০১ জুন ২০২০

শরীয়ত বয়াতি বনাম পীর-ফকিরের বেসাতি!

শরীয়ত বয়াতি বনাম পীর-ফকিরের বেসাতি! - ছবি : সংগ্রহ

ঘটনাগুলো যে কোন সালে ঘটেছিল তা আজ আর মনে নেই। তবে ঘটনার কথামালা ও তার রেশ আমার মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, চেষ্টা করেও কোনোকালে ভুলতে পারিনি। ভুলতে না পারা প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের গ্রাম থেকে আট-দশ গ্রাম পেরিয়ে অন্য এক গ্রামে। ঘটনার দিন দুপুরের খাবারের পর গ্রামের কয়েকজন ময়-মুরব্বি ও ১০-১২ জন চ্যাংড়া পোলাপানের সাথে দলবেঁধে দূরের সেই গ্রামে বিচার গান শুনতে গিয়েছিলাম। আমাদের গ্রামে প্রচার হয়ে গিয়েছিল যে, বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনের নামকরা শিল্পী হাজেরা বেগম আজ রাতে ভাঙ্গা থানার কাউলিবাড়া গ্রামে বিচার গান শোনাবেন। তখনকার জমানায় আবদুর রহমান বয়াতির জারি গান এবং হাজেরা বেগমের বিচার গানের খুবই নাম-ডাক ছিল। ফলে এসব শিল্পীর কোনো অনুষ্ঠান থাকলে মানুষ ৩০-৪০ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হতো।
আমাদের গ্রাম থেকে কাউলিবাড়ার দূরত্ব অনেক। ফলে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতেই রাত ৮টা বেজে গেল। গিয়ে দেখি হাজেরা বেগম গাইছেন- ‘শরিয়তের মোল্লাজি। নামাজ পড়ার কায়দা জানো নি। নামাজ তো রে দূরের কথা, অজু করতে শিখছ নি।’ আমি যখন হাজেরা বেগমের কণ্ঠে বিচার গানের উল্লিখিত কথামালা শুনেছিলাম, তখন আমার বয়স বড়জোর আট কিংবা ৯ বছর। জীবনের পথপরিক্রমায় অনেক কিছু ভুলে গেছি কিন্তু হাজেরা বয়াতির কথাগুলো ভুলিনি। অধিকন্তু জীবনের পরিণত বয়সে এসে কথাগুলোর নিত্যনতুন অর্থ মন-মস্তিষ্কে এমনভাবে নাড়া দেয়, যার প্রভাব থেকে নিজেকে বিযুক্ত বা বিমুক্ত রাখার শক্তি এখনো অর্জন করতে পারিনি। এটি কেন হয় বা এর প্রতিক্রিয়াই বা কী, এসব বলার আগে আমার জীবনের অন্য কয়েকটি ঘটনা বলে নিই, যেগুলোর কার্যকারণও প্রায় একই প্রকৃতির।

আমার জীবনের দ্বিতীয় ঘটনাটিও বয়াতিসংক্রান্ত। এবারের ঘটনাটি ঘটেছিল ফরিদপুর জেলার পুকুরিয়া নামক একটি বাসস্ট্যান্ডে, খুব সম্ভবত বাকশালী জমানা অর্থাৎ, ১৯৭৪ বা ১৯৭৫ সালের দিকে। তখনকার দিনে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। আমাদের ফরিদপুর জেলায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মহাসড়ক বলে পরিচিত ফরিদপুর-বরিশাল সড়ক ছাড়া অন্য কোনো রাস্তায় বাস চলাচল করত না। থানা পর্যায়ের রাস্তাগুলোর কিছু কিছু স্থানে হয়তো ইট বিছানো ছিল- তবে বেশির ভাগ রাস্তাই ছিল কাঁচা। আমাদের সদরপুর থানার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একফোঁটা পাকা রাস্তা বা কোনো বিদ্যুৎ লাইন ছিল না। তবে টেলিফোনের লাইন ছিল যা কিনা পাকিস্তান জমানাতেই চালু হয়েছিল এবং সেই টেলিফোন কেবল পোস্ট অফিসে ব্যবহৃত হতো টেলিগ্রামের কাজে। অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি অফিসে টেলিফোন বা টেলিগ্রাফ ছিল না।

দূরবর্তী কোনো জায়গায় যেতে হলে আমরা বাড়ি থেকে হেঁটে অথবা বড়জোর ঘোড়ার গাড়িতে করে ১৫-১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে যেতাম। তারপর বহুক্ষণ অপেক্ষা করে একটি বাস হয়তো পেয়ে যেতাম এবং রাজ্যের আবেগ ও আনন্দ ভাগাভাগি করে এমনভাবে গাড়িতে চড়তাম, যাতে মনে হতো আমরা কোনো নভোযানে করে চান্দের দেশে যাচ্ছি। ঘটনার দিন আমরা বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় দেখি একটি দোকানে বহু লোক ভিড় করেছে এবং তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন শুনছে। আমি দাদীর আঁচলের বন্ধন ত্যাগ করে ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখি এক মহা আজব যন্ত্রে অদ্ভুতভাবে গান বাজছে। আমাদের জমানায় আমরা শুধু রেডিও দেখেছি, যা ছিল দুর্লভ এবং একই সাথে আভিজাত্যের প্রতীক। আব্বা যখন বিলেতের মারফি কোম্পানির তৈরি প্রায় আধা মণ ওজনের বিশাল এক রেডিও কিনে আনেন, তখন আমাদের গ্রামে রীতিমতো হই চই পড়ে যায়। কারণ ওই তল্লাটে তখন অবধি কোনো রেডিও ছিল না। কাজেই রেডিও কেনার পর গ্রামে আমাদের মানমর্যাদা বেড়ে গেল এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষজন তাদের পছন্দমতো অনুষ্ঠানাদি শোনার জন্য সকাল থেকে গভীর রাত অবধি ভিড় করতে আরম্ভ করল।

রেডিও নিয়ে যখন আমার বড়াই তুঙ্গে, তখন ঢাকা থেকে আমার এক কাকা গ্রামে এলেন। তিনি জানালেন, তাদের বাসায় সম্প্রতি টেপ রেকর্ডার কেনা হয়েছে। এরপর তিনি টেপ রেকর্ডারের দাম এবং সেই যন্ত্রে গান শোনার কায়দা কানুন বলে আমাকে তাক লাগিয়ে দিলেন। ফলে আমার চিন্তা-চেতনায় নতুন আকেরটি যন্ত্রের ধারণা বাসা বাঁধল। পুকুরিয়া স্টেশনে যে ভিড়ের কথা বলছিলাম, সেটি পেরিয়ে দেখি আমার স্বপ্নের টেপ রেকর্ডারে উচ্চৈঃস্বরে জারি গান বাজছে। বয়াতি আবদুুর রহমানের গাওয়া জারিগানের সুরে প্রায় দুই-আড়ই শ’ মানুষ যে কিভাবে মোহগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবেন না। বয়াতি সুর করে গাচ্ছিলেন ফাতেমার ছলনাÑ আলীর প্রাণে সহে না! একদিন ঝগড়া করলেন তারা দুইজনা। মা ফাতেমা আলীর খেদমত জানতেন না।

আলোচনার এ পর্যায়ে এবার বয়াতি বাদ দিয়ে পীর-ফকির-ওঝা বৈদ্য নিয়ে আবহমান বাংলার কিছু বাস্তব ঘটনা বলছি। আমাদের বাড়ির একদম পাশেই বিশ্ব জাকের মঞ্জিল নামে পরিচিত আটরশির পীর হাসমত আলীর বাড়ি। সেখান থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে চরমুকুন্দিয়া নামে পরিচিত আরেক পীরের বাড়ি। এ ছাড়া আটরশির মতো জমজমাট না হলেও চরমুকুন্দিয়ার চেয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল বা লাভজনক আরেক পীরের আস্তানা চন্দ্রপাড়ার দূরত্বও আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়- বড়জোর পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হবে। পীরের বাইরে ফকিরের সংখ্যা তো আমি গুনেও শেষ করতে পারব না। জটাধারী ফকির, জটা ছাড়া ফকির, মারেফতি ফকির, শরিয়তি ফকির ছাড়াও মহিলা ফকির ও শিশু ফকিরে আমাদের অঞ্চল গিজ গিজ করত। কিছু চালাক ফকির হঠাৎ সঙ পরিবর্তন করে পীরের বেশ ধারণ করত। কারণ পীরের আয়রোজগার ও মান-মর্যাদা ফকিরদের তুলনায় বেশি ছিল। এ ব্যাপারে ফারুখ ফকিরের পীর হওয়ার ঘটনা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।

ফারুক আমাদের পাশের বাড়ির ফেলু মাতুব্বরের ছোট ছেলে ছিল। সে আমাদের সাথে প্রাইমারি স্কুলে পড়ত এবং বয়সে আমার চেয়ে মাত্র এক বছরের বড়। তারা মাতুব্বর পদবিধারী হলেও সম্ভবত ফকিরি কর্মকাণ্ড অর্থাৎ ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ, জাদুটোনা বা জিন চালানের অনুরক্ত ছিল। আমাদের গ্রামের ইমরান মোল্লা, জালাল মোল্লা এবং বিষা ফকির বহু দিন ধরে গ্রামের মানুষদের ফকিরি সেবা দিয়ে যাচ্ছিল। তারা বছরে কয়েকবার উৎসবের আয়োজন করত- শত শত ভক্ত মুরিদানের আগমন ঘটত এবং খানাপিনার পাশাপাশি গাঁজার নেশাও চলত। গাঁজার নেশায় বুঁদ হওয়া যেকোনো একজনের ওপর জিন হাজির করা হতো এবং সেই নেশাগ্রস্ত লোকটি যা বলত লোকজন তার বক্তব্যকে জিনের বক্তব্য বলে বিশ্বাস করত। প্রচণ্ড জাল-জালিয়াতি ও ভেলকিবাজির মাধ্যমে কথিত ফকিররা জিনের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষের সর্বনাশ ঘটাত।
আমাদের এলাকার ফকিরদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ছিল এবং শত্রুতাও ছিল জঘন্য। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করত এবং নিজেদের ভক্ত-মুরিদ বাড়ানোর জন্য আধুনিক মার্কেটিং ব্যবস্থাপনার মতো আকর্ষণীয় প্যাকেজ চালু করত। নিত্যনতুন ফকিরের আমদানি হতো আবার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক ফকির তার পুরনো পেশায় ফিরে যেত। আমাদের পাশের বাড়ির ফেলু মাতুব্বরের ছেলে ফারুখকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট প্রথমে তাকে ফকির বানানোর চেষ্টা করল এবং ব্যর্থ হয়ে তারা অনেকটা দুঃসাহস দেখিয়ে বালক ফারুখকে পীর বানিয়ে ফেলল। বিষয়টি খুব সহজ ছিল না। কারণ আটরশির হাসমত আলী পীর এবং চন্দ্রপাড়ার পীরের মধ্যখানে বালক পীরের আস্তানা টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ, পর্যাপ্ত প্রচার-প্রপাগান্ডা এবং শক্তিশালী-ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল এবং সেটি কী ধরনের হতে পারে তা আন্দাজ করার জন্য আটরশি ও চন্দ্রপাড়ার কর্মকাণ্ডের কিছু সাধারণ নমুনা-বর্ণনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

আটরশি ও চন্দ্রপাড়াতে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ আসে। এসব লোকের কাছ থেকে নজরানা গ্রহণ, তাদের খানাপিনা, বর্জ্য ত্যাগ এবং আগত লোকজনের মন-মানসিকতা, পদ-পদবি এবং আশা-আকাক্সক্ষার বিষয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকলে কোনো পীরের আস্তানা জমে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে আটরশির শ্রেষ্ঠত্ব বাংলাদেশের যেকোনো আস্তানার চেয়ে বেশি। সেখানে সব ধর্মের লোকজন যাতায়াত করে এবং ধর্মমত অনুযায়ী খানাপিনা এবং অন্য বিষয়াদির ব্যবস্থা থাকে। ধর্মীয় আলোচনা, কেনাকাটা, বিশ্রাম এবং বিনোদনের একটি কম্পোস্ট প্যাকেজ এমনভাবে রচনা করা হয়, যার কারণে মানুষ সেখানে গিয়ে একধরনের আনন্দ অনুভব করেন। কেউ কেউ আবার সেই আনন্দে আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পান এবং আবেগপ্রবণ হয়ে পীরের কদমে নিজের সব কিছু নিবেদন করে বসেন। ফলে প্রতিটি পীরের আস্তানাকে ফুলেফেঁপে ওঠার জন্য ভক্ত-মুরিদদের আবেগ এবং অনুভূতিকে টার্গেট করে চলতে হয়। যারা পারে তার কুঁড়েঘর দিয়ে শুরু করে এবং আস্তানাকে শাহী প্রাসাদ বানিয়ে ফেলে। যারা পারে না, তারা শাহী প্রাসাদকে কুঁড়েঘর বানিয়ে ছাড়ে।
কথিত বালকপীর ফারুখকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার সিন্ডিকেট আটরশি ও চন্দ্রপাড়ার অনুকরণে কার্যক্রম শুরু করে এবং বছর কয়েক ধরে অব্যাহত চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারে না। ফলে ফারুখ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। আজ এত বছর পর হঠাৎ করেই বয়াতি এবং পীর-ফকিরদের কথা মনে এলো সাম্প্রতিক সময়ের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষাপটে। পত্রপত্রিকায় দেখলাম, শরীয়ত বয়াতি নামে একজন বাউল শিল্পীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শরীয়ত বয়াতির গ্রেফতারের প্রতিবাদে বাউলরা দলবেঁধে রাস্তায় নেমে এসেছেন এবং তাদের সমর্থন জানাচ্ছে দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী বলে পরিচিত একদল লোক। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার পর সরকারের টনক নড়ে। ফলে বয়াতিকে নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং শরীয়ত বয়াতির ব্যাপারে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখতে বাধ্য হন।

শরীয়ত বয়াতির বিরুদ্ধে অভিযোগÑ তিনি ইসলাম ধর্মের ব্যানারে অবমাননাকর বক্তব্য রাখেন এবং বিকৃত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে গান রচনা করে মানুষজনকে বিভ্রান্ত করেন। তিনি দেশের নামকরা আলেম-ওলামা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গকে কটাক্ষ করে বিভিন্ন অসম্মানজনক বক্তব্য রাখেন, যা কিনা দেশের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। শরীয়ত বয়াতি ছাড়াও কিছু পীর নামধারীর বিরুদ্ধে ইদানীং যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছে তা ইতপূর্বে কল্পনাও করা যেত না। নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জনৈক বিতর্কিত পীরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে প্রতারণার অভিযোগে। অন্য এক কথিত পীর তার বাড়িতে নকল কাবা স্থাপন করে সেখানে খুব কম খরচে হজ-ওমরাহর প্যাকেজ চালু করেছিল, যা পুলিশি তৎপরতায় বন্ধ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কিছু ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে দেখা যায় যে, কিছু ভণ্ডপীরের ভণ্ড মুরিদরা দাবি করছে যে, তাদের পীরই আল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় পীর-ফকির বা বয়াতিদের নিয়ে যে কুসংস্কার বা পশ্চাৎপদতা সেই ষাট বা সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রবল ছিল তা হঠাৎ করে ২০২০ সালের এই উন্নয়নের কথিত জোয়ারে কেন নতুন করে মাতামাতি শুরু করল তা বলতে পারব না। তবে এ কথা বলতে পারব যে, বয়াতি বা পীরদের প্রচারিত বিষয়বস্তু কিন্তু বহুসংখ্যক মানুষের মন-মানসিকতা ও চিন্তার রাজ্য আচ্ছন্ন করে ফেলে। নানা বয়সের মানুষজন বয়াতির সুর, কথা বা পীর-ফকিরদের কাণ্ডকারখানা দিয়ে প্রভাবিত হয় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা বয়ে বেড়ায়। তাদের কারো কারো মনে এসব বিষয় এতটাই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যে, তারা বিকৃত তথ্য, মিথ্যার বেসাতি এবং কুসংস্কারের মায়াজালে বন্দী হয়ে প্রকৃত সত্যকে পরিহার করে- কেউ কেউ সত্যকে রুখে দিয়ে মিথ্যার পাহাড় গড়ে তোলে এবং সেই পাহাড়ের পাদদেশে নিজেদের ভ্রান্তির প্রতিমূর্তি স্থাপন করে পূজা-অর্চনা শুরু করে দেয়।

সমাজবিজ্ঞানী-মনোবিজ্ঞানী এবং জ্ঞানী-গুণী মহামানবরা উল্লিখিত কুসংস্কারের জন্য প্রথমত মানুষের হতাশা, দ্বিতীয়ত মানুষের অশিক্ষা এবং তৃতীয়ত সমাজব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকে দায়ী করেন। মানুষ যখন শ্রমের মূল্য পায় না, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং প্রাণ খুলে নিজের আবেগ-অনুভূতি, রাগ-ক্ষোভ, কান্না এবং প্রতিবাদের স্বর প্রকাশ করতে পারে না, তখনই সে এলোমেলো এবং ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। মানুষ যখন সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে পারে না এবং সেই অবিশ্বাস যখন তার মনের গহিনে অনাস্থা সৃষ্টি করে, তখন তার ভেতরকার মায়া-মমতা, বিচার-বুদ্ধি এবং অন্যান্য মানবিক গুণ লোপ পায়। তার মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির ওপর একধরনের পর্দা পড়ে যায়। ফলে সে যখন বয়াতির মুখে হজরত আলী বা মা ফাতেমার কাহিনী শোনে, তখন সত্য খোঁজার তাগিদ অনুভব করে না। অন্য দিকে, তারা যখন কোনো পীর-ফকিরের আখড়ায় যায়, তখন সেখানে দুনিয়া ও আখিরাতের তাবৎ সমস্যার সমাধান দেখতে পেয়ে সব কিছু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ