২৭ জানুয়ারি ২০২১
`

চোর

-

বুনো লতায় প্রায় ছেয়ে গেছে জীর্ণ ডাকবাক্সটা। রাস্তার ধারে চরম অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এক সময় এর মাঝে কত রঙ-বেরঙের চিঠি জমা হতো! কোনো চিঠিতে কান্না আবার কোনো চিঠিতে হাসির সুবাস লেগে থাকত। চিঠির সে সময় মানুষ পাড়ি দিয়ে এসেছে। এখন আর কেউ চিঠি লেখে না। জিনিসটা রয়ে গেছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। মাইনুল সাহেবও নিজেকে জীর্ণ ডাকবাক্সের মতো মনে করে। সকালে নিয়ম করে হাঁটেন তিনি। পথে ডাকবাক্সটা পড়ে। তিনি তাকিয়ে দেখেন। মনে নানা ভাবনার উদয় হয়। শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক আগেই। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে থাকে না। কেউ বড় চাকুরে। শহরে ব্যস্ত সময় কাটায়। সপ্তাহে দু-একদিন ফোনে কথা বলে দায়িত্ব শেষ করে। কেউ বা উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এ সবই মাইনুল সাহেবের কাছে মিথ্যা মরীচিকা মনে হয়। আসলে সুখ কোথায়? যেখানে সুখদ জিনিস পাওয়া যায় সেখানেই তো সুখ। সবার সুখ এক রকম নয়। মাইনুল সাহেব ঢাকা ভার্সিটি থেকে পাস করেছেন। ইচ্ছে করলেই বড় চাকরি নিয়ে বড় শহরে বাস করতে পারতেন। তিনি চাকরি নিলেন প্রাইমারি স্কুলে। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতা মানে অন্যের মাঝে নিজের প্রতিফলন। নিজের স্বপ্ন, আদর্শ অন্যের মনে পুঁতে দেয়া। তাই প্রাইমারি স্কুলকে তিনি মনে করেন শিক্ষকতার শ্রেষ্ঠ জায়গা। ছোট্ট শিশুদের উর্বর মনে সহজেই আদর্শের বীজ বপন করা যায়। তাদের সুশিক্ষা দিতে পারাটাই তার সুখ। নৈতিক শিক্ষা বিলানোতেই তার আনন্দ।
বাপ-দাদার রেখে যাওয়া বাড়িটাকে মনে করেন সুখের আধার। এখানে তিনি যে সুখ পান আর কোথাও পান না। যেখানেই যান, মনটা এ বাড়িতেই রয়ে যায়। এ বাড়ির আনাচে-কানাচে নিজের শৈশব-কৈশোরের ঘ্রাণ পান। শানবাঁধানো পুকুর, নিজের লাগানো বিভিন্ন গাছ, গাছের ডালে ডালে বাতাসের হুড়োহুড়ি এসব দেখেই জীবনটা পার করলেন। বাকি জীবনটাও এখানেই কাটাতে চান। এ বাড়িতে এখন তিনি, তার স্ত্রী আর পুরনো চাকর-বাকর ছাড়া আর কেউ নেই। মাঝে-মধ্যে তার ছেলেমেয়েরা নাতি-পুতিদের নিয়ে একসাথে বেড়াতে আসে। তখন বাড়ি সরগরম হয়ে যায়। অনেক মজা হয়। এই দিনগুলোর কথা মনে করে মাইনুল সাহেব বিনোদিত হন। হাতের কড় গুনে গুনে হিসাব করেন, আবার কবে আসবে তারা।
বিজ্ঞান মানুষকে কত কাছে এনে দিয়েছে! মাইনুল সাহেবের এক মেয়ে থাকে আমেরিকায়। আরেক ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। তাদের সাথে প্রায়ই ভিডিও কলে কথা হয়। দেখা হয়। দূরে থেকেও তারা কত কাছে! মনে হয় তারা আশপাশেই আছে। দিনে দিনে কত কী আবিষ্কৃত হচ্ছে। আজ থেকে ২০ বছর আগেও মানুষ যা ভাবতে পারত না, এখন তা জীবনের জন্য অপরিহার্য হয়ে গেছে। মুঠোফোন মাইনুল সাহেবের সারাক্ষণের সঙ্গী। এটা ছাড়া তার এক মুহূর্তও চলে না। আজ বাইরে থেকে হেঁটে এসে মুঠোফোনটা পাচ্ছেন না। প্রতিদিনের মতো বিছানাতেই রেখে গেছেন। কিন্তু কে নিতে পারে! এ বাড়িতে অন্য মানুষের আনাগোনা নেই। পুরনো চাকর-বাকররা খুব বিশ্বস্ত। কোনো দিন কোনো জিনিস তাকে না বলে তারা নেয়নি। সেদিন মালিহার মা অবশ্য বলেছিল, তার বড় মেয়ে একটা মুঠোফোনের বায়না ধরেছে। তারপরও তাকে অবিশ্বাস করা যায় না। কারণ সে এ বাড়িতে আছে প্রায় ২৫ বছর ধরে। মুঠোফোনটা গেল কোথায়! মুঠোফোনে তার কেমন যেন একটা আসক্তি। এটা হাতে না থাকলে অস্বস্তি লাগে। মনে হয় কেউ হয়তো তাকে খুঁজে পাচ্ছে না।
আজকের দিনটা খুব সুন্দর। মাইনুল সাহেব অনেক দূর হেঁটে এসেছেন। আম-কাঁঠালের ছায়াঘেরা পুকুর পাড়ে বসলেন। পুকুরের নিশ্চল জলে শরতের নীলাকাশ দেখা যাচ্ছে। একঝাঁক পানকৌড়ি উড়ে যাচ্ছে। তিনি উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকালেন। পানকৌড়ির ঝাঁক দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছে। তার বহু পরিচিত নিজের ছবিটা পুকুরের জলে প্রতিফলিত হচ্ছে। ছবিটার দিকে আনমনে তাকিয়ে আছেন তিনি। নিজের মাঝে কত পরিবর্তন! খরস্রোতা নদী যেন তড় হয়ে গেছে! হঠাৎ তার মনে হলো মুঠোফোনটা কি তাহলে মালিহার মা-ই নিলো? কিন্তু...। তার মনে পড়ে গেল স্কুলজীবনের এক বন্ধুর কথা। সে প্রায়ই বলত, ‘টাকার আবেদন সবকিছুর চেয়ে বেশি।’ আসলেই কি সবাই টাকার কাছে দুর্বল? মনে নানা ভাবনা। একবার ভাবলেন, মালিহার মাকে জিজ্ঞেস করবেন। আবার ভাবলেন জিজ্ঞেস করলে সে কষ্ট পাবে। ভাববে আমি তাকে সন্দেহ করছি। পেছন থেকে কে যেন মৃদুস্বরে ডাক দিলো। ফিরে তাকাতেই দেখলেন, মালিহা দৌড়ে তার দিকে আসছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, দাদু, তোমার ফোন দিয়ে বানর ছবি তুলছে। হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে তিনি বললেন, ‘কোথায়?’
‘নারিকেল গাছে। বানর সেলফি তুলছে।’
কাছে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই তো তাই। বিড়বিড় করে বললেন, আমাদের মন অনেক সময় ভুল রিডিং দেয়। ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। হ



আরো সংবাদ