২৭ জানুয়ারি ২০২১
`

পাবনা জেলার সাঁথিয়ায় মোগল বংশধর

-

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার কাশীনাথপুর একটি বৃহৎ গ্রাম ও ইউনিয়ন। ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে গ্রামটি আত্রাই নদীর তীরের অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে চলে যাওয়া মহাসড়কটির দক্ষিণ দিকে দু-তিন কিলোমিটার সরু রাস্তা পার হলে পাওয়া যায় ছায়া-সুনিবিড় ছাতক-বরাট গ্রাম। এ গ্রামেই বাস করছেন এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মোগল স¤্রাটদের বংশধরেরা।
সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠপুত্র দারাশিকোর প্রথম পুত্র সোলেমান বা টার্নু বেগ পাবনা জেলার কাশীনাথপুর ইউনিয়নের ছাতক গ্রামের প্রথম জায়গিরদার ছিলেন। দ্বিতীয় পুত্র সাকে ইউসুফ গোয়লিয়রের দুর্গে পিতৃব্য সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিহত হন। সোলেমানের পুত্র মির্জা নান্না বেগ পিতার মৃত্যুর পর ছাতকের জায়গিরদার হন। তিনি রাজকার্য দেওয়ানের হাতে অর্পণ করে বিলাসে মগ্ন থাকতেন। তার চার পুত্রÑ মির্জা শাহ বেগ, মির্জা ওয়াছেল বেগ, মির্জা বহরম বেগ ও মির্জা নকি বেগ। জ্যেষ্ঠপুত্র মির্জা শাহ বেগ মিতচারী, সৎ ও বুদ্ধিমান ছিলেন। দ্বিতীয় পুত্র মির্জা ওয়াছেল বেগ বুদ্ধিমান ও আড়ম্বরপ্রিয় ছিলেন। তৃতীয় পুত্র মির্জা বহরম বেগ বিলাসে অনাসক্ত ছিলেন। চতুর্থ পুত্র মির্জা নকি বেগ বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছিলেন। মির্জা শাহ বেগের পুত্র মির্জা রাহানু বেগ ছাতকের শেষ জায়গিরদার ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিলাসী ছিলেন। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে তার জায়গির বাজেয়াপ্ত হয়। তিনি জায়গির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কৃতকার্য হননি। ওই সময় থেকে তার বংশধরগণের পারিবারিক অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হতে থাকে। মির্জা রাহানু বেগের ছয় পুত্র; তারা হলেনÑ মির্জা মোনায়েম বেগ, মির্জা বারু বেগ, মির্জা গোলাপ বেগ, মির্জা নাসের বেগ, মির্জা বাকের বেগ ও মির্জা রহমত বেগ। প্রথম পুত্র মির্জা মোনায়েম বেগ বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তার তিন পুত্রÑ মির্জা আদম বেগ, মির্জা সহিদম বেগ ও মির্জা রোস্তম বেগ। মির্জা আদম আরবি ও ফারসি ভাষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। মির্জা সহিদম বেগের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। ভ্রাতৃবিরোধ উপস্থিত হওয়ায় মির্জা রোস্তম বেগ পালিয়ে ময়মনসিংহ চলে যান। তার বংশধরগণ এখনো ময়মনসিংহে বসবাস করছেন।
মির্জা আদম বেগের পুত্র মির্জা আলিম বেগ আরবি ও ফারসি ভাষায় বিশেষ সুপণ্ডিত ছিলেন। তার পুত্র মির্জা আমিন উদ্দিন আহমদও আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি তত্ত্বকথা, নব্য ভারত, ঈমান ও ইসলাম, মোগল জাতির ইতিহাস নামে চারটি বই রচনা করেন। তিনি সুজানগরের সাগরকান্দি জমিদারি এস্টেটের নায়েব ছিলেন। তিনি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মির্জা আমিন উদ্দিন আহমদের পাঁচ পুত্রÑ মির্জা আব্দুল হামিদ, মির্জা আব্দুল মজিদ, মির্জা হারুনার রশিদ, মির্জা সহিদুর রশিদ ও মির্জা আবু ছইদ। মির্জা আব্দুল হামিদ ঢাকার একটি বাণিজ্যিক অফিসে চাকরি করতেন। মির্জা আব্দুল মজিদ পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন। মির্জা হারুনার রশিদ ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। মির্জা সহিদুর রশিদ সুবক্তা ছিলেন। দু’জনেরই ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু হয়। মির্জা আবু ছইদ দন্ত্যচিকিৎসক ছিলেন। মির্জা আব্দুল হামিদের পুত্র মির্জা নুরুল হুদা ঢাকায় মেডিক্যাল সার্জারি কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন। মির্জা আব্দুল মজিদের পুত্র শামসুল হুদা; তারা এখনো সাঁথিয়ার ছাতক-বরাট গ্রামে বসবাস করছেন।
ছাতক-বরাটের শেষ জায়গিরদার রাহানু বেগ দারার পঞ্চম পুরুষ ছিলেন। মির্জা রাহানু বেগের দ্বিতীয় পুত্র মির্জা বারু বেগ আরবি ও ফারসি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি দরবেশ ছিলেন। তার পুত্র মির্জা লস্কর বেগ বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তার দুই পুত্রÑ মির্জা মহম্মদ ইয়াসিন ও মির্জা মহম্মদ হোসেন। মির্জা মহম্মদ ইয়াসিন সুবিবেচক ছিলেন। মির্জা মহম্মদ হোসেন মিতচারী, বিদ্বান ও সাহসী ছিলেন। তার তিন পুত্রÑ মির্জা সগির উদ্দিন আহমদ, মির্জা বসির উদ্দিন আহমদ ও মির্জা কসিম উদ্দিন আহমদ। মির্জা সগির উদ্দিন আহমদ ফারসি ও আরবি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। মির্জা বসির উদ্দিন আহমদ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সাব ইন্সপেক্টর ছিলেন। তারা দু’জনেই নিঃসন্তান ছিলেন। মির্জা কসিম উদ্দিন আহমদ বগুড়ার পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন। তিনি ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার তিন পুত্রÑ মির্জা নছিম উদ্দিন আহমদ, মির্জা ওয়াছিম উদ্দিন আহমদ ও মির্জা ফছি উদ্দিন আহমদ। মির্জা নছিম উদ্দিন আহমদ অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর পদে কার্যরত ছিলেন। তিনি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মির্জা ওয়াছিম উদ্দিন আহমদ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন। মির্জা ফছি উদ্দিন আহমদ নিজের জমিদারি তত্ত্বাবধান করা অবস্থায় ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মির্জা নছিম উদ্দিন আহমদের তিন পুত্রÑ মির্জা মোসলেম উদ্দিন আহমদ, মির্জা আবু ইউসুফ তছলিম উদ্দিন আহমদ ও মির্জা মেফতাহুল ইসলাম মোহসিন উদ্দিন আহমদ।
মির্জা নছিম উদ্দিন আহমদের দ্বিতীয় পুত্র মির্জা আবু ইউসুফ তছলিম উদ্দিন আহমদ ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বিএ পাস করে ইতিহাসে এম এ অধ্যয়নরত অবস্থায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে (১৯৪৩ খ্রি.) যোগদান করে লাহোর অফিসার্স ট্রেনিং স্কুল এবং ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি, দেরাদুন থেকে কিংস কমিশন ল্যান্ডফোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করে আসাম, মনিপুর ও বার্মার বিভিন্ন রণক্ষেত্রে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শেষে তিনি অবিভক্ত বাংলাদেশ সরকারের অধীনে পোস্টওয়ার রিকনস্ট্রাকশন স্কিমে মেদেনীপুর, কালিংপং, দার্জিলিং, কলকাতা ও কাঁচড়াপাড়ায় কর্মরত ছিলেন। ভারত বিভক্তের পর (১৯৪৭) তিনি ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে আনসার অর্গানাইজেশন গঠন করার কাজে লিপ্ত হন। ১৯৫০-এ তিনি পূর্ব পাকিস্তান জুনিয়র সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। এ সময় তিনি মাদারীপুর জেলার ডামুড্যা নিবাসী স্বনামধন্য সৈয়দ বংশের সরওয়ার বকশ সাহেবের প্রথম কন্যা খোদেজা আকতারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মির্জা আবু ইউসুফ আরআইডিপিতে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপসচিব পদ মর্যাদায় প্রিন্সিপাল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে বাংলাদেশ স্বনির্ভর প্রোগ্রামে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। তার দুই পুত্র মির্জা আখতার মাসুদ ও মির্জা আখতার মারুফ। মির্জা আখতার মাসুদ লিবিয়ার একটি ফার্মে কমার্শিয়াল ডাইরেক্টরের চাকরি করতেন। তার দুই সন্তানÑফারহান মির্জা ও ইরফান মির্জা। মির্জা আখতার মারুফ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল পদ থেকে বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছেন। তারও দুই সন্তানÑ তাসনিম মির্জা ও তাসফিক মির্জা। তারা এখনো ছাতক-বরাট গ্রামে বসবাস করছেন। হ

 



আরো সংবাদ