০৭ এপ্রিল ২০২০

সুস্থ থাকতে হাঁটুন

-

প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বলেছিলেন ‘মানুষের জন্য সর্বোত্তম ওষুধ হলো হাঁটা’। আসলেই তাই! এটি যেমন বাড়তি ওজন ঝরিয়ে সুন্দর গড়ন পেতে সাহায্য করে, তেমনি মানসিকভাবেও ভালো বোধ করায় ভূমিকা রাখে। হাঁটলে রাতে ভালো ঘুমও হয়। যার ফলে আপনার সৌন্দর্য অক্ষুণœ থাকে। যেহেতু হাঁটার জন্য কোনো ব্যায়ামের যন্ত্র বা প্রশিক্ষকের প্রয়োজন নেই, তাই জিমে ভর্তি না হয়েই একদম বিনা খরচে হাঁটার কাজটি করা সম্ভব। এ ছাড়াও সব ব্যায়ামের মধ্যে হাঁটাহাঁটি সবচেয়ে সহজ। এটিই একমাত্র ব্যায়াম যা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকেই করে ফেলা যায়, আলাদা করে সময় দিতে হয় না।
ঝকঝকে ত্বক পেতে প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট হাঁটা উচিত। এটি ত্বকে অনেকটা এন্টি-অক্সিডেন্টের মতো কাজ করে। বিভিন্ন সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ত্বক সুন্দর করা যায়, যা ত্বকের বাইরের আবরণে কাজ করে, ত্বকের ভেতরে পৌঁছায় না। কিন্তু হাঁটাহাঁটি করার সময় আমাদের হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস অক্সিজেন পাম্প করে রক্তে পৌঁছে দেয় যা সারা শরীরে পৌঁছায়, ত্বকে পৌঁছায় এবং শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়। এতে করে ত্বকের নানা সমস্যা দূর হয়। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও নিয়মিত হাঁটলে স্ট্রেচ মার্কস, ব্রণ ইত্যাদি দূর হয়।
ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেয় নিয়মিত হাঁটা। হাঁটাহাঁটি করার ফলে রক্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ত্বকে পৌঁছায়। ফলে ত্বক সুন্দর থাকে ও সহজে কুঁঁচকে যায় না। হাঁটার সময় ঘাম বের হয় যা বন্ধ হয়ে থাকা লোমকূপের মুখ খুলে দেয়, লোমকূপের গোড়ার ময়লা বের করে দেয় ও ত্বক পরিষ্কার করে। তাই ত্বক সুন্দর রাখতে হলে নিয়মিত হাঁটতে হবে।
যারা নিয়ম করে সপ্তাহে অন্তত ছয় দিন হাঁটেন, তাদের রাতে ঘুম ভালো হয়। কারণ হাঁটাহাঁটি মানুষের শরীরে মেলাটোনিন নামক হরমোনের প্রভাব বাড়ায়। এই মেলাটোনিন হচ্ছে ঘুমের হরমোন। এ ছাড়াও নিয়মিত হাঁটলে শরীরের নানা ধরনের ব্যথা দূর হয় যা ভালো ঘুম হওয়ার আরেকটি কারণ। ঘুমের মাঝে ত্বকে নতুন কোষের জন্ম হয়, কোলাজেন, ইলাস্টিন ইত্যাদি তৈরি হয়। ভালো ঘুম হলে তা অবশ্যই ত্বকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, ফলে চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটা নার্ভাস সিস্টেমকে ভালো রাখে। ফলে রাগ ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে থাকে। হাঁটার সময় মস্তিষ্ক ‘হ্যাপি হরমোন’ নিঃসরণ ঘটায়, যার কারণে মন ভালো থাকে। তা ছাড়া হাঁটাহাঁটির সময় প্রতিবেশীদের অনেকের সাথে দেখা ও কথা হয়, যা মানসিকভাবে ভালো বোধ করার আরেকটি কারণ। আর মন ভালো থাকলে চেহারায় সেই সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
নিয়মিত হাঁটলে অনেক ক্যালোরি ক্ষয় হয়, যার ফলে ওজন কমে। হাঁটা শুরু করার এক মাসের মধ্যেই দেখবেন পরনের কাপড়গুলো ঢিলেঢালা মনে হতে থাকবে। হাঁটার কারণে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়া কৃদ্ধি পায়, যা পেটের মেদ কমাতে সাহায্য করে। এতে করে শরীর সুন্দর আকার ফিরে পায়। প্রতিদিন মাত্র এক কিলোমিটার হাঁটলেই এক মাসে ২ শতাংশ বডিফ্যাট কমানো সম্ভব।
নিয়মিত হাঁটলে রক্তে সুগার বা চিনির অনুপাত কমে আসে, অর্থাৎ ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি কমে আসে। তা ছাড়া নিয়মিত হাঁটা রক্তচাপ কমে যা ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁঁকি কমায়। এ ছাড়াও হৃদরোগের ঝুঁঁকি কমাতেও হাঁটাহাঁটির গুরুত্ব অপরিসীম। যারা নিয়মিত হাঁটেন তাদের তুলনায় যারা নিয়মিত হাঁটেন না, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। হার্ভার্ড পাবলিশিং আউটলাইন অনুযায়ী বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র ৮.৮ কিলোমিটার হাঁটলেই হৃদরোগের আশঙ্কা ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায় এবং হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁঁকি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তিরা বেশ ধীরগতিতে হেঁটেই এই ফলাফল অর্জন করে ফেলেছেন। তাদের গতি ছিল ৩.২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।
প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট অথবা সপ্তাহে অন্তত ১ ঘণ্টা হাঁটলে হাড়ের সন্ধিস্থল বা জয়েন্টের ব্যথা উপশম হয়, এমনকি আথ্রাইটিসের মতো রোগ প্রতিরোধ করা যায়। হাঁটাহাঁটির ফলে রক্তসঞ্চালন ভালো হয়, ব্যথার স্থানে রক্ত ভালোভাবে পৌঁছায় এবং সন্ধির আশপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে।
হাঁটাহাঁটি মানুষের আয়ু বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। আমেরিকান জেরিয়াট্রিকস সোসাইটির একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা শারীরিক পরিশ্রম বেশি করেন তারা দীর্ঘদিন বাঁচেন। যারা যৌবনেই হাঁটাহাঁটির অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাদের বিভিন্ন রোগ যেমনÑ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ফলে তাদের দীর্ঘজীবন লাভের পথ সুগম হয়।
হাঁটার সঠিক উপায়
হাঁটার সময় মাথা সোজা থাকবে। নিচের দিকে নয়, বরং সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হবে।
ঘাড়, পিঠ ও কাঁধ স্বাভাবিক রাখতে হবে, শক্ত করে রাখা যাবে না।
দুই হাত স্বাভাবিক রাখতে হবে। হাঁটার সাথে সাথে হাত হালকাভাবে বা জোরে দুলবে। কনুই সামান্য বাঁকা থাকবে।
পেটের পেশি হালকাভাবে একটু শক্ত করে রাখতে হবে। পিঠ যেন কুঁজো হয়ে না থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
হাঁটার গতি আপনার পছন্দমতো হবে। ইচ্ছে হলে আস্তে হাঁটবেন, ইচ্ছে হলে জোরেÑ পুরোটাই আপনার ইচ্ছে ও শারীরিক সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে। তবে মনে রাখবেন, বেশি জোরে হাঁটলে বেশি ভালো ফল পাওয়া যায়, আস্তে হাঁটলেও ভালো ফল পাওয়া যাবে তবে একটু সময় লাগবে।
প্রতিদিন যদি ৩০ মিনিট হাঁটেন তাহলে এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে পারেনÑ প্রথম ৩ মিনিট ওয়ার্মআপ করুন। তারপর ১ মিনিট জোরে ও ১ মিনিট ধীরে এভাবে করে ২৫ মিনিট হাঁটুন। শেষের ২ মিনিট বিশ্রাম নিন।
হাঁটা শুরুর আগে
হাঁটা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন? যদি আপনার কোনো শারীরিক সমস্যা যেমনÑ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি থেকে থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তবেই হাঁটা শুরু করুন।
প্রথমেই একজোড়া উপযুক্ত ও আরামদায়ক জুতা কিনে নিন হাঁটার জন্য। এ ছাড়াও হাঁটার জন্য উপযুক্ত রাস্তা বা মাঠ খুঁজে বের করুন যেখানে গর্ত নেই, হাঁটার জায়গা সমতল। রাস্তায় হাঁটলে এমন রাস্তায় হাঁটুন যাতে গাড়িঘোড়া কম।
হাঁটার শুরুতে ওয়ার্মআপ করে নিতে ভুলবেন না।
বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। প্রথম দিন থেকেই ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা করে হাঁটা সম্ভব নাও হতে পারে। বা প্রথম দিনই এত বেশি হাঁটার ফলে পরে হাঁটার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই প্রথম সপ্তাহে ১০ মিনিট করে হাঁটবেন, পরের সপ্তাহে ১৫ মিনিট। এভাবে আস্তে আস্তে বাড়ান যতদিন না আপনার লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছেন।
একটি চার্ট তৈরি করুন, যাতে আপনি লিখে রাখতে পারবেন প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটলেন এবং প্রতি মাসে কতটুকু ওজন কমল। হাঁটার জন্য একজন সঙ্গী পাওয়া গেলে হাঁটতে বেশি ভালো লাগবে এবং একে অন্যকে প্রেরণা জোগাতে পারবেন। আপনার প্রতিবেশী বা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি আপনার সাথে হাঁটতে রাজি কি না। দুইজন গল্প করতে করতে হাঁটলে খুব সুন্দর সময় কাটবে।
একা হাঁটলে পর্যাপ্ত আলো আছে ও নিরাপদ, এমন পথে হাঁটবেন। পরিবারের সবাইকে জানিয়ে রাখবেন, আপনি ঠিক কোন পথে হাঁটেন এবং সবসময় সেই পথেই হাঁটবেন। এতে করে আপনার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে।

নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটার আরো ১০টি উপকারিতা

ষ যারা প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটেন তাদের সর্দিকাশি হওয়ার প্রবণতা কম হয়।
ষ হাঁটলে শরীরের প্রায় সব পেশির নড়াচড়া হয় এবং ব্রেইনের টিস্যুতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছাতে সাহায্য করে।
ষ উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমাতে হাঁটুন। হাঁটার সময় শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার প্রক্রিয়াটি খুব ভালোভাবে হয় যা মন থেকে সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে সাহায্য করে। হাঁটার সময় শরীর মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠায় যেন সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা মস্তিষ্ক থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়া হয়।
ষ নিয়মিত হাঁটা পেশিক্ষয় রোধ করে যা মধ্যবয়সীদের জন্য খুব উপকারী।
ষ নিয়মিত হাঁটলে শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমে, ডায়াবেটিসের ঝুঁঁকি কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ষ মেদবিহীন পেট ও কোমর পেতে হলে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটুন। সুন্দর উরু ও পা পেতে হলেও এর জুড়ি নেই।
ষ প্রতিদিন হাঁটলে গায়ে রোদ লাগে, ফলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি পায়। আর এই ভিটামিন ডি হার্টের নানা অসুখের ঝুঁকি কমায়।
ষ নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়।
ষ নিয়মিত হাঁটলে শরীরে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এতে করে হাড় মজবুত হয়।
ষ সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত হাঁটেন তারা ব্রেস্ট ক্যান্সারের মতো রোগ হলেও দ্রুত সেরে উঠতে পারেন।

 


আরো সংবাদ

দীর্ঘদিন জেলখাটা আসামিদের মুক্তির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর (২৭৯১৩)করোনা ছড়ানোয় চীনকে যে ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়ার দাবি উঠল জাতিসংঘে (১৭৬৭৩)গাদ্দাফিকে উৎখাতকারী জিবরিলের করোনায় মৃত্যু (১৫৭৯০)রমজান মাসে অফিসের সময়সূচি নির্ধারণ (১৪৩১৪)উকুন মারার ওষুধে ৪৮ ঘণ্টায় খতম করোনা (১৩৯১৮)করোনায় মৃতদের জানাজা-দাফনে প্রস্তুত এক ঝাঁক আলেম (১২৯১২)এবার করোনায় আক্রান্ত বাঘ (১০৬৬১)৩ ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়েছেন ২ দিন, খরচ হয়েছে ৪ হাজার টাকা! (১০৫১৮)'মেয়েকে কোলেও নিতে পারছি না!' দূর থেকে ভেজা চোখে তাকিয়ে পুলিশ অফিসার (১০০৭২)করোনার চিকিৎসায় তুরস্কের অভূতপূর্ব পদক্ষেপ, পাল্টে যাচ্ছে চিকিৎসা পদ্ধতি (৯৭০৬)