২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

হেদায়েত বান্দার প্রতি রবের বিরাট অনুগ্রহ

হেদায়েত বান্দার প্রতি রবের বিরাট অনুগ্রহ - ছবি : সংগৃহীত

হেদায়েত মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। যে হেদায়েত পেয়েছে সে জান্নাত পেয়েছে। হেদায়েতের মূলমন্ত্র হলো কালিমায়ে তাইয়িবার মর্মের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা। মহানবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মনেপ্রাণে, বিশ্বাসের সাথে কালেমা পাঠ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (ইবনে হিব্বান)

সুতরাং দুনিয়া ও আখেরাতের চূড়ান্ত সফলতা হেদায়েতপ্রাপ্তির ওপর নির্ভরশীল। কেননা, যে হেদায়েদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কুফরিকে গ্রহণ করল সে জাহান্নামকে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নিলো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কাফেরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নেয়া হবে।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ৭১) পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, সেখানে চিরকাল অবস্থানের জন্য। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল।’
কিন্তু কাঙ্ক্ষিত এ হেদায়েত ও সফলতা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে মানুষের কোনো দখল এবং হাত নেই; বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হেদায়েত দান করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যাকে ভালোবেসেছেন তাকে হেদায়াত করতে পারবেন না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৫৬) বিষয়টি বুঝতে কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হলো-

হজরত নুহ আ.-এর পুত্রের কুফরি

হজরত নুহ আ.-কে দ্বিতীয় আদম বলা হয়। পবিত্র কোরআনে অন্তত ৪৩ বার তাঁর কথা উল্লেখিত হয়েছে। পাপে নিমজ্জিত এক জাতিকে হেদায়েতের পথ দেখাতে আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করেন। দীর্ঘ সাড়ে ৯০০ বছর নিজ জাতিকে দাওয়াত দেন। তবে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে হেদায়েতের আলোতে প্রবেশ করে, বাকিরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে-এদের মধ্যে ছিল তাঁর স্ত্রী ও এক পুত্রও। হজরত নুহ আ. গোটা জীবন মানুষের হেদায়েতের পিছনে ছুটলেন। কিন্তু আপন পরিবারই হেদায়েত পেল না। পব্ত্রি কোরআনে তাঁর এ ঘটনা বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ যখন তাঁর জাতিকে প্রলংকারী এক বন্যার পরীক্ষা দিয়ে তাঁকে একটি নৌযানে আরোহণের আদেশ দিলেন তখনো তাঁর স্ত্রী-পুত্র তাকে উপেক্ষা করল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বললাম, আপনি তাতে প্রত্যেক যুগল হতে দুটি করে তুলে নিন। (তুলে নিন) যাদের প্রতি আগে ভাগেই শাস্তির কথা নিশ্চিত হয়ে গেছে তাদের বাদে আপনার পরিবারের সদস্যদেরকে এবং (তুলে নিন) তাদের, যারা ঈমান এনেছে। অবশ্য তাঁর সাথে মাত্র স্বল্প সংখ্যক লোক ঈমান এনেছিল’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৪০) বন্যা শুরু হলো কিন্তু তাঁর ওই কাফের পুত্র ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো, তখন তিনি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করেন, ‘নুহ তাঁর প্রতিপালককে ডেকে বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র তো আমার পরিবারভুক্ত। আর আপনার প্রতিশ্রুতিও নিশ্চয়ই সত্য। আপনি শ্রেষ্ঠতম বিচারকও। তিনি বললেন, ‘হে নুহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, সে অসৎ কর্মপরায়ণ’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৪৫, ৪৬) এভাবেই তাঁর কাফের পুত্র হেদায়েতপ্রাপ্ত না হয়েই ডুবে মারা গেলো।

মহানবী সা.-এর চাচা আবু তালিবের হেদায়েত প্রত্যাখ্যান

মহানবী সা. দ্বীন প্রচারে চাচা আবু তালেব থেকে বিপুল সাহয্য পেয়েছিলেন। মহানবী সা. আবু তালেবকে খুব ভালোবাসতেন এবং আবু তালেবও তাঁকে প্রাণাধিক স্নেহ করতেন। কিন্তু এই আবু তালেবের ভাগ্যেও হেদায়েত জুটেনি। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব রহ. থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু তালেব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলেন, রাসুল সা. তার নিকট গেলেন। আবু জাহলও সেখানে ছিল। নবী সা. তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' -কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব।

তখন আবু জাহল ও আব্দুলল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবু তালেব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবু তালেব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তা হলো, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের ওপরেই আছি। এ কথার পর নবী সা. বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাজিল হলো, ‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামী’ (সূরা তওবা, আয়াত : ১১৩) আরো নাজিল হয়, ‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ (সূরা কাছাছ, আয়াত : ৫৬) এ ব্যাপারে মহানবী সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি এ কালেমা গ্রহণ করবে, যা আমি আমার চাচার (আবু তালেব) কাছে পেশ করেছিলাম আর তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেই কালেমা ওই ব্যক্তির নাজাতের উপায় হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

কাফের আজোরের ঘরে হজরত ইবরাহিম আ.-এর দ্বীপ্ত ঈমান

হজরত ইবরাহিম আ. মুসলিম জাতির পিতা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের ধর্মে কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন পূর্বেও এবং এই কুরআনেও, যাতে রাসুল তোমাদের জন্যে সাক্ষ্যদাতা এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলির জন্য।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৭৮) তাঁর নামে কুরআনে একটি সুরাও রয়েছে। তা ছাড়া পবিত্র কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণ, মসজিদুল আকসার ভিত্তি এবং আমাদের শরীয়তের ওয়াজিব বিধান কোরবানীর মতো আরো বহু ঘটনার সাথে তিনি সম্পৃক্ত। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তাঁর জন্ম হয়েছিল আজোর নামে মূর্তিপূজারী এক কাফেরের ঘরে। এরপরও আল্লাহ তাঁকে অসংখ্য মানবের হেদায়েতের পথপ্রদর্শক বানিয়েছেন। কুরআনে তাঁর কথা বলা হয়েছে এভাবে- ‘তুমি এই কিতাবে ইবরাহিমের কথা বর্ণনা কো। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী। যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! তুমি তার পূজা কেন করো, যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোনো উপকারে আসে না। হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না। নিশ্চয়ই শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করছি যে দয়াময়ের একটি আজাব তোমাকে স্পর্শ করবে, অতঃপর তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবে।’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৪১-৪৫)। পিতা তো তাঁর কথা মানলোই না; বরং তাঁকে হত্যা ও দেশত্যাগের হুমকি দিলো। কোরআনের আয়াত- ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই পাথর মেরে তোমার মাথা চূর্ণ করে দেব। তুমি আমার সম্মুখ থেকে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও’। (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৪৬) ফলে ইবরাহিম হেদায়েত নিয়ে দেশত্যাগ করলেন।

হজরত মুসা আ.-এর হেদায়েত ও সামেরির শিরক

পবিত্র কুরআনে হজরত মুসা আ. সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তিনি বহু ঘটনার পরে ফেরআউনের ঘরে লালিত হন। কোরআনের আয়াত, ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, ‘তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৯) কট্টর কাফেরের গৃহে থেকেও রবের অনুগ্রহে হেদায়েত লাভ করেছেন। পক্ষান্তরে তাঁর সময়কার সামেরি ওরফে মুসা জিবরিলের কাছে পালিত হয়েও হেদায়েত পাননি; বরং গোবৎসের পূজার গোড়াপত্তন করেছেন। কোরআনের আয়াত, ‘অতঃপর সে তাদের জন্য তৈরী করে বের করল একটি গো-বৎস, একটা দেহ, যার মধ্যে গরুর শব্দ ছিল। তারা বলল, এটা তোমাদের উপাস্য এবং মুসার ও উপাস্য।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত : ৮৮)

উপরোল্লিখিত ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হেদায়েত জাত, কুল, বংশ ও বর্ণের সাথে সম্পৃক্ত নয়। আল্লাহ যাকে দান করবেন সেই হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে। জনৈক কবি উপরোক্ত ঘটনার চমৎকার বর্ণনা করেছেন। ‘লালিত যেথা, ইমরান পুত্র মুসা, ধিকৃত ফেরাউন সে/ পুষ্পিত মহানাম-মুসা,চির অম্লান,খোদাপাকের প্রিয় যে/ মুসা ওরফে সামেরি, দূত জিবরীল থেকে বাঁচবার হাতেখড়ি/ সৃষ্টির কাছে ঘৃণিত, শ্রেষ্ঠ রতন পেয়ে স্রষ্টায় বাড়াবাড়ি/ নুহের গৃহে কিশতিতে বেঈমান স্বীয় পুত্র/ আজোড় ক্রোড়ে ইবরাহিমের হাতে ঈমানের সূত্র/’

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক-মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ ঢাকা


আরো সংবাদ


premium cement