০৩ জুন ২০২০

শান্তি কোথায়? কুরআনেই

-

যখন মানুষ সৃষ্টি করলেন আল্লাহ, ফেরেশতারা বললেন, তোমার ইবাদত করব আমরাই, অন্যের প্রয়োজন হবে না। আল্লাহ বললেনÑ যা আমি জানি, তোমরা জানো না। একপর্যায়ে আদমকে আদেশ দিলেনÑ ‘নেমে যাও ওই মাটির পৃথিবীতে। ওখানে থাকবে একে অপরের শত্রু হিসেবে’।
তাহলে এই-ই বিধির লিখন। খণ্ডানোর কি কোনো উপায় নেই?
মানুষের মধ্যে ঐক্যের বাণী প্রচার করি যারা, তারা কি মনেপ্রাণে মানুষের ঐক্যে বিশ্বাস স্থাপন করিনি? যদি না করি সঙ্ঘাত কোনো দিন থামবে না। প্রভুর কাছে সেটাই আমাদের পরীক্ষা। আমরা কতখানি মানুষ, কতখানি পশু। যদি মানুষকে হত্যা করি অকারণে, তা হলে আমি পশু। যদি সহ্য করি, তা হলেই মানুষ। তা হলে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সহ্যের পরীক্ষা। প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করি মানুষে মানুষে হিংসা। পাকিস্তানে, ভারতে, বাংলাদেশে ও মিয়ানমার সীমান্তেও।
পৃথিবীতে কত মানুষ যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছে তার ইতিহাস কেউ রাখেনি ‘ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া’ জানাচ্ছে কিছু সংখ্যা।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন ছয় কোটি থেকে সাড়ে আট কোটি। প্রথম মহাযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন দুই কোটি থেকে ১০ কোটি। এর মধ্যে আমাদের লোকও আছে। কত যুদ্ধের নাম করব? মোঙ্গলদের যুদ্ধে চার কোটি থেকে সাত কোটি। চীনের যুদ্ধে সাড়ে তিন কোটি থেকে চার কোটি। নতুন যুদ্ধগুলোতে যেমন কোরিয়ান যুদ্ধে ১২ লাখ। ইরান ইরাক যুদ্ধে ১০ লাখ। সোভিয়েত আফগানিস্তান যুদ্ধে ৯ লাখ থেকে এক কোটি ২২ লাখ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আট লাখ থেকে ৩৮ লাখ। আমেরিকানরা কত লোক মেরেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারবে না। এই সংখ্যাগুলো পাঠ করার সময় আমাদের অনুভূতি কাজ করে না, কারণ আমরা মানুষের মৃত্যুকে ততক্ষণ অনুধাবন করি না, ততক্ষণ তা আমাদের নিজের সামনে এসে ধরা দেয়। কুমিল্লায় যে ওয়্যার সেমিট্রি আছে সেখানে কয়েকবার গেছি। ব্রিটিশ সরকার সেগুলোতে মালি লাগিয়ে ফুল দেয় পরিচর্যা করে। অবাক হয়ে দেখি ওখানে আছে আমাদের দেশের অনেক মুসলমানের নাম, অনেক হিন্দুদের নাম, অনেক বৌদ্ধদের নাম। ওরা কেন প্রাণ দিলো? কার স্বার্থে? ওরা ছিল ব্রিটিশদের গোলাম। তাই কি ওরা প্রাণ দিলো? ওদের প্রাণ কি বিফলে গেল না? কারণ ব্রিটিশরাই ছিল আমাদের শত্রু। তাই ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়া কি গৌরবের, না গ্লানিমা মাখা। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির আগে যে লাখ লাখ লোক সাম্প্রদায়িক হত্যায় প্রাণ দিলো তার কথা কি আমরা ভাবি? গত ৫০ বছরে ভারতে যে লাখ লাখ মুসলমান প্রাণ দিলো। বিশেষ করে হায়দরাবাদ ও কাশ্মিরে তার কথা কি আমরা ভুলে যাবো? ভ্রাতৃ হত্যায় যারা বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুকে হত্যা করল একাত্তর সালে, তাদের কথা কি আমরা ভুলে যাবো? আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র তাহলে কি?
এ নিয়ে ভাবতে হবে। শত্রু-মিত্র চিনতে হবে। গোলামি বিসর্জন দিয়েছি, গোলামিতে নেই মর্যাদা। অসত্যের কাছে মাথা নত করব না। পশ্চিমা সভ্যতা আমাদের সাহায্য করতে চায়, না দমিয়ে রাখতে চায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। এইখানে আসতেই হবে কুরআনের কাছে :
কুরআন শরিফের সূত্র নব-বিজ্ঞানীরা নতুন করে আবিষ্কারে রত, বিশ্বাস থেকে নয়, বরং অবিশ্বাস থেকে। ‘রিজন বনাম ম্যাটার’ [ৎবধংড়হ াবৎংঁং সধঃঃবৎ] নিয়ে আমেরিকার ক্যামব্রিজে চলছে গবেষণা। ওয়ার্ল্ড ফেনোমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষণায় আকাশ গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি বিবর্তনই নয়, চলছে জীবন ও মৃত্যুর দোলাচলের আবর্ত। গবেষণার ফলাফলে কুরআনের কথা ঘুরেফিরে এসেছে, যদিও তারা কুরআনের সমর্থক নন। জীবনের রহস্য যদি হয় ‘কার্বন’-এর সাথে ‘মলিকিউল’-এর মিশ্রণ, মৃত্যুজীবনের শেষ নয়। এর একটি পর্যায়, বাইওসেনট্রিজমের [নরড়পবহঃৎরংস] নতুন থিউরি প্রণিধানযোগ্য। যারা এ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে আগ্রহী তাদের জন্য রয়েছে ‘রবার্ট ল্যাঞ্জার’-এর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুচ্ছ, যা পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েছে। [তার লেখা ওং ফবধঃয ধহ রষষঁংরড়হ? ঊারফবহপব ংঁমমবংঃং ফবধঃয রংহ’ঃ ঃযব বহফ] এক জীবন থেকে আরেক জীবন, অর্থাৎ আমরা কেউ মৃত হবো না। বৈজ্ঞানিকরা আবিষ্কার করেছে যে, ‘ফোটন’-এর কাছে আছে সে তথ্য যা পূর্ব নির্ধারিত, যার নাম আল্লাহ দিয়েছেন ‘কিতাবুল হাফিজ’, অর্থাৎ সংরক্ষিত গ্রন্থ। সব তথ্য এখানে আগে থেকে জমাকৃত। স্মরণ করি সূরা রাহমানের আয়াত : ‘ফাবিআইয়ি আলাই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ অর্থাৎ তোমরা রবের কোন নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? [৫৬:৭৫], যা এসেছে ২৯ বার।
রহস্যে ঘেরা পৃথিবী, গভীর রহস্যে আবৃত মানবদেহ ও মন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে খানিকটা, বেশির ভাগ অনাবিষ্কৃত। সবচেয়ে রহস্যের আধার আল্লাহ। বিজ্ঞান বা বিশ্বাস যে দিকেই যান, মূলে থাকতে হবে একটি ‘প্রেমিস’। না হলে অনুসন্ধান এগুবে না।
ঈমানের বা বিশ্বাসের খুঁটি যতখানি মজবুত, অবিশ্বাসের কাছে তা ততখানি ভঙ্গুর। প্রকৃতিকেই কেউ কেউ ঈশ্বর বলে শনাক্ত করেছেন। ঈশ্বর অথবা তার সাথে সংশ্লিষ্ট আধ্যাত্ম জগৎ বলে কিছু নেই, ‘থিইজম’ অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ‘এথেইজম’ ঈশ্বরের অনবস্থিতি, পৃথিবী সৃষ্টির জন্য নেই প্রয়োজন ঈশ্বরের অথবা কোনো গ্রন্থের। জীবন পরিচালনার জন্য মনুষ্য প্রস্তুত নৈতিক মূল্যবোধ প্রস্তুত, যা নিয়ে জীবন গড়িয়ে যাবে আপাত স্বাচ্ছন্দ্যে। ইউরোপ ধর্ম থেকে সরে এসেছে। ধর্মের অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিয়ে ব্যবস্থা, সন্তান উৎপাদন, সমলিঙ্গ বিয়ে, নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন, সব কিছুই এ পার্থিব জীবন উদযাপনের ব্যবস্থা নিজেরাই করে ফেলেছে। জীবন বলগাহীন হরিণের স্রোতে, ঈশ্বর জীবন থেকে পালিয়ে গেছে জানালা দিয়ে। বলছে : ধর্মের ভিত্তি নড়বড়ে, ধর্ম বুদ্ধিহীনদের করায়ত্ত, যাদের ধর্মবিশ্বাস ছিল এককালে, তারা তা হারিয়ে ফেলেছে, তারা ধর্মহীন সংস্কৃতির অনায়াস বিস্তৃতিতে আবদ্ধ, ধর্ম তাদের জীবনে কোনো মহত্তই বয়ে আনতে পারেনি। এদের মধ্যে কেউ সেক্যুলারিস্ট, যাদের কাছে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ধর্মের কথা মূল্যহীন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা দু’দিক সামলে চলেন অর্থাৎ না ঈশ্বরবাদী না নিরীশ্বরবাদী। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অনেকেই আধুনিক জীবনের বৃত্তে ক্যারিয়ারকেই জীবন ধর্ম বলে মেনেছেন; যিশু একদিনের জন্য, যখন গির্জায় ঘণ্টা বেজে ওঠে, বাইবেলের ধার ধারেন না তারা। ‘এথেইস্ট’-রা ধর্ম না মানলেও নৈতিকতাকে অবহেলা করেন না তারা।
বৈজ্ঞানিক ইবরাহিম আবু হারবের ‘প্রবাবিলিটি অব ম্যাক্রো ইভোলিউশন’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে ২৬ আগস্ট, ২০১৩। পড়ে চমৎকৃত। যারা এটি পাঠ করবেন তাদেরও কিঞ্চিত মাথা ঘুরে যেতে পারে, কারণ জেনেটিক্সের রাজ্যে এটি একটি সবচেয়ে বড় সংবাদ, যা ক্ষুদ্র ইভোলিউশন থিওরির সবকিছু নতুনভাবে নির্ণয় করছে, অর্থাৎ আপনাআপনি যে জগৎ সৃষ্টি হচ্ছে তার মূল চাবিকাঠি ম্যাক্রো ইভোলিউশনের মধ্যে। ইভোলিউশন থিওরি বলছে যে সৃষ্টির সাথে সংযুক্ত যা তা সে আদিম যুগ থেকেই একটি প্রাণবিন্দু থেকে অর্থাৎ ‘প্রক্যারিওটস’-এর সাম্রাজ্য থেকে উৎপাদিত, যার মূল একই। মানুষের প্রাণবিন্দু অর্থাৎ শুক্রবিন্দুতে আছে ৩০০ কোটি কেমিক্যাল নিউক্লিওটাইডস যা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টির [এসিটিজি] মধ্যে ৩৪ মিলিয়ন নিউক্লিওটাইডস প্রয়োজন প্রোটিন তৈরি করার জন্য, যা প্রতিটি জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। প্রোটিন তৈরি হয় অ্যামিনো এসিড দিয়ে। একটি জীবন্ত প্রাণের জন্য তাহলে প্রয়োজন লাখ লাখ নিউক্লিওটাইডস যা চারটি অক্ষরের সমষ্টি। যা তৈরি হবে, ধরা যাক, ব্যাকটেরিয়া, একটি বৃক্ষ, একটি মশা, একটি মাছ অথবা একটি মানুষ। তার জন্য প্রয়োজন এ কোডিংয়ের যার মানবিক উপাদান অর্থাৎ কোডম থেকে তৈরি হবে সৃষ্টি।
কিভাবে মানবিক শুক্র উৎপাদিত তার রহস্য অনেকখানি প্রস্তুত এ প্রবন্ধে। এর থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে সৃষ্টির আবর্তে প্রথম দিন থেকেই এ সৃষ্টি ধারাবাহিকভাবে সৃষ্ট এবং এর আছে বৈজ্ঞানিক নিয়মানুবর্তিতা। কোনোটাই আপনাআপনি নিয়মবহির্ভূতভাবে সৃষ্ট নয়। ডক্টর এম এস হক জানাচ্ছেন, ডিএনএ সৃষ্টিতে বংশের ধারায় প্রবাহিত রক্তকণিকা পরম্পরা সৃষ্টিতে অনেক অবদান রেখে চলেছে। ইভোলিউশন থিওরির প্রবক্তারা বলছেন : এটি সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে। এর ব্যাখ্যা করেছি আমার মতো করে। তা হলো : কুরআনে আল্লাহ বলছেনÑ ‘আমিই সৃষ্টি করেছি, আপনাআপনি নয়’। যারা আমাকে বিশ্বাস করবে, তাদের ‘প্রেমিস’ : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি আছি, ছিলাম, থাকব, বিশ্বাস করো, আর নাই করো।
বিশ্বাস না করলে, নেই জবরদস্তি। অপেক্ষমান কালগহ্বরে নিকৃষ্টতম শাস্তি। তাই কি চাও?
পথ চিনে নেয়ার দায়িত্ব¡ তোমার।
‘স্পষ্ট জ্যোতি’ তোমার সামনেই।
‘আন কারিব’। এস আমার কাছে। আমি তোমার অভিভাবক।
নিজ কলবে অর্থাৎ ‘সিরহে’, ‘আল্লাহ’ শব্দটি ধ্বনির তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে পরিচয় হবে দৃঢ়।
করুণাময়ের বিগলিত ধারা অন্তর মাঝে এসে উপস্থিত হয় মুহূর্তে বাঁধভাঙ্গা বন্যা¯্রােতের মত, হৃদয়ের একুল-ওকুল দেখা যায় না। অপেক্ষার পর অপেক্ষা, ধৈর্য্যরে পরীক্ষা, এ বুঝি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া আর হলো না। যখন প্রহর এলো প্রতীক্ষা শেষের, তখন খানিকটা আনন্দের প্রাপ্তি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।
মানুষ ক্ষয় হয়েছে যুদ্ধে একি তা হলে বিধির বিধান? শান্তির অমীয় বাণী তাহলে মিথ্যা? শান্তি হবে না পৃথিবীতে? মজলুমরা চিরদিন নির্যাতিত হয়েই চলবে, কুরআন তা বলে না।

 


আরো সংবাদ