুইজারল্যান্ড এক হাজার ৪০ টন (নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে অতীত থেকেই সোনা কেনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে) ৮. জাপান ৭৬৫.২ টন, ৯. ভারত ৬১৮.২ টন (এ দেশে মানুষেরা সোনা মজুদ করতে অভ্যস্ত অতীতকাল থেকেই) ১০. নেদারল্যান্ডস ৬১২.৫ টন।

বিশ্বের ধনী দেশগুলো নিজেরাও সোনা উৎপাদন করে থাকে নানাভাবে। এদের ১৫টি দেশ ২০১৮ সালে কত সোনা উৎপাদন করেছিল গোল্ড কাউন্সিল তার একটা হিসাব দিয়েছে। তা হলো- ১. চীন ৪০৮ টন ২. অস্ট্রেলিয়া ৩১৯ টন ৩. রাশিয়া ২৯৭ টন ৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২২২ টন ৫. কানাডা ১৮১ টন ৬. পেরু ১৫৮ টন ৭. ইন্দোনেশিয়া ১৩৭ টন ৮. ঘানা ১৩০ টন ৯. দক্ষিণ আফ্রিকা ১৩০ টন ১০. মেক্সিকো ১১৫ টন ১১. ব্রাজিল ৯৭ টন ১২. উজবেকিস্তান ৯২ টন ১৩. সুদান ৭৭ টন ১৪. পাপুয়া নিউগিনি ৬৯ টন ১৫. কাজাখস্তান ৬৮ টন। অন্য সব দেশ মিলে এক হাজার এক টন; সারা বিশ্ব- তিন হাজার ৫০৩ টন। সারা বিশ্বের মোট সোনার মজুদ ৫৪ হাজার টন বলে উল্লেখ করেছে উইকিপিডিয়া।

বিশ্বের রুপার পরিমাণ সত্যিকারভাবে জানা যায় না। ব্যবসায়ী এবং এর উৎপাদকরা এর গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যস্ত। এর প্রধান কারণ, নিরাপত্তা।

অনুসন্ধানীরা মোটামুটি নিশ্চিত যে, রুপার পরিমাণ তিন থেকে তিন দশমিক পাঁচ বিলিয়ন আউন্স। এ হিসাবে বিশ্বে সোনার চেয়ে রুপার মজুদ কম। অন্য দিকে, কর্মক্ষেত্রে সোনার চেয়ে রুপার ব্যবহার অনেক বেশি। ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে বলা হয়, সোনার মূল্য রুপার চেয়ে ৭০ গুণ বেশি। রুপার মুদ্রার বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন বিশ্বে ২.৩ বিলিয়ন আউন্স মুদ্রা আছে। এর বেশির ভাগই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। এর বিশাল অংশ মূলত অলঙ্কারে ব্যবহৃত হচ্ছে; যদিও একাংশ ইন্ডাস্ট্রিতেও ব্যবহার করা হয়। একই সূত্র দাবি করেছে, খনি থেকে রুপার আহরণ হয়তো ২০২৭-২০৩৮ সালে তুঙ্গে পৌঁছবে আর ২২৪০ সালের মধ্যে এর উত্তোলন শেষ হয়ে যাবে। তখন রুপার পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের নির্ভরশীল হতে হবে।

এখন তিনটি দেশে প্রধানত খনি থেকে রুপা উত্তোলিত হচ্ছে। দেশ তিনটি হলো- ১. পেরু, মজুদ এক লাখ ২০ হাজার টন (পেরুর রুপা সাধারণত তামার খনি থেকে পাওয়া যায়) ২. অস্ট্রেলিয়া, মজুত ৮৯ হাজার টন ৩. পোল্যান্ড, মজুত ৮৫ হাজার টন।

রুপার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ধাতুর মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। এ জন্য প্রধানত এর সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এ দিকে এর চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আগেই বলা হয়েছে, এই মুদ্রা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা কঠিন। কারণ এর ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীরা এমন অবস্থা সৃষ্টি করে রাখেন রূপার মূল্যকে নিয়ন্ত্রণের জন্য।


আরো সংবাদ