২৪ জুলাই ২০২১
`

কোরবানির হুকুম গুরুত্ব ও তাৎপর্য

কোরবানির হুকুম গুরুত্ব ও তাৎপর্য - ছবি : নয়া দিগন্ত

অন্যান্য ইবাদতের মতো কোরবানিও একটি ইবাদত যা নির্দিষ্ট সময়ে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ওয়াজিব হয় এবং এ ইবাদত হাসিলের মাধ্যমে মুমিন-মুত্তাকিগণ মহান আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করতে সচেষ্ট হন। এ মর্মে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের সূরা কাউসারের ২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ আদায় কর এবং কোরবানি কর।’ এছাড়াও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, নবী সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের ধারে-কাছেও না আসে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১২৩)

কোরবানি আল্লাহর প্রেমের এক অনন্য উপমা। যুগে যুগে মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক নবী-রাসূলগণের ওপরেই এই দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন এবং এর বিধি-বিধান সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল; যার ধারাবাহিকতা এখনো প্রবহমান। ইসলামে কোরবানির ইতিহাস সুপ্রাচীন। আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের দেয়া কোরবানি থেকেই মানবেতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে রাসূল আপনি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল। তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো। অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না।’ অবশ্য আমাদের উপর যে কোরবানির বিধান প্রচলিত হয়ে আসছে তা মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহিম আ:-এর আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ।

সূরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করে দিয়েছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদিপশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় যেন তারা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে আর সব সময় যেন মনে রাখে একমাত্র আল্লাহ্ই তাদের উপাস্য।’

হযরত আয়েশা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: ইরশাদ করেছেন, ঈদুল আজহার দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট সবচাইতে পছন্দনীয় কাজ হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা)। (মুসতাদরেকে হাকিম: ৭৫২৩)

ইসলামী ভাষ্য মতে, মহান আল্লাহ তাআলা নবী হযরত ইবরাহিম আ:-কে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কোরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি ভাবলেন, আমার কাছে তো এ মুহূর্তে প্রিয় পুত্র ইসমাইল আ: ছাড়া আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। তখন তিনি পুত্রকে কোরবানির উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করেন। যখন ইবরাহিম আ: আরাফাত পর্বতের উপর তাঁর পুত্রকে কোরবানি দেয়ার জন্য গলদেশে ছুরি চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন যে তাঁর পুত্রের পরিবর্তে একটি প্রাণী কোরবানি হয়ে গেছে এবং তাঁর পুত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। তখন আল্লাহ্র হুকুম বাস্তবায়নে ইবরাহিম আ:-এর মানসিকতা আল্লাহ্র কাছে কবুল হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাকে স্মরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০-১২ তারিখ এই তিন দিন ঈদুল আজহা উদযাপন করে থাকে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদুল আজহা তথা কোরবানি এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে আছে।

ইসলামী শরিয়াহ্ অনুযায়ী উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ; তবে তা হতে হবে মানুষের গৃহপালিত পশু। এ ছাড়া অন্যান্য হালাল পশু যেমন- হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা বৈধ নয়। উট, গরু, মহিষ সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি দেয়া যাবে। এ পশুগুলো একাকীও কোরবানি করা যাবে তবে এককভাবে কোরবানি করাই উত্তম। আর ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার যে কোনোটিই সর্বোচ্চ একজনের দ্বারা কোরবানি করা বৈধ। (মুয়াত্তা মালেক, মুসলিম শরিফ)

কোরবানি যেহেতু আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা তাই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য অত্যুত্তম বস্তু উৎসর্গ করার কোনো বিকল্প নেই; তাই কোরবানির পশু নিখুঁত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা হযরত বারা ইবনে আজিব রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা: হাত দিয়ে ইশারা করেছেন এবং বলেছেন, চার ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা যায় না। সেগুলো হলো, যে পশুর এক চোখের দৃষ্টিহীনতা স্পষ্ট, যে পশু অতিশয় রুগ্ণ, যে পশু সম্পূর্ণ খেআড়া এবং যে পশু এত শীর্ণ যে তার হাড়ে মজ্জা নেই। (সহীহ্ ইবনে হিব্বান : ৫৯১৯)

অন্য এক হাদিসে হযরত আলী ইবনে আতি তালিব রা: বলেন, ‘রাসূল সা: আমাদের শিং ভাঙা বা কান কাটা পশু দিয়ে কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭)
পরিশেষে বলা যায়, লোকদেখানো বা নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য কোরবানি নয় বরং অবলা পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশুত্ব ও অহংবোধকে কোরবানি করাই মুসলিম উম্মাহ্র ব্রত হওয়া উচিত।

ঈদুল আজহা; যা কোরবানির ঈদ বা বকরা ঈদ নামে পরিচিত। কোনো কোনো মুসলিম দেশে এটি ঈদুজ্জোহা, ঈদুল কুরবান বা ঈদুল নাহর নামেও অভিহিত করা হয়। পবিত্র কুরআনুল কারিমে সরাসরি কোরবানি শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় না তবে ‘কোরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর হাদিসে কারিমায় ‘কোরবানি’ শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে ‘উযহিয়্যাহ্’ ও ‘যাহিয়া’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এ জন্যই কোরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আজহা’ বলা হয়। আরবি ‘কোরবান’ শব্দটি ‘ফারসি বা উর্দু ভাষায় ‘কোরবানি’ রূপে ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ নৈকট্য। আর পারিভাষিক অর্থে ‘কোরবানি’ ওই মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করা যায়। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আজহার দিন আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির লাভের উদ্দেশ্যে ইসলামী শরিয়াহ্ মোতাবেক যে পশু জবেহ করা হয়, তাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানি মুসলমানদের জন্য একটি ধর্মীয় ইবাদাত। ঈদের দিন প্রত্যুষে সূর্য উপরের দিকে ওঠার সময়ে কোরবানি করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আজহা’ও বলা হয়ে থাকে। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে বিশ্ব মুসলিমগণ এই উৎসব পালন করে থাকেন। নবী সা: বলেন, ‘প্রতিটি জাতির উৎসব আছে, আমাদের উৎসব হলো এই দুই ঈদ।’ (সহীহ্ মুসলিম ও সুনানে তিরমিযি)

ঈদ আল্লাহ পক্ষ থেকে নির্দেশিত। এ দিনের বিশেষ ‘আমল হলো আল্লাহ্র ওয়াস্তে কোরবানি করা। এ দিনে কোনো মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
আল্লাহ্ তাআলা বলেন, ‘সকল সম্প্রদায়ের জন্য আমি কোরবানির বিধান দিয়েছি, তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা হজ : ৩৪)

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেছেন, আমাকে ইয়াওমুল আজহার আদেশ করা হয়েছে। (অর্থাৎ এ দিবসে কোরবানি করার আদেশ করা হয়েছে।) (মুসনাদে আহমদ: ৬৫৭৫)

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা: মদিনার ১০ বছরের প্রতি বছরই কোরবানি করেছেন। (জামে তিরমিযি: ১৫০৭, মুসনাদে আহমদ: ৪৯৫৫) নবী সা: বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (সুনানে ইবনে মাযাহ্: ৩১২৩)

এ কোরবানি কেবল পশু কোরবানি নয়; নিজের আমিত্ব, পশুত্ব, ক্ষুদ্রতা, হীনতা, দীনতা, নীচতা, অহঙ্কার, স্বার্থপরতা ত্যাগের কোরবানি। নিজের জীবন-মরণ, নামাজ, রোযা, কোরবানি, সহায়-সম্পদ সব কিছুই কেবল আল্লাহ্র রাহে, শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানস এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কোরবানি।

অন্য দিকে সন্তানের ভরণপোষণের সামর্থ্য হারিয়ে গৃহবন্দী। এ-জাতীয় মানুষের সন্ধানে এগিয়ে আসা সময়ের অপরিহার্য দাবি। তাদের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়ানোর মর্যাদা সর্বাধিক। এ মহান দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমাদের আনন্দও হবে সুদূরপরাহত। কোরবানির উদ্দেশ্যও হবে ম্লান। অনাবিল প্রশান্তির ছায়া থেকে আমরা হবো বঞ্চিত। করোনার দুর্যোগে ভালোবাসার পরশে এগিয়ে আসার সূবর্ণ সুযোগ আমাদের হাতের নাগালে। কোরবানির এ শুভলগ্নে অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টাই হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।

শৈশবের বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে কোরবানির স্মৃতি আজো হৃদয়ে অম্লান। প্রতিযোগিতা চলে কার আগে কে যাবে গরু নিয়ে মাঠে। ইমাম সাহেব সিরিয়াল ঠিক করতে হিমশিম খেয়ে যান। দলবেঁধে সবাই একসাথে ধরে গরু শুইয়ে দেয় মাটিতে। কখনো বা জবাই শেষ হওয়ার আগেই এক লাফে পালায় গরু। সবাইকে ছাড়িয়ে জীবন বাঁচাতে দেয় দৌড়।

ভীতিকর এক অবস্থা। কে যাবে গরু ধরতে সবাই তো আনাড়ি। সাহস যার বেশি এগিয়ে যান তিনি। তাতেই ঘটে বিপদ। জবাইয়ের সময় ভয়ে গরু ছেড়ে দিলেই ঘটে বিপত্তি। আহত হয়ে হাসপাতালেও যেতে দেখা যায়। তবুও থেমে থাকে না নির্মল আনন্দের এ গতিধারা।
কোরবানির মাঠে সবাই একসাথে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। চামড়া ছোলা থেকে গোশত কাটার কাজে ছোট-বড় সবাই অংশ নেয়। সারা বছর যারা শহরে থাকেন তারাও স্বাচ্ছন্দ্যে গোশত কাটার কাজে যোগ দেন। অপূর্ব অভাবনীয় আনন্দময় এক পরিবেশ বিরাজ করে কোরবানির মাঠে মাঠে। গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ রাখা হয় সামাজিক বণ্টনের অংশ হিসেবে। পড়ন্ত বিকেলে ধনী-গরিব সবাই একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন সামাজিক বণ্টনে অংশ নিতে। সামর্থ্য অসামর্থ্যরে কোনো পার্থক্য থাকে না সেখানে। সবচেয়ে দামি গরু কোরবানি করা ব্যক্তির ছেলে আর সমাজের অসহায় গরিব ছেলেটি একই কাতারে। কী এক অনুপম সাম্য সম্প্রীতির দৃশ্য! হৃদয় মন আন্দোলিত হয় এভাবেই। শত বছরের ঐতিহ্য সাম্যের নিদর্শন।
ঈদে কোরবানির গোশত খাওয়া এক ভিন্ন সংস্কৃতি। নানান স্বাদ, ঘ্রাণে মুখরিত পরিবেশে থাকে নানান রকমের রান্নার আয়োজন। এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে ঘুরে খাওয়ায় এক পরম আনন্দ। পরিমাণের দিকে কোনো খেয়াল নেই। খুশির অনুভূতিই মুখ্য। কারো বাড়িতে না খেলে বেজায় মন খারাপ। খাওয়া আর খাওয়ানোর চলে প্রতিযোগিতা। যাদের গরুর গোশত খাওয়া নিষেধ তারাও বেমালুম ভুলে যান সব কিছু। কোরবানির গোশত খাওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। এ ভাবনা যেন চাউর হয়ে ওঠে। ডায়াবেটিসের রোগীরও সে দিকে খেয়াল থাকে না। বিশ্বাসে ভর করেই চলতে থাকে জীবন তরী।

কোরবানির ঈদের পড়ন্ত বিকেলে দীর্ঘ প্রতীক্ষা এক পশলা বৃষ্টির। রক্তময় মাঠঘাট ধুয়ে মুছে নির্মল করে তোলে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা। প্রবল বর্ষণে প্রকৃতি ফিরে পায় সজীবতা। মানুষের মনে ফিরে আসে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

কোরবানি যেমন হৃদয়কে কলুষমুক্ত করে তেমনি বৃষ্টির প্রবলধারায় প্রকৃতিও প্রাণান্ত রূপে ধরা দেয়। কিশোর যুবারা দলবেঁধে খেলায় মেতে ওঠে। বিবাহিত ও অবিবাহিত দু’ভাবে ভাগ হয়ে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। উন্মুক্ত মাঠে খেলা হয়ে ওঠে সবার উপভোগ্য। টান টান উত্তেজনা। মনের অজান্তেই সবাই কারো না কারো সমর্থক হয়ে যায়। হারজিত খেলার চিরায়ত রীতি হলেও মাঠে চলে বিজয়ের লড়াই। সবশেষে হয় পুরস্কার বিতরণের আয়োজন। ঈদে যোগ হয় ভিন্ন রকম আনন্দ-উৎসবের। ভাববিনিময়ের এ এক মিলনমেলা।
কোরবানি ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর পুরনো। ইবরাহিম আ:-এর হৃদয় গভীর ভালোবাসা ত্যাগের মহিমায় দীপ্যমান। বৃদ্ধ বয়সে নিরাশার অন্ধকারে আলোর বিচ্ছুরণ। শিশুপুত্র ইসমাইলের আবির্ভাব। হাজেরার মাতৃক্রোড় আলোকিত।

মা-বাবার আদর-সোহাগে বেড়ে ওঠে শিশু। হঠাৎ নির্দেশ আসে মা ও দুই বছরের শিশুকে নির্জন তপ্ত মরুভূমিতে রেখে আসার। স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসায় তাদের রেখে দেয়া হয় খাবার-পানিবিহীন মরুপ্রান্তরে। হাজেরা পিপাসার্ত শিশুর তৃষ্ণা নিবারণে ছুটে বেড়ান সাফা ও মারওয়ার পাদদেশে। এক ফোঁটা পানির খোঁজে। মাতৃহৃদয় পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে। একপর্যায়ে শিশুর পদচিহ্নে প্রবহমান ঝরনাধারা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। জমজম কূপের সেই স্মৃতিময় ঝরনাধারা আজো মুসলিম বিশ্বের কাক্সিক্ষত পবিত্র পানীয়।
কালের পরিক্রমায় পিতাপুত্র মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল। আবারো পরীক্ষার পালা। এলো শিশুপুত্রকে কোরবানির নির্দেশ। একমাত্র কলিজার টুকরো সন্তানকে কোরবানির আদেশে হৃদয় কেঁপে ওঠে। স্রষ্টার কী অপার মহিমা! যেমন পিতা তেমন পুত্র। একবাক্যে রাজি হয়ে যান মাত্র ৮-১০ বছরের শিশু ইসমাইল। বলে ওঠেন, আল্লাহ যদি সন্তুষ্ট হন তা হলে আমার জীবন সার্থক। নেই কোনো ভাবনা চিন্তা। মিনার প্রান্তরে পুত্রকে নিজ হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোরবানি দিতে প্রস্তুত পিতা। পৃথিবীতে বোধহয় এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটেনি। জীবন যার দান সবই তার হাতে নিবেদিত সমর্পিত। পিতা চোখ বেঁধে চালালেন ধারালো ছুরি। জবাই শেষ করলেন মহান রবের তরে। চোখ খুলে পাশে তাকিয়ে দেখেন শিশুপুত্র হাসছে আনন্দের হাসি। কবুল হয়ে গেল কোরবানি। মানবেতিহাসে এক নতুন ধারায় প্রচলন হয় কোরবানির। তা না হলে পৃথিবীতে কোরবানির ইতিহাস কী হতো, ভাবতে গেলে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে।

কোরবানি মহান সত্তার ভালোবাসা লাভে ধন্য হওয়ার উপায়। নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। পশু কোরবানির প্রতীকে হৃদয়ের সব পঙ্কিলতা লোভ লালসা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। অপার্থিব এক আনন্দময় অনুভূতির সঞ্চার হয়। কোরবানির গোশত আমরা নিজেরাই খেয়ে থাকি প্রাণভরে। যাঁর নির্দেশে কোরবানি, তাঁর কাছে পৌঁছে শুধু হৃদয়ের আবেগ আকুতি। আত্মসমর্পণ নিজেকে সঁপে দেয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। মননের ঐকান্তিকতার মাপমাঠিতে নির্ণিত হয় এর প্রতিদানও। কার পশু কত দামি মানদণ্ড তা নয়। অন্তরের সমর্পণ নিবেদন কতটা ত্যাগের তাই প্রকৃত মাপকাঠি। আল কুরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে কখনো কোরবানির গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না। বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াটুকুই পৌঁছায়। (সূরা আল হাজ্জ, আয়াত ৩৭)

কোরবানি মহান রবের প্রতি আত্মসমর্পণের এক অনুপম নিদর্শন। আমাদের নামাজ-কোরবানি জীবন-মরণ সবই তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা তাঁরই কাছে। অসহায় মানুষের মধ্যে গোশত বিতরণের আনন্দ মননের শিরা উপশিরায় সঞ্চারিত হয়। হৃদয় মন নেচে ওঠে। পার্থিব কোনো আনন্দ এর সাথে তুলনীয় নয়। অনুভব স্মৃতি সহমর্মিতা ঔদার্যে এর সৌন্দর্য সর্বোচ্চ শিখরে। আকাশের বিশালতা সাগরের গভীরতা চাঁদের স্নিগ্ধতার মতো হৃদয় মন ভরিয়ে তোলে। প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক কোরবানির ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। তবেই পৃথিবী হবে সুন্দর জীবন হবে আনন্দময়।



আরো সংবাদ