০২ এপ্রিল ২০২০

বাংলা ভাষার শত্রু ও মিত্র

-

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। তখন কেবল বাংলা একাডেমিতে দাফতরিক কাজে বাংলা ব্যবহার হতে আরম্ভ হয়েছে। নথিপত্র বাংলায় লেখা হচ্ছে। প্রথম দিকে আমরা সাধু বাংলা ব্যবহার করতাম। তখন অনেকেই সাধু ভাষা ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। তখন যারা নবীন তাদের কাছে সাধু ভাষা তেমন পছন্দনীয় ছিল না। অথচ আমরা কথ্যভাষা সঠিকভাবে উচ্চারণ করতেও পারতাম না। আমাদের অনেকের উচ্চারণে আঞ্চলিকতার ছাপ ল করা যেত। যেমন ড. এনামুল হক। তার উচ্চারণে চট্টগ্রামের টান থাকতই। আমরা উচ্চারণের েেত্র তেমন সচেতন ছিলাম না। যারা সচেতন ছিলেন তাদের মধ্যেও আঞ্চলিকতার টান দেখা যেত।
তবুও আমরা কথ্যভাষার পে ছিলাম। নথিতে কথ্য ভাষা ব্যবহার করতাম। তখন দু’টি শব্দ নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। শব্দ দু’টি হচ্ছে ‘ইতিমধ্যে’ ও ‘উপরোক্ত’। এই বিরোধ নিরসনের জন্য আমরা উভয় প ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর শরণাপন্ন হলাম। তিনি বললেন, চলতি বাংলায় ‘ইতিমধ্যে’ ও ‘উপরোক্ত’ শুদ্ধ কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে অশুদ্ধ। ফলে সেই ষাটের দশক হতে ‘ইতিমধ্যে’ ও ‘উপরোক্ত’ শব্দ দু’টি ব্যবহার করে আসছিলাম।
সম্প্রতি অর্থাৎ স্বাধীনতার বেশ কিছু দিন পর এই শব্দ দু’টিকে সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে শুদ্ধ করে ব্যবহার করছেন অনেকে। তারা ‘ইতিমধ্যে’র পরিবর্তে লিখছেন ‘ইতোমধ্যে’ এবং ‘উপরোক্ত’ শব্দের পরিবর্তে ‘উপর্যুক্ত’ বা ‘উপরি-উক্ত’। আমরা সবাই জানি উপরি-উক্ত আমরা ভুলেও বলি না। কথ্য বাংলায় বলা সম্ভব নয়। তবে কেন এই প্রচেষ্টা? প্রকৃতপে সমস্যাটি কোথায়?
আমাদের কিছু সংখ্যক সংস্কৃত প্রেমিক নতুন করে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের অধীনে আনতে আগ্রহী। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সেই কারণ জানতে হলে বিগত তিন শ’ বছরের বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস সেই সাথে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তন জানতে হবে। জানতে হবে বাংলা ভাষার অর্থনীতি।
মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় এক বিশাল সাহিত্য সৃষ্ট হয়েছিল। সেই সাহিত্যকে দোভাষী সাহিত্য বলে দূরে সরিয়ে দিয়ে আধুনিক যুগের লেখকরা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের নির্দেশে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দ সংস্কৃত বানানে লিখতে শুরু করলেন। তারা সংস্কৃত থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ নিয়ে বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে আরম্ভ করলেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের অধীন নিয়ে এলেন, যা আজো বলবৎ আছে। অথচ কিছু শব্দের বানান ছাড়া আর কিছুই সংস্কৃত ব্যায়াকরণের নিয়ম অনুসারে লেখার প্রয়োজন হয় না। এর কারণ ভাষার অর্থনীতি। সব ভাষার কিছু অর্থনৈতিক মূল্য আছে। বাংলা ভাষারও অর্থনৈতিক কিছু মূল্য আছে। তবে সবার কাছে নয়। স্বল্প কিছু লোকের কাছে বাংলা ভাষা অর্থনৈতিক পণ্য। এককালে ছিল ব্রাহ্মণদের। এখন বাংলায় ডিগ্রি থাকলে শিক হওয়া যায়। বাংলা পাঠ্যপুস্তক লেখা যায়, তার নোট বই লেখা যায়। সতেরো কোটি মানুষের দেশে সামান্য ১-২ শতাংশ মানুষই দৃশ্যত বিশাল। সেই বাংলা ভাষা যদি দুরূহ হয় তবে তার অর্থনৈতিক মূল্য আরও বেশি। এই অল্প ক’জন বাংলা নিয়ে ব্যবসা করে ভালোই আছেন। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ তো লেখাপড়া না করেই চালিয়ে যাচ্ছে পরাধীন প্রজার জীবন। তারা শাসক হতে পারবেন না। শাসক হওয়ার জন্য ইংরেজিকে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা ইংরেজি ভাষা তেমন রপ্ত করতে পারে না তাদের জন্য রয়েছে দুর্বোধ্য তৎসম শব্দবহুল বাংলা ভাষা, যা বিক্রি করে তারা জীবন ধারণ করেন। এখানেই বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। সবাই যদি বাংলা লিখতে পড়তে পারে তাহলে যে বাংলার দাম কমে যাবে। তাহলে আমরা কী বেচে খাবো?
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ, তেমনি হিন্দি ভাষার পণ্ডিতরা দাবি করেন যে, চর্যাপদ হিন্দি ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। তার অর্থ হিন্দি ও বাংলা ভাষার উৎস এক। ছাপাখানা আসার আগে উত্তর ভারতের সব ভাষার লিপি ছিল এক ব্রাহ্মী লিপিÑ কখগঘ; এমনকি থাই ভাষার লিপিও ছিল একই। হাতে লেখার পদ্ধতি বা উপকরণের কারণে হরফের চেহারা সামান্য ভিন্ন হতো। সেটাকেই, সেই ভিন্নতাকে ইংরেজ সাহেব ছেঁনিকাটা হরফ তৈরি করতে গিয়ে প্রত্যেকের জন্যই আলাদা হরফ তৈরি করে দিলেন। হয়ে গেল দেবনাগরি, অহমি, বাংলা, সিলেটি নাগরি, উড়িয়া থাই ইত্যাদি হরফ। সচেতনভাবে একতাকে বিচ্ছিন্ন করা হলো। অথচ ইউরোপে কত ভাষা অথচ লিপি একÑ এ বি সি ডি, গথিক, রোমান ও ইটালিক। তিন প্রকার হরফ তারা ব্যবহার করে পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে তুলেছে, যা আমাদের করতে দেয়া হয়নি। উত্তর ভারত থেকে থাইল্যান্ড অবধি ভাষাগুলোর লিপি ছিল ব্রাহ্মী লিপি। বিভিন্নজনের বিভিন্ন ধরনের হাতের লেখার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হতো। হরফগুলো ছিল মূলত ফোনেটিক। যে কারণে যার যা প্রয়োজন তারা তাদের ভাষায় সেই হরফ রেখে বাকিগুলো ঝেড়ে ফেলে দিলেন। আমাদের আধুনিক বাংলায় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এমন হরফ আমদানি করলেন, যা কেবল সংস্কৃত ভাষায় ব্যবহার হয়। ছোটবেলায় আদর্শলিপিতে একটি হরফ ছিল, যা দেখতে অনেকটা ৯-এর মতো। তাকে বলতাম ‘লি’। তার প্রকৃত উচ্চারণ আমরা জানতাম না। এখন আর সেই হরফ দেখি না।
বাংলা ভাষা একসময় প্রচুর আরবি ফার্সি পর্তুগিজ শব্দবহুল ভাষা ছিল। বাংলা ভাষা ছিল বাঙালি জাতির মতো বহু জাতির সংমিশ্রণ, একটি সহজ সরল উদার শব্দসমৃদ্ধ ভাষা। ভাব প্রকাশের জন্য যে শব্দ প্রয়োজন, সেই শব্দ গ্রহণের মতাসম্পন্ন ভাষা। সাধারণ মানুষের ভাষা। আলালের ঘরের দুলাল নাটকে তার পরিচয় মেলে। দেশীয় বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার। আধুনিক যুগের প্রারম্ভে কিছুসংখ্যক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এই বাংলা সাহিত্যের নামকরণ করলেন ‘মুসলমানি সাহিত্য’ বা ‘দোভাষী সাহিত্য’ এবং আধুনিক বিদ্যানিকেতন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল এসব সাহিত্যকে, যেমন দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল মুসলমান জ্ঞানী পণ্ডিত ও মুনশিদের। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে হারিয়ে গেল অসংখ্য মুসলমান জ্ঞানী মুনশি শিক মোদাররেস বাহরুল উলুম বা বিদ্যাসাগর। তারা নিছক জীবন রার জন্য পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের দুর্গম বিল অঞ্চলে।
অন্য দিকে ১৮০০ সালের জুলাই মাসে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের ভারতীয় ভাষায় শিতি করে তোলা। যেসব প্রধান এশীয় ভাষা এই প্রতিষ্ঠানে শিা দেয়া হতো; সেগুলো হলো আরবি, হিন্দুস্তানি, ফার্সি, সংস্কৃত ও বাংলা। কলেজের প্রতিটি বিভাগের শিকরা ছিলেন সে যুগের বিশিষ্ট হিন্দু পণ্ডিত বা ইংরেজ সাহেব। এই কলেজে কোনো একজন মুসলমানকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ভাবতে অবাক লাগে মাত্র ৫০ বছর আগে যে দেশের শাসন ছিল মুসলমানের কাছে, বেশির ভাগ আমলা, সভাসদ, রাজ কর্মচারী, বিচারক, শিক ইত্যাদি সবাই ছিলেন মুসলমান; সে েেত্র বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক কলেজের জন্য একজন মুসলমান পাওয়া গেল না! কারণ কী? আমাদের ইতিহাসবিদরা অভিযোগ করেন, মুসলমানরা ইংরেজি শিখত না। মুসলমানরা ইংরেজি শিখবে কী করে? বেশির ভাগ আলেম মুনশি পালিয়ে জীবন রা করতে গেছেন সুদূর পূর্ববঙ্গে নদ-নদী বিলের মধ্যে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা সবাই কিন্তু ইংরেজি জানতেন না। এই কলেজের পণ্ডিতরাই সাধু বাংলা গদ্যের স্রষ্টা। যে বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলতাম না। সেই গদ্য ভাষায় প্রথম আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্য রচিত হয়েছে। যে বাংলা ভাষায় কেউ কথা বলত না। মুসলমান আমলের বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকে স্বীকারই করা হয়নি। বিষয়টি চিন্তা ও গবেষণা করা দরকার। কলেজের ফার্সি বিভাগের প্রধান ছিলেন সরকারি ফার্সি অনুবাদক নেইল বি. এডমন্ডস্টোন। তার সহকারী শিক ছিলেন সদর দেওয়ানি আদালতের বিচারক জন এইচ হ্যারিংটন ও সেনা কূটনীতিবিদ ফ্রান্সিস গ্ল্যাডউইন। আরবি শিা দিতেন বিশিষ্ট আরবিবিদ লেফটেন্যান্ট জন বেইলি। দেশীয় ভাষা বিভাগের প্রধান ছিলেন বেসরকারি মিশনারি ও একাধিক ভারতীয় ভাষাবিদ উইলিয়াম কেরি। কলেজ কর্তৃপ শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনের কেরিকে এই বিভাগে নিয়োগ করেন। কেরি মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে হেড পণ্ডিত, রামমোহন বাচস্পতিকে সেকেন্ড পণ্ডিত ও রামরাম বসুকে অন্যতম সহকারী পণ্ডিতের পদে নিয়োগ করেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরাই সাধু বাংলা গদ্যের স্রষ্টা। সেই গদ্য ভাষায় প্রথম আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্য। প্রথম যুগ কেন? পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ভাষা ছিল সাধু। সবাই এই বাংলা ভাষায় গদ্য লিখতে পারতেন না। এই সাধু ভাষা সর্বসাধারণের জন্য ছিল না, ছিল স্বল্পসংখ্যক মানুষের জন্য।
জাতিভেদের আরেক রূপ, যার ব্যাপ্তি ঘটেছিল পলাশীর যুদ্ধের পর হিন্দু-মুসলমান সবার মধ্যে। সৃষ্টি হলো শ্রেণী বিভক্ত সমাজ। আমি বলছি না এর আগে সমাজ শ্রেণী বিভক্ত ছিল না, তা নয়। তবে কম ছিল। মোগল আমলে শিা ছিল সর্বজনীন। ইংরেজ আমলে আমাদের প্রথমে সম্পূর্ণ অশিতি করে তারপর নতুন করে আমাদের কিছু লোককে শিতি করা হচ্ছিল ইংরেজদের সেবা করার জন্য। ইংরেজি শিখে নতুন আশরাফ জাত সৃষ্টি করা হলো। কারণ, তারা আমাদের শাসন করার জন্য শিা ও সাহিত্য সবার জন্য হতে দেয়নি। অজান্তে তাদের সাহায্য করেছেন হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতসমাজ। কারণ তারা ভীষণ কৃতজ্ঞ ছিলেন ইংরেজদের প্রতি সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা ও বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য। বাংলা গদ্যের বিবর্তন অনেকাংশেই ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাতেই অগ্রসর হয়েছে। সাহিত্য তো জীবন বিমুখ হতে পারে না। তার বাহক বাংলা গদ্য জনবিচ্ছিন্ন থাকতে পারেনি তাই ইতোমধ্যে প্রমথ চৌধুরী পশ্চিম বাংলার কথ্যভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় নিয়ে এলেন। চালু হলো কথ্যভাষার ব্যবহার। কিন্তু এই ভাষাও যে পশ্চিম বাংলার কথ্যভাষা। পূর্ব বাংলার কথ্য ভাষা নয়।
পূর্ব বাংলার মানুষকে এই কথ্যভাষা নতুন করে শিখতে হয়। এ বিষয়ে আবুল মনসুর আহমদ কিছু মন্তব্য করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পূর্ব বাংলার কথ্যভাষা পশ্চিম বাংলার কথ্যভাষা থেকে কিছু ভিন্ন ধাঁচের হবেই। তার পরেও বাংলা গদ্যকে সাধারণের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য তাকে আমরা সংস্কৃত ব্যাকরণের নিগড়ে বেঁধে রাখলাম। আগেই বলেছি, বাংলা ভাষা সহজ সরল ও শব্দবহুল ভাষা। যে কোনো ভাষার শব্দ বাংলা আত্তীকরণ করে নিতে পারে। কিন্তু পণ্ডিতরা তা না করে সংস্কৃত ব্যাকরণ দিয়ে শব্দ তৈরি করে বাংলাকে দুর্বোধ্য করতে চেষ্টা করলেন নিজেদের মূল্যবান করে তোলার জন্য। তারাও ব্রাহ্মণদের মতো বিধান দিলেন, যাতে সংস্কৃত শব্দ বাংলা না হয়ে যায়। তাই সৃষ্টি হলো ণত্ব বিধান ও ষত্ব বিধান।

 


আরো সংবাদ