১১ এপ্রিল ২০২০

সেদিনের রক্তের দাগ

-

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কয়েক যুগ হলো। একটি দেশের জন্য এই সময়টা নেহায়েত কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কথা ওঠে যখন অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। সে মৃত্যু রাস্তার দুর্ঘটনার কারণে হোক, কর্মস্থলে আগুন লাগার কারণে হোক, বজ্রপাতে হোক কিংবা প্রতিহিংসার কারণে হোক। যেভাবেই হোক অস্বাভাকি মৃত্যু মানুষকে শঙ্কিত করে, ভাবিয়ে তোলে; সমাজকে অস্থির করে। এ নিয়ে কথাও ওঠে। দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি জুলুম, অন্যায়-অত্যাচারে দিনের পর দিন দেশের বাতাশ ভারী হয়ে উঠছে। জাতীয় দৈনিকের পাতা ভরে খুনের খবরা-খবর ছাপা হচ্ছে। এসব খবর দেখার পর রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘বাতাশে লাশের গন্ধ’ শিরোনামের কবিতাটির চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে দেশ পাকিস্তানি বর্বরতাকে সহ্য করতে পারেনি সে দেশের মাটিতে প্রতিদিন ৯ জন করে খুন হচ্ছে! জখম হচ্ছে শত শত জন; কী করে সম্ভব, কেমন করে মেনে নেয়া হচ্ছে এমন ভয়াবহতা। রুদ্র সাহেব তার কবিতায় মুক্তিসংগ্রামে পাকিস্তানি জান্তা কর্তৃক এ দেশের মানুষের প্রতি নৃশংস ও বিভৎসতার চিত্র তুলে এনেছেন। তিনি তার কবিতার প্রথম চরণে বলার চেষ্টা করেছেন ‘আজও আমি বাতাশে লাশের গন্ধ পাই/আজও আমি মাটিতে মৃতের নগ্ন নৃত্য দেখি/ ধর্ষিতার করুণ চিৎকার শুনি আজও আমি তন্দ্রার ভেতরে/এ দেশ কী ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত! রক্তাক্ত সময়!’। সত্যিই কী বাংলাদেশ ভুলে গেছে সেই সময়ের খুন, হত্যা, রক্ত আর জখমের কথা। সে দিনের স্বজন হারানোর ব্যথা কী ভুলে গেছে এ দেশ? এ দেশের মানুষ? তা না হলে নতুন করে আবার কেন নৃশংসতা, খুন, ধর্ষণ, জুলুম, অত্যাচার? কেনো আবার স্বজন হারানোর ব্যথা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে স্বাধীন দেশের আপনজনকে। তা হলে কী সে দিনের রক্তের দাগ মুছে গেছে? না কী সেই রক্তের সাথে এদেশ বিশ্বাসঘাতকতা করছে, ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
২০১৯ সালে সড়কে মৃত্যু বেড়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা আবারো রাস্তায় নেমেছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালেও খুনের সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, ২০১৭ জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে ৫১৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালে তিন হাজার ৯৮৮ জনকে, ২০১৪ সলে চার হাজার ৫১৪ জনকে, ২০১৫ সালে চার হাজার ৩৫ জনকে এবং ২০১৬ সালে প্রায় চার হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে। পত্র-পত্রিকার ভাষ্যমতে, নানাবিধ কারণে এসব খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও পুলিশ হেফাজতে ১৮ সালের তিন মাসে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, টাকা-পয়সার লেনদেন, ছিনতাই, প্রতারণা, যৌতুক, পরকীয়াসহ বিভিন্ন কারণে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে চলেছে।
পারিবারিক সহিংসতায় বাবা-মা খুন হচ্ছে সন্তানের হাতে, আবার সন্তান খুন হচ্ছে মা-বাবার হাতে। ভাইবোন খুন হচ্ছে ভাইবোনের হাতে। প্রতিবেশী খুন হচ্ছে প্রতিবেশীর হাতে। বন্ধু-বান্ধব খুন হচ্ছে বন্ধু-বান্ধবের হাতে। ব্যাবসায়-বাণিজ্যের পার্টনার খুন হচ্ছে আরেক পার্টনারের হাতে। ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে হত্যা করছে। পরকীয়ার কারণে স্বামী স্ত্রীকে খুন করছে, আবার স্ত্রী হত্যা করছে স্বামীকে। এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে। সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে হত্যা করে লাশ ডোবা-নদী-নালাতে ফেলে দেয়া হচ্ছে, আবার কখনো খুনের পর লাশ গুম করে দেয়া হচ্ছে। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যৌনহয়রানি বেড়ে গেছে। খুবই আশ্চর্য হতে হয় তখন, যখন দেখি নারী সাংসদরা পর্যন্ত যৌন যাতনার জালে আটকা পড়েন। বৈশ্বিক জরিপের তথ্য মতে, ৮২ শতাংশ নারী সাংসদ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ এই ৮২ শতাংশ নারী সাংসদই তাদের কর্মপরিবেশে যৌন-নির্যাতনমূলক মন্তব্য শুনে থাকেন। এদের মধ্যে ২০ শতাংশ ধর্ষণ এবং ২৬ শতাংশ শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হন। এ জরিপটি বিশ্বের পাঁচটি অঞ্চলের ৩৯টি দেশের ৫৫ জন নারী সাংসদদের ওপর পরিচালনা করা হয়। মনে বিস্ময় জাগে, নারী সাংসদ মানে সমাজের প্রভাবশালী মহিলা। তাদেরই শিকার হতে হয় হিং¯্রতার। তবে যেখানে পুরুষ কর্তৃক পুরুষ হিং¯্রতার শিকার বহুগুণে ঘটে, সেখানে অন্য নারীদের অবস্থা কতটা করুণ হতে পারে অনুমান করা যেতে পারে অতি সহজেই। হত্যা-খুন-ধর্ষণের এমন লোমহর্ষক চিত্র সমাজকে বিচলিত না করে পারে না। সরকার, রাজনীতিক এমনকি দেশের বুদ্ধিজীবীরাও এর দায় এড়াতে পারেন না।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে হত্যা-খুন-ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে নানা রকম বিশ্লেষণ রয়েছে। সেসব বিশ্লেষণে মোটামুটিভাবে উঠে এসেছে যে, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন; যশ-খ্যাতি-অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তি সব একসাথে চাওয়া; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ঘুষ-দুর্নীতির কারণে দুর্বল চার্জশিট; বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা; মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়; সহনশীলতার ঘাটতি; শিথিল পারিবারিক বন্ধন; সামাজিক অস্থিরতা; হতাশা; মানসিক বিষণœতা; আর্থিক দৈন্য এবং মাদকের ছোবলসহ ইত্যাদি কারণে সমাজে হত্যা-খুন-ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হত্যা-খুনের পেছনে যে অবক্ষয়গুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সে সব অবক্ষয় নিরসনে জোরালো কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের কোনো সময়ই বাগে আনা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বাংলদেশের বহু খুন-খারাবির পেছনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা কলকাঠি নাড়েন এমন খবর পত্রিকাগুলোতে হরহামেশায়ই উঠে আসতে দেখা যায়। অথচ রাজনীতিকদের দায়িত্ব ছিল সমাজ থেকে খুন-খারাবির মূল উৎপাটন করে সমাজকে পরিচ্ছন্ন রাখা। বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সাম্য, সমতা ও ভাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করা। অথচ তারা নিজেরাই এখন অস্ত্রবাজি, দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদিতে বাজিকরের প্রতিরূপ ধারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রাজনীতিকদের চরিত্রে সেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ, নিষ্ঠা আর ত্যাগের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যাচ্ছে না হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দলবাজি, জুলুমবাজি, লুটতরাজ বন্ধ করা
একটি দেশের মানুষ কোন মূল্যবোধে বিশ্বাস করবে তা ঠিক করে দিতে পারে সে দেশের রাজনীতি ও সরকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কিভাবে বিশ্বসমাজে স্থান করে নেবে সেটাও ঠিক করে দিতে পারে সে দেশের রাজনীতিক ও সরকার। একটি দেশ কতদিন টিকে থাকবে অথবা টিকে থাকবে কী থাকবে না সেটিও নির্ধারণ করে দিতে পারে সে দেশের রাজনীতি ও সরকার। কারণ একটি দেশের নাগরিককে পরিচালনার জন্য সে দেশের সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে একমাত্র সরকার। কাজেই রাজনীতি ও সরকার একটি দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে। এই নিয়ামকেও গলদ লক্ষ করা গেছে। এ দেশের রাজনীতিতে মেধাশূন্য লোকদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে অবলীলায়।
একাত্তর সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এ স্বাধীনতা মাত্র ১০০ বছর টিকে থাকার জন্য নয়। এ দেশের মানুষ অনন্তকাল ধরে এ দেশের স্বাধীনতাকে দেখতে চেয়েছে। স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে সম্মানের সাথে নিজেদের পরিচিতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। জীবন বাজি রেখে লড়েছে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও রক্তপাতশূন্য বসবাস উপযোগী দেশের জন্য। এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিযোদ্ধারা। সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে আরো কত শত বছর লাগবে তা কে জানে। আত্মত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নে দেখা যে দেশ সে দেশের স্বাধীনতাকে টিকে রাখতে চাইলে দেশের প্রতিটি মানুষকে হতে হবে আদর্শে, নৈতিকতায়, সততায়, পরিশ্রমে, সাম্যে, ভাতৃত্বে, মূল্যবোধে এবং উন্নতজীবনবোধে আপসহীন পর্বতদৃঢ় সৈনিক। এমন বৈশিষ্টসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক তৈরিতে যে তৎপরতা দরকার; এ দেশের রাজনীতি ও সরকারগুলোতে কখনোই সেভাবে তৎপর হতে দেখা যায়নি। গ্রহণ করা হয়নি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। কেন হলো না সে প্রশ্নও বড় করে ওঠে আসেনি। সে জন্যই হয়তো এই নৈরাজ্য ও নৈরাশ্যের জন্ম হতে পেরেছে।
খুন একটি ভয়ানক অপরাধ। একটি খুন আরো দশটি খুনের জন্ম দিতে পারে। খুন-জখমে জাতি মেতে উঠলে দেশের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখা মুশকিল হতে পারে। এমন হওয়ার তো কথা ছিল না। এমন হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। দেশের রাজনীতিকদের ওপর থেকে সাধারণ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস কমতে থাকে। মানুষ মুক্তিসংগ্রামকে নিয়ে ভুল বুঝতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে রাজনীতিও তাহলে জনগণের সাথে প্রতারণা করতে পারে? নতুন প্রজন্ম যখন চোখের সামনে রক্তের বন্যা দেখে; যখন দেখে তারই সহপাঠী রামদা, কুড়াল নিয়ে তার মতো আর একজন সহপাঠীকে ধাওয়া করে, মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করে; যখন দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রী ধর্ষণের মামলা হয়; যখন দেখে চাকরি নিতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতকদের ঘুষ দিতে হয়; যখন দেখি এ দেশের রাজনীতিকরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে সম্পত্তি বেদখল করে নেয়; যখন দেখি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। যখন দেখে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মের কারণে ভিন্নধর্মের মানুষকে হত্যার শিকার হতে হয়, তখন তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে আগ্রহ-উৎসাহ হারিয়ে ফেলে; তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা নতুন প্রজন্মের অন্তরে বিষাদের জন্ম দেয়। নতুন প্রজন্মের সেই অন্তর্জ্বালা দেশের সরকার এবং রাজনীতিক কেউই উপলব্ধি করার চেষ্টা করেননি। রাজনীতিকরা যদি নবাগত প্রজন্মের মর্মবেদনা আত্মস্থ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারত, তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে ভোটের জন্য এ দেশের মানুষের কাছে বারবার ফেরি করতে হয়তো হতো না। এসব থেকে নৈরাশ্য থেকে মুক্ত পেতে হলে সত ও যোগ্য মানুষ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। হ

 


আরো সংবাদ