০১ জুন ২০২০

শহীদ জিয়ার জন্মশতবার্ষিকী : কী ভাবছে বিএনপি?

জিয়াউর রহমান - ফাইল ছবি

শিশুটি যে দিন ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সে দিন তাকে ঘিরে তার মহীয়সী মাতা-পিতার আদর আহ্লাদ বা স্বপ্ন কেমন ছিল তা আমরা হয়তো বলতে পারব না। আমরা এ কথাও বলতে পারব না যে, জন্মকালে বা শৈশবে তার যে ডাক নামটি দেয়া হয়েছিল তা কি ভেবেচিন্তে করা হয়েছিল, নাকি আবহমান বাংলার অন্যসব শিশুর মতোই তার নামটি রাখা হয়েছিল। তার জন্ম এবং শৈশবের নাম নিয়ে আমার কৌতূহলের প্রধান কারণ হলো শৈশবকাল থেকেই তার চিন্তাচেতনা এবং কর্ম যেমন অন্যদের মতো ছিল না, তেমনি তার স্বভাব চরিত্র যেভাবে তার শৈশবের নামটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তা সচরাচর আমাদের সমাজে দেখা যায় না। তিনি খুব ছোটবেলা থেকেই দেশের কথা ভাবতেন এবং সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মানবতার সেবায় কাজ করতেন। তার ডাক নাম কমলের মতোই তিনি ছিলেন প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের এক বাস্তব রূপ। তার সৌম্যদর্শন মূর্তি, শান্তশিষ্ট স্বভাব, আলোকময় চোখ। বিনম্রতা এবং মৃদুভাষী বা কম কথা বলার অভ্যাসের সাথে তার শৈশবের ডাকনামটি যেভাবে একাকার হয়ে গেছে তা বাংলার অন্য কোনো কিংবদন্তির চরিত্রে দেখা যায় না।

তিনি জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালে এবং তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯৮১ সালে। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে মাত্র পঁয়তাল্লিশটি বছর। তার শৈশব-কৈশোর, শিক্ষা-দীক্ষা এবং কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য মাত্র সতেরোটি বছর ব্যয় হয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমিশনড অফিসার হিসেবে তিনি ১৯৫৩ সালে পিএমএ অর্থাৎ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির ১২তম লং কোর্সে যখন অংশগ্রহণ করেছিলেন তখন তার বয়সের সাথে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজয়ী এক সেনাপতির বয়স হুবহু মিলে গিয়েছিল। সিন্ধু বিজয়ের মহানায়ক মুহাম্মদ বিন কাসিম মাত্র সতেরো বছর বয়সে সিন্ধু ও মুলতান জয় করে ভারতবর্ষের দরজা মুসলমানদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন, যার ফলে পাক-ভারত উপমহাদেশে প্রায় এক হাজার বছরব্যাপী মুসলমানদের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল।

১৯৫৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেলেন, সে দিন থেকেই মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত শুধু অনবরত কাজই করে গেছেন। তার কর্মজীবনের সুদীর্ঘ ২৮টি বছরের প্রতিটি সেকেন্ডকে তিনি এমনভাবে কাজে লাগিয়েছেন, যার কারণে মাত্র ৪৫ বছরের জীবনে তিনি পৃথিবীর বুকে কর্মযজ্ঞের এমন সব সুমহান কীর্তিস্তম্ভ তৈরি করে গেছেন, যা অতিক্রম করার মতো মানুষ আজ অবধি পয়দা হয়নি। তিনি তার কর্মকে বিস্তৃত করেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে এবং চিন্তাচেতনা দিয়ে প্রভাবিত করেছেন দুনিয়ার মাশরেক থেকে মাগরেবের শাহী প্রাসাদ-জীর্ণকুটির, রাজধানীগুলোর কসমোপলিটান নাগরিক জীবন থেকে শুরু করে গহিন অরণ্যে বসবাসরত আফ্রিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। তিনি আরবের মরুবাসীকে শিখিয়েছেন ধূসর মরুর উষর প্রান্তরকে ফুল-ফল বৃক্ষরাজিতে পরিণত করার পদ্ধতি। তিনি বাংলার খরাকবলিত কৃষকের ভূমিতে পানির প্রবাহ ঘটিয়ে যেমন অভিনব সবুজ বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন, তেমনি পারস্য উপসাগর লোহিত সাগরের উপকূল এবং সাব সাহারার রুক্ষ মরুপ্রান্তরে যুদ্ধরত আরব-অনাবরদের মধ্যে শান্তির বাতাস প্রবাহিত করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

তার ২৮ বছরের কর্মজীবনের শুরুটা ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতো। বোনাপার্টও একজন কমিশনড কর্মকর্তারূপে ফরাসি সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়েছিলেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে কমিশন লাভ করেছিলেন। ফরাসি বাহিনীতে কমিশন লাভের চার বছরের মাথায় সেই দেশে ইতিহাসবিখ্যাত ফরাসি বিপ্লব হয়ে যায়। ফলে নেপোলিয়ন তার কর্মস্থল থেকে নিজের জন্মভূমি কর্সিকাতে চলে যান, নিজ জন্মভূমিকে দেশী বিদেশী শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন এবং একটি ত্রিমাত্রিক যুদ্ধে নিজের বীরত্বের প্রমাণ দিয়ে জাতীয় বীরে পরিণত হয়ে পড়েন। ফলে তার কমিশন লাভের মাত্র দশ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৭৯৫ সালের মধ্যে ফরাসি বাহিনীর প্রধান জেনারেলরূপে ইটালিতে অভিযান পরিচালনা করে বিশ্বের তাবৎ যুদ্ধের ইতিহাসকে ওলটপালট করে দেন। নেপোলিয়নের সৈনিক জীবনের দশম বর্ষ যেমন তার জীবনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি আমাদের আজকের নিবন্ধের মহানায়কের সৈনিক জীবনের দশম বর্ষও তার জীবনের সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছিল।

চাকরির দশম বছরে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কোম্পানি কমান্ডাররূপে পাঞ্জাবের খেমকরণ সেক্টরে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ইতিহাসবিখ্যাত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে কমল নামের শান্তশিষ্ট এবং স্বল্পভাষী সামরিক কর্তাটি যে বীরত্ব প্রদর্শন করেন তা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তার কোম্পানির মাত্র ১৫০ জন সৈন্য নিয়ে তিনি কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমরে ভারতীয় বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়নের আটশত সৈন্যকে সমূলে পরাজিত করে পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে যুদ্ধজয়ী রেজিমেন্টের গৌরব এনে দেন। তার এই বিজয় ওই অঞ্চলে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যা কয়েক দিনের মধ্যে অন্যান্য পাকিস্তানি রেজিমেন্টকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। ফলে যুদ্ধের ময়দানে ভারতের জন্য নিত্যনতুন দুর্ভোগ দুর্দশা এবং পরাজয় হানা দিতে থাকে।

ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে সেনাপতি কমল মাত্র ২৯ বছর বয়সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করেন। তাকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জীবিত যুদ্ধজয়ী বীরের সর্বোচ্চ সম্মাননা হিলাল-ই-জুরত নামক পদকে ভূষিত করা হয়। তার সেই বীরত্বের কারণে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নকেও পুরস্কৃত করা হয় সিতারে জুরত এবং তামঘা-ই-জুরত নামের দুর্লভ সম্মানিত পদক দিয়ে। পুরো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে বাঙালি বীর কমল ব্যতিক্রমী বীরত্ব প্রদর্শন করতে পেরেছিলেন তার অনন্য সাহস প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং শ্রেষ্ঠতম সামরিক কৌশলের কারণে। তিনি ছিলেন সেইসব বিরল সামরিক জিনিয়াসদের অন্যতম, যারা তাদের সৈনিক জীবনের প্রথম ১০ বছরের মধ্যে অত্যন্ত সফলতার সাথে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, কমান্ডো প্রশিক্ষণ, প্যারাট্রুপিংয়ের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অন্যান্য সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে পেরেছিলেন। তিনি জার্মান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ একাডেমি এবং ব্রিটেনের রাজকীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ একাডেমি থেকে যে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন তা-ও ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক এবং বিরল পেশাগত যোগ্যতা।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র তার নবীনতম জাতীয় বীরকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে। রাষ্ট্র বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একজন স্বল্পভাষী কমলকে মেজর জিয়াউর রহমানরূপে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনের কাছে যেমন আলাদা মর্যাদায় উপস্থাপন করেন তেমনি পাকিস্তানের চির শত্রু ভারতের কাছে মেজর জিয়ার বীরত্বকে মূর্তিমান আতঙ্করূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে ১৯৬৫ সালের পর থেকে মেজর জিয়া নামটি পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্র জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যেমন ভাবছিল ঠিক তার বিপরীতে ব্যক্তি জিয়ার ভাবনা ছিল কেবল পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে। তিনি পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের উত্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুধাবন করেন যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সদস্যরূপে পূর্ববঙ্গের জনগণ বেশি বেশি অংশগ্রহণ না করলে কোনো দিন যেমন ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে না তদ্রূপ পাকিস্তানের ফিউডাল গোষ্ঠীকে চাপে রাখতে হলে বড় বড় সামরিক পদপদবিতে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের যেকোনো মূল্যে নিয়োগ লাভ করতে হবে।

জিয়াউর রহমান তার উল্লিখিত ভাবনাকে কর্মে পরিণত করার জন্য নিজের ইমেজ কাজে লাগান। তিনি পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটো নতুন ব্যাটালিয়ন যা অষ্টম ও নবম বেঙ্গল নামে সুপরিচিতি লাভ করে, গঠন করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। এরপর তিনি কৌশলে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ডরূপে ঢাকার জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে বদলি হয়ে আসেন ১৯৬৯ সালে। জিয়াউর রহমান সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং তাকে স্বাধীনতাযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে, যার জন্য দরকার পড়বে আরো কৌশলগত প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা। সেই লক্ষ্যে তিনি অ্যাডভান্সড মিলিটারি কমান্ডের ওপর দুটো গুরুত্বপূর্ণ কোর্স করার জন্য প্রথমে পশ্চিম জার্মানির মিলিটারি একাডেমি এবং পরে ব্রিটিশ রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণগুলোতে মেজর জিয়া অনন্য সফলতা দেখান এবং এক নতুন মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন ১৯৭০ সালে এবং একই বছরের অক্টোবর মাসে জয়দেবপুর থেকে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে যান।

১৯৭০ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ভোলাসহ দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ইতিহাসের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয় এবং ১১ নভেম্বর পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হেনে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের জীবনহানিসহ প্রকৃতি ও পরিবেশ লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ১৯৭০ সালের উত্তাল রাজনৈতিক অবস্থা এবং পাকিস্তানি জান্তা ইয়াহিয়ার নির্লিপ্ততার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগটি মানবেতর রূপ নেয়। পাকিস্তান সরকারের পক্ষে দুর্যোগ মোকাবেলা এবং ত্রাণকার্যসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব পড়ে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। পাকিস্তানের কিছু গলাবাজ রাজনৈতিক নেতার অমানবিক আচরণ, সামরিক জান্তার নিষ্ঠুর মনোভাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণের আহাজারি মেজর জিয়ার মন বিষিয়ে তোলে। তিনি সম্ভবত ভোলা ট্র্যাজেডির নির্মম অভিজ্ঞতা থেকেই একটি স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করার বিষয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যান। তা না হলে তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে স্বতন্ত্রভাবে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারতেন না এবং তার আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং নিজের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়াকে গ্রেফতার করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

স্বাধীন বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণকে সুখ শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে তার চিন্তাচেতনা এবং পূর্বপ্রস্তুতি যে কতটা পরিপক্ব ছিল তা আমরা বুঝতে পারি রণাঙ্গনে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়ার অসম সাহসী এবং অমিত বিক্রমের সম্মুখ যুদ্ধের বিজয়গাথা দেখে এবং পরে তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হলেন তখন তার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেখে। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রে এবং সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুগপৎ ভূমিকা রেখে বীরত্ব সাহসিকতা দেশপ্রেম মেধা মননশীলতা এবং সৃজনশীলতায় জিয়াউর রহমান যে মাইলফলক স্থাপন করেছেন তার নজির কেবল বাংলাদেশ নয়- বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও খুব একটা দেখা যায় না। তিনি নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি আপন স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেন এবং অন্যের স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা-ও হাতেকলমে শিক্ষা দিতেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার আত্মমর্যাদাবোধ, আভিজাত্য, উন্নততর শিক্ষা, রুচিবোধ এবং পরিমিতিবোধ সারা দুনিয়ার প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তার ড্রেস কোড, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, বাচনভঙ্গি এবং বাংলা ও ইংরেজি বলার ধরন তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। তার সার্বিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তিনি যখন বিশ্ব নেতাদের সাথে বৈঠক করতেন তখন সবাই একবাক্যে তার প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতেন। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, চৌধুরী চরণ সিং ও মোরারজি দেশাইয়ের সাথে ত্রিমাত্রিক কূটনীতি করার সফলতা এবং পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল জিয়ার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সৌদি বাদশাহ খালিদ এবং চীনা প্রেসিডেন্ট মার্সাল ঝু ডে’র আনুকূল্য লাভ বিশ্ব-কূটনীতির ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব, ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির স্নেহ লাভের পাশাপাশি সাদ্দাম হোসেন, কর্নেল গাদ্দাফি এবং হোসনি মোবারকের মতো বিশ্বনেতাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন যে কতটা জটিল তা মূল্যায়ন করার মতো মেধা আমাদের দেশের খুব অল্প লোকেরই রয়েছে।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকালীন জিয়াউর রহমান বিভিন্ন দেশ থেকে যে রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন তা পাক ভারতের অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের কপালে জোটেনি। তিনি মিসর সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান অর্ডার অব দি নাইল লাভের পাশাপাশি যুগোস্লাভিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান যথাক্রমে অর্ডার অব দি যুগোস্লাভ স্টার এবং হিরো অব দি রিপাবলিক লাভ করেন। তুরস্ক সরকার তাদের রাজধানী আঙ্কারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণ করে বাংলাদেশ এবং এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে সম্মানিত করেছে তা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্য কারো ভাগ্যে জোটেনি।

জিয়াউর রহমান ক্ষণজন্মা কিংবদন্তির মহাপুরুষ ছিলেন। তার সামরিক মেধা রাজনৈতিক মেধা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সততা ও মানবিক গুণাবলি কেবল বাংলাদেশ নয়- বিশ্ববাসীর জন্য এক অনন্য উদাহরণ। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এবং সেই বিএনপির শীর্ষনেতারা আগামী দিনে যখন জিয়াউর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন করবে তখন হয়তো তার জীবনের আরো বহু অপ্রকাশিত আলেখ্য সামনে চলে আসবে এবং আমাদের ভালো মানুষ হওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ

সকল