০৯ এপ্রিল ২০২০

একুশের মর্মবাণী

-

সংস্কৃতি যদি হয় সমষ্টির আচার-আচরণ, বোধ-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনার একটি পরিশীলিত সমন্বিত রূপ তাহলে বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতির স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। অথচ এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতিকে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণে এর স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তাকে এর চেহারা ও চরিত্রকে ভিন্নতর চিত্রণে চাতুর্যের অপূর্ব আয়োজন ল করা যায়। বস্তুত বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বেশির ভাগ েেত্র মনে করা হয়ে থাকে সার্বভৌমত্ববিহীন এমন এক সত্তা, যাকে যেকোনো অবয়ব অভিধায় আখ্যায়িত ও বিকৃত করা চলে। গণসংস্কৃতি বলতে এমনই এক সংস্কৃতির ধারণা প্রচার পায় যা গণবিচ্ছিন্নতারই নামান্তর।
বাংলাদেশে নাট্যশিল্পের প্রসার স্বাধীনতা উত্তরকালে একটি গর্বিত অর্জন। নাট্যকর্মীদের নিবেদিত নিষ্ঠা ও নাট্যমোদী দর্শকদের আগ্রহ এ েেত্র বিরাট গঠনমূলক ভূমিকায় রয়েছে। সংপ্তি সময়ে জীবনের খণ্ডচিত্রের প্রতিলিপি দেখতে আগ্রহী অতি ব্যস্ত মানুষ। বিনোদন মাধ্যমগুলোর দ্রুত পট-পরিবর্তন এ জন্যই ঘটছে। কিন্তু বাংলাদেশের নাটকে জীবন-ঘনিষ্ঠতা বরাবরের মতো এখন গণনাট্যের নামে শোষণ ও বঞ্চনার এবং শ্রেণী-সংগ্রামের নামে সম্প্রদায়গত সম্প্রীতিকে প্রশ্নবোধক করণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ সুকৌশলে প্রতারণা ও বিভ্রান্তির বেড়াজাল নির্মাণের মাধ্যমে সত্য গোপনের অপচেষ্টায় শাসন ও বঞ্চনার যে ব্যপ্তি ঘটেছে তার প্রতিফলন নেই নাটকে। নাটকে নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনযাপনের আচার-অনুভূতির বোধ-বিশ্বাস ও আনন্দ সর্বনাশের কোনো বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বরং সেখানে এমন বোধ-বিশ্বাসেরই অহরহ উপস্থিতি, যা প্রতিনিধিত্বশীল নয় সমকালীন সমাজের। বাংলাদেশের টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে ‘সোর্ড অব টিপু সুলতান’ প্রদর্শিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে দু’বার প্রচার করা হয়েছে একটি ইরানি ফিচার ফিল্ম বাংলা ডাবিং করে। এ দুই েেত্রই ল করা যাবে চরিত্র-চিত্রণ ও সংলাপ প্রপেণে বাস্তবসম্মত পরিবেশের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত থাকা সম্ভবপর এবং উচিত। একটি ধর্মনিরপে বলে কথিত পরিবেশে, সংখ্যালঘু হিসেবে নিশ্চিত একটি সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন আলাপচারিতা, ঘর-গৃহস্থালীর অবয়ব, ইবাদত বন্দেগির অনিবার্য আচার-আনুষ্ঠানিকভাবে যদি ‘সোর্ড অব টিপু সুলতানে’ চিত্রিত করা যায় তাহলে বাংলাদেশের নাটকে কোনো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জীবনবোধকে? কিভাবে সম্ভব? কিভাবে এ শিল্পকে জীবনঘনিষ্ঠ অভিধায় আখ্যায়িত করা চলে যেখানে নেই সামষ্টিক জীবনের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি, কিভাবে ওই সৃষ্টিকে বলা যাবে বাস্তবের প্রতি বিশ্বস্ত যেখানে বরং খণ্ডিত অবয়বে বিকৃত করার মানসিকতায় উপস্থাপিত করা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতিকে, বোধ বিশ্বাসকে?
সাহিত্যে শ্রেয়বোধ, সত্যসন্ধ অনুভূতি এবং স্থান কাল পাত্রের অনিবার্য নৈতিক বিজয়ে আস্থার বিকাশ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। সকল সুকুমার শিল্পের এটাই বড় বৈশিষ্ট্য মানুষের মনে একটা অমোময় আশা ও প্রত্যাশা সব সময় থাকে-অবৈধ বৈধের কাছে, মিথ্যা সত্যের কাছে, অন্যায় ন্যায়ের কাছে পরাস্ত হবেই। সুকুমার শিল্পের উদ্দেশ্য হলোÑ সেই প্রত্যাশাকে স্বীকৃতি দেয়া, উজ্জীবিত ও বেগবান করা। তাকে হত্যা করা নয়। সমাজের অন্যায়-অনিয়ম যখন অবারিত হয়ে ওঠে, নৈরাজ্যের দিকে যখন ধাবিত হয় সব প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মশৃঙ্খলা তখন সেই হলাহলপূর্ণ পরিস্থিতিতে বেশি সর্বনাশে সহায়তা করা হয় নৈরাজ্যের চিত্র লাগামহীনভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে মস্তানকে সমাজনায়ক হিসেবে দেখিয়ে আবার তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কোন বাস্তবতার প্রতিফলন এবং কোন মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা সাধন হলো তা বিতর্কের ব্যাপার বৈকি! অস্বীকার করার জো নেই যে, সমাজে এ ধরনের চরিত্রের বিকাশ ঘটছে এবং এমন অনিয়ম অহরহ ঘটছে। ঘটনার বিশ্বস্ত প্রতিলিপি হয় এটি কিন্তু এর অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে নাট্যকারের বক্তব্য গঠনমূলক, সুচিন্তিত ও সমাজ-দর্শনের ভিত্তিতে সুস্থির নয়। সমাধান কিংবা নির্দেশনা দিতে না পারলে সমস্যার বিশ্বস্ত চিত্রায়নও বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যে দেশে বেশির ভাগ জনগণ এখনো শিার আলো থেকে বঞ্চিত, গণমাধ্যমসহ জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারে নিয়োজিত সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার সীমিত এবং যে সমাজে অভ্যন্তরে প্রতারণা-শোষণ ও বঞ্চনার বিচিত্র কৌশল বিদ্যমান সে দেশে দর্শক সমাজকে ঘটনার বাস্তবতা দেখিয়েই তাদেরকে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া কতখানি যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখা দরকার। পাগলকে নৌকায় নাচতে নিষেধ করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি কোনো সৃজনশীল কর্মের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। সীমিতসংখ্যক আতেল দেড় থেকে দুই কোটি সচেতন শিতি মানুষ নগরকেন্দ্রিক জনাকয়েক সংস্কৃতিকর্মী নিয়েই গোটা দেশ নয়। সব শ্রেণীর ও পর্যায়ের জীবন ও মূল্যবোধের আশা-আকাক্সা, ভালো-মন্দ জ্ঞানের বাস্তবায়ন ও রূপায়ণই হওয়া উচিত সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ল্যমাত্রা। দেশের আপামর জনসাধারণের দিনযাপনের চিত্রলিপিতে না যেয়ে শুধু নন্দনতাত্ত্বিক এবং শুধু সীমিত গণ্ডির মধ্যে সৃজনশীল চিন্তা-চেতনাকে আবর্তিত হতে দেয়াকে দেশজ সুকুমার শিল্পের বিকাশ হিসেবে ধরে নেয়া যায় না।
মহান ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল পর্যায়ক্রমে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা আদায়, স্বাধিকার অর্জন এবং স্বাধীনতা লাভের অয়োময় প্রত্যাশায়। বাহ্যিকভাবে এগুলো অর্জিত হয়েছে কিন্তু একুশের অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণার বাস্তব অর্জন হয়েছে কি? শিার সুযোগকে সর্বত্রগামীকরণের মধ্যে মাতৃভাষার প্রকৃত বিকাশ ও মর্যাদা নিহিত সে উপলব্ধির বাস্তবায়ন প্রায়ই মনে হয় সুদূরপরাহত। গণশিা কার্যক্রম এখনো সরকারি ও এনজিও কর্মসূচির নথিতে বন্দী। উচ্চশিা সন্ত্রাস ও বিভ্রান্তির বেড়াজালে কছুটা বিপথগামীও। সর্বজনকে স্বার ও সচেতন করে তোলার ল্েয কোনো সামাজিক সচেতনতাপ্রসূত আন্দোলন এখনো হয়নি। দেশের শিাব্যবস্থাকে এখনো বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপকের দফতর থেকে পরীা-নিরীার কলাকৌশল থেকে বের করা যায়নি।
একুশের চেতনা কেন সার্বিকভাবে জাতিকে নবজাগৃতির অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেনি, তার যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া দরকার।
একুশে ফেব্র“য়ারির আন্দোলন শুধু মুখের ভাষার দাবি ছিল না, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধি থেকে পৃথক জাতিসত্তার উত্থানও ঘটেছিল একুশকে কেন্দ্র করে। ভাষার সাথে কৃষ্টিক স্বকীয়তা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ছাড়া নিরাপদ নয়, আবার রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা জাতীয় পরিচিতি ছাড়া নির্মল নয় বলেই একুশের আন্দোলনের বাংলাদেশ নেশন স্টেটের কালচারাল, ন্যাশনাল ও পলিটিক্যাল পরিচিতি স্পষ্টকরণে পথিকৃতের ভূমিকায় থাকার কথা। কিন্তু কেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্ট স্বকীয়তায় বিকাশ লাভ করেনি তার কারণ এবং একুশের অবমূল্যায়ন প্রোপট পর্যালোচনা করে ুরধার লেখনীর লেখক মরহুম আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯) ১৯৭৭ সালে ‘একুশের মর্মবাণী’ শীর্ষক রচনায় যে শানিত বক্তব্য পেশ করেছিলেন তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য : ‘বাংলার অব্যবহিত গত দুই শ’ বছরের ইংরাজ সৃষ্ট’ কলিকাতাকেন্দ্রিক বেংগল ছিল আসলে দুইটি বাংলা : পশ্চিমে টাওয়ার বাংলা, পূর্বে খামার বাংলা। এই মুদ্দতের বাঙালিরা ছিল দুইটি কৃষ্টিক জাতিতে বিভক্ত, ‘ভদ্র লোক’ ও ‘মুসলমান’।
আবুল মনসুর আহমদ, আরও উল্লেখ করেন : টাওয়ার বাংলা ভদ্রলোক-প্রধান, আর খামার বাংলা ছিল মুসলমান-প্রধান। টাওয়ার বাংলায় ছিল কৃষ্টি ও আর্ট; খামার-বাংলায় ছিল কৃষ্টি ও পাট। খামার বাংলা টাওয়ার বাংলাকে দিত পাট ও ধান। টাওয়ার-বাংলার খামার-বাংলাকে দিত আর্ট ও গান। রবীন্দ্রনাথ বেঙ্গলের স্বরূপ বর্ণনায় তাই লিখিয়াছিলেন : ‘বাংলা শুধু দেহেই দুই নয়, অন্তরেও দুই।’ ইতিহাসের অমোঘ বান-তুফানে সেই বেংগল আজ দৈহিকভাবেও দ্বিধাবিভক্ত। টাওয়ার-বাংলা বিশ্বকবির ইচ্ছামতো বিশ্বভারতীয় মহাভারতে লীন হইয়া আত্মিক নির্বাণ লাভ করিয়াছে। আর খামার বাংলা ভব-বন্ধন হইতে মো লাভে অসমর্থ হইয়া কর্মফল ভুগিবার জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হইয়াছে। কিন্তু দৈহিক মুক্তি যত সহজ, আত্মিক মুক্তি তত সহজ নয়। একটা কায়িক বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য, অপরটা মানসিক বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। তাই রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার সাথে কৃষ্টিক স্বকীয়তা অটোমেটিক্যালি আসে না। বাংলাদেশের বেলায় এটাই ঘটিয়েছে। আমরা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা লাভ করিয়াছি বটে, কিন্তু কৃষ্টি স্বকীয়তা হাসিল করি নাই। খামার-বাংলার মাটি লইয়া আমরা বাংলাদেশ নামে নেশনস্টেট গড়িয়াছি। কায়িকরূপে রাষ্ট্র অর্গানিক। ওটা চেনা সহজ। আমাদের রাষ্ট্রনায়করা তাই বাংলাদেশের ন্যাশনাল সভরেন্ট্রি ও টেরিটোরিয়াল ইনটিগ্রিটি রার সাধ্যমতো চেষ্টা করিতে পারিতেছেন। পান্তরে, আত্মিকরূপে জাতি ইন-অর্গানিক। ওটা মানসিক ও স্পিরিচুয়াল বলিয়া দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। ন্যাশনাল আইডেন্টিটি ও কালচারাল অটোনমির সীমারেখা তাই সহজে চেনা যায় না। তার ওপর আমাদের চিন্তানায়কের কেউ কেউ বাংলাদেশের ভাষা-সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তায় বিশ্বাস করে না। তাদের মতে, বাংলা বাটোয়ারায় মাটি ভাগ হইয়াছিল কৃষ্টি-সাহিত্য ভাগ হয় নাই। টাওয়ারের কৃষ্টি-সাহিত্যই আমাদের কৃষ্টি-সাহিত্য। টাওয়ারী রূপও আংশিকেই তা আমাদের থাকিবে।
টাওয়ারী কৃষ্টি-সাহিত্যের আগুনে বিদগ্ধ এই মনীষীদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে যাহা ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ মর্যাদার ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ হইয়াছে। কৃষি-পাটের বেলা ‘দুই বাংলা’ যুধ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু কৃষ্টি-আর্টের বেলা তারা যুগ্মমান সহধর্মী। ‘ওপার বাংলা’ গঙ্গার পানির ধারা ফারাক্কায় আটকাইয়া ‘এপারে বাংলার’ কৃষি পাটের মাঠ পয়মাল করিতেছে, কিন্তু ভাগীরথীর বাণীর ধারা মুক্ত রাখিয়া বরং আরও ফারাক করিয়া ‘এপার বাংলার’র কৃষ্টি-আর্টের ঘাট সয়লাব করিতেছে। ফলে আমাদের ‘শহীদ মিনার’ আজ ‘অর্চনার বেদি’ হইয়াছে। মিনার যেখানে জাতীয় গৌরবে আমাদের উন্নত-শির আকাশমুখী করিতে পারিতবেদী সেখানে ভক্তিনত শোকাহত আমাদের নত-মস্তক পাতালমুখী করিতেছে। এটা একাধারে টিপিকাল ও বিস্বলিক্যাল। কাজেই এটা সার্বিক ও সার্বাত্মিক।’ (অন্তরে অনির্বাণ’ বাংলাদেশ পরিষদ সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগ প্রকাশিত একশের সাহিত্য প্রতিযোগিতার স্মরণিকা, ১৯৭৭)।


আরো সংবাদ