০৪ ডিসেম্বর ২০২০

সৃষ্টির কল্যাণ ও নির্মাতার নির্দেশনা

সৃষ্টির কল্যাণ ও নির্মাতার নির্দেশনা - ফাইল ছবি

পৃথিবীর দেশে দেশে সংবিধান কেন রচনা করা হয়? কি প্রয়োজন এই বাঁধাধরা নিয়মকানুনের? কেনইবা এত বাধ্যবাধকতা এই সংবিধানের প্রতি?

মানুষ জন্মগতভাবে পৃথিবীর সব কিছুকে নিজের মতো করে নিতে চায়। নিজের বিরুদ্ধে, কিন্তু অন্য সবার স্বার্থে কাজ করতে মানুষ আগ্রহী হয় না। ব্যতিক্রম দুই-চারজন যারা আছেন তারা কেউই সাধারণ নন। দেখতে মাটির গড়া মানুষের মতো হলেও তাদের কাছে সৃষ্টিকর্তার অমীয় বাণী এসেছে। যার শক্তিতেই তারা পুরো জীবনটা মানবসেবায় ব্যয় করেছেন। প্রচার করেছেন সৃষ্টিকর্তা প্রদর্শিত চলার সঠিক পথ।

বর্তমান পৃথিবীতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি দেশ চালানোর জন্য যখন কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তাকে দেয়া হয় কিছু নিয়মকানুন সংবলিত একটি বই। যা আমাদের সমাজে সংবিধান হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে যেটিকে কনস্টিটিউশন এবং আরবি ভাষায় দুস্তুরুন বলা হয়। প্রশ্ন হলো, কেন এই সংবিধান? যতটুক মনে হয়, দেশ পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর এক ধরনের অনাস্থা থেকেই হয়তো এই সংবিধানের সৃষ্টি। যিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি নিজেও ওই সংবিধানের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আর এতেই প্রমাণ হয় যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখেন না। নিজের মনপ্রসূত সব কর্মকাণ্ড দেশ বা মানব কল্যাণের পক্ষে হবে না; এ কথা বুঝেই তিনি সংবিধানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন।

তাহলে আমরা কেন এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করব বা মেনে নেবো? কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, আমাদের মাঝে এমন কেউই নেই যে আত্মস্বার্থের ঊর্ধ্বে। তাই সংবিধানের দরকার হয়েছে। যেন তিনি সংবিধানের পরিপন্থী কিছু করলে তা বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন আসে, সংবিধানের রচয়িতাও তো সেই মানুষ যার প্রবণতা হলো আত্মস্বার্থ দেখা। তাহলে কী করে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, এই সংবিধান পুরোপুরি সঠিক হবে। আত্মপূজারি মানবকুলের রচিত এই সংবিধান মানবতার মুক্তিতে কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে? এর উত্তর আসবে নেতিবাচক।

যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিও তাঁর সৃষ্ট মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেননি। আর এ কারণেই তিনি কালের বিবর্তনের বাঁকে বাঁকে বিশেষ কিছু মানুষ পাঠিয়েছেন আমাদের কাছে। আর সাথে দিয়েছেন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিচালনার নিয়মকানুন সংবলিত নির্দেশিকা। প্রেরিত সেই মহা পুরুষগণ ওই নিয়মানুসারে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন মানবতার মুক্তির জন্য, পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, অধিকারবঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য, সত্যকে মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে।

সংবিধান রচনার প্রয়োজন মূলত মানুষের আমিত্ব থেকে বেরিয়ে না আসতে পারার কারণে। আর পৃথিবীতে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার বাণীগুলোই নিরপেক্ষ এবং মানবতা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তাই এ কথা প্রমাণিত যে, মানব রচিত সংবিধানে সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত নবী বা রাসূল ও ঐশিগ্রন্থের বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু থাকলে সেটি মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে না।

এবার আসা যাক প্রচলিত একটি কথার দিকে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ কথাটি কে কবে প্রথম বলেছিলেন তা আমার জানা নেই। সব মানুষ দেখতে একই। বাইরে থেকে দেখে সাধারণত মানুষের মধ্যে জাতি বা ধর্মের পার্থক্য বোঝা যায় না, যদি না বিশেষ কোনো জাতি বা ধর্মের চিহ্ন বহন না করে। বিশেষ কোনো বেশ, পোশাক বা ভাষা ব্যবহারেও বোঝা যায় তার জাতি ও ধর্ম পরিচয়।

এরকম প্রচলিত প্রতিটি জাতি ও ধর্মের আলাদা আলাদা কিছু সংস্কৃতি রয়েছে। বাঙালি হয়ে ভিনদেশী সংস্কৃতি অনুসরণ করলে আপনি যেমন জাতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে নিন্দিত হবেন; ঠিক তেমনি অন্য ধর্মের সংস্কৃতি গ্রহণ করলেও আপনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য হবেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। (সূরা ইমরান : ১৯) অন্যত্র আল্লাহ বলেন ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামত তোমাদের প্রতি সম্পূর্ণ করলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে আমি দ্বীন হিসেবে দান করে সন্তুষ্ট হলাম (তাই হালাল ও হারামের যে বিধিনিষেধ আমি আরোপ করেছি তা মেনে চলো)। তবে কেউ গুনাহের দিকে না ঝুঁকে (ক্ষুধার কারণে) বাধ্য হয়ে যদি কিছু (হারাম জিনিস) খেয়ে ফেলে তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।’ (সূরা মায়িদা : ০৩) এ আয়াতের ‘দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম’ অংশের ব্যাখ্যায় তাফসিরগ্রন্থে বলা হয়েছে, দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দেয়ার অর্থ দ্বীনের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্থায়ী চিন্তা ও জীবনবিধান এবং এমন এক পরিপূর্ণ সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে কায়েম করা, যার মধ্যে জীবনের সব প্রশ্নের জবাব ও সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে এবং পথনির্দেশ ও আদেশ-উপদেশ লাভ করার জন্য কোনো অবস্থাতেই আর কোথাও হাত বাড়ানোর দরকার হবে না। নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দেয়ার অর্থ হেদায়াত বা জীবনপথের ব্যবস্থাদানের কাজ সম্পূর্ণ করা। ইসলামকে একমাত্র দ্বীন হিসেবে কবুল করে নেয়ার অর্থ তোমরা আমার আনুগত্য ও দাসত্ব করার স্বীকৃতি দিয়েছিলে যেহেতু তোমরা তোমাদের চেষ্টা ও সাধনা দ্বারা তা খাঁটি, আন্তরিক ও অকপটে স্বীকৃতি দেয়ার প্রমাণ করেছ, সেহেতু আমি তাকে আমার মঞ্জুরি ও কবুলিয়াতের মর্যাদা দান করেছি। এখন তোমাদেরকে আমি বাস্তবে এমন অবস্থায় পৌঁছিয়ে দিয়েছি যে, আমার ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব ও আনুগত্যের শিকল তোমাদের গলায় আর নেই। তোমরা আকিদা-বিশ্বাসের দিক দিয়ে যেমন মুসলিম হয়েছো, তেমনি বাস্তব জীবনেও আমার ছাড়া অন্য কারো অনুগত হবে না।

সৃষ্টি যার হুকুমও তাঁর এটা অনুধাবন করা এখন আমাদের জন্য খুবই সহজ। আমাদের হাতে যেসব আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে তার মাধ্যমে আমরা এটি অনুধাবন করতে পারি। কম্পিউটার, মোবাইল, ক্যামেরা, টেলিভিশনসহ সব প্রযুক্তি পরিচালানায় বেশ কিছু নিয়ম আছে। আর এ নিয়মগুলো প্রযুক্তির উদ্ভাবক নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আমরা সবাই সেই নিয়ম মেনে এগুলো ব্যবহার করি। কখনো কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করি না। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় প্রযুক্তি উদ্ভাবকের দেয়া নিয়ম মানলেও যিনি (আল্লাহ) আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিয়ম মানতে চাই না বা মানলেও অনেকেই বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি না। অবশ্যই এর মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে। জীবন চলার পথে আমাদের যে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছি তা সৃষ্টার নিয়ম যথাযথো অনুসরণ না করারই ফল। জীবনের  জটিলতাগুলো আমাদের অবাধ্যতার প্রতিদান।

সূরা আরাফের ৫৪ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন, ‘যিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকা সৃষ্টি করেছেন, যা তাঁর হুকুমের অধীন। সাবধান! সৃষ্টিও তাঁর, হুকুমও তাঁরই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বড়ই বরকতময়।’ এ আয়াতের ‘সাবধান! সৃষ্টিও তাঁর, হুকুমও তাঁরই’ এই অংশের ব্যাখ্যায় তাফসিরকারক বলেছেন, ‘আল্লাহ এই বিশ্বালোক সৃষ্টি করেছেন ও তিনিই এর নির্দেশক ও পরিচালক। নিজের সৃষ্টিকে তিনি অন্যের অধীনে ছেড়ে দেননি এবং তিনি তাঁর সৃষ্ট বস্তুকেও এ অধিকার দেননি যে, সে নিজ ক্ষমতা ও অধিকারে যা ইচ্ছা তাই করবে।

সুতরাং আমরা যারা নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করি অবশ্যই আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে চলতে হবে। ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ করে নিজেকে পাপমুক্ত বা সঠিক পথে ভাবার উপায় নেই। আমাদের কল্যাণ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তার বিধিনিষেধ মেনে চলার মধ্যেই।

লেখক : সাংবাদিক


আরো সংবাদ

সৌদি আরবে ইমাম হোসাইন মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ (১০৭২৭)অপশক্তি মোকাবেলা করে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে : মামুনুল হক (৯১৪৮)রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি পায়নি সম্মিলিত ইসলামী দলগুলো (৮৩৫৮)ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন কোনোক্রমে মেনে নেয়া যায় না : সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ (৫৯৯৭)স্টেডিয়ামগুলোকে জেলে রূপান্তরের অনুমতি না দেয়ায় কেজরিওয়ালের ওপর ক্ষুব্ধ মোদি (৫৬৯৯)দেশের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের নির্দেশ সেনাপ্রধানের (৫৪১৬)আওয়ামী লীগের আপত্তি, মামুনুল হকের মাহফিল বাতিল (৫২৩৭)কোনো মুসলিম হিন্দু নারীকে বিয়ে করতে পারে কিনা (৪৯৫৯)বাবার ডাকে বাড়ি ফিরে বড় ভাইয়ের হাতে খুন (৪৬০৮)পাঠ্যসূচিতে থাকলেও গুরুত্ব হারাচ্ছে ইসলাম শিক্ষা (৪০৩৯)