০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

লেনদেন সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক বিধিমালা

লেনদেন সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক বিধিমালা - ছবি : সংগৃহীত

ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণকর পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মানুষকে অভাব, দারিদ্রতা, বৈষম্য ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে। ইসলাম নির্দেশিত লেনদেন ব্যবস্থা মানুএষর মাঝে ভাসাম্য ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের সৃষ্ট অর্থব্যবস্থার দুর্বিষহ অভিশাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য ইসলাম প্রবর্তিত লেনদেন পদ্ধতি মানুষের জন্য অধিকতর কল্যাণকর।

রাসূল সা: সমাজে সুদি কার্যকলাপকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে সাদাকা বা দান-খয়রাত করার প্রতি তাকিদ দিয়েছেন। কিন্তু সমাজের সব মানুষ দান-সাদাকাহ করার সামর্থ্য রাখে না, আবার সব লোক দান-সাদাকাহ নিতে পছন্দও করেন না। ফলে অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য মানুষের মাঝে ধার-কর্জ বা ঋণ আদান-প্রদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ সা: ধারকর্জ বা ঋণদান অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

হযরত ইবনু মাসঊদ রা: হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঋণই সাদকাহ।’ [বায়হাকী] অপর এক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘কোনো মুসলিম অপর কোনো মুসলিমকে দু’বার ঋণ দিলে সে একবার সাদকাহ করার সওয়াব পাবে।’ [ইবনে মাযাহ]

কর্জ বা ঋণ যেহেতু মানব জীবনের অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়, তাই সঠিক নিয়মে লেনদেন পদ্ধতি গ্রহন না করলে তা কলহ-বিবাদের কারণও হতে পারে। আল্লাহ তা‘য়ালা রাসূল সা:-এর মারফতে আল-কুরআন ও আল-হাদীসে ঋণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন বা বিধিমালা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।

আল-কুরআনের সূরা আল-বাকারার ৩৮ রুকুতে ‘আয়াতুদ দাইন’ বা ঋণ সংক্রান্ত একটি আয়াত রয়েছে। এটি আল-কুরআনের সবচেয়ে বড় আয়াত। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা এ আয়াতে কারীমায় বলেন,
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখ। আর তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেয়। আল্লাহ যাকে লেখাপড়ার যোগ্যতা দিয়েছেন, সে লিখতে অস্বীকার করবে না। সুতরাং সে যেন লিখে দেয়। লেখার বিষয়বস্তু বলে দেবে সেই ব্যক্তি যে ঋণের বহনকারী (অথাৎ ঋণ গ্রহীতা)। আর সে যেন তার রব আল্লাাহকে ভয় করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কমবেশি না করে। তবে ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু না বলে দিতে পারে, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায় সঙ্গতার সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়। অতঃপর (লেনদেনের সময়) যাদের প্রতি তোমরা রাযি থাক এমন পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন স্বাক্ষী রাখো। আর যদি দু’জন পুরুষ না থাকে, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী স্বাক্ষী হিসেবে তোমরা পছন্দ করো। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন যেন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। স্বাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। আর (লেনদেন) তা ছোট হোক কিংবা বড় হোক তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। এটি আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। তবে তোমরা পরস্পর যে ব্যবসায় নগদ লেনদেন কর, তা না লিখলে তোমাদের কোনো দোষ নেই। আর তোমরা স্বাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচাকেনা করবে এবং কোনো লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের জন্য অনাচার। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখো আল্লাহ তোমাদেরকে (কর্মপদ্ধতি) শিক্ষা দিচ্ছেন। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ [সূরা আল-বাকারা: ২৮২]

আলোচ্য আয়াতে কারিমাটি আল্লাহ তা‘য়ালা নাযিল করেছিলেন প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। ওই সময়ে আরবদের কাছে আজকের মতো সহজলভ্য কাগজ ছিল না। তখন মানুষ লিখত পাতা, চামড়া বা হাড়ের উপরে। পড়ালেখা জানত হাতেগোনা কয়েকজন। সেই অবস্থায়ও আল্লাহ তা‘য়ালা ঋণের ব্যাপারে লিখতে বলেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায় লিখিত চুক্তি করা কতটা জরুরি। ঋণ নিয়ে মানুষের মধ্যে হাজারো সমস্যা হয় এজন্যই আল্লাহ তা‘য়ালা স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তি করার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। কিন্তু মুসলিম সমাজ নামাজ, রোজা, যাকাতকে ফরজ জেনে যেভাবে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে, স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তির ব্যাপারটা ফরজ হওয়ার পরেও তেমন গুরুত্ব দেন না।

আলোচ্য আয়াতে কারিমাটি হচ্ছে লেনদেন বা ঋণের উপর একটি আইন সঙ্কলন। এ আয়াতে কারিমায় লেনদেন সম্পর্কিত আইনের জরুরি মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে যাকে চুক্তিনামাও বলা যেতে পারে। এরপর স্বাক্ষ্য-বিধির বিশেষ ধারা উল্লেখিত হয়েছে। [মাআরেফুল কুরআন] এ আয়াতে কারিমায় লেনদেন সম্পর্কিত মৌলিক বিধিমালা জারি করা হয়েছে।

প্রথম বিধি- লেনদেনে সময় নির্দিষ্ট করা ও লিপিবদ্ধ করা : লেনদেনে সময় চুক্তি লিপিবদ্ধ করার নির্দেশনা বা লেনদেন সংক্রান্ত প্রথম মূলনীতি বা আইনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নাম্বার আয়াতে প্রথমে বলেন, ‘হে ঈমানগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখ।’

আজকাল লেখালেখির যুগ, লেখাই মুখের কথার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অতীতে দুনিয়ার সব কাজ-কারবার ও ব্যবসা-বাণিজ্য মুখে মুখেই চলত। লেখালেখি এবং দলীল-দস্তাবেজের প্রথা প্রচলন ছিল না। সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিম এদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]

এখানে প্রথম নির্দেশ এই যে, ধার-কর্জের লেনদেনে দলীল-দস্তাবেজ লিপিবদ্ধ করা উচিত, যাতে ভুল-ভ্রান্তি অথবা কোনো পক্ষ থেকে অস্বীকৃতির কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তখন কাজে লাগে। দ্বিতীয় নির্দেশ হলো ধার-কর্জের ব্যাপারে মেয়াদ বা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধার-কর্জের লেনদেন বৈধ নয়। এতে কলহ-বিবাদের দ্বার উন্মুক্ত হয়।

এ কারণেই ফিকাহবীদগণ বলেছেন, মেয়াদও এমন নির্দিষ্ট করতে হবে, যাতে কোনোরূপ অস্পষ্টতা না থাকে। মাস এবং দিন তারিখসহ নির্দিষ্ট করতে হবে। কোনোরূপ অস্পষ্ট মেয়াদ, যেমন ‘ধান কাটার সময়’ এরূপ নির্ধাতির করা যাবে না। কেননা, আবহাওয়ার পরিবর্তনে ধান কাটার সময় আগে-পিছে হয়ে যেতে পারে। [মাআরিফুল কুরআন]

এখান থেকে এ বিধান পাওয়া যায় যে, ঋণের ব্যাপারে সময়সীমা নির্ধারিত হওয়া উচিত। সাধারণত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ঋণের লেনদেনের ব্যাপারে দলীল বা প্রমাণপত্র লেখাকে এবং স্বাক্ষী রাখাকে দূষণীয় ও আস্থাহীনতার প্রকাশ মনে করা হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর বাণী হচ্ছে এই যে, ঋণ ও ব্যবসায় সংক্রান্ত লেনদেনের চুক্তি স্বাক্ষ্য-প্রমাণাদিসহ লিখিত আকারে সম্পাদিত হওয়া উচিত। এর ফলে লোকদের মধ্যে লেনদেন পরিস্কার থাকবে। [তাফহীমূল কুরআন]

আয়াতে কারীমার প্রথমে বলা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট মেয়াদ শর্তে যখন ঋণ দেয়া হয়, তখন তা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে লিখিত চুক্তি করে রাখতে হবে। এটা মুসলিমদের জন্য ফরজ বা ওয়াজিব। লিখিত চুক্তি করার এই নির্দেশ ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক ঋণ উভয়ের জন্য। কত দেয়া হচ্ছে, কবে ফেরত দেয়া হবে, কে নিচ্ছে, কে দিচ্ছে, ঋণের অর্থ একবারেই ফেরত দেয়া হবে নাকি কিস্তিতে ফেরত দেয়া হবে। কিস্তিগুলো কত হবে এ সবকিছু লিখিত চুক্তি করতে হবে, যেন পরে এই ব্যাপারে কোনো ধরনের মতবিরোধের সুযোগ না হয়।

অনেক সময় আমাদের মনে হয়, ‘সম্মানিত মানুষ, কিভাবে আমি তাকে লিখিত চুক্তি করতে বলি? তিনি কী মনে করেন?’ অথবা, ‘গরীব মানুষ, পড়ালেখা জানে না। বেচারা বিপদে পড়ে আমার কাছে ধার চাইতে এসেছে। তাকে লিখিত চুক্তি করতে বলি কিভাবে? লোকটা দুঃখ পাবে।’

আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদের এভাবে ভাবতে নিষেধ করেছেন। বরং তিনি আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন। ঋণ যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিত্তিতে হয়, তাহলে তা ছোট-বড় যা-ই হোক, লিখে রাখার ব্যাপারে অবহেলা করা যাবে না। কারণ, আল্লাহর কাছে এটা বেশি সুবিচারপূর্ণ, প্রমাণ হিসেবে বেশি নির্ভরযোগ্য এবং এতে সন্দেহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

দ্বিতীয় বিধি- দলিল বা চুক্তি লেখকের মাধ্যমে লিখে নেয়া : লেনদেনের সময় দলিল বা চুক্তি লেখকের মাধ্যমে লিখে নিতে হবে। লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখকের করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের পরের অংশে বলেন: ‘আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে দেয়। আল্লাহ যাকে লেখাপড়ার যোগ্যতা দিয়েছেন, সে লিখতে অস্বীকার করবে না।’

এ আয়াতে কারিমায় বলা হয়েছে, আর তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। সেইরূপ লিখতে কোনো লেখক যেন অস্বীকার না করে। আয়াতের এই অংশটি অদ্ভুত। চুক্তি লেখক যে লিখতে পারে, সে যে শিক্ষিত মানুষ হয়েছে, তার কৃতিত্ব আল্লাহ তা‘য়ালা নিচ্ছেন। এখানে তিনি আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, আমরা যে আজকে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হয়েছি, ২৫ বছর ধরে পড়াশুনা করে আইনজীবী হয়েছি, তার কৃতিত্ব আল্লাহর তা‘য়ালার। তিনি ব্যবস্থা করে না দিলে আজকে আমরা শিক্ষিত হতাম না। ইসলামি দায়িত্ব পালন করার সময় আমরা যেন এই কথা সব সময় মনে রাখি। আজকে আমরা যেই যোগ্যতার বড়াই করি, যেই ডিগ্রি, সার্টিফিকেট পেয়েছি, সেটা শুধু আমাদের নিজেদের অর্জন নয়, আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় রেখেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে।

কেউ আমাদেরকে ঋণের চুক্তি লিখে দেয়ার অনুরোধ করলে, তাকে ‘অন্যের কাছে যান, আমি এইসব ছোটখাটো কাজ করি না। আমি একজন ব্যারিস্টার!’ বলে তাড়িয়ে দেয়ার আগে যেন মনে রাখি যে, আমার যোগ্যতা আল্লাহর তা‘য়ালার অনুগ্রহের ফল। তিনি চাইলে আমাকে যে কোনো সময় পথে বসিয়ে দিতে পারেন। এটা জরুরি যে, তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখবে। এতে একদিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, লেখক কোনো এক পক্ষের লোক হতে পারবে না; বরং নিরপেক্ষ হতে হবে। যাতে কারো মনে সন্দেহ-সংশয় না থাকে।

অপরদিকে লেখককে ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যের ক্ষণস্থায়ী উপকার করে নিজের চিরস্থায়ী ক্ষতি করা তার পক্ষে উচিত হবে না। এরপর লেখককে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘য়ালা তাকে এ লেখার বিদ্যা দান করেছেন। এর কৃতজ্ঞতা এই যে, সে লিখতে অস্বীকার করবে না। [মাআরেফুল কুরআন]

তৃতীয় বিধি- ঋণ গ্রহীতার মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা : লেনদেনের সময় ঋণ গ্রহীতার মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় ঋণ গ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের পরের অংশে বলেন, ‘সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং লেখার বিষয়বস্তু বলে দেবে সেই ব্যক্তি যার উপর ঋণ চাপছে (অথাৎ ঋণ গ্রহীতা)। আর সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কম না দেয়।’

এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, অতএব তার লিখে দেয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কমবেশি না করে। এখানে ঋণগ্রহীতাকে বুঝানো হয়েছে, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং টাকার যেন সঠিক পরিমাণ লেখায়, কম করে যেন না লেখায়। অথাৎ, চুক্তি লেখার সময় সব শর্ত বলবে ঋণ গ্রহীতা, ঋণ দাতা নয়। [তাফসীরে উসমানী]

চতুর্থ বিধি- ঋণ গ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা : ঋণ গ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে দলিল বা চুক্তি লেখা সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আয়াতে কারিমার পরের অংশে বলেন: ‘কিন্তু ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু না বলে দিতে পারে, তাহলে তার অভিভাবক যেন ইনসাফের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।’

লেনদেনের ব্যাপারে দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ বা অক্ষম, বৃদ্ধ, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক, মুক অথবা অন্য ভাষাভাষী হতে পারে। এ কারণে দলিলের বিষয়বস্তু বলে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার পক্ষ থেকে তার কোনো অভিভাবক চুক্তি লেখাবে। যেমন পাগল ও নাবালেগের সব কাজ-কারবার অভিভাবক দ্বারাই সম্পন্ন হয়। মুক ও অন্য ভাষাভাষীর অভিভাবকও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যদি তারা কাউকে উকিল নিযুক্ত করে, তাতেও চলবে। এখানে কুরআনুল কারীমের ‘ওলী’ শব্দটি উভয় অর্থই বোঝায়।

এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]

পঞ্চম বিধি- লেনদেনের সময় দু’জন বিশ্বস্ত স্বাক্ষী রাখা : লেনদেনের সময় দু‘জন বিশ্বস্ত স্বাক্ষী রাখতে হবে। লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় ঋণদাতা ও গ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের পরের অংশে আরো বলেন, ‘অতঃপর (লেনদেনের সময়) তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন স্বাক্ষী রাখ। আর যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী স্বাক্ষী হিসেবে তোমরা পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।’

এ আয়াতে কারিমায় বলা হয়েছে, আর তোমাদের মধ্যে দু’জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) স্বাক্ষী কর। যদি দু’জন পুরুষ না পাও, তাহলে স্বাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ করো তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে স্বাক্ষী করো। যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। [তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ]

ফিকাহবিদগণ বলেছেন যে, শুধু লেখা শরিয়তসম্মত প্রমাণ নয়, তাই লেখার সমর্থনে শরিয়তসম্মত স্বাক্ষ্য না থাকলে শুধু লেখার উপর ভিত্তি করে ফায়সালা করা যায় না। বর্তমানে সাধারণ আদালতসমূহেও এ রীতিই প্রচলিত রয়েছে। লেখার মৌখিক সত্যায়ন ও তৎসমর্থনে স্বাক্ষ্য ব্যতীত কোনো ফয়সালা করা হয় না।

আয়াতে এরপর সাক্ষ্য-বিধির কতিপয় জরুরী নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। (ক) সাক্ষী দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা হওয়া জরুরি। একা একজন পুরুষ অথবা শুধু দু’জন মহিলা সাধারণ লেনদেনের সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। (খ) স্বাক্ষী মুসলিম হতে হবে। (গ) স্বাক্ষী নির্ভরযোগ্য আদিল বা বিশ্বস্ত হতে হবে, যার কথার উপর আস্থা রাখা যায়। ফাসেক ও ফাজের (অর্থাৎ পাপাচারী) হলে চলবে না। যেখানে স্বাক্ষী রাখা ইচ্ছাধীন সেখানে মুসলমানরা কেবলমাত্র মুসলমানদেরকে স্বাক্ষী বানাবে। তবে অমুসলিমদের স্বাক্ষী অমুসলিমরা হতে পারে। যে কোনো ব্যক্তি স্বাক্ষী হওয়ার যোগ্য নয়। বরং এমন সব লোককে স্বাক্ষী করতে হবে যারা নিজেদের নৈতিক চরিত্র ও বিশ্বস্ততার কারণে সাধারণভাবে লোকদের মধ্যে নির্ভরশীল বলে বিবেচিত হতে হবে। [তাফহীমূল কুরআন]

ষষ্ঠ বিধি- লেনদেনে স্বাক্ষ্যদানের ব্যাপারে সাক্ষীর বিরক্ত না হওয়া : লেনদেনে স্বাক্ষ্যদানের ব্যাপারে স্বাক্ষীর বিরক্ত হওয়া যাবে না। লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় স্বাক্ষীর করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের পরের অংশে বলেন, ‘স্বাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। আর (লেনদেন) তা ছোট হোক কিংবা বড় হোক তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। এটি আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর।’

এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, আর যখন স্বাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়, তখন যেন স্বাক্ষীরা অস্বীকার না করে। ঋণ ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনোরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। [তাফসীরে ইবনে কাছীর]

আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যখন কোনো ব্যাপারে কাউকে স্বাক্ষী করার জন্য ডাকা হয়, তখন সে যেন আসতে অস্বীকার না করে। কেননা, স্বাক্ষ্যই হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার এবং বিবাদ মেটানোর উপায় ও পন্থা। কাজেই একে জরুরি জাতীয় কাজ মনে করে কষ্ট স্বীকার করবে।

এরপর আবার লেনদেনের দলিল লিপিবদ্ধ করার উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, লেনদেন ছোট কিংবা বড় হোক সবই লিপিবদ্ধ করা দরকার। এ ব্যাপার বিরক্তিবোধ করা উচিত নয়। কেননা, লেনদেন লিপিবদ্ধ করা সত্য প্রতিষ্ঠিত রাখতে, নির্ভুল স্বাক্ষ্য দিতে এবং সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে চমৎকাররূপে সহযোগিতা করে। যদি নগদ লেনদেন হয়। বাকিতে না হয়, তবে তা লিপিবদ্ধ না করলেও ক্ষতি নেই। তবে এ ব্যাপারেও কমপক্ষে স্বাক্ষী রাখা বাঞ্ছনীয়। কেননা, উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সময় মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। যেমন বিক্রেতা মূল্যপ্রাপ্তি অস্বীকার করতে পারে কিংবা ক্রেতা বলতে পারে যে, সে ক্রীতবস্তু বুঝে পায়নি। এ মতবিরোধ মিমাংসার ক্ষেত্রে স্বাক্ষ্য কাজে লাগবে। [মা‘আরিফুল কুরআন]

সপ্তম বিধি- ইচ্ছা হলে নগদ লেনদেনে না লিখে রাখা : নগদ লেনদেনে না লিখে রাখলেও অসুবিধা নেই। নগদ লেনদেনের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের পরের অংশে বলেন, ‘তবে তোমরা পরস্পর যে ব্যবসায় নগদ লেনদেন কর, তা না লিখলে তোমাদের কোনো দোষ নেই।’

এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোনো দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর, তখন স্বাক্ষী রাখ।[তাফসীরে আহসানুল বায়ান] এর অর্থ হচ্ছে, যদিও নিত্যদিনের কেনাবেচার ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়টি লিখিত থাকা ভালো, যেমন আজকাল ক্যাশ মেমো লেখার পদ্ধিত প্রচলিত আছে, তবুও এমনটি করা অপরিহার্য নয়। অনুরূপভাবে প্রতিবেশী ব্যসায়ীরা পরস্পরের মধ্যে রাত দিন যেসব লেনদেন করতে থাকে, সেগুলোও লিখিত আকারে না থাকলে কোনো ক্ষতি নেই। [তাফহীমূল কুরআন]

অষ্টম বিধি- ঋণ চুক্তির লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা : ঋণ চুক্তির লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। লেনদেনের ব্যাপারে দলিল বা চুক্তি লেখার সময় লেখক বা স্বাক্ষীর সাথে দাতা ও গ্রহীতার করণীয় সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের শেষ অংশে বলেন, ‘আর তোমরা স্বাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচাকেনা করবে এবং কোনো লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’

আয়াতের শুরুতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন লিখতে ও স্বাক্ষী দিতে অস্বীকার না করে। এমতাবস্থায় তাদেরকে হয়ত মানুষ বিরক্ত করে তুলতে পারত। তাই আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, কোনো লেখক বা স্বাক্ষীকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়। নিজের উপকারের জন্য যেন তাদের বিব্রত না করা হয়।

এরপর বলা হয়েছে, তোমরা যদি লেখক বা স্বাক্ষীকে বিব্রত কর, তবে এতে তোমাদের গোনাহ হবে। এজন্য লেখক কিংবা স্বাক্ষীকে বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হারাম। এ কারণেই ফকীহগণের মতে, লেখক লেখার পারিশ্রমিক দাবি করে কিংবা স্বাক্ষী যাতায়াত খরচ চায়, তবে এটা তাদের নায্য অধিকার। তা না দেয়াও তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিব্রত করার শামিল। ইসলাম বিচার ব্যবস্থায় স্বাক্ষীকে স্বাক্ষ্যদানে বাধ্য করেছে এবং স্বাক্ষ্য গোপন করাকে কঠোর অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। [তাফসীরে জাকারিয়া]

সমাপনী : মেয়াদ ও সময় নির্দিষ্ট করে ব্যবসা বা যে কোনো লেনদেনে চুক্তিপত্র বা দলিলে লিপিবদ্ধ করা উচিত, যাতে ভুল-ভ্রান্তি অথবা কোনো পক্ষ থেকে অস্বীকৃতির কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ বা ধার-কর্জের লেনদেন বৈধ নয়। চুক্তি লেখার সময় কোনো দলিল লেখক যেন আল্লাহ যেরূপ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন তার বিবেক অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখে দেয় এবং সে লিখতে যেন অস্বীকার না করে।

চুক্তি লেখার সময় সব শর্ত বলে দেবে ঋণ গ্রহীতা, ঋণ দাতা নয়। দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ হলে তার পক্ষ থেকে তার কোনো অভিভাবক সব শর্ত লিখে দিবে। আর লেনদেনের চুক্তির সময় অবশ্যই স্বাক্ষী রাখতে হবে। ইসলামে স্বাক্ষ্য-বিধির জরুরি নীতি হলো স্বাক্ষী দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা হতে হবে, স্বাক্ষী নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বস্ত হতে হবে। লেনদেনের ব্যাপারে যখন কাউকে স্বাক্ষী করার জন্য ডাকা হয়, তখন কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তবে পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান করা হয, তা না লিখলেও কোনো দোষ নেই।

লেনদেনের ব্যাপারে কোনো লেখক বা স্বাক্ষীতে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, কেননা এটি বড় ধরনের অপরাধ। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এ আয়াতে কারিমায় লেনদেন সম্পর্কিত যে মৌলিক বিধিমালা জারি করা হয়েছে তা মেনে চলার এবং রাসূল সা: প্রদর্শিত ন্যায়সঙ্গত পন্থায় লেনদেন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।

ই-মেইল: drmidris78@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement

সকল