২৪ নভেম্বর ২০২০

করোনাকালের অর্থনীতি : আগে ও পরে

-

প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনাকে স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও সঙ্কট হিসেবে দেখার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই, কিন্তু করোনার অভিঘাত মূলত যে অর্থনীতিতে সে বিষয়টি দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। করোনার জন্ম ও বিকাশের এবং বিশ্বব্যাপী আঘাতের মূল প্রেরণা যে অর্থনৈতিক মোড়লিপনার খাত ও ক্ষেত্র দখল, পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন-মুক্তবাজার ব্যবস্থায় চপেটাঘাত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথ পরিষ্কার করা এবং নব্য সামন্তবাদী পরাশক্তির উদ্ভব তা বুঝতে আর সময় নিচ্ছে না।
করোনার উৎস, অতি সংক্রমণের প্রসার, প্রসার প্রতিরোধ এবং ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে কোনো ঠাণ্ডাযুদ্ধ পরিস্থিতি আছে কি না, মানবিক বিপর্যয় রোধে তাদের কারো কারো দৃশ্যমান ব্যর্থতার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি আছে কি না তা নিয়ে সমাজ, অর্থ ও রাজনীতিবিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে গবেষণায় নেমে পড়েছেন। মার্কিন ভাষাতত্ত্ববিদ দার্শনিক নোয়াম চমস্কি গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহেই তীর্যক মন্তব্য করেছিলেন’ চীনের বাইরে দেশগুলোর কাছে করোনার ভয়াবহতার তথ্য আগে থেকে থাকা সত্ত্বেও ঘড়ঃযরহম ধিং ফড়হব. ঞযব পৎরংরং ধিং ঃযবহ সধফব ড়িৎংব নু ঃযব ঃৎবধপযবৎু ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ষরঃরপধষ ংুংঃবসং ঃযধঃ ফরফহ'ঃ ঢ়ধু ধঃঃবহঃরড়হ ঃড় ঃযব রহভড়ৎসধঃরড়হ ঃযধঃ ঃযবু বিৎব ধধিৎব ড়ভ ‘রাজনৈতিক ভেদ বুদ্ধির ফেরে কিছুই করা হয়নি, নইলে করোনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত।’
সে পরিপ্রেক্ষিতে এই মুহূর্তে দেশে দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার সময় এবং করোনা-উত্তরকালে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে মনোনিবেশ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথা না মেনে উপায় নেই যে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ শারীরিকভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, হচ্ছে বা হবে তার চেয়ে করোনাকালে কর্ম ও আয় উপার্জনহীন হয়ে, অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে আর্থিক সঙ্কটে তার শত-সহস্রগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যক্তি ও বিশ্বঅর্থনীতির জন্য করোনা তাই বড় হুমকি। এই মুহূর্তে মানবসম্পদ বাঁচানোর জন্য প্রযোজ্য সবাইকে দৈনন্দিন খোরাকি পৌঁছাতে হচ্ছে, অব্যাহত রাখতে হবে যতদিন তারা স্বাভাবিক কর্মচঞ্চল আয় উপার্জনের অবস্থায় ফিরে না আসে। সবাইকে প্রয়োজন মতো খাদ্য খোরাকি নিয়মিত পৌঁছানোর ব্যবস্থাপনা হওয়া দরকার নিñিদ্র ও দুর্নীতিমুক্ত। প্রথমদিকে উৎসাহী সহায়তাকারীদের ইতঃবিক্ষিপ্তভাবে খাদ্য ও নগদ অর্থ বিতরণে আগ্রহ দেখা গিয়েছিল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থার পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা বিতরণের উদ্যোগ ছিল বা আছে, কিন্তু এ তৎপরতাকে নিয়মিত ও টেকসই করতে খোরাকি ভাতা বা সামগ্রী বিতরণের কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে । অনানুষ্ঠানিক খাতে দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। আপদকালীন সময়ে তাদের দেখার দায়িত্বও নিতে হবে।
জনসম্পদই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ অর্থনীতির ভরসা। সুতরাং প্রান্তিক মানুষগুলোকে শুধু বাঁচিয়ে রাখা নয়, তারা যাতে সক্ষম থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সঙ্কট কতদিন স্থায়ী হবে জানা না থাকায় আগামী ছয় মাস কিংবা এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে।
অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডে এখন থেকে কঠোর কৃচ্ছ্রতা অবলম্বনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। করোনা জাতীয় অর্থনীতিতে এতদিনের অর্জিত সাফল্য ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রাকে শুধু শ্লথ করবে না, ক্ষেত্রবিশেষে পিছিয়ে দেবে এবং গোটা অর্থনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে ছাড়বে। এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠে করোনা উত্তরকালে স্বনির্ভর হতে বা থাকতে এখন থেকেই সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি ও সামষ্টিক খাতে সর্বত্র উন্নয়ন-অনুন্নয়ন বাজেটে ব্যয়সাশ্রয়ী হতে কঠোর কৃচ্ছ্রতা সাধনের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতে হবে। সব প্রকার অপ্রয়োজনীয়, অনুৎপাদনশীল খাতে সময়, ৩৫ টাকার বালিশ ৫৬০ টাকায় দেখানো, সামর্থ্য, সমর্থন ও অর্থের অপচয় অপব্যয় পরিহার করা আবশ্যক হবে। করোনা বিশ্বব্যাপী তার আক্রমণের দ্বারা, বড়-ছোট সব অর্থনীতিকে কুপোকাত করে এই সত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে যে, এখন থেকে যার যা আছে তাই দিয়ে তাকে চলতে হবে। পরমুখাপেক্ষী কিংবা পরনির্ভরশীল হওয়া বা থাকার সুযোগ হবে সীমিত। সুতরাং স্বনির্ভর আর্থিক স্বয়ম্ভরতা অর্জনের পথে আরো বেশি ’হিসাবি’ আরো বেশি ‘সতর্ক’ ও সাবধানতা অবলম্বনকে জাতীয় চিন্তাভাবনা ও অভ্যাসের আওতায় আনতে হবে।
অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা রাখতে যা যা করা দরকারÑ স্বাস্থ্য ও জীবিকা পরস্পরের হাত ধরে চলে। তাই করোনা মহামারী থেকে জনগণকে রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছোট-বড় ম্যানুফেকচারিং, আমদানি-রফতানি, ব্যবসা বিপণন, কৃষি (খাদ্য, সবজি, মাছ, গোশত) উৎপাদন, পরিবহন, পর্যটন, সেবা ও আর্থিক খাতে পর্যায়ক্রমে ক্ষুদ্র মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তাদের করোনায় ক্ষয়ক্ষতির শুমার করে প্রথমত তাদের টিকে থাকা এবং করোনার প্রকোপ শেষ হওয়ার সাথে সাথে যার যার কাজ জোরেশোরে শুরু করতে পারে সে জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ আকারে নগদ সহায়তাসহ ট্যাক্স ট্যারিফ ফিসকাল ইনসেনটিভ ঘোষণা করা। টার্গেট গ্রুপভিত্তিক সহায়তা বিতরণ ও ইনসেনটিভ প্রদানের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব পরিহার, পক্ষপাতহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা সংবলিত নীতিমালা ও অনুশাসন অনুসরণ আবশ্যক হবে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বিধান, সুশাসন কার্যকর ও নীতি নৈতিকতার অধিষ্ঠান জোরদার করা, যথাপ্রযোজ্য সংস্কারে উদ্যোগ নিতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের আর্থিক খাত করোনা পূর্বকাল থেকেই বেশ কিছু বশংবদ দুর্বলতায় সংক্রমিত। সমাজে আয় বৈষম্য বৃদ্ধির মাত্রা সীমা অতিক্রান্ত হয়ে আছে। করোনা-উত্তর পরিবেশে আয়-ব্যয় বণ্টন বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি সামাজিক সংহতি ও করোনায় ক্ষতি হেতু সবার বর্ধিত চাহিদা ও দাবি পূরণের পথে শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই করোনা-উত্তরকালে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যেসব দেশে আয়-ব্যয় বৈষম্য পরিস্থিতি আগে থেকেই রোগাক্রান্ত সেসব দেশে গণ-অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে নিজ নিজ দেশকেই তা মোকাবেলায় পারঙ্গম হতে হলে লুণ্ঠিত টাকা বা সম্পদ পুনরুদ্ধার ও বণ্টনে বৈষম্য-দুর্নীতি দমনের আবশ্যকতা দেখা দেবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদন, আমদানি রফতানি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, বাজার ব্যবস্থাপনায় ‘নিজেরটা নিজে দেখ’ নীতি অবলম্বনের তাগিদ আসবে। করোনার বিশ্বব্যাপী বিচরণে ও মোটাতাজাদের সরু হওয়ার কারণে জাতীয় ও বিশ্ব অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার চত্বর চৌহদ্দিতে এই উপলব্ধি পরিব্যাপ্ত হচ্ছে বা হবে যে, ‘পুঁজিবাদ’, ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র ধ্যান-ধারণা হালে পানি পাবে না। এখন ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ নীতিতে অবগাহনের প্রয়োজন হবে। আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় সাফল্য আছে। একে আরো জোরদার করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশের রয়েছে উর্বর কৃষিজমি, জলাশয়, অধিক ফলনশীল শস্য উৎপাদনের অবকাঠামো, উদ্যম ও উদ্যোগ সেহেতু খাদ্যশস্য, সবজি, মৎস্য ও গোশত নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে বহির্বিশ্বের বর্ধিত ও সৃজিত চাহিদা মেটানোতে বাংলাদেশ বরং এ খাতে রফতানির মহাসড়কে উঠতে পারবে। করোনা এই সুযোগ বাংলাদেশের জন্য এনে দেবে যদি এ খাতের প্রতি যতœবান ও মনোযোগ দেয়া হয়।
বাংলাদেশের মানবসম্পদ তৈরী পোশাক খাতে যে অবদান রাখছে তাতে ভ্যালু এডিশন আরো বাড়ানো সম্ভব হবে বাংলাদেশ যদি কাঁচামাল, মেশিনারিজ ও টেকনোলজিতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলতে পারে। যেকোনোভাবে হোক ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজে গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের মানবসম্পদকে বাধ্যতামূলকভাবে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে , কারিগরি উচ্চশিক্ষায় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করে দেশের চাহিদা (উল্লেখ্য বিদেশী কর্মীদের দ্বারা বার্ষিক গড়ে সাত বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন হয় বাংলাদেশ থেকে) মেটানো সম্ভব হবে, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ দেশে যেকোনো বৃত্তিমূলক পেশায় এবং বিদেশে ‘ভালো বেতনে’ কাজ পাবেন।


আরো সংবাদ