২১ জানুয়ারি ২০২১
`

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট

-

২-১২-২০১৯ তারিখে মিডিয়ায় রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের বরাত দিয়ে একটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, যাতে তিনি বলেছেন, ‘কচু ছাড়া সব কিছুতেই ফরমালিন, নির্ভেজাল খাবার দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। খাদ্যে ভেজালের কারণে ক্যান্সারসহ জটিল রোগ হচ্ছে। কিছু মানুষ দানব হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে শুধু পকেট মারলেই গণপিটুনি দেয়া হতো, এখন খাদ্যে ভেজালকারী মানুষকেও গণপিটুনি দিতে হবে। মানুষকে এ পথ থেকে ফেরাতে হবে। নইলে জাতি হিসেবে আমরা পঙ্গু হয়ে যাব।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসে তিনি (রাষ্ট্রপতির বক্তব্য যদি সঠিকভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে) ওই বক্তব্য দিতে পারেন কি না, এ মর্মে আইনগত ব্যাখ্যা বা নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত থাকলেও তিনি গণমানুষের মনের কথাটিই বলেছেন। অনুরূপ সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবেও তিনি বর্তমান রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। যারা তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে তাদেরকে ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ী ও আমলারা যেভাবে ল্যাং মেরে মাঠছাড়া করছেন, সে কথাও রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘যে পুলিশ আমার পাছার মধ্যে বাড়ি দিয়েছে, সে পুলিশই অবসর গ্রহণের পর আমার সাথে রাজনীতি করতে চায়।’ আমাদের সমাজে হাইব্রিডের প্রভাবে রাজনীতির যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির অন্যান্য হাস্যস্পদ কথার মধ্যে ওই বক্তব্যও প্রকাশ পেয়েছিল। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্যগুলো অপ্রাসঙ্গিক হলেও সত্যের অপলাপ ঘটেনিই, বরং কথাগুলো ছিল তৃণমূলে রাজনীতি করা মানুষের মনের কথা। খাদ্যে ভেজাল ও রাজনীতিতে হাইব্রিড নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এ জন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তাকে আরো বেশি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা যেত, যদি তিনি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থার অন্যান্য বিষয় নিয়েও সরাসরি বক্তব্য রাখতেন। একজন মানুষ যখন খাদ্যে ভেজাল দেয় তখন সে আর মানুষ থাকে না, বরং হিংস্র পশুতে পরিণত হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি আমাদের দেশেই হয়, অন্য কোনো দেশে এ ধরনের পৈশাচিকতার কথা না শোনা গেলেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার এবং শুধু এ কারণেই যার সামর্থ্য আছে সে বাংলাদেশে চিকিৎসা করানোকে নিরাপদ মনে করে না। ফলে সামান্য চিকিৎসার জন্যও বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের কার্যকারিতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন। এখানে আইনের চেয়ে মানুষের নৈতিকতা ও পৈশাচিকতা কতটুকু নিচে নামতে পারে, এরও একটি মাপকাঠি প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রপতি থেকে গণমানুষ অনেক কিছু আশা করে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন যে নির্বাচনী সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা প্রতিরোধে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থাকলে দেশবাসী তাকে জীবনভর মনে রাখত। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি দফতর এখন লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, এ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মানুষ আশা করে।

সম্প্রতি গবেষক ও আবহাওয়াবিদরা প্রকাশ করেছেন, বায়ুদূষণের প্রশ্নে ঢাকা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত শহর। ইতঃপূর্বেও জাতিসঙ্ঘের জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা বসবাসের অযোগ্য। অন্য দিকে যানজটের কারণে অনেক বৈদেশিক বিনিয়োগ বাংলাদেশে হচ্ছে না বলে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এসব অবস্থার জন্য দায়ী কে? সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ একটি লুটের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। যে যে দিক দিয়ে পারছে, একটু প্রভাবশালী হলেই লুট করতে আর অসুবিধা হয় না। কারণ, এ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতি সহজেই কেনা যায়, প্রশাসনের মুখ বন্ধ করা যায় অর্থের বিনিময়ে। অতএব, যার অর্থ আছে তার কাছে বাংলাদেশ একটি ভোগের সামগ্রী মাত্র, যে যে দিক দিয়ে পারছে সেদিক থেকেই লুটে খাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে ভোগ করছে।

দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য সংবিধান (পঞ্চাদেশ সংশোধন) আইন ২০১১-এর ১২ ধারা বলে ১৮(ক) অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা হয়, যাতে উল্লেখ করা হয়, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’ অথচ জনপ্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের সরাসরি মদদে জলাভূমি, তিন ফসলি ভূমি, খালবিল, নদীনালা সব ভরাট করে বড় বড় হাউজিং কোম্পানি আবাসন প্রকল্প করে ঢাকা শহর ও শহরতলির জনপথকে পদভারে আরো ভারী করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর প্রতিরোধের কোনো ভূমিকা নেই। রাষ্ট্রের পক্ষে ভূমিদস্যুদের প্রতিরোধ করা যাদের দায়িত্ব, তারাই এখন ভূমিদস্যুদের প্রধান দোসর।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২-১২-২০১৯ তারিখে স্পেনের মাদ্রিদে অ্যাকশন ফর সারভাইভাল ভালনারেবল নেশন্স কপ-২৫ লিডার্স সম্মেলনে বক্তব্যে আগামী প্রজন্মের জন্য বসবাসযোগ্য একটি পৃথিবী গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন গোটা বিশ্বের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এখনই কাজ শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে তারা ক্ষমা করবে না। প্রতি মুহূর্তে আমাদের নিষ্ক্রিয়তা পৃথিবীর প্রতিটি জীবিত মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ দেশে বিভিন্ন সময় বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘তিন ফসলি জমিতে কোনো প্রকার শিল্পকারখানা বা প্রকল্প স্থাপন করা যাবে না। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় রাজধানীর পাশের রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, তিন ফসলি জমি, নাল জমি প্রভৃতি জায়গা বালু ফেলে ভূমিদস্যুরা ভরাট করে ফেলছে। বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি ও প্রশাসন চোখেও দেখে না; শুনেও শোনে না। প্রধানমন্ত্রীর কথা অগ্রাহ্য হচ্ছে নির্বিচারে। তারপরও নির্লজ্জতার সাথে সুশাসনের দাবি করছে সরকার। পরিবেশের হুমকি ছাড়াও একজনের জমি আরেকজন বালু ফেলে ভর্তি করে ফেলবে, এটা কেমন আইন এবং সরকারই বা কোন কারণে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভূমিদস্যুদের যদি প্রতিরোধ না করা হয়, তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যগুলো লোক দেখানো বক্তব্যে পরিণত হবে, আক্ষরিক অর্থে নয়। প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পরিবেশ রক্ষায় তার কঠিন হুঁশিয়ারিতে কোনো কাজ না হওয়ায় জনগণকে প্রতিকারের জন্য নিয়তই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে এবং হাইকোর্ট ভূমিকা নিচ্ছে বলেই কোথাও কোথাও এর প্রতিকার হচ্ছে। কিন্তু হাইকোর্টে আসার শক্তি-সামর্থ্য কয়জনের আছে? কোর্টের শরণাপন্ন হলেও ভূমিদস্যুরা বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা চালায়, তখন জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কোনো প্রকার প্রটেকশন ভুক্তভোগীরা পায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আশ্রয় পাবে কোথায়?

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)



আরো সংবাদ