২৪ জুলাই ২০২১
`

কোরবানি : নিয়ত ঠিক রাখা জরুরি

কোরবানি : নিয়ত ঠিক রাখা জরুরি - ছবি : নয়া দিগন্ত

প্রথম নবী ও মানব হজরত আদম আ:-এর আমল থেকেই কোরবানি শুরু। আদম আ:-এর সন্তানরা বড় হলে এবং বিয়ের প্রয়োজনে আল্লাহর আদেশে জিবরাইল এসে প্রথম পক্ষের ছেলে ও অপর পক্ষের মেয়ে এবং প্রথম পক্ষের মেয়ে ও অপর পক্ষের ছেলের সাথে বিয়ের সিদ্ধান্ত দেন। সেই মতে আদম আ:-এর বড় ছেলে কাবিল ও দ্বিতীয় ছেলে হাবিল তাদের বোন আকলিমাকে বিয়ে নিয়ে বিবাদ দেখা দিলে মহান আল্লাহ বিবাদ মেটানোর জন্য কোরবানির আদেশ দেন। হজরত হওয়া আ: সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় সন্তান প্রসব করতেন। তাঁর প্রথম জোড়া ছিল কাবিল ও আকলিমা, দ্বিতীয় জোড়া ছিল হাবিল ও গাযাহ। তারা বড় হলে বিয়ের সময় হাবিল ও আকলিমা এবং কাবিল ও গাযাহর মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত দেন তাদের পিতা নবী আদম আ:। কিন্তু আকলিমা ছিল অত্যন্ত সুন্দরী এবং গাযাহ ছিল কম সুন্দরী। তাই কাবিল বেঁকে বসে, আকলিমাকে বিয়ের বায়না ধরে।

বিষয়টি মীমাংসার জন্য নবী আদম আ:-এর আদেশে তারা মক্কার মিনায় পাহাড়ে গিয়ে কোরবানি করে। তখন বিধান ছিল কোরবানির পর পশুর গোশত পাহাড়ের ওপর রেখে দেয়া হতো। যার কোরবানির গোশত কুদরতি আগুনে পুড়ে যেত তার কোরবানি কবুল হয়েছে বলে গণ্য হতো। সেই মতে হাবিলের কোরবানির গোশত পুড়ে গেল। বিষয়টি কাবিলের মনঃপূত না হওয়ায় বিবাদ জটিলতার দিকে যায়। প্রথম ছেলে কাবিল দ্বিতীয় ছেলে হাবিলকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মানব জাতির মধ্যে পিতার কথা সন্তানের অমান্য করার মাধ্যমে এটিই প্রথম অপরাধ শুরু হয়। অতঃপর দ্বিতীয় অপরাধ হলো হাবিল হত্যা। প্রথম কোরবানি ছিল বিবাদ মেটানোর কৌশল প্রয়োগ।

নবী আদম আ:-এর পর হজরত নবী শীশ আ:, তার পর নবী ইদ্রিস আ:, নবী নূহ আ:, নবী হুদ আ: ও নবী সালেহ আ: পর্যন্ত মানুষ কোরবানি করলেও তখন পর্যন্ত কোরবানির গোশত খাওয়ার তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের কোরবানি নিছক আল্লাহর রাহে ছিল। এরপর হজরত ইব্রাহিম আ:-এর জামানা থেকে কোরবানির গোশত খাওয়ার রীতি চালু হয়। ধারণা করা হয় ইব্রাহিম আ:-এর নিজ সন্তান কোরবানি করা ছিল বিরল ঘটনা। এ জন্য তাঁর জামানা থেকে কোরবানির গোশত খাওয়া বিধান পাওয়া যায়। তিনি সন্তানকে যেভাবে আল্লাহর রাহে পেশ করেছিলেন। তার জবাবে মহান আল্লাহ- ‘ডেকে বলেন ইব্রাহিম, তুমি তো তোমার স্বপ্নকে সত্য প্রমাণ করলে’, সূরা আস-সাফফাত ১০৪-১০৫।

কোরবানির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রিয় বস্তু কোরবানি করা। নবীদের কাছে প্রিয় বস্তু সন্তান হলেও এখন দেখছি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় বস্তু অর্থ। কারণ নবীগণ অর্থের পেছনে ঘুরতেন না। এখন মানুষ যেভাবে অর্থের পেছনে ঘোরে, তাতে ওই কথাই সত্য প্রমাণিত হয়। আজ বড় পরিতাপের বিষয় এই মহা মূল্যবান কোরবানি এখন গোশত খাওয়া আর আনন্দ-ফুর্তির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে! আমার মনে আছে, কথাটা ১৯৮৬ কী ৮৭ সাল হবে, আমরা এক ভদ্র লোকের বাসায় গেলাম ঈদুল আজহার দিনে তিনি আগের বছরের কোরবানির গোশত আমাদের পরিবেশন করলেন। পরিহাস হলেও এটিই ইতিহাস। শুধু তা-ই নয়, কোরবানি দাতারা এখন কোরবানি উপলক্ষে বড় বড় ডিপ ফ্রিজ কিনে তা ভরে রাখছে গোশত দিয়ে। মেয়ে আসবে, জামাতা আসবে, নাতি আসবে তাদের উদোর পূর্তি করে কোরবানির গোশত জনমের মতো খাওয়ানোর আয়োজন এখন অহরহ ঘটছে। হাটে গিয়ে বড় বড় গরুর দিকে চোখ পরখ করে নেয় কোন গরুতে কত গোশত হবে। যেটায় গোশত বেশি হবে, সেটি কেনার টার্গেট করে। আর বড় গরু কিনলে পত্রিকায় কভারেজ পাওয়া যায়। আর নির্বাচনের বছর হলে তো কথাই নেই। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, গ্রামে গ্রামে ও ইউনিয়নে ইউনিয়নে গরু কিনে নাম কামাতে হবে। এই ধান্ধায় এখন সবাই ব্যস্ত।

কোরবানির গোশত গরিবদের মধ্যে নামকাওয়াস্তে বিলি হয়। যদি প্রতিটি গ্রামে ৩০টি গরু কোরবানি হয়। ওই গ্রামের লোক সংখ্যা যদি ১৫ হাজার হয়। যারা গ্রামে থাকে তাদের সংখ্যা যদি ১২ হাজার হয়, তবে গরিবের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি হবে না। ৩০টি গরুতে সাধারণত তিন হাজার ৬০০ কেজি গোশত হয়। গরিবরা পাবে এক হাজার ২০০ কেজি। তখন জনপ্রতি আড়াই কেজি গোশত পায়। অর্থাৎ প্রতি পরিবার সাড়ে ১২ কেজি গোশত বরাদ্দ হয়। তা হলে গরিব লোকের বাড়িও আনন্দের বন্যা হয়ে যায়। তারাও তাদের মেয়ে, জামাতা ও নাতি-পুতিদের খাওয়াতে পারে। তখন সব ঘরে ঈদের আনন্দ বয়ে যেতে পারে।

কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সেটি কল্পনা করা কঠিন। গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বার, মাতুব্বর-সরদারদের প্রতি মানুষের আজ আস্থার সঙ্কট। তারা ওনাদের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। তবে গ্রামের সব লোক এক হয়ে মসজিদ-মাদরাসার লোক দিয়ে সৎ যুবকদের স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্তি এবং গরিবদের তালিকা করে ব্যবস্থা নিলে সব লোকের ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দেয়া সম্ভব। গ্রামগুলো আজ রাজনৈতিক দলের অনৈতিক প্রভাবে তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। ইচ্ছা করলে হুজুররা ওভাবে করতে পারবে না। এভাবে কাজটি করলে হয়তো পরের দিন তার চাকরিই কোরবানি হবে।

অন্য দিকে কোরবানি এলে গরুর বেপারি, ফড়িয়া, মাস্তান, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ, চামড়াবাজ, ধান্ধাবাজ, পুলিশ, কসাই ও সরকার সবাই অর্থ কামাইয়ের পসরা বসায়। কোরবানি মানে তাদের ব্যবসা। এ অনুষ্ঠান থেকে তারা সবাই আয়ের ধান্ধা করে। মানুষের নৈতিক মান নিচে নেমে যাওয়ায় সমাজের এ দুরবস্থা অবস্থা। মনে রাখতে হবে, হজরত ইবরাহিম আ:-এর বৃদ্ধ বয়সে জন্ম নেয়া সন্তানকে আল্লাহর রাহে কোরবানি করা খুব সহজ কাজ নয়। শিশু ইসমাইলের পিতা তাঁকে কোরবানি করবে এমন বিষয় জানার পরও নিজেকে সোপর্দ করা মোটেও সহজ বিষয় নয়। সেই কঠিন বাজটি তাঁরা সহজে করেছেন। দুঃখ হলেও সত্য, এসব ভুলে কোরবানিকে আমরা আজ গোশত খাওয়া, অর্থ কামাই আর আনন্দ-ফুর্তির অনুষ্ঠানে পরিণত করেছি। গোশত খেতে বাধা নেই, তবে তা উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে অন্যথায় কোরবানি বৃথা হবে।



আরো সংবাদ


সকল