০৪ এপ্রিল ২০২০
সুশাসন

আদালতের ক্ষমতা ও মর্যাদা

-

সাধারণ অর্থে আদালত বলতে বিচারালয়কে বুঝায়। আদালতের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আদালতে বিচারকার্য পরিচালনায় আসীন ব্যক্তির ক্ষমতাই আদালতের ক্ষমতা। এ ক্ষমতা আদালতের মাধ্যমে প্রযুক্ত হয়। এ ক্ষমতা আদালতে বিচারকার্যে আসীন ব্যক্তির পদমর্যাদা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

আমাদের আদালত তথা বিচারব্যবস্থাপনা দুই ধরনের আদালতের সমন্বয়ে গঠিত। একটি হচ্ছে উচ্চ আদালত, যা দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান দিয়ে সৃষ্ট। অপরটি নিম্ন আদালত, যা আইন দিয়ে সৃষ্ট। আমাদের উচ্চ আদালতকে বলা হয় সুপ্রিম কোর্ট, যা দু’টি বিভাগে বিভক্ত। এর একটি হচ্ছে আপিল বিভাগ আর অপরটি হাইকোর্ট বিভাগ। আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগে প্রাথমিক আদালত হিসেবে এর অবমাননা ব্যতীত অপর কোনো মামলার বিচার হয় না। হাইকোর্ট বিভাগ রিট কোম্পানি, অ্যাডমিরালটি ও আদালত অবমাননাসংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক শুনানি ছাড়াও নিম্ন আদালতের দেয়া ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার রায় ও আদেশের আপিল এবং রিভিশনের শুনানি গ্রহণ করে থাকেন।

নিম্ন আদালত দু’ভাগে বিভক্ত; যথা- দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পূর্ণরূপে ফৌজদারি আদালত হিসেবে বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন। অপর দিকে সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজরা শুধু দেওয়ানি মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন। যুগ্ম জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজরা দেওয়ানি ও ফৌজদারি, উভয় ধরনের মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন এবং এ কারণেই উপরোক্ত বিচারকদের যুগ্ম জেলা ও সহকারী দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা ও দায়রা জজ নামে অভিহিত করা হয়।

সমাজে বসবাসরত একজন মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করার পর থেকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে থাকে। আসমানি কিতাবের মাধ্যমে আবির্ভূত ধর্ম ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের অধিকার এবং মানবাধিকারকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আবির্ভাব- পূর্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সামন্ত রাজারা নিজ নিজ এলাকার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। রাজার সামনে একজন বিচারপ্রার্থী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি করজোড়ে কুর্নিশ করে দণ্ডায়মান হয়ে অভিযোগ দায়ের করতেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সমভাবে দণ্ডায়মান হয়ে রাজার কৃপা প্রার্থনা করতেন।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিচারপ্রার্থী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয়কে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় বিচার ও কৃপা প্রার্থনা থেকে উত্তরণের পথে যুগান্তকারী ভূমিকার অবতারণা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হতে থাকলে নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৪৮ সালে প্রণীত জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদ সমগ্র বিশ্বের মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখার এক অনন্য দলিল। এ সনদের ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদ বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং সেখানে একইভাবে বিবৃত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।

জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির, প্রকাশ্য আদালতে আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নির্দোষ দাবি করার অধিকার থাকবে এবং সেখানে নিজেকে সুরক্ষার সব ধরনের অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে। মানবাধিকার সনদের এ বিধানটি আমাদের সংবিধানের ৩৫(৩) নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিফলিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বা নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বা প্রকাশ্যে বিচার লাভের অধিকারী হবেন। আমাদের সংবিধানের ৩৫(৫) ও ৩৫(৩) নম্বর দফাদ্বয়ের বিচার ও দণ্ড সম্পর্কিত রক্ষণ বিষয়ে অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৫(৬) দফায় বলা হয়েছে, প্রচলিত আইনের নির্দিষ্ট কোনো দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোনো বিধানের প্রয়োগকে এ অনুচ্ছেদের তিন বা পাঁচ দফার কোনো কিছুই প্রভাবিত করবে না।

অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৫-এর ৬ দফা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত যে, দেশের প্রচলিত আইনে যেসব দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে; এর বাইরে অন্য কোনোরূপ দণ্ড দেয়ার ক্ষমতা কোনো আদালতের নেই। প্রচলিত আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, দণ্ডবিধিতে অপরাধীদের পাঁচ ধরনের সাজা দেয়ার অনুমোদন রয়েছে। ১. মৃত্যুদণ্ড; ২. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; ৩. সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড; ৪. সম্পত্তির বাজেয়াপ্তকরণ এবং ৫. অর্থদণ্ড।

আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যে মৌল নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত তা হচ্ছে নির্দোষিতার অনুমান (Presumption of innocence)। এ মৌল নীতিটির অর্থ হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণিত না হচ্ছে যে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নিতে হবে তিনি নির্দোষ। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক (Adversarial)। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিচারব্যবস্থায় বিচারকের ভূমিকা অনেকটা খেলায় মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তির (Umpire) অনুরূপ।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের ক্ষমতা সংবিধান, আইন ও বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। অপর দিকে, নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে সংবিধান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন ও বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এ ক্ষমতার বাইরে উচ্চ আদালতের বিচারকরা সব ধরনের মামলার বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকরা শুধু দেওয়ানি মামলার বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Inherent power) ভোগ করে থাকেন। আইনের অপব্যবহার রোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে এ ক্ষমতাটি প্রযুক্ত হয়ে থাকে, কিন্তু যে ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিধিবিধান অথবা প্রতিষেধ রয়েছে সে ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ অনুপস্থিত।

উচ্চ আদালতের বিচারকরা শপথের অধীন। এ আদালতে বিচারক হিসেবে নিয়োগের পর শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে একজন ব্যক্তি বিচারক পদে আসীন হন না এবং তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত বিচারক পদে বহাল থাকেন, তাকে এ শপথ রক্ষা করে চলতে হয়। উচ্চ আদালতের একজন বিচারক শপথ গ্রহণের সময় অপর অন্যান্য বিষয়ের সাথে পাঠ করেন যে, ‘তিনি সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন।’

আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সে ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর করা হয়। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে যেসব মৌলিক অধিকারের উল্লেখ রয়েছে ওই মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের ১ দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে একই ভাগে।

আমাদের প্রচলিত আইন দণ্ডবিধিতে যেসব কার্যকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এর বাইরে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনকে সুসংহত করার জন্য কিছু কার্যকে সংবিধানে ৭ক অনুচ্ছেদে সন্নিবেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধের জন্য ৭ক-এর দফা ১(খ) প্রাসঙ্গিক। তাতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায়- এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা তা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে তার এ কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে। উক্ত ব্যক্তিকে অনুরূপ কার্যে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি একই অপরাধে অপরাধী হবে।

আদালত অবমাননা সংক্রান্ত বিচারকে ‘আধা ফৌজদারি বিচার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে সংবিধানে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারের বিষয় ব্যক্ত করা হয়েছে। যেসব আদালতে প্রকাশ্য বিচারকার্য পরিচালিত হয় সেসব আদালতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত নয়। তবে চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে জন-উপস্থিতি আদালতের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে আইনজীবী, মামলার পক্ষ, সাংবাদিক ও আগ্রহী ব্যক্তি কতজন প্রবেশ করতে পারবেন তা আদালত নির্ধারণ করে দিতে পারেন। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে আইনজীবীবহির্ভূত ব্যক্তিরা আদালত কক্ষে আইনজীবীদের সাথে বসে বিচারকার্য প্রত্যক্ষ করেন।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবী, পক্ষ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামি বিচার কক্ষে একই ধরনের আসনে উপবিষ্ট থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ স্বাক্ষর করেছে, সেসব রাষ্ট্রের অধিকাংশেই মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিরা পুরো বিচার চলাকালেই আসামি বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট থাকেন। বাংলাদেশ যদিও জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড ও ব্যবহার বিষয়ে প্রতিষেধ রয়েছে আমাদের নিম্ন আদালতে বিচার চলাকালে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিদের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান থেকে বিচারকার্য অবলোকন করতে হয়। ফৌজদারি মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিরা কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান থেকে বিচারকার্য প্রত্যক্ষ করবেন- সে বিষয়ে আমাদের কোনো আইনে সুস্পষ্টভাবে কোনো উল্লেখ নেই; বরং সংবিধানে যেটি উল্লেখ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য এবং সে ক্ষেত্রে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিদের মামলা চলাকালে অবশ্যই আদালত কক্ষে উপবেশনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

উচ্চ আদালতে আদালত অবমাননা সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় রুল দেয়ার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে কখনো কখনো দু-একটি বেঞ্চের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশিত ব্যক্তিকে দীর্ঘক্ষণ আদালত কক্ষে দণ্ডায়মান রাখতে দেখা যায়। দেশের নাগরিকদের প্রশ্ন, দণ্ডায়মান করার এ বিষয়টি সংবিধানে অনুমোদিত কি না। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৫-এর দফা ৫-এর বিধানাবলির সাথে দণ্ডবিধির ৫৩ বিধিতে বিবৃত দণ্ডের বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায়, দণ্ডবিধি ও সংবিধান মামলা সংশ্লেষে একজন ব্যক্তির আদালতে দণ্ডায়মান থাকা অনুমোদন করে না।

উচ্চ আদালতের একজন বিচারক শপথগ্রহণ করাকালে ব্যক্ত করেছেন, ‘তিনি সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন।’ তাই দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর জিজ্ঞাস্য, সংবিধান যেখানে মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরের নিশ্চয়তা বিধান করছে, সেখানে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বিচারক সংবিধানের সুস্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘনপূর্বক তার শপথের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আদালত কক্ষে উপবেশন করার আসন খালি থাকার পরও অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকরভাবে একজন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিতে পারেন কি না।

দেশের শীর্ষস্থানীয় দু’জন আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন ও বিচারপতি টি এইচ খান সম্প্রতি আদালতে বলেছেন, ‘রিট মামলায় প্রতিপক্ষকে আদালতে দণ্ডায়মান করে রাখা সংবিধান ও আইনে সমর্থিত নয়।’ উভয়ের বক্তব্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত এবং প্রকাশিত হলে দেশবাসী বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের আদালতে দাঁড় করিয়ে রেখে অপমানিত করার ঘটনাবলি ইতোমধ্যে সংসদে আলোচিত হয়েছে। তাই আইনাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বিষয়টি সমর্থিত না হয়ে থাকলে সংবিধানে নব সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ নং ৭ক-এর দফা ১(খ) অনুযায়ী এরূপ কার্য অসাংবিধানিক কি?

পোশাকধারী ট্রাফিক কনস্টেবল একজন বিচারককে সালাম না দেয়ার কারণে তাকে কান ধরে ওঠবস করানো কিংবা বিমানে ইকোনমি শ্রেণীর যাত্রী হয়ে প্রথম শ্রেণীতে বসার দাবি পূরণ না হওয়ায় পাইলট ও বিমানবালাকে আদালতে এনে স্বীয় মর্যাদাহানির কথা বলে দাঁড় করিয়ে রাখা কতটুকু যৌক্তিক এবং বিচারক ও বিচার বিভাগের জন্য সম্মানবহ কি না, তা নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক ও উত্তপ্ত আলোচনা দেশবাসী মিডিয়ার সুবাদে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে। তা ছাড়া, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী নিজেই বিচারক হলে সে ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার কতটুকু নিশ্চিত হতে পারে? এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক যে, একজন বিচারককে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে- শুধু ন্যায়বিচার করলেই হবে না; ন্যায়বিচার যে নিশ্চিত করা হয়েছে তা স্পষ্টত দেখিয়ে দিতে হবে। শপথে পঠিত অনুরাগ ও বিরাগের বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য।

উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের শপথ ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের দফা ৫-এর পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়, সংবিধান উচ্চ আদালতে কোনো মামলার শুনানি চলাকালে মামলার কোনো পক্ষকে আদালত কক্ষে দণ্ডায়মান থাকা অনুমোদন করে না। সংবিধানের এ অবস্থানটিকে পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সন্নিবেশিত ৭ক-এর ১(খ)-এর সাথে বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয়, উচ্চ আদালতের কোনো বিচারক মামলা চলাকালে দণ্ডায়মান থাকার নির্দেশ প্রদান অনুচ্ছেদ নং ৭ক ১(খ)-এর ভাষ্য অনুযায়ী, অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করার সমতুল্য, যা সংবিধানের ভাষায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে জনগণের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। দেশের কোনো নাগরিক অসাংবিধানিকভাবে আদালত কর্তৃক নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত হলে তা দেখার দায়িত্ব সাংবিধানিক পদধারী দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। কিন্তু ইতঃপূর্বে দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ আদালতের দু-একজন দ্বারা অসাংবিধানিকভাবে জনগণের অংশ পোশাকধারী পুলিশ ও সমাজের বিশিষ্টজন নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত হলেও সংসদ ও সংসদের বাইরে সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিরা সংবিধানকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে এর কোনো ধরনের প্রতিকার বিধানে এগিয়ে আসেননি। যে মুহূর্তে দেখা গেল, সংসদের স্পিকারের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ উক্তি করা হয়েছে, তখন সংসদ সদস্যরা নিজেদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেন। তাদের উচিত ছিল ইতঃপূর্বে যখন সাধারণ নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছিল তারও প্রতিবিধানে এগিয়ে আসা। তারা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারলে আর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না। এখনো যদি আমরা এ বিষয়ে প্রতিবিধান করতে না পারি, তবে এর শেষ কোথায় তা শুধু ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।

অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে মানুষ এর যথাযথ প্রতিবিধানের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। বিচারকরা সব সময় জনগণের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট। অপর দিকে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা বিচারকের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ। আদালতের সম্মান আছে, তেমনি প্রতিটি মানুষেরও এক ধরনের সম্মান আছে। আদালতে অন্যায় ও আইনবহির্ভূতভাবে কোনো ব্যক্তির সম্মানের হানি ঘটে থাকলে এ দুঃখজনক ঘটনায় ব্যক্তির চেয়ে আদালতের মর্যাদাই অধিক ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা আদালতের প্রতি অনেকের অনাস্থার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আদালত জনগণের শেষ ও চূড়ান্ত ভরসাস্থল। তাই সেখানে ন্যায়বিচার পেয়ে সম্মানিত হওয়ার পরিবর্তে নিগৃহীত, অপমানিত, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হলে আদালতের মর্যাদা কতটুকু অটুট থাকতে পারে, তা ভেবে দেখে সংশ্লিষ্ট সবার সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন এ ব্যাপারে।

লেখক : সাবেক জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিম কোর্ট
Email: [email protected]
[সহযোগিতায়- সা কা ম আনিসুর রহমান খান, সাবেক জেলা জজ]


আরো সংবাদ

আত্মহত্যার আগে মায়ের কাছে স্কুলছাত্রীর আবেগঘন চিঠি (১৩৫৩০)সিসিকের খাদ্য ফান্ডে খালেদা জিয়ার অনুদান (১২৬০৬)করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল (৯৩১৫)ভারতে তাবলিগিদের 'মানবতার শত্রু ' অভিহিত করে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ (৮৪৯০)করোনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ইতালির একটি পরিবার (৭৮৬৪)করোনার মধ্যেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আরেক যুদ্ধ (৭১৪০)করোনায় আটকে গেছে সাড়ে চার লাখ শিক্ষকের বেতন (৬৯৩১)ইসরাইলে গোঁড়া ইহুদির শহরে সবচেয়ে বেশি করোনার সংক্রমণ (৬৮৯০)ঢাকায় টিভি সাংবাদিক আক্রান্ত, একই চ্যানেলের ৪৭ জন কোয়ারান্টাইনে (৬৭৬১)করোনাভাইরাস ভয় : ইতালিতে প্রেমিকাকে হত্যা করল প্রেমিক (৬২৯৬)