১৩ জুন ২০২১
`

শ্রমিকের ঈদ

-

ঈদ মুসলমানদের জাতীয় উৎসব। কালের পরিক্রমায় প্রতি বছর খুশির বার্তা নিয়ে এ উৎসবের আগমন ঘটে। এ উৎসব উদযাপনে সব মুসলমানের সমান অধিকার আছে। তাই বিশ্বের সব দেশের ও সব পেশার মুসলমান ঈদ উদযাপন করে থাকে। নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য ঈদের আনন্দ উপভোগ নির্ধারিত নয়। আবার কোনো সম্প্রদায় ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিতও নয়। বরং ঈদের আনন্দ সবার জন্যই অবারিত। ধনীর অট্টালিকায় আর দরিদ্রের জীর্ণ কুটিরে ঈদের আনন্দ প্রবাহিত। তবে আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ শ্রমিকরা ঈদের আনন্দ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধাংশ শ্রমিক। আর মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে শ্রমিকদের অধিকাংশই মুসলিম। তাই বাংলাদেশে ঈদের সাথে শ্রমিকের গভীর সম্পর্ক থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঈদের উৎসবে তাদের অধিকাংশের আনন্দ অনুপস্থিত। অধিকন্তু করোনাভাইরাসের সঙ্কটকালে তাদের জন্য ঈদের উৎসব সুদূর পরাহত, কারণ তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
দেশের খাদ্য উৎপাদনে, অবকাঠামো নির্মাণে, পোশাক শিল্পে, কল-কারখানাতে, পরিবহনে এমনিভাবে দেশের সব ক্ষেত্রে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের দেশের অধিকাংশ শ্রমিক গরিব এবং সামাজিকভাবে তারা অবহেলিত। এ ছাড়া আমাদের দেশের বেশির ভাগ শ্রমিক অশিক্ষিত। তাই তাদের অধিকাংশই অসচেতন ও বঞ্চিত। কল-কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা, ঘন ঘন দুর্ঘটনা ইত্যাদি বাংলাদেশের শ্রমিকের নিত্য- নৈমিত্তিক ব্যাপার। অধিকন্তু তারা মালিক-মহাজনদের নিপীড়ন-গঞ্জনার শিকার। আমাদের দেশের শ্রমিকরা সাধারণত অন্যের কারখানা-ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠানে মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করে। এতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের সব লাভ চলে যায় মালিকের ঘরে। অধিকন্তু অনেক মালিক শ্রমিকদের মজুরি কিংবা ন্যায্য পাওনা দিতে গড়িমসি করে। এতে অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের বেশির ভাগ দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। আর দরিদ্র্যতার কশাঘাতে নিষ্পেষিত বাঙালি শ্রমিকের ঘরে ঈদের বার্তা পৌঁছে সবার শেষে! এ সময় পোশা পণ্যের দাম অস্বাভাবিক থাকে। তাই অধিকাংশ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে ঈদের উৎসবে নতুন জামা-কাপড় ও উন্নত মানের খাবার জোটে না। এ কারণে তাদের অনেকেই ঈদের উৎসবও যথাযথভাবে উপভোগ করতে পারেন না। এ ছাড়া অল্প ুমজুরিতে কাজ করে দৈনন্দিন সাংসারিক খরচ চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। অধিকন্তু কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক সঙ্কটে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ না থাকায় অনেক শ্রমিক ও তাদের পরিবার অনাহারে দিন কাটায়। এসব কারণে শ্রমিক পরিবারে এবারের ঈদ উৎসব নিরানন্দময়!
আমাদের দেশের শ্রমিকরা ঈদের আনন্দের চেয়ে ধর্মীয় চেতনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এ জন্য তাদের ঈদে আনন্দের চেয়ে ধর্মীয় বিষয় প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তারা সারা মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিনে মহান আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ঈদের দিনে খুব ভোরে ওঠে ফজরের নামাজ আদায়, ঈদগাহে বিশাল জামাতে অংশগ্রহণ, পরস্পরের সাথে কোলাকুলি, আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ইত্যাদি কার্যাবলি সম্পাদন করেন তারা ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে। ভিনদেশী ও বিজাতীয় সংস্কৃতির খাবারের সমারোহ নয় বরং দেশীয় সংস্কৃতির পায়েশ-সেমাই ও অন্যান্য মিষ্টান্ন জাতীয় খাবারকে তারা ঈদের সুন্নাত মনে করেন। এ ছাড়া বাঙালির ঐতিহ্যবাহী গোশত-খিচুড়ি জাতীয় সুস্বাদু-উপাদেয় খাবারের আয়োজন করেন তারা পবিত্র ঈদের দিনে। শুধু সৌজন্যতা-ভদ্রতা রক্ষার জন্য নয় বরং পরম মমতা ও আন্তরিকতা নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সাথে তারা দেখা-সাক্ষাৎ এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার কিংবা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে নয় বরং ঈদের দিনে শ্রমিকরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সাধ্যমতো দান-খয়রাত করেন।
আমাদের দেশের শ্রমিক, দর্জি-দোকানিরা ঈদ উপলক্ষে মনের মাদুরি মিশিয়ে অন্যকে সুন্দর করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে জামা-কাপড়, জুতা-প্যান্ট, শাড়ি-প্রসাধনী সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। অথচ পরিশ্রম বা কাজের চাপে তারা নিজেদের বিষয়ে উদাসীন থাকেন। সেলুন-বিউটি পার্লারের কর্মীরা অন্যকে সুন্দর করে সাজিয়ে নিজেদের দুুুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। একটু বাড়তি আয়ের জন্য অনেক রিকশাচালক, বাসশ্রমিক, লঞ্চশ্রমিক ঈদের দিনগুলোতেও কাজ করেন। এমনিভাবে শ্রমিকদের উৎপাদিত পণ্য-পোশাক পরে কিংবা তাদের সেবা নিয়ে উঁচুতলার লোকেরা মহানন্দে ঈদের উৎসব উদযাপন করেন। অথচ অধিকাংশ শ্রমিক অর্থাভাবে ঈদ উৎসবেও নি¤œমানের পোশাক পড়েন। এমনকি নি¤œ আয়ের অনেক দিনমজুর ঈদের দিনেও অভুক্ত থাকেন!
সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও অন্যান্য পেশার মানুষরা ঈদের উৎসবভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পায়। অধিকন্তু ঈদ উপলক্ষে সব পেশার লোকজনের বাড়তি উপার্জনের ধুম পড়ে যায়। প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা জনগণের পক্ষ থেকে বিশেষ ‘উপরি’ ‘বখশিশ’ পায়! ঈদ উপলক্ষে চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীদেরও উপার্জনের পরিমাণ বেড়ে যায়! এমনিভাবে প্রায় সব পেশার লোকজনের ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত অর্থোপার্জিত হয়। কিন্তু জাতীয় উন্নয়নসেবক শ্রমিকদের ভাগ্য প্রায় অপরিবর্তিতই থেকে যায়। অধিকাংশ দিনমজুর-শ্রমিককে ঈদের উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। আর যেসব শ্রমিককে ‘উৎসব ভাতা’ বা ‘ঈদ সেলামি’ দেয়া হয় তার পরিমাণও বেশি নয়। যা দিয়ে ঈদের আনন্দ-উৎসব করা তাদের জন্য দুষ্কর হয়। এভাবে ঈদের পবিত্র উৎসব উদযাপনে শ্রমিকরা বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়।
প্রকৃতপক্ষে ঈদে সব মুসলমানের সমান অধিকার থাকলেও অবহেলিত ও বঞ্চিত থাকেন অধিকাংশ শ্রমিক। যা ঈদ সংস্কৃতির সাথে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং এতে জাতীয় উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়। তবে সরকারি পোষকতা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা তাদের বঞ্চনা দূর করতে পারে। যাতে মালিক-শ্রমিক, কৃষক-মজুর, জেলে-কুমার, ধোপা-মুচি সবাই ঈদের আনন্দ-উৎসব উপভোগ করতে পারে। এতে বৈষম্য, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে মুসলিম সমাজের ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুসংহত হবে। ভেদাভেদ নয় বরং মুসলিম সমাজে ইসলামী আদর্শের শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক এ প্রত্যাশা রইল পবিত্র ঈদের দিনে। আর ‘করোনার বৈশ্বিক সঙ্কট থেকে জাতিকে রক্ষা করুন’ মহান আল্লাহর নিকট এ দোয়া হোক ঈদের প্রার্থনাতে। হ

 



আরো সংবাদ