৩১ মার্চ ২০২০

অপূর্ণতা

-

এই কাক ডাকা ভোরে মনটা ভারী হয়ে উঠেছে। আমার তিন বছর বয়সী ছেলে রাকিব অনবরত কাঁদছে আর বলছে, ‘আম্মু কোথায়? আমি আম্মুর কাছে যাবো।’ অনন্যোপায় হয়ে রাকিবকে তার মায়ের কবরের পাশে নিয়ে আসি। বলি, ‘এখানে তোমার আম্মু ঘুমিয়ে আছে।’ ছেলের কান্নাজড়িত উত্তর ‘না, এখানে আম্মু নেই। আম্মু কোথায়? আম্মু এনে দাও।’ ছেলের এমন কান্না দেখে আমার চোখ দু’টি ছলছল করছে। পনেরো দিন হলো মিথিলা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। কোথায়? জানি না। এই পনেরো দিনে হয়তো সে এমন পথ পাড়ি দিয়েছে, যেখান থেকে আর কোনো দিন ফিরে আসা সম্ভব নয়। মিথিলা বড় মামার একমাত্র মেয়ে। খুব আদরের। ছোট বেলা থেকে মিথিলা আর আমার যথেষ্ট মিল- কথা, কাজে ও বিশ্বাসে। সময়ের আবর্তনে কখন যে আমাদের মধ্যে ভালোবাসার অঙ্কুরোদগম হয় বুঝতে পারিনি। এসএসসি পাসের পর ঢাকায় একটা কোম্পানিতে চাকরি নিই। মিথিলা মাস্টার্স পাস করলেও আমার পাঠ চুকাতে হয়েছে এসএসসি পাশের পরপরই। এই একটি মাত্র ব্যবধানের কারণে মামা-মামী কেহই আমাদের সম্পর্ককে মেনে নিতে রাজি হয়নি। কিন্তু মিথিলা অনড়। বিয়ে করতে হলে সে আমাকেই করবে। এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখে সে দিন চোখে পানি এসেছিল। একরকম নিরুপায় হয়েই একদিন আমরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। সবার অলক্ষ্যে। অজানা উদ্দেশে। বিয়ে করে ফেলি। মিথিলাকে বলি, ‘মিথি, তুমি শিক্ষিত মেয়ে, সবাইকে ছেড়ে আমার হাত ধরে চলে এলে। আমি তোমাকে দুঃখ ছাড়া কি-ই বা দিতে পারব?’ মিথি আমার কোলে মাথা রেখে বলে, ‘এই যে তোমার কোলে মাথা রাখলাম। এভাবে তোমার কোলে মাথা রেখে যদি মরতে পারি তা হলে এটাই হবে আমার বড় পাওয়া।’ মিথিলার এ আশা আমি পূরণ করে পারিনি। মিথিলার এ আশা পূরণ হয়নি। আমি ঋণী হয়ে গেলাম। যে দিন মিথিলা আমাদের ছেড়ে চলে যায় সেদিন সকাল বেলা হঠাৎ সে আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘রতন, আমার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।’ তখন আমার মনপাখিটা ডানা ঝাপটাতে লাগল অবিরাম। অনবরত। আমার ইচ্ছে করে, যদি সুপারম্যান হতাম তাহলে এক মিনিটে ঢাকা হতে বাড়ি ফিরে আসতাম। কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমি অসহায়। প্রকৃতির বিধান যে অলঙ্ঘনীয়। ঢাকা শহরের পাষাণ জ্যাম আমাকে অনেকক্ষণ আটকে রাখে। যখন বাড়ি ফিরি, তখন কোনো এক অজানা অভিমানে মিথিলা আমার সাথে কথা বলেনি। একটি কথাও না। তার নিথর দেহটা শুধু কাঁধে নেয়ার সুযোগ পেলাম মাত্র।
প্রিয়জন-১৬৩৮


আরো সংবাদ