০৫ জুলাই ২০২০

নববর্ষের জন্মকথা

-

নববর্ষ বলতে গেলেই প্রশ্ন ওঠে কোন নববর্ষ। এ দেশে এখন তিনটি নববর্ষ চালু আছে। ইংরেজি, আরবি এবং বাংলা। অন্য কথায় বাঙালি মুসলমানদের তিনটি নববর্ষ উৎসব পালন করার সুযোগ আছে।

নববর্ষ নিয়ে নানা উৎসব, আলোচনা-সমালোচনা হয় এবং স্বাভাবিক। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- সময় এবং জোয়ার কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই বয়ে যাওয়া সময় নিয়ে শুধু ভাবনাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। প্রধান ভাবনা হলো বছরের গণনা কেন শুরু হয়- দিন মাস বছর। আরো ক্ষুদ্রাংশের দিকে গেলে বলতে হয় ঘণ্টা সেকেন্ড ইত্যাদি।

এগুলোর প্রচলন হয় মানুষের প্রয়োজনে। নিজের জীবনকে পরিচালনা করতে হলে স্থান-সময় নির্ধারণ করা দরকার পড়ে। তাই ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অতীতের মানুষরা দিনপঞ্জির ব্যবহার আজকের মানুষের মতোই করত। খ্রিষ্টীয় বছরের বয়স ২০০০ বছর হলেও দিনপঞ্জির ব্যবহারের ইতিহাস চার-পাঁচ হাজারের এবং বিশ্বের সর্বত্র এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

শুধু ইংরেজি মাসগুলোর নামের দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়, এগুলো রোমান এবং গ্রিকদের দেয়া এবং অনেক স্থলে অবিকৃত রয়ে গেছে। তারা দিনপঞ্জি ঠিক করে। তার অংশগুলো নামকরণ করে তাদের দেবতার নাম অনুসরণে। ফলে বেশির ভাগ নাম গ্রিক ও রোমান।

তখন বর্ষ শুরু হয় রোমান দেবতা জানুসকে স্মরণ করে। তবে খ্রিষ্টীয় বর্ষ শুরু হয় নামকরণ ও খৎনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। যিশু খ্রিষ্টের (হজরত ইসা আ:) জন্ম স্মরণ করে বর্ষ গণনা করা হয়। পয়লা জানুয়ারি হয় তাঁর খৎনার অষ্টম দিন। লুথেরান এবং অ্যাংলিকান চার্চ এই উৎসব এখনো পালন করে। তবে এই উৎসবের জন্ম মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) অবস্থিত তাদের চার্চগুলোতে।

রোমান পঞ্জির প্রথম মাস ছিল মার্চ। সে হিসাবে বছর গণনা হতো ১০ মাস দিয়ে। এর জের এখনো চলছে। এ জন্য সে নামগুলোর পরিবর্তন হয়নি। যেমন সেপ্টেম্বর। এর অর্থ সপ্তম হলেও মাসটি বছরের নবম মাস। অক্টোবর মাসের অর্থ হলো অষ্টম মাস। অথচ বাস্তবে এটা দশম মাস। এভাবে নভেম্বর (রোমান ভাষায়) হলো নবম মাস, যদিও এটা এখন বাস্তবে এগারোতম মাস এবং ডিসেম্বর রোমান নাম অনুসারে দশম মাস হলেও বাস্তবে এখন এটা বছরের শেষ মাস। বছরের অন্য মাসগুলোর নামকরণ হয় বেশির ভাগ রোমান দেবতাদের নাম অনুসারে। যেমন জানুয়ারি দেবতা জানুসের নামে। তবে ফেব্রুয়ারি নাম হলো রোমানদের ফেব্রয়া বা পরিশীলিত হওয়ার উৎসবের নামে। রোমান যুদ্ধের দেবতা মার্সের নামে মার্চ মাস। রোমান এপ্রিলিস বা পাতা-ফুলের সময়ের নাম অনুসারে এপ্রিল মাস। এরপর মে গ্রিস রোমের বসন্ত দেবীর নামে। জুন রোমানদের প্রধান দেবীর নামে। জুলাই রোমের স্বৈরশাসক জুলিয়াস সিজারের নামে। আগস্ট রোমের সম্রাট অগাস্টাস সিজারের নামে। সেপ্টেম্বর বছরের সপ্তম মাস। অক্টোবর বছরের অষ্টম মাস (বাস্তবে দশম মাস)। নভেম্বর নবম মাস (বাস্তবে ১১তম মাস) এবং ডিসেম্বর-দশম মাস (বাস্তবে বছরের দ্বাদশ বা শেষ মাস)।

আসলে পঞ্জিকার জন্ম হয় প্রাকৃতিক উপসর্গকে নির্ধারণ এবং স্মরণ করার জন্য। এর প্রচলনের ইতিহাস পাওয়া যায় যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ২০০০ বছর আগ থেকে। তখন থেকেই তারা তিনটি ঘটনাচক্র বা সময়ের ভাগ করে প্রাকৃতিক উপসর্গ এবং অবস্থাভেদে। এরা হলো- দিন (পৃথিবীর ঘূর্ণন), বছর (সূর্যের চার দিকে ঘূর্ণন) এবং চাঁদের ঘূর্ণন (পৃথিবীর চার দিকে)। তাদের অসুবিধা ছিল প্রাকৃতিক অবস্থাগুলোর সময় (সাইকেল) সমভাবে চলে না। ফলে চন্দ্র মাস বা সৌরমাসের সাথে যোগ বিয়োগ করতে হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫০ সালে রোমের প্রতিষ্ঠার সময় এর প্রতিষ্ঠাতা রমুলাস দিনপঞ্জীয় ব্যবহার শুরু করেন বলে বর্ণিত। তখন বছর ছিল ১০ মাসের এবং বছর শুরু হতো মার্চ মাস থেকে। পরে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি যোগ করা হয়। রোমান নামগুলো হলো- ১. জানুয়ারিয়াস (জানুয়ারি), ২. ফেব্রুয়ারিয়াস (ফেব্রুয়ারি) (ইন্টারক্যালারিস-লিপ মান্থ), ৩. মাটিয়াস (মার্চ) ৪. এপ্রিলিস (এপ্রিল), ৫. মাটাস (মে), ৬. জুলিয়াস (জুন), ৭. কুইন্টিলিস (জুলাই), ৮. সেক্সটিলিস (আগস্ট), ৯. সেপ্টেম্বর (সেপ্টেম্বর), ১০. অক্টোবর (অক্টোবর), ১১. নভেম্বর (নভেম্বর), ১২. ডিসেম্বর (ডিসেম্বর)।

খ্রিষ্টপূর্ব ৭১৩ সালে রোমের রাজা নুসা পম্পিলিয়াস দিনপঞ্জির সংস্কার করেন। তিনি শীতকালীন সময়কে দু’ভাগে ভাগ করে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি নাম দেন এবং জানুয়ারিকে প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ল্যাটিনে ‘জে’ অক্ষরটির প্রচলন করে জানুয়ারি লিখেন। পরে এটি ইংরেজির অংশও হয় এবং ‘লিপ ইয়ারের’ প্রচলনও তিনি করেন।

তিনি সংস্কার করেন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার, যা প্রস্তুত করেন জুলিয়াস সিজারের আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত জোতির্বিদ সোসিজেনিস। অবশ্য সে সংস্কার ছিল সামান্য। আজও সোসিজেনিসের দিনপঞ্জি বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরে আসে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যাতে পোপ গ্রেগরি (ত্রয়োদশ) ১৫৮২ সালে ১১ মিনিট সংযোজন করেন। তাই এখন জুলিয়ান এবং গ্রেগরি ক্যালেন্ডার বলে পরিচিত হলেও তারা বিশ্বব্যাপী প্রায় একই ক্যালেন্ডার।

তবে মাসের জুলাই নামের পেছনে একটি ইতিহাস আছে। খ্রিষ্টপর্ব ৪৫ সালের মধ্যে রোমান দিনপঞ্জি নানা প্রভাবে বিভিন্নভাবে গণনা করার ফলে দিনপঞ্জি প্রকৃতির সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। একসময় জানুয়ারি শীত পেরিয়ে বসন্তে চলে যায়। ঠিক এ সময়েই জুলিয়াস সিজার ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তার হুকুমে পঞ্জিকার সংস্কার করে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫ সালে ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন ঘোষণা করা হয়। ঘটনাক্রমে এ মাসেই সিজারেরও জন্ম হয়েছিল। তাই এই সংস্কারের কাজ করার জন্য মাসটির নাম জুলিয়াসের নাম অনুসারে জুলাই রাখা হয় রোমান নাম কুইন্টিলিস পরিবর্তন করে।

এরপর সিজারকে হত্যা করা হলে তার নাতি অক্টেভিয়ান ক্ষমতা দখল করে অগাস্টাস সিজার নাম ধারণ করে। তখন একটা মাস তার নামে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং মাসটিকে আগস্ট বলে অভিহিত করা হয়। ফলে সেক্সটিলিস হলো আগস্ট। রোমের ইতিহাস ছিল ভয়ানক অশান্ত। এই ২৭ খ্রিষ্টপূর্বে রোমের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান হয়, মিসর তাদের অধীনে আসে এবং অগাস্টাস রোম দখল করে।

এ সময়েই ‘মে’ মাসের নামও পরিবর্তন করে সম্রাট ক্লডিয়াসের নামে রাখা হয় এবং এপ্রিল পরিবর্তন করে সম্রাট নিরোর নামে রাখা হয়। নানা কারণে এই পরির্তন সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে এপ্রিল এবং মে টিকে যায়। তবে এ সময়ের সম্রাট কসোডাস (যিনি পেশাদার মল্লযুদ্ধকে উৎসাহ দিতেন) তার বারোটা নাম অনুসারে প্রত্যেক মাসের নাম রাখেন। যেমন সেপ্টেম্বরকে বলা হলো জারমেনিকাস বা এন্টোমিনাস বা ট্যাসিটাস। জুলিয়াস এর পরিবর্তন করে বর্তমানের নামগুলো রাখেন।

সারা বিশ্বে এই রোমান ক্যালেন্ডার প্রাধান্য লাভ করার ফলে নববর্ষ পালিত হয় ১ জানুয়ারিতে। তবে এখনো বহু দেশ তাদের নিজেদের পঞ্জিকা অনুসরণ করে দিনটি পালন করে। কেবল ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কলোনিগুলোর দেশগুলোতে জানুয়ারি প্রথম নববর্ষ। বিশেষ করে ১৭৫২-তে ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন ঘোষণা করেন পোপ গ্রেগরি।

ইথিওপিয়ার নওরোজ হয় ১১ সেপ্টেম্বর। তবে তারা মিসরের দিনপঞ্জিও অনুসরণ করে। আবার লেজোথোর মানুষরা তাদের সোথো দিনপঞ্জি অনুসারে ১ আগস্ট তাদের সেলেমো সা বাসোথো উৎসব পালন করে। এটা শীতের প্রস্থান এবং নতুন বছরের আগমন হিসেবে ধরা হয়। চীনের বিভিন্ন স্থানে সৌর এবং চান্দ্রমাসের হিসাবে জানুয়ারি ২০ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০ মধ্যে নববর্ষ পালন করে। এ দিনে তারা তাদের উপহারগুলো লাল রঙে রঞ্জিত করে বা লাল কাপড় দিয়ে আবৃত করে। এই রঙকে তারা সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে দেখে। ভিয়েতনামীদের নববর্ষকে টেট নগুয়েন দান বা সংক্ষেপে টেট বলে অভিহিত করা হয়। এর অর্থ হলো প্রথম সকালের ভোজ। এরা চান্দ্রবছর অনুসরণ করে। জাপান এখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। চীনা ক্যালেন্ডার তারা বাদ দিয়েছে। কোরিয়ার নববর্ষের নাম সিওলিয়াল। এটা চান্দ্র দিনপঞ্জি অনুসারে। তবে তারা গ্রেগরি দিনপঞ্জিও একসাথে উদযাপন করে। এ দিনে তারা পিতা-মাতা-পূর্বপুরুষদের কবর পরিদর্শন করে পরিবারের সাথে ইয়ুননুরী বলে এক ধরনের খেলায় মেতে থাকে। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠদের কিছু অর্থ দান করে। ক্যাম্বোডিয়ার নববর্ষের নাম চাউল চমন থেম্মে, যা উদযাপন করা হয় ১৩-১৪ এপ্রিলে। খেমারদের নববর্ষ উদযাপন তিন দিন ধরে। প্রথম দিনকে বলা হয় মহাসংক্রান। দ্বিতীয় দিন হলো ভিরাক ওয়ানাবাট এবং শেষের দিন হলো ভিরান লউরং সাক। এ সময়ে তারা প্যাগোডায় (তাদের উপসনালয়) যায় অথবা ঐতিহ্যবাহী খেলায় মত্ত হয়। থাইল্যান্ডের নববর্ষ ১৩-১৪ এপ্রিল সংক্রান হিসাবে। এ সময় তারা একে অন্যের ওপর পানি ছিটিয়ে বা ঢেলে দেয়। এই পানি হলো বুদ্ধমূর্তি ধুয়ে যে পানি পাওয়া যায়, সেই পানি। এই পবিত্র পানি জ্যেষ্ঠদের ঘাড়ে ঠেলে দেয়া হয় আশীর্বাদ এবং সৌভাগ্য হিসেবে। ভারতে খ্রিষ্টানরা ১ জানুয়ারি নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করে। আসলে ভারতে নববর্ষের সংখ্যা অনেকগুলো। কারণ নানা বর্ণের মানুষ তাদের ধর্মমত এবং কৃষ্টি অনুসারে দিনটি পালন করে থাকে। বিশেষ করে হিন্দুধর্মের নানা অংশ এটি বিভিন্নভাবে পালন করে। বৈশাখ মাস এপ্রিলের সাথে গণনা করা হয়। এ জন্য নববর্ষ এ সময় পালন করা হয়। নেপালের নববর্ষ হলো নেপাল ‘সমবাত’। বাংলাদেশে নববর্ষ হলো ১ বৈশাখ। এটা পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা এবং আসামের একাংশ উদযাপন করে। শিখদের নববর্ষ হলো তাদের নানকি দিনপঞ্জি অনুসারে, ১৪ মার্চ। সিংহলের তামিলরা তাদের ‘আলুথ আভুরুদ্দ’ নববর্ষ হিসেবে প্রতিপালন করে। এটা তাদের ফসল তোলার শেষ মাস যা ‘বাক’ বলে পরিচিত। এটা ‘মীন’ রাশি থেকে ‘মেষ’ রাশিতে পদার্পণ করার সময় হিসাবে ধরা হয়। তেলেগুদের নববর্ষের নাম ‘ইউগাদি’, যা ‘চৈত্রম চৈত্র শুদ্ধ পাদিয়ামি’ হিসেবে অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, কর্নাটকে উদযাপন করা হয়। তবে তাদের নববর্ষ চান্দ্র বছরভিত্তিক হওয়ার কারণে কোনো ইংরেজি বছরে এক হয় না। তারিখ পরিবর্তিত হয়। ইউরোপের সার্বিয়ায় নববর্ষ স্রাপস্কা নোভা গোদিনা হিসেবে উদযাপিত হয়। আরবে হিজরি সাল থেকেই নববর্ষ গণনা হচ্ছে এখন। পারস্যের নওরোজ বিখ্যাত নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে। এটা গত ৩০০০ বছর ধরে প্রতিপালিত হচ্ছে বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। এটা সাধারণ ২১ মার্চ এক দিন আগে বা পরে পারস্যের বিভিন্ন স্থানে উদযাপিত হয় ‘তিশরেল’ পর্ব হিসেবে। ইহুদিরা নববর্ষ রোশ হাসানাহ হিসেবে বিশ্বের যেখানে থাকে সেখানে পালন করে। তাদের দিনপঞ্জি হিসেবে এটা সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে পড়ে। তবে তারা ১ জানুয়ারিও উদযাপন করে ‘সিলভেস্টার’ বা ‘সিভিল নিউ ইয়ার’ হিসেবে উদযাপন করে।

দিনটি কিভাবে উদযাপিত হয়? জবাবে বলা যায়, সর্বত্রই একটি কর্মকাণ্ড এক রকম। তা হলো ‘খাওয়া-দাওয়া’। এর সাথে প্রার্থনাও কেউ কেউ জোড়া দেন। কিছু দৃশ্যের বর্ণনা দেয়া যায়।

যেমন লন্ডনে টেমস নদীর তীরে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় আতশবাজি দেখার জন্য। সেখানে রাত ১২টায় বিগবেন ঘড়িতে ঘণ্টা বাজলেই এই আতশবাজি শুরু হয়। স্কটরা নববর্ষ দিনকে ‘হোগমানি’ বলে, সেখানে খাওয়া-দাওয়া ও আতশবাজি চলে। ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। গ্রিস এবং সাইপ্রাসে রাত ১২টা বাজলেই সবাই ঘরের আলো নিভিয়ে দেয় এবং ‘ভাসিলোপিতা’ পাত্রটি কেটে খুলে ফেলে। এই পাত্রে একটা মুদ্রা রাখা থাকে। যে এই মুদ্রা পায় তার জন্য সারা বছরের ভালো কপাল বলে বলা হয়। তখন তারা ‘ট্রিয়ানটাইনা’ বলে এক খেলায় যোগ দেয়, যা তাদের প্রার্থিত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। ফিলিপাইনের নববর্ষ অন্য সব খ্রিষ্টান দেশগুলোর মতো। রাশিয়ায় কমিউনিস্ট অধিকারের পর তাদের নববর্ষের সংখ্যা বেড়ে যায়। পুরনো নববর্ষ ১৩ জানুয়ারিতে এখনো পালন করা হয়। প্যারিসে নববর্ষ শুরু হয় রাত ১২টা পার হলেই। হাজার হাজার নারী-পুরুষ সাঁজেলিজেতে জড়ো হয়, একে অন্যকে চুমু দেয় এবং আলিঙ্গন করে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। এখানে যেকোনো পুরুষ যেকোনো নারীকে চুম্বন করে শুভেচ্ছা জানাতে পারে। নিউ ইয়র্কের কর্মকাণ্ড সত্যিই অপূর্ব। এখানে অনেক ওপরে রাখা ১১৮৭৫ পাউন্ড (৫৩৪৬ কেজি) ওজনের বিশাল বলটি রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে নামানো শুরু হয় এবং ১২টা বাজলে তা ভূমি স্পর্শ করলেই সারা নিউ ইয়র্ক যেন আনন্দে ডুবে যায়। তোপধ্বনি, আতশবাজি, নানা সঙ্গীত এবং বাজনায় ভরে যায় শহরটিসহ সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। স্পেনে নববর্ষ পালনটি মজার। সবাই ১২টি আঙ্গুর হাতে নিয়ে রাত ১২টা বাজার ঘড়ির প্রতিটি শব্দের সাথে একটি করে আঙ্গুর খায়। এই খাওয়াটাকে তারা সৌভাগ্যের দ্বার মনে করে।

ইতিহাস অনুসারে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫ সালে নববর্ষ পালনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে আজকের দিনপঞ্জীয় নায়ক হচ্ছেন জুলিয়াস সিজার। তিনি পুরনো রোমান দিনপঞ্জি সংস্কারের জন্য জোতির্বিদ সোসিজেনিসকে তার ভার দেন। তিনি পুরনো ১ মার্চ বছরের প্রথম দিন পরিবর্তন করে ১ জানুয়ারি করেন এবং বছরের মাসের সংখ্যা ১০ থেকে ১২-তে উন্নীত করেন। ১৫৭০-এ পোপ গ্রেগরি এই দিনপঞ্জি সংস্কারের জন্য জোতির্বিদ ক্রিস্টফার ক্লাভিসকে ভার দেন। তিনি লক্ষ করেন চান্দ্র এবং সৌর গণনা হিসাবে বছরের আকার ১০ দিন কম-বেশি হয়। তিনি লিপইয়ার (যা চার বছর পরপর হিসাব করা হয়) স্থাপন করে এই সমস্যার সমাধান করেন। সোসিজেনিস এবং ক্লাভিজ প্রণীত এই ক্যালেন্ডার এখন চালু। তবে এই নববর্ষ পালন এখন আর শান্তিপূর্ণ নেই পৃথিবীর কোথাও। এমন যেন সবাই এই দিনে তাদের এজেন্ডা নতুন করে শুরু করবে- অপরাধীরা তাদের অপরাধ, ক্ষমতাবানরা তাদের ক্ষমতার ব্যবহারের- এ বিষয়টি যদি বাদ দেয়া যেত, তাহলে নববর্ষ সত্যিই সুন্দর হতো।


আরো সংবাদ