০১ জুন ২০২০

আমাদের ইতিহাসজ্ঞান

আমাদের ইতিহাসজ্ঞান - ছবি : সংগ্রহ

অতীতের কথা শুধু ইতিহাস পাঠেই জানা সম্ভব। ঐতিহাসিক ঘটনার কার্যকারণ জানা থাকলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সক্ষমতা বাড়ে। আগামীর পথচলা হয় সহজ। আর ভবিষ্যতে চলার পথে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, সেই জটও খুলে যেতে পারে অনায়াসে। কোনো জাতির বৈষয়িক উন্নতির জন্যও সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসের অন্তত পাঁচ শ’ বছরের ঘটনা জানা আবশ্যক। বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ঘটনাবলি নখদর্পণে থাকলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জানার ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত কোনো পথ নেই। জানতে হয় সবটুকু। বর্তমান বিশ্বে যেসব জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে এবং দুনিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেসব দেশের রাজনীতিকেরা বিশ্ব ইতিহাসের বাঁক সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। আমরাও কাক্সিক্ষত উন্নতি চাই। কিন্তু চাইলেই তো আর সবকিছু পাওয়া যায় না। এর জন্য থাকতে হয় একাগ্রতা আর প্রস্তুতি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাসজ্ঞান কেমন। এর একটি নমুনা পাওয়া যায় দিন দশেক আগে অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সরকারদলীয় এক নেতার বক্তব্যে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে ওই নেতা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, বাংলার মাটিতে গত ১০০ বছরেও এমন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আর হয়নি। দেশবাসী তার কথায় আস্থা রাখলে সদ্য সমাপ্ত ঢাকার সিটি নির্বাচনকে ‘নির্বাচনের রোল মডেল’ ধরা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশে আগামীতে যত নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন, তাও এমনই হবে।

মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় রাজধানী করেন ১৬০৮ সালে। যদিও তার ৩০০ বছর আগে ঢাকার গোড়াপত্তন হয়। ইংরেজরাই প্রথম পৌরসভা গঠন করে ১৮৬৪ সালে। পৌরসভা হলো পুরবাসী বা শহরের নাগরিকদের স্বশাসিত সঙ্ঘ। প্রাচীন নগরী ঢাকা পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৩৬ বছর আগে ১৮৮৪ সালে। সেদিনের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু আর শান্তিপূর্ণ হয়েছিল। তবে নারীবাদী দৃষ্টিকোণে কেউ বলতে পারেন, ঢাকা সিটির সর্বশেষ অনুষ্ঠিত পয়লা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মতো মোটেও অবাধ হয়নি। কারণ, ওই নির্বাচনে নারীর ভোটাধিকার ছিল না। এ ছাড়া নগরের সব পুরুষও ভোট দিতে পারেননি। কেবল তারাই ভোটার ছিলেন যারা অন্তত এক টাকা ৫০ পয়সা পৌর কর দিতেন, তাদেরই শুধু ভোটাধিকার ছিল। এই বিবেচনায় বলা যেতেই পারে, ওই ভোটগ্রহণ সর্বজনীন ছিল না। প্রথম নির্বাচনে ভোটার ছিলেন সাত হাজার ২০২ জন। আর ১৮৮৪ সালে ঢাকার মোট লোকসংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ২১০ জন।

এদিকে পয়লা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঢাকার দুই সিটিতে ভোট পড়েছে ১৪ লাখের মতো। ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধকোটি। মোট ভোটারের ১৫-১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বর্তমান দুই মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অবশ্য একটি তথ্য আমাদের অনেকের জানা যে, বিশ্বের গণতান্ত্রিক অনেক দেশে প্রদেয় ভোটের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শুধু জয়ী হলেই চলে না। অবশ্য এই নিয়ম শুধু জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাকি, স্থানীয় সরকারের বেলাতেও আমলযোগ্য; তা আমাদের জানা নেই। তবে এ কথা ঠিক, আমাদের সুযোগ্য! নির্বাচন কমিশন ভোটার উপস্থিতির জন্য কম কসরত করেনি। এত কিছুর পরও ভোটাররা ভোট দিতে না এলে কিই বা করার ছিল ইসির? এ জন্য গণতন্ত্রপন্থীরা নগরবাসীকে ভোট দেয়ার সাংবিধানিক অধিকার পালনে অনীহার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারেন। ঢাকার ভোটাররা কেন এমন অগণতান্ত্রিক আচরণ করলেন; সেজন্য তাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। রাজধানীর বাসিন্দাদের হওয়ার কথা দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি সচেতন। সেখানে অবাক করা কাণ্ড, ঢাকার বাসিন্দারা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে উল্টো নির্বাচন কমিশন আর সরকারকে দুষছে; কেন এত কম ভোট কাস্ট হলো। এমন মানসিকতার নিকুচি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এ তো নিজের দায় অন্যের ঘাড়ে চালান দেয়ার শামিল। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো আর কাকে বলে। তাই বিরোধীরা যতই ওই নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করুন না কেন; তিনি শতভাগ ইতিহাসসম্মত তথ্য আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এতে আমাদের ইতিহাসজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়েছে। হয়েছে আলোকিত।

শাসক ব্রিটিশরা মনে করেছিলেন, একদিন তারা চলে গেলে উপমহাদেশের মানুষ ব্রিটেনের মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ চালাবে। সেজন্য তারা তৎকালীন ভারতবাসীকে গণতন্ত্র শেখাতে স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করে। ইউনিয়ন বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু দেখেন তাদের সে আশায় গুড়ে বালি। কোনো অগ্রগতি নেই। ১৯১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলার গভর্নর তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘পৌরসভাগুলোতে ৩০ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এখন আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নাগরিকরা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। নির্বাচিত কমিটির সদস্যরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

প্রথমে ঢাকা ছিল পৌরসভা। ১৯৭৮ সালে এই নগরীকে ৫০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। নামকরণ হয় ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। ১৯৮২ সালে মিরপুর ও গুলশান পৌরসভা এর সাথে একীভূত করা হলে ওয়ার্ড সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬টি। গত শতকের নব্বই দশকে নামকরণ করা হয় ঢাকা সিটি করপোরেশন। প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচনের বিধান করে আইন পাস হয়। ১৯৯৪ সালে বিএনপির আমলে ঢাকায় সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই খণ্ড করে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী হবে ঢাকা। ঢাকা একটি অখণ্ড সত্তা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা উত্তর বা ঢাকা দক্ষিণে নয়।

কিন্তু অনেকে বলে থাকেন, বৃহৎ নগরী আর রাজধানী দুই জিনিস। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানীকে কিভাবে গড়ে তুলতে হয় এবং পরিচালনা করতে হয়, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। বলা অত্যুক্তি হবে না, এখনো আমরা তা আয়ত্ত করতে পারিনি। সে কারণে ঢাকা ক্রমে সম্প্রসারিত হয়েছে, মানুষ বেড়েছে; কিন্তু রাজধানীর বৈশিষ্ট্যে গড়ে ওঠেনি। ফলে বিশ্বের অনেক ম্যাগাসিটির মতো এই নগরীতে নগরসংস্কৃতি নির্মিত হয়নি। এই নগরীর বাসিন্দারা এখনো নগর সংস্কৃতি আত্মস্থ করতে পারেননি। তাই তো ঢাকা বিশ্বের পুরনো নগরী এবং স্বাধীন দেশের রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। সে জন্য ঢাকার নাম আন্তর্জাতিক জরিপকারীদের তালিকায় উঠে গেছে, তার কারণ অনেক গভীরে। স্বাধীন দেশের রাজধানী হওয়ার পর যা হতে পারত, হয়েছে তার বিপরীত। বাস অনুপোযোগী ম্যাগাসিটি। যা এক দঙ্গল মানুষের জনভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এখনই যদি এই নগরীর মেরামতে হাত দেয়া না হয়; তাহলে হয়তো একদিন দলে দলে মানুষকে ঢাকা ছাড়তে হবে যেভাবে তারা একদিন জীবিকার তাগিদে এখানে ডেরা বাঁধতে আসে। এতে অনেকের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ ইতোমধ্যে তারা যা কামিয়েছেন বিদেশে বসে বসে আয়েশি জীবন কাটাতে পারবেন। কিন্তু আমজনতার কপাল পুড়বে।

[email protected]


আরো সংবাদ