১৩ মে ২০২১
`

রমজানের শুরুতেই দুঃসংবাদ পাচ্ছেন পবিত্র কোরআনের হাফেজরা

-

বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবি বিষয়ে সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণে এবার রমজানেও তারাবির নামাজ পড়ার সুযোগ হারাচ্ছেন পবিত্র কোরআনের অসংখ্য হাফেজ।

গত বছর তারাবি পড়াতে না পারলেও এবার পারবেন এমন আশায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাফেজরা। কিন্তু, রমজান শুরু না হতেই দুঃসংবাদ শুনতে হচ্ছে তাদের।

তারাবি পড়ানোর জন্য প্রায় সব মসজিদেই ইমাম বাছাইয়ের পরীক্ষা নেয়া হয়। শত হাফেজ থেকে বাছাই করে নির্বাচন করা হয় এক-দুজনকে। অনেকটা চাকরির ইন্টারভিউয়ের মতোই। এক মসজিদে ঠিক না হলে আরেক মসজিদে দৌড়াতে হয় তাদের।

ভালো ও মানসম্পন্ন হাফেজ হলেও তারাবি পড়ানোর জন্য মসজিদ জোগাড় করতে অনেক কষ্ট করতে হয় তাদের। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি ব্যয় হয় অর্থ-কড়িও। এ সব কিছু বিফলে যাচ্ছে পবিত্র কোরআনে কারীমের সম্মানিত হাফেজদের।

সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গেলে আজ থেকেই তারাবি শুরু হওয়ার কথা। এই আনন্দের সময় পবিত্র কোরআনের হাফেজরা পাচ্ছেন অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃসংবাদ। বহু কষ্টে জোগাড় করা তারাবি পড়ানো হচ্ছে না তাদের। মসজিদ কমিটির সদস্যরা ফোন করে জানাচ্ছেন, খতম তারাবির পরিবর্তে এবার তারা সুরা তারাবি পড়তে চান। সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণেই মসজিদের দায়িত্বশীলরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানাচ্ছেন হাফেজরা।

রাজধানীর মিরপুর জামিউল মাদরাসায় জালালাইন জামাতে (শ্রেণীতে) পড়েন হাফেজ মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। তিনি গত তিন বছর ধরে তারাবি পড়িয়ে আসছেন কুমিল্লার বরুড়ার একটি মসজিদে। হঠাৎ মসজিদ কমিটির একজন সদস্য তাকে ফোন করে জানান, এবার আমরা খতম তারাবি পড়বো না।

একই ধরনের কথা বলে নিষেধ করে দেয়া হয় গাজীপুর মাদরাসা দাওয়াতুল হক দেওনার শিক্ষার্থী হাফেজ তানিম আকন্দকে। গাজীপুরের শ্রীপুর থানার গোসিংগা পেলাইদ উত্তর পাড়া জামে মসজিদে তার তারাবি পড়ানোর কথা ছিল।

মিরপুর ১২ জামিয়া ইমদাদিয়া দারুল উলুম মাদরাসার তাইসীর জামাতের শিক্ষার্থী হাফেজ ইমাম হাসান জানান, আগে তারাবি বাসায় পড়ানো হলেও এবার রমজানে মসজিদে পড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু, লকডাউনের কারণে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে তাকেও। তাই এবারো বাসায়ই পড়াতে হবে।

রাজধানীর জামিয়া শারইয়্যা মালিবাগ মাদরাসা থেকে এবার দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) শেষ করেন হাফেজ খন্দকার রহমতুল্লাহ। তিনি বরিশাল সদর পশ্চিম কাউনিয়া আল মামুর জামে মসজিদে গত আট বছর ধরে খতম তারাবি পড়িয়ে আসছেন। লকডাউনের কারণে তাকেও নিষেধ করে দেয়া হয় মসজিদ কর্তৃপক্ষ থেকে।

এমন আরো অনেক হাফেজ এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন তাদের আশাহত হওয়ার কথা। বছরের অন্য সময় সাধারণত মাদরাসার শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কোরআনে কারীম নিয়মতান্ত্রিক তিলাওয়াত করার সুযোগ খুব একটা হয়ে উঠে না। পবিত্র রমজানে খতম তারাবি পড়ানোর মাধ্যমে তারা কোরআনের হিফজকে (মুখস্থ) পাকাপোক্ত করেন।

অনেক দরিদ্র হাফেজরা তারাবি পড়িয়ে যা হাদিয়া পান, তা দিয়ে বিভিন্ন বইপুস্তক কিনে ইলম অর্জন করেন। কেউবা মাদরাসার খোরাকি পরিশোধ করেন। করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মসজিদে সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বিপাকে পড়েছেন এসব হাফেজরা।

গার্মেন্টস-ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে মসজিদ মাদরাসার ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মুসল্লীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মুসল্লী নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, লকডাউনে গার্মেন্টস ও কারখানায় সীমিত সংখ্যক লোক দিয়ে যখন কাজ করানো হচ্ছে না। এসব জায়গায় সীমাবদ্ধতাও আরোপ করা হয়নি। শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে মসজিদে তারাবিতে কেন ২০ জন মুসল্লির সীমা বেঁধে দেয়া হলো?

এ বিষয়ে প্রখ্যাত তরুণ আলেম শায়েখ আহমদুল্লাহ বলেন, ঘোষিত লকডাউনে গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানায় উপস্থিতির সংখ্যা কি সীমাবদ্ধ? যদি তা না হয় তাহলে রমজান মাসে মসজিদে ২০ জনের বেশি উপস্থিত হতে পারবে না কেন? মসজিদে শুধু মহল্লার সুস্থ-সবল মানুষ সামান্য সময়ের জন্য উপস্থিত হবেন। পক্ষান্তরে কলকারখানায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন দীর্ঘ সময় একত্রে থাকবেন; আবার নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন। অর্থাৎ, তুলনা করা হলে দেখা যাবে যে গণসংক্রমণের ঝুঁকি মসজিদে বরং কম।

তিনি সরকারের নীতি নির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও রমজান মাসে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও তারাবি আদায় করতে দিন মানুষকে।



আরো সংবাদ