০৯ এপ্রিল ২০২০

দেশের অর্থনীতির পতনমুখী প্রবণতা

-

অর্থনীতি একটি জটিল বিষয়। কোনো একটি দিক বিবেচনায় এর ভালো-মন্দ বিবেচনা করা যায় না। অর্থনীতির সার্বিক শৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হয়। তা ছাড়া, এর থাকে নানা খাত-উপখাত। এসব খাত-উপখাতের বিকাশে সমন্বয় কতটুকু আছে তা-ও বিবেচনা করতে হয়। সব খাত-উপখাতের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার নামই অর্থনৈতিক অগ্রগমন। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, সব খাতের ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল উন্নয়নই প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি সময়মতো সব খাত-উপখাতের প্রয়োজনীয় ব্যয়নির্বাহ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করাও স্থিতিশীল অর্থনীতির দাবি। নইলে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায় না। যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ভাবব, তখনো সব খাতের উন্নয়নের মাঝে সমন্বয় সাধনের কথা ভাবতে হবে। এক খাত স্থবির রেখে আরেক খাতের উন্নয়ন-ভাবনা সুষ্ঠু অর্থনীতির স্বাভাবিক নীতির বাইরে। এসব বিষয় মাথায় রেখে যখন একটি সরকার তার অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো নেয়, তখন অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে, অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়, অর্থনীতির স্বাভাবিক অগ্রগতি ঘটে। জানি না, আমাদের নীতিনির্ধারকদের মাঝে এই উপলব্ধি কতটুকু কাজ করে।

একটা বিষয় আমরা লক্ষ করছি, বর্তমান সরকার যখন কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কথা ভাবে, তখন তাদের ভাবনায় এমন সব উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার পায়, যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে যেন দৃশ্যমান করে তোলা যায়। মোটকথা এমন সব প্রকল্পে সরকারের আগ্রহ বেশি, যেগুলো নিয়ে সরকারের নেতানেত্রীরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে গালভরে বলতে পারেন- আমরাই এটা করেছি, ওটা করেছি। এর বিপরীতে সরকারের নজর কম থাকে সাধারণ মানুষের দৃশ্যের আড়ালে থাকা খাতের উন্নয়ন উদ্যোগে। যেমন- দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নমূলক প্রকল্প ইত্যাদির প্রতি। ফলে দেশে এলোপাতাড়ি উন্নয়ন ঘটলেও সমন্বিত উন্নয়নের দেখা মেলে না।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারপক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি হারে বড়গলায় বলা হয়, আমরা মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ব্যাপকমাত্রায় বাড়িয়ে তুলছি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে উন্নয়নের রোলমডেল হয়ে গেছে আমাদের বাংলাদেশ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারই যে অর্থনৈতিক উন্নতির নিশ্চিত সূচক নয়, সে কথাই আজকের দিনের অর্থনীতিবিদরা বলছেন। আমাদের অর্থনীতি যে অন্যসব দেশের জন্য রোলমডেল হয়ে ওঠেনি, সেটা বলা দরকার।

আমরা আমাদের অর্থনীতি নিয়ে যত গর্ববোধই করি না কেন, বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে বলেন, ‘একমাত্র রফতানি বাণিজ্য নেগেটিভ। এ ছাড়া একটি খাতও নেই, যেখানে আমরা পিছিয়ে আছি।’ কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সাথে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। সরকারি এই তিন সংস্থার দেয়া তথ্য-পরিসংখ্যান মতে, শুধু একটি সূচকই ভালো, বাকি সব সূচক পতনমুখী। ফলে অর্থমন্ত্রী এক দিন পরই তার আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে সংসদে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, দেশের অর্থনীতি এখন খারাপ অবস্থায় আছে। অবশ্য তিনি আশাবাদী, চলতি অর্থবছর শেষে অর্থনীতির এই খারাপ অবস্থা আর থাকবে না। তবে কেন এই খারাপ অবস্থা আর থাকবে না, কিভাবে তা ভালো হয়ে উঠবে তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি দেননি। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন একটি জাতীয় দৈনিককে বলেছেন, ভালো দিক হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী অন্তত স্বীকার করে নিয়েছেন, অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। তবে বছর শেষে তা ভালো হয়ে যাবে, মুখে বললেই তা বিশ্বাস করা যায় না। কাজে প্রমাণ করতে হবে।

বাস্তবে আমরা দেখছি, আমাদের অর্থনীতির একটি মাত্র সূচক ভালো অবস্থানে আছে। সেটি হচ্ছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বাকি সব সূচকই খারাপ অবস্থানে রয়েছে। সূচক খারাপ থাকা খাতগুলো হচ্ছে : রফতানি, আমদানি, মূলধনী যন্ত্র আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল, রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, সরকারের ঋণ ও বেসরকারি খাতের ঋণ। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি- এই সাত মাসে রফতানি আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। এই সময়ে রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৫ দশমিক ২১ শতাংশ। এর আগের বছরে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই বলেছিলেন, খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, খেলাপি ঋণ ক্রমেই বাড়েছে। যেমন- ২০১৮ সাল শেষে যেখানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১ কেটি টাকা, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর অর্থ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। তবে আইএমএফ বলছে, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। অপর দিকে এবার বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। আর সেই হার হচ্ছে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। সবিশেষ উল্লেখ্য, এবার যদি শেষ পর্যন্ত এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকে, তবে তা হবে গত দশকের একটি রেকর্ড। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের আমদানির যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে দেখা গেছে- আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আমদানি ও রফতানির খারাপ চিত্র থেকে ধরেই নেয়া যায়, দেশে উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ভালো নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া তথ্য মতে, দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সর্বশেষ হিসাবে গত ডিসেম্বরে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

তবে গত ৬ ফেব্রুয়ারির এক বৈঠকে খেলাপি ঋণ বেড়ে চলার জন্য অর্থমন্ত্রী দায়ী করেন ব্যাংকারদের। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন খারাপ অবস্থায় আছে। ব্যাংক খাতের অবস্থাও খুব ভালো নয়। ব্যাংকগুলোও যদি ভালো চলত, তবে এগুলোকে একীভূত করতে হতো না। ব্যাংক খাতে অনেক অসঙ্গতি আছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে।’

তবে এ ব্যাপারে ব্যাংকাররা অর্থমন্ত্রীর সাথে পুরোপুরি একমত নন। তারা এর জন্য দায়ী করেন ঋণখেলাপিদের বারবার নানা সুযোগ দেয়া, যথাযথ নজরদারির অভাব, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করার বিষয়কে।

তাদের এই বক্তব্য যে অযৌক্তিক কিছু নয়, তা-ই বা আমরা অস্বীকার করি কী করে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বা বজায় রাখার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। সরকার কি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা এড়াতে পারছে? ব্যাংক খাতের ঋণ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায় অন্তত এ সরকার অস্বীকার করতে পারে না। অস্বীকার করতে পারে না বিদেশে মুদ্রাপাচার রোধে সরকারের ব্যর্থতার দায়ও। আমরা জানি, ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ প্রতি বছর মুদ্রাপাচারের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তার সর্বশেষটি প্রকাশ করা হয় গত বছরের গোড়ার দিকে। সে প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত এক দশকে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচার হয়েছে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা পাচার ঠেকানোর দায়িত্ব তো ছিল সরকারেরই। সে দায়িত্ব পালনে কি সরকারের ব্যর্থতা নেই?

অর্থনীতিবিদদের অভিমত, অর্থনীতিতে এক ধরনের মন্দাভাব বিরাজ করছে। উৎপাদন খাত গতি হারিয়ে ফেলায় সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে। ভ্যাট, শুল্ক ও আয়কর আদায় কমে গেছে। আয় কমে যাওয়ায় সরকার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে খরচের টাকা জোগাড় করতে সরকারের নজর থাকে ব্যাংক খাতের ওপর। এক দিকে সরকারের আয় কমে যাওয়া, অপর দিকে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে গত এক দশকের মাঝে এবারই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থাও যে ভালো নেই, সে খবর তো আমাদের কাছে অহরহ আসছে। এক দিকে খেলাপিঋণের আঘাত, অন্য দিকে সরকারকে দিতে হচ্ছে বর্ধিত পরিমাণ ঋণ। ফলে আমাদের বেসরকারি খাত পাচ্ছে সবচেয়ে কম ঋণ। এখন আবার সরকারের নির্দেশে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এবার আবার ব্যাংকগুলো ৯ ও ৬ শতাংশ হারের সুদসীমা মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। এ দিকে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার কথা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা শাখা থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়েই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৯ হাজার ১০৯ কোটি টাকা।

এটা সহজ হিসাব, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি পরিমাণে ঋণ নিলে, ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে তেমন ঋণ দিতে পারে না। আবার ব্যাংকে অর্থ থাকলেই বেসরকারি খাত ঋণ নেবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ঋণ নেয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকা দরকার।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বিনিয়োগ ও রফতানি। এ দুই ক্ষেত্রেই চলছে নেতিবাচক প্রবণতা। রফতানি কমে গেলে কান টানলে মাথা আসার মতোই একটি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে এই অবস্থাই বিরাজ করছে।

সরকারপক্ষ যা-ই বলুক, সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটা পিছুটান বিরাজ করছে। আছে অর্থনীতির নানা খাতে নানা বিশৃঙ্খলা। এসব বিশৃঙ্খলা দূর না করলে যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগমন নিশ্চিত হবে না, তেমনি বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য অর্থনৈতিক রোলমডেল হয়ে গেছে, এমনটি বলে বেড়ানো হাসির খোরাক জোগানোরই শামিল হবে। অতএব, অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলোর প্রতি আমাদের নজর দেয়ার চূড়ান্ত সময় এখনই। মনে রাখতে হবে- সময়ের এক ফোঁড়, আর অসময়ের দশ ফোঁড়।


আরো সংবাদ

জামালপুরে হাসপাতালের নার্সসহ আরো ২ জন করোনায় আক্রান্ত জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের ইন্তেকাল জে কে রাউলিংয়ের করোনা মুক্তির পদ্ধতিতে ঝুঁকি দেখছেন চিকিৎসকরা ১১২টি আইসিইউ নিয়ে করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ কতটা সক্ষম? বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে করোনা উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু গরম পড়লে কি করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে যাবে? সৌদি রাজ পরিবারের ১৫০ সদস্য করোনায় আক্রান্ত সাঈদীর মুক্তি চেয়ে সাতকানিয়ার শতাধিক সামাজিক সংগঠনের বিবৃতি ভারতের গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করল পাকিস্তান ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে নারীর শরীরে করোনা শনাক্ত নারায়ণগঞ্জ ফেরত যুবকের শরীরে করোনা, সৈয়দপুরে ২০ বাড়ি লকডাউন

সকল