২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

সোলাইমানি হত্যা, মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা

ট্রাম্প দাবি করেছেন জেনারেল সোলাইমানি মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। - ছবি : সংগৃহীত

২০২০ সালের প্রারম্ভিক উত্তেজনাকর ‘আগুনে নতুন করে ঘি ঢালা’র কাজটি করা হলো ইরানের দুই নাম্বার ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আল কুদস প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যার মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটানোর মধ্য দিয়ে নিজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছে বলে মনে হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও তার বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্তের সময় তাড়াহুড়ো করে ইরাকে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে এবার ঘটনাটির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের সে লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না সংশয় রয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ও প্রতিনিধি সভার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে অগ্নিকুণ্ডলীতে ডিনামাইট মারার কাজটি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে এবং সেখানে কর্তব্যরত আমেরিকানরা আরো অনিরাপদ হয়ে পড়বেন।

রিপাবলিকানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। অন্য দিকে, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের বেশির ভাগই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও নিজেই বলেছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে ইউরোপের কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছে না। এর উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো কেবল ইসরাইল ও এর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালের পর কোনো স্বাধীন দেশের জেনারেলকে যুদ্ধ ছাড়াই এবং রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে বিদেশ সফরকালে ড্রোন হামলায় হত্যার নতুন যে রেকর্ড স্থাপিত হলো, তাতে সব জেনারেলই আতঙ্কবোধ করতে পারেন। আর বুলগেরিয়ার বাবা ভাঙ্গার মতো কেউ কেউ ২০২০ সালে শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান গুপ্তহত্যার শিকার হতে পারেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছেন। এতে টার্গেটেড গুপ্তহত্যার যে নজির ইসরাইল বিশেষভাবে স্থাপন করেছিল, সেটি সাধারণ ক্ষেত্রে অনুসৃত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় কি না এ ব্যাপারে অনেকেই আতঙ্কিত। কারণ ট্রাম্পের তালিকায় শুধু কাসেম সোলাইমানি সন্ত্রাসী ছিলেন না, ছিলেন খোদ আয়াতুল্লাহ খামেনিও। এ কারণে সোলাইমানিকে হত্যার পর অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

কাসেম সোলাইমানির মৃত্যু ইরানের জন্য নিঃসন্দেহে অনেক বড় ক্ষতি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক নির্মাণে তার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখা, লেবাননে হিজবুল্লাহকে একটি দুর্দমনীয় ধরনের বাহিনীতে রূপান্তর, ইয়েমেনে আনসারুল্লাহ বাহিনীকে (হাউছি) সংগঠিত করা ও শক্তি জোগানোতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এই ভূমিকার জন্য সোলাইমানি একটি সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখার প্রধান হলেও তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ছিল অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট রুহানির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাকে ইরানের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছিল।

এ অবস্থায় সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় আঘাত। কিন্তু এ ঘটনার পর দেশটিতে যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেটি ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশাসহ বিভিন্ন কারণে যে ক্ষোভ-অসন্তোষ জনগণের মধ্যে ছিল, সেটি কাটিয়ে উঠতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে সোলাইমানির জানাজায় ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ১৯৮৯ সালে ইরানি বিপ্লবের নায়ক আয়াতুল্লাহ খামেনির নামাজে জানাজায় সর্বাধিক ৫০ লাখ লোকের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। ইরানের সরকারি মিডিয়ার ভাষ্য অনুসারে, সেই রেকর্ড ভেঙে আরো বেশি মানুষ এবার হাজির হয়েছেন সোলাইমানির জানাজায়।

একই সাথে এ ঘটনার অনেক বড় প্রভাব পড়বে ইরাকেও। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিরও অবসান ঘটবে বলে মনে হচ্ছে এখন। ইরাকের মোকতাদা আল সদরসহ যারা ইরান প্রভাবিত ইরাক সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছিলেন, তারা আমেরিকার এই হামলার পর অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এর মধ্যে রোববার ইরাকের পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশনে ইরাক থেকে দখলদার মার্কিন সেনা বহিষ্কার করার বিল পাস হয়েছে। এই অধিবেশনে ভাষণ দানকালে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল মাহদি বলেছেন, ‘ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি বাগদাদের আমন্ত্রণে ইরাক সফরে এসেছিলেন এবং শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় আমার সাথে তার সাক্ষাৎ করার কথা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে, ইরাকের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সাথে ইরানের যে সংলাপ চলছিল, সে সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছিলেন জেনারেল সোলাইমানি। সৌদি আরব এর আগে ইরাকের মাধ্যমে ইরানকে যে বার্তা দিয়েছিল, সে ব্যাপারে তেহরানের জবাবি বার্তা নিয়ে জেনারেল সোলাইমানি বাগদাদ সফরে গিয়েছিলেন।’

ট্রাম্প দাবি করেছেন জেনারেল সোলাইমানি মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর এ চাঞ্চল্যকর তথ্য সোলাইমানিকে হত্যা করার পেছনে আমেরিকার দাবি মিথ্যা প্রমাণ করেছে। এখন মনে হচ্ছে, সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইরানের শাসন পরিবর্তনে আমেরিকা-ইসরাইলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, ইরাকে ইরানি প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আবারো বাড়তে থাকবে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জেনারেল সোলাইমানি হত্যার জন্য দায়ীদের ওপর প্রতিশোধ বা পাল্টা আঘাত হানার কথা বলেছেন। এর মধ্যে কোম শহরের প্রধান মসজিদে রক্তলাল পতাকা উড্ডীন করা হয়েছে। এটি ’৭৯ সালে বিপ্লবের পর আর কোনো সময় দেখা যায়নি। ইরান কিভাবে কত দ্রুত প্রতিশোধের পদক্ষেপ নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এর আগে রাশিয়া ও চীনের সাথে বিশেষ বোঝাপড়ার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। এই দুই দেশের সাথে ইতোমধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে ইরান।

ইরান মার্কিন হামলার জবাব কিভাবে দেবে? ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র অন্যতম কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফাজল শেকারচি বলেছেন, ‘জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার কারণে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। তবে এজন্য তাড়াহুড়ো করবে না ইরান। আমেরিকাকে কঠোর জবাব দেয়ার জন্য ইরান ধৈর্য ধরে পরিকল্পনা করবে এবং উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্ধারণ করেই জবাব দেবে।’

সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এ ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমেরিকার জেনে রাখা উচিত, এত বড় অপরাধযজ্ঞ চালিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় তারা সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল করেছে এবং এত সহজে তারা এই ভুলের পরিণতি থেকে রেহাই পাবে না। উপযুক্ত সময়ে ও উপযুক্ত স্থানে আমেরিকার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে।’

ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেয়া এসব বক্তব্যে মনে হয় না যে, খুব তাড়াহুড়া করে দেশটি প্রতিশোধের পথে পা বাড়াবে। বরং তারা যা কিছু করবে তা করা হবে ভেবেচিন্তে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণে নিবৃত্ত থাকা অথবা প্রতিশোধকে সমপর্যায়ে সীমিত রাখার বিনিময়ে সব ধরনের অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য আমেরিকার দেয়া এক প্রস্তাবের কথা বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এসব প্রস্তাবকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয়নি তেহরানের বক্তব্যে। বরং তারা এর আগে ছয়টি বিশ্বশক্তির সাথে চুক্তির কারণে পারমাণবিক যেসব কর্মসূচি স্থগিত রেখেছিল তা পুনরায় শুরু করার কথা ঘোষণা করেছেন। তারা শিগগিরই যদি এই শক্তি অর্জন করেন, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

এর মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ৩৫টি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলেছে। অন্য দিকে, ট্রাম্প ইরানের প্রতিশোধের ঘটনা ঘটলে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৫২টি স্থানে আঘাত করার হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নেয়ার আগে ইরানের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখবে। তবে আমেরিকার সংবিধান অনুসারে, কোনো দেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হলে আগে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। ইরানের পাল্টা আঘাত এবং তার পরিণতিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাতে মার্কিন সম্পৃক্ততার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।

ইরানের রিপাবলিকান গার্ড প্রধানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া যেভাবে প্রতিনিধি সভা ব্যক্ত করেছে এবং দেশটিতে যেভাবে যুদ্ধবিরোধী প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখানো হচ্ছে, তাতে এ ধরনের অনুমোদন পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হতে পারে। এছাড়া আমেরিকান প্রশাসন বা দেশটির ‘ডিপ স্টেট’ যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চায় বলে মনে হয় না। ইরানের সাথে সঙ্ঘাতে সৌদি-আমিরাত বলয় ও ইসরাইলকে সামনে নিয়ে আসার কথা বিবেচনা করতে পারে মার্কিন প্রশাসন। সোলাইমানি হত্যার ঘটনার সাথে তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সম্পর্ক থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডে ‘ইসরাইলের গোয়েন্দা সহায়তা’র কথা বলা হলেও এই অপারেশন প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রই চালিয়েছে। আর সৌদি আরব এ ঘটনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছে বলে যে কথা উঠেছে, সেটিও প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। এসব কারণে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এর মধ্যে বাড়তি বেশ কিছু সেনা ট্রাম্প প্রশাসন ওই এলাকায় পাঠিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈরী পরিবেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কতটা নিয়ে ইসরাইল এবং সৌদি-আমিরাতকে খুশি করতে পারবেন সেটিও বিবেচনার বিষয়। যুদ্ধ জিনিসটা এমন, এটি একবার শুরু করা হলে তা বন্ধ করার সুইচ সাধারণত আর হাতে থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাতমুখর অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় চীন বা রশিয়াকে কোনোভাবেই হিসাব-নিকাশের বাইরে রাখা যাবে না। রাশিয়া সিরিয়াতে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যে ধরনের ঝুঁকি নিয়েছে, তার চেয়েও বেশি ঝুঁকি নিতে পারে তেহরানের ইস্যুতে। এর কারণ, ইরান হলো এই অঞ্চলে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র। যুক্তরাষ্ট্র এখানে ইরানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হলে রাশিয়া, অনেকখানি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইরানের সহায়তাকারী হয়ে যেতে পারে। এর ইঙ্গিত এ ঘটনার আগে চীন-রাশিয়া-ইরান ত্রিদেশীয় সামরিক মহড়ায় দেখা গেছে।

উত্তেজনা যতই বাড়–ক না কেন, ইরান সম্ভবত চাইবে না যুদ্ধকে তার নিজ ভূখণ্ডে নিয়ে আসতে। ফলে ধারণা করা যায় যে, ইরান প্রতিশোধ গ্রহণের কাজটি প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে করার চেষ্টা করবে। আর সে ক্ষেত্রে যতটা না যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য হবে, তার চেয়ে বেশি হতে পারে ইসরাইল-আমিরাত-সৌদির মতো আমেরিকার সহায়ক শক্তিগুলো। আর ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে প্রক্সি শক্তিগুলোর ওপর আঘাত হানার বিষয়কে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে পারে।

সবারই প্রশ্ন হলো, ইরান কিভাবে সেই প্রতিশোধ নেবে? দু’দেশের সামরিক সক্ষমতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। তুরস্কের জনপ্রিয় দৈনিক ইয়েনি সাফাক পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহিম কারাগুলের মতে, ইরান কখনো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করবে না। এখন যে সঙ্কট বা উত্তেজনা, তা শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক হুমকির বাইরে খুব একটা যাবে না। তার পর্যবেক্ষণ অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সিরিয়া ও ইরাকে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে যখন আঘাত করছিল, তখনো তেহরান কোনো সাড়া দেয়নি। তিনি ট্রাম্পের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেছেন। এতে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান কখনোই যুদ্ধে জেতেনি, তবে এটি কখনো কোনো আলোচনায় পরাজিত হয়নি।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে যে, আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন যে সমঝোতার কথা বলছেন, তা কি কৌশলের বিষয় নাকি তিনি সত্যি সত্যি যুদ্ধ এড়াতে চান, সে বিষয়ে তেহরানের নিশ্চিতভাবেই সন্দেহ রয়েছে বলে মনে হয়।

কারাগুলের যে পর্যবেক্ষণ তা আংশিক সত্য হতে পারে। ইরান যে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছে, তাতে মনে হয়, সোলাইমানির হত্যার প্রতিশোধ কার্যক্রম ইরাকের মাটিতেই নেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান তাদের প্রভাব আরো বাড়ানোর জন্য যুদ্ধকে ইরাকে বাড়িয়ে তুলছে। অনেকের মতে, আসলে এ সঙ্ঘাত ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে সংঘটিত হতে চলেছে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে শক্তির যে লড়াই ইরাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে, আমেরিকার পদক্ষেপে তা আরো বড় হচ্ছিল। এখন এর মাত্রা আরো বাড়তে পারে।

উত্তেজনা বাড়লেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি বা আনুষ্ঠানিক লড়াইয়ে এবারো সম্ভবত নামবে না। দেশটি প্রক্সিযুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষ উপায়ে মার্কিন পদক্ষেপের সাড়া দেবে। ইরান তার ছায়া সহযোগী শক্তির মাধ্যমে পরোক্ষ উপায়ে আফগানিস্তান থেকে লেবানন সিরিয়া বা আশপাশের দেশে মার্কিন স্বার্থে আঘাত করতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোতেও আঘাত করতে পারে। ‘হাউছি ক্ষেপণাস্ত্র’ সৌদি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সুবিধা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অথবা দুবাইয়ের ওপর পড়তে পারে। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের মূল ভূখণ্ডের পরিবর্তে বাইরের দেশে ইরানি শক্তি বা প্রক্সির ওপর আঘাত হানতে পারে। আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হলো মুসলিম বিশ্বে বিবদমান শক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে লালন করে যাওয়া। ফলে চূড়ান্ত কোনো লড়াই, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দু’পক্ষেরই বিপুল ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে তাতে আমেরিকাও নামবে বলে মনে হয় না। তবে মাত্রা যাই হোক না কেন মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ার যে শঙ্কা, সেটিই জেগে উঠবে সব ধরনের আঘাত আর পাল্টা আঘাতে।

একপর্যায়ে যুদ্ধ ও শোডাউন ইরাকের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরে তীব্র হতে পারে। এর অর্থ, ইরান-সৌদি সংঘর্ষ। একই সাথে এর অর্থ হবে পারস্য উপসাগরে বিবদমান পক্ষগুলোর হুমকি ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সম্ভবত আরো অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠবে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব রাজনীতিতে। আর পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি হলে তা নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাওয়ার যে আশঙ্কার কথা বলা হয়, তা ঘটে যাওয়াটাও বিচিত্র কিছু নয়।

[email protected]


আরো সংবাদ