১৩ মে ২০২১
`

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পয়লা বৈশাখ উদযাপন

-

বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা বর্ষের প্রথম দিবস পয়লা বৈশাখ এবার উদযাপিত হচ্ছে করোনাকালে সাড়ম্বরে নয়, অনাড়ম্বরে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারক ও বাহক এই নববর্ষের উৎসব শুধু বার মাসের তের পার্বণের অন্যতমটি নয়, এটির সাথে সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার চালচিত্রের পরিচয় বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনটির উদযাপনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। পয়লা বৈশাখের আগের দিন চৈত্র সংক্রান্তিতে যুগে যুগে স্থানে ও কালে আয়োজিত হয় অনেক অনুষ্ঠান ও সংস্কারবান্ধব রীতিনীতি পালনের পর্ব। পরের দিন পয়লা বৈশাখ যেন নির্ভেজাল নির্ভার নিরাপদ আনন্দে শুরু হতে পারে সে কারণে সংবছরের যাবতীয় লেনদেন বোঝাপড়ার সালতামামি চলে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে। আগের বছরের শেষের হিসাব কিতাব মেলানোর মধ্যে নতুন বছরের যাত্রার বেগ ও মাত্রা নির্ভর করে। শুচি শুভ্র অবয়বে, মনের সকল ক্ষোভ খেদ, বেদনা ও বিমর্ষভাব কাটিয়ে আনন্দ উৎসবে নতুন বছরকে নতুন দিনে বরণ করাই উদ্দেশ্য।
হালখাতা এই আর্থ-সামাজিক জীবনায়নে নতুন প্রেরণা প্রাপ্তি অনুষ্ঠানের অন্যতম উপলক্ষ। নতুন বছরের নতুন খাতা খোলা হবে ব্যবসাবাণিজ্যের কেনাবেচার দায় দেনার লেনদেনের। হালখাতা শব্দের মধ্যে অর্থনৈতিক জীবন যাপনের একটা প্রাকরণিক পদ্ধতির নির্দেশনা আছে। নতুন দিনে নতুনভাবে সবকিছু শুরুর মধ্যে একটা পূতপবিত্র ও প্রসারিত মন প্রসারণের, হৃদয় উজাড়করণের, মনোযোগের বিবেচনার ব্যাপার জড়িত। সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসেবে বাংলাবর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন। পয়লা বৈশাখকে সেই সনের প্রথম দিন হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। সে সময় থেকে চৈত্রসংক্রান্তি অধুনা জুন মাসের তিরিশা তারিখের মতো। চৈত্র মাসে অনেক কাজ শেষ হওয়ার, শুরুর নয়। চৈত্র মাস স্বভাবে শুষ্ক, রুক্ষ; রক্তচক্ষুর ন্যায় তার চাহনি। সারা বছরের সব ভালো-মন্দের মেজাজ চৈত্র মাসের মগজে ঠাঁই নেয়। বিয়ের কাজের মতো শুভকাজ কেউ চৈত্র মাসে ফেলতে চায় না। কিন্তু বৈশাখ? সে যেন নতুন কিছু গড়ার নতুন কিছু শুরুর জন্য মাহেন্দ্রক্ষণ হাজির করে। রাস্তায় আল্পনা এঁকে এই নতুন সময়কে স্বাগত জানানো হয়। নতুন পোশাক পরে সবাই নতুন খুশির মেজাজে দিন বা বছর শুরু করতে চায়। রুক্ষ চৈত্র থেকে বিমল আনন্দের বৈশাখে বিবর্তন ঘটে মানুষের, প্রকারান্তরে তার মনের বনে লাগে শুভ্র শুচির ছোঁয়া জাগে প্রসারিত হৃদয়ের দোলা। মাত্র একদিন আগে সে ছিল উদ্বিগ্ন, উত্তপ্ত, নিতান্ত ব্যতিব্যস্ত ও মনমরা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ হালখাতা উৎসব ক্রমশ তার কার্যকারিতার তাৎপর্য হারাচ্ছে। বাড়ছে না হালখাতা (হিসাব রাখার নতুন খাতা) ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ। নববর্ষ উদযাপনে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে (অধিকাংশই অনুৎপাদনশীল খাতে) কর্মকাণ্ড বেড়েছে। যা দেখে সংবাদমাধ্যমের কাছে মনে হয়েছে অর্থনীতিতে গতিশীলতা এসেছে। মনে হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে মানুষের মধ্যে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আবহমান উৎসবে মানুষের অংশগ্রহণের মাত্রা বাজারে বৈকি, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই সে চাঞ্চল্যে নিতান্ত নানাবিধ ব্যয়ের উৎসবে মাতামাতি বেড়েছে। কিন্তু পণ্য ও সেবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি চাহিদা অনুযায়ী না বাড়ায় সরবরাহে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় বৈসাদৃশ্য ও বেমানান বাড়াবাড়িতে সমাজ ও অর্থনীতির দৈন্য ও দুর্দশা ফুটে উঠেছে। ইলিশের সংগ্রহে ভাটা সত্ত্বেও একদিকে ইলিশ রফতানির প্রয়াস যেমন চলেছে অন্যদিকে বর্ধিত চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন বা ধরার উদ্যোগে ভাটা পড়ায় ইলিশের দাম এই পয়লা বৈশাখের দুই-চার দিন আগে থেকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে মুখরোচক সংবাদ শিরোনামে পরিণত হতো। যত দাম হাঁকা হোক না কেন, প্রতিযোগিতা করেই যেন কেউ কেউ ইলিশ কিনেছেন, ভাবখানা এই ইলিশ না হলেই যেন চলে না। চড়া দামে ইলিশ কেনার মানুষ আছে বলেই ইলিশের চড়া দাম হাঁকার অবকাশ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই মহামহিম দূরত্বের দেশে চড়া আকাশচুম্বী দাম হাঁকা হয়েছে। এই অবস্থায় সমাজে আর্থিক বৈষম্যের বিবর আরো বেদনাদায়কভাবে উন্মোচিত হয়েছে। বৈশাখের যে আবহমান সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ- ভেদাভেদ ভুলে পুরনো দিনের বেদনা ও বৈষম্যের জঞ্জাল সরিয়ে নতুন দিনের আলো অবগাহনের মতো গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও পরিতৃপ্তিকে উপভোগ করার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে কতিপয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির এই অতি অস্বাভাবিক আচরণে।
প্রভূত পরিসংখ্যান, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পটভূমিতে আজ এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে দূরত্ব বাড়ছে অনেক ক্ষেত্রে- সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের ও নাগরিকের মধ্যে, করদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে, শিল্পমালিক ও শ্রমিকের মধ্যে, নীতিনির্ধারকের সাথে পোষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, উৎপাদনকারীর সাথে খুচরা ক্রেতার, ব্যাংকের আমানতকারীদের সাথে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার, সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় প্রত্যাশার সাথে আর্থিক খরচে কর্মনৈপুণ্যের, রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনার সাথে ব্যয় ব্যবস্থাপনার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর সাথে সাধারণ মানুষের। সমাজে অর্থ ক্ষেত্রে অপব্যয়ের জৌলুসের চাকচিক্যের ডামাডোলকে মনে হতেই পারে এটি পুঁজিবাদী মানসিকতা প্রস্তুত এবং বৈষম্যবিলাসী উদাসীন ঊর্ধ্বতনদের ইচ্ছা ও অভিলাষ উৎসারিত। এই অগ্রগতি গুণগতমান উন্নয়ন ব্যতিরেকে শিক্ষার পাসের হার বৃদ্ধির মতো সাময়িক তৃপ্তিলাভের অগ্রগতি মনে হতে পারে- ভূত ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করে নয়- সাময়িকভাবে, নিজেদের মতো করে অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিতভাবে সীমাবদ্ধকরণের প্রয়াস উৎসারিত। অর্থনৈতিক বৈষম্য বিভাজন থেকে মুক্তির সংগ্রামে জয়ী একটি স্বাধীন সার্বভৌম অর্থনীতির প্রাণবায়ু যে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়নীতিনির্ভরতা, নৈতিক মনোবল ও মূল্যবোধ তার সার্বিক অবস্থান ও উপস্থিতি আপাত প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরে আসা অবয়বে উৎসাহিতবোধ করা চলে না। সেগুলো ক্রমশ নির্বাসনে পাঠিয়ে সাময়িক এই প্রগলভতায় সমাজ প্রকৃতপক্ষে এগুচ্ছে না পেছাচ্ছে তার একটা সালতামামি প্রয়োজন।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন প্রয়াসে জাতীয় বাজেটকেন্দ্রিক মতবিনিময় সভাসমূহে আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থবছরের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও উঠে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ, প্রশাসনিক কর্মযোজনা, উন্নয়ন অভীপ্সা প্রভৃতিতে গুণগত পরিবর্তন সূচনায় অর্থবছর এর মেয়াদ মেরুকরণের প্রসঙ্গটি জাতীয় ভাবনার অংশ হয়ে ওঠার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।
পয়লা বৈশাখ থেকে অর্থবর্ষ গণনার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর মূলত রাজস্ব আহরণ তথা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই। ইতঃপূর্বেকার চান্দ্র মাসের ভিত্তিতে প্রচলিত হিজরি সন এবং সৌরবর্ষ গণনার পদ্ধতি প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় ও সাযুজ্য সাধনের তাৎপর্য ও যৌক্তিকতাকে বিচার বিশ্লেষণের ভার তার নবরতœ সভার সবচাইতে বিজ্ঞ বিচক্ষণ সদস্য, মশহুর ইতিহাসবেত্তা আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২) এবং অর্থ ও রাজস্ব বিষয়ক সদস্য রাজা টোডর মলকে তিনি অর্পণ করেছিলেন এ বিবেচনায় যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই রাজ্য কিংবা সরকারের অন্য সকল কর্মকাণ্ডের ওপরে অধিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবক ভূমিকায় থাকে। তাদের নির্দেশনায় ফতেহ উল্লাহ সিরাজী যে সমন্বিত প্রস্তাব প্রণয়ন করেন সে ভিত্তিতে ফসলি সন নামে নতুন বর্ষগণনার রীতি প্রবর্তিত হয় ৫৯৪ হিজরি সনের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার মোতাবেক ১২ এপ্রিল, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মোতাবেক ১৪ এপ্রিল সোমবার। প্রবর্তনের খ্রিষ্টীয় সনটি ১৫৮৪ হলেও ফসলি সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সন ১৫৫৬ থেকে এর ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করা হয়। প্রজাদের উৎপাদিত ফসল এর ওপর কর রাজস্ব আরোপ, হিসাবায়ন এবং যথা মৌসুমে তা সংগ্রহের সুবিধার্থে মূলত ফসলি সনের প্রবর্তন। এই ফসলি সনই পঞ্জিকা তথা অর্থবছর হিসেবে বিবেচিত হতো। ভারতের দিল্লিতে বসে প্রবর্তিত রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশক এই ফসলি সনই পরবর্তীকালে সুবা বাংলায় (বর্তমানের বাংলাদেশ) বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে অব্যাহতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মোগলদের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রাজস্ব আহরণের উদ্দেশ্য অভিপ্রায় ও প্রক্রিয়া ছিল মূলত বেনিয়া বাণিজ্য বোধ বিশ্বাসের ভিত্তিতে। সে সময় আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ফসলি সনের ব্যবহারিক গুরুত্ব হ্রাস পায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাবধারায় অর্থবছর পৃথকভাবে গণনার রেওয়াজ চালু হয়। বাংলার প্রজাদের শস্য উৎপাদনের মৌসুমের সাথে মিলিয়ে রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে পরিবর্তন। মুনাফা ও রাজস্বলোভী মুৎসুদ্দি মানসিকতার কাছে বাঙালির আবহমান কালের শাশ্বত সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে অর্থবছর হিসেব বাংলা সন অনুসরণে চিড় ধরে। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষের বিপুল ব্যবহার ফসলি সনের কদরকে ফিকে করে দেয় আর পুরো আর্থ-প্রশাসনিক অবস্থা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা দান করে। কোম্পানি বাংলার মৌসুমি জলবায়ু তো দূরের কথা ফসল উৎপাদনের সময়সূচিকে রীতিমতো অবজ্ঞাভরে দেখতে শুরু করে।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের পর ভারতের রাজদণ্ড কোম্পানির হাত থেকে খোদ ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়। ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতে পরিচালিত ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে আইনসভায় পেশ করা হয় ৭ এপ্রিল ১৮৬০। অর্থবছরের ধারণাটা বাংলা সনের অনুগামী রাখার পক্ষপাতী ছিলেন ভারতবর্ষে প্রথম অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০)। স্বনামধন্য ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের সচিব, অর্থসচিব, ব্রিটিশ আইনসভার প্রভাবশালী সদস্য, ফ্রি ট্রেড আন্দোলনের কর্মী, পেপার কারেন্সির প্রবর্তন প্রবক্তা জেমস উইলসন ভারতে ভাইসরয়ের কাউন্সিলে অর্থসদস্য (মন্ত্রী সমতুল্য) হিসেবে নিযুক্তি পেয়ে কলকাতায় যোগদান করেন ১৮৫৯ এর ২৯ নভেম্বর। সিপাহি বিপ্লবের পর ভারতে নতুন ব্রিটিশ সরকারের আর্থিকসঙ্কটের মোকাবেলায় উইলসনকেই উপযুক্ত ভেবেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী খড়ৎফ চধষসবৎংঃড়হ। ইতিহাসসচেতন বিচক্ষণ অর্থনীতিবিদ উইলসন ভারতের আর্থ-সংস্কৃতি ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে ১৮৬০ এর ৭ এপ্রিল উপস্থাপিত ভারত সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতাতেই ভারতে আধুনিক আয়কর প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। প্রাচীন ভারতের মনুসংহিতা থেকে রাজস্ব আদায়ের সূত্র উল্লেখ করলেও তিনি মূলত ব্রিটেনের আয়কর আইনের কাঠামোয় এদেশে আয়কর আরোপের রূপরেখা দেন। এপ্রিল মাস থেকেই তার বাজেটটির বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়, প্রচলিত বাংলা সনের সাথে ছিল যার যৌক্তিক সাযুজ্য। পরিতাপের বিষয়, ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী, ভারতে আধুনিক আয়কর প্রবর্তনের মাত্র তিন মাসের মাথায় ডিসেন্ট্রিতে ভুগে মারা যান আগস্ট মাসের ১১ তারিখে কলকাতাতেই। পরবর্তী চার বছর বাজেট এপ্রিল মে এমনকি জুন মাসে উপস্থাপিত হলেও ১৮৬৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ১ এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরুর বিধানটি কার্যকর হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চকে অর্থবছর অনুসরণ অব্যাহত রাখে, কিন্তু পাকিস্তান সরকার জুলাই-জুনকে অর্থবছর সাব্যস্ত করে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য থাকায় পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমানের বাংলাদেশ প্রাদেশিক বা আঞ্চলিকতায় পর্যবেশিত হয়। সুতরাং বাংলার কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌসুম অনুগামী বাংলা সন অর্থবছরের সাজুয্যতায় মর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুই ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিন্ন। সে কারণে এপ্রিল মার্চের স্থলে জুলাই জুনকে অর্থবছর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তই একচ্ছত্র হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থবছরকে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রতিফলক বাংলা সনের অনুগামীকরণের বিষয়টি যৌক্তিক বিবেচনায় এসেও যেন আসেনি। দুঃখজনকভাবে পাকিস্তান আমলে প্রবর্তিত জুলাই জুন এখনো বাংলাদেশের অর্থবছর হয়ে আছে। উপযুক্ত কারণ পরীক্ষা পর্যালোচনা করে এটি পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতা অনুভূত হয়।
বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বার্ষিক কর্মযোজনার নিরীখে এটা খুবই স্পষ্ট যে জুলাই জুন অর্থবছর হিসেবে যোগ্যতর নয়, হতে পারে না। আমাদের দেশে মূলত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর অবধি বর্ষাকাল। বিদ্যমান অর্থবছর শুরু হয়েই প্রথম তিন চার মাস বর্ষাজনিত কারণে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। আয়কর আইন অনুযায়ী আগের অর্থবছর শেষ হওয়ার তিন মাসের মাথায় ঠিক এ সময়টাতে আয়কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা চলে আসে, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় বড় বন্যা তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় দুর্গতি বয়ে আনে এবং এ সময়টা ফসল বপনের, ফসল তোলার নয়; ফলে আয়কর হিসাবায়ন, পরিশোধ তথা রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতায় বিব্রত বোধ করে রাজস্ব প্রদানকারীরা, নানান কারণে প্রায় প্রতিবছর আয়কর প্রদানের সময় বাড়ানোর দাবি উঠে আসে।
অর্থবছরের প্রথম তিন-চার মাস একধরনের কর্মহীনভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়া হয়। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কার্য কিংবা সরবরাহের আদেশ দিতে দিতে এপ্রিল-মে। সরবরাহ সেবা কিংবা ভৌত কর্মকাণ্ড শুরু যখন হয় তখন বর্ষা শুরু হয়ে যায়। কাজের, সরবরাহের, সম্পাদনের গুণগতমান বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের বর্ষাকালে। এ সময় মেরামত সংস্কার কাজে জনভোগান্তি যেমন বাড়ে, কাজের গুণগতমান পরিবীক্ষণেও ঘটে বিপত্তি। অর্থবছরের শেষে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানোর জরুরিয়তায় নানান অনিয়ম অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়াটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও এ সময়টাতে অপব্যয় অপচয়ের অবকাশ হয় অবারিত। শুধু মাত্র কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থবছরের পাঁচ ছয়টি মাস অর্থনীতির জন্য অনুকূল না হয়ে প্রতিকূল হয়ে ওঠে।
অথচ অর্থবছর এর এই ব্যাপ্তিটা জুলাই জুনের পরিবর্তে যদি এপ্রিল-মার্চ (বাংলা সনের কাছাকাছি) হয় তাহলে প্রথম মাসেই কাজ শুরু করে পরবর্তী তিন-চার মাস বর্ষাকালে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ব্যয় করে অক্টোবর-মাচর্ এই ছয় মাস পুরোটাই নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই সময়টিই সকল কাজের জন্য অনুকূল, সহনশীল ও উৎপাদনমুখী। ব্যক্তি ও ব্যবসা উভয় শ্রেণীর করদাতার জন্যও মে-জুন মাসে করের হিসাবায়ন, কর প্রদান তথা রিটার্ন দাখিলে বিড়ম্বনা স্বাভাবিকভাবে হবে কম। কৃষিপ্রধান অর্থনীতির এই দেশে উৎপাদন মৌসুম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও আবহমান সংস্কৃতির সুসময়কে শনাক্ত করেই অর্থবছরে ব্যাপ্তিকাল নির্ধারিত হওয়া উচিত।



আরো সংবাদ


ধামরাইয়ে কোসটাল ওয়েলফেয়ারের উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ এখনো মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করিনি : হামাস ইসরাইলি আরবরা নিজ দেশে যেভাবে বৈষম্যের শিকার ইসরাইলের পক্ষে দাঁড়াল ভারত, জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিনের ‘বিশেষ নিন্দা’ কোভিডে একের পর এক অধ্যাপকের মৃত্যু, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আতঙ্ক কোম্পানীগঞ্জে বাদলের অনুসারীদের লক্ষ্য করে মির্জা অনুসারীদের গুলি, পালাতে গিয়ে আহত ৫ হাজারতম ম্যাচে হারলেন সেরেনা নিখোঁজ অমিত শাহ’র খোঁজে দিল্লি পুলিশের কাছে মিসিং ডায়েরি মাগুরায় ২ মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ১ বাউফলে গভীর নলকূপ স্থাপন ও দুস্থদের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করলেন ড. মাসুদ ইসরাইলি সন্ত্রাস বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি বাবুনগরীর আহ্বান

সকল