০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

তালাকের প্রতিশোধ নিতে ছেলেকে হত্যা, নারীসহ সৎবাবা গ্রেফতার

তালাকের প্রতিশোধ নিতে ছেলেকে হত্যা, নারীসহ সৎবাবা গ্রেফতার - ছবি : সংগৃহীত

বগুড়ায় স্ত্রীর তালাকের প্রতিশোধ নিতে শিশু সামিউল ইসলাম সাব্বিরকে (১০) নৃশংসভাবে হত্যা করেছে সৎবাবা। এ ঘটনায় নারীসহ শিশুটির সৎবাবাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত ফজলুল হক শাজাহানপুর উপজেলার খরনা কমলাচাপড় গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে সহায়তা প্রদানকারী অনিতা রানী (৩৫) উপজেলার চেলো গ্রামের মৃত খিরদ চন্দ্র দেবনাথের মেয়ে।

বুধবার বেলা ১১টায় বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী তার নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শাজাহানপুর উপজেলার মানিকদিপা উত্তরাপাড়া গ্রামের লাউ ক্ষেতের জমিতে গলায় সুতার রশি পেঁচানো অবস্থায় শিশু সামিউলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সুপার জানান, শাজাহানপুর উপজেলার সাজাপুর গ্রামের মৃত ডালের আলী প্রমাণিকের মেয়ে সালেহা বেগম (২৮)। প্রায় ১০ বছর আগে মাঝিড়া কাগজীপাড়া গ্রামের মৃত মনঞ্জুর আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে (৩০) বিয়ে করেন। জাহাঙ্গীর আলমের সাথে সংসার চলাকালে সালেহার ছেলে সামিউল ইসলাম সাব্বির জন্মগ্রহণ করে। সামিউল ইসলাম মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাজাপুর পূর্ব দক্ষিণপাড়া তালিমুল কোরআন হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করছিল সামিউল। মাদক সেবন করার কারণে বনিবনা না হওয়ায় প্রায় দেড় মাস আগে সালেহা তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে তালাক দেন।

তিনি জানান, সালেহা তার ছেলেকে সাথে রেখে শাজাহানপুর থানার খরনা কমলাচাপড় গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে ফজলুল হককে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে ফজলুল হক সালেহার ছেলেকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। ফজলুল হক সালেহার ছেলে সামিউলকে সালেহার মা ও বোনের কাছে রেখে আসার জন্য শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ দিতে থাকেন। এছাড়া ফজলুল হক মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় সামিউলকে ঘরের বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিতেন, খাবার না দিয়ে অনাহারে রাখতেন।

তিনি আরো জানান, ঈদ-উল-ফিতরের দিন শিশু সামিউল তার মায়ের সাথে বেড়াতে যেতে চাইলে সৎবাবা ফজলুল হক সামিউলকে মারধর করে সালেহার বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সালেহা তার সন্তানের কষ্ট দেখে ফজলুল হকের সাথে বিয়ের ১০ থেকে ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর কাজী অফিসের মাধ্যমে গত ১১ মে তাকে তালাক দেন। পরে ফজলুলকে তালাক দিয়ে সালেহা তার সন্তানকে নিয়ে সাজাপুর গ্রামে তার বোনের বাড়িতে যান। এমতাবস্থায় ১৪ মে ঈদের পর ছেলের মাদরাসা খুললে সালেহা তার ছেলেকে মাদরাসায় রেখে আসেন। তিনি তার স্বামী ফজলুল হককে তালাক দেয়ায় ফজলুল হক তার উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার ছেলেকে খুন করার পরিকল্পনা করেন।

পুলিশ সুপার আরো জানান, পরিকল্পনা মোতাবেক ফজলুল সালেহার ছেলেকে নেয়ার জন্য ১৬ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাজাপুর পূর্ব দক্ষিণপড়া গ্রামের তালিমুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসায় যান। ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাদরাসার শিক্ষক মোঃ আবু মুছাকে বলেন। কিন্তু মাদরাসাশিক্ষক আসামি ফজলুল হকের কাছে শিশু সামিউলকে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ফজলুল হক আগেই অনিতা রানীকে শিশু সামিউলের মা পরিচয় দিয়ে অনিতা রানীর মোবাইল নম্বর মাদরাসাশিক্ষকের কাছে দিয়ে বলে যে সামিউল ইসলাম সাব্বিরের মায়ের সাথে কথা বলেন।

তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক মাদরাসার শিক্ষক আবু মুছা তার ব্যক্তিগত নম্বর থেকে ফজলুল হকের দেয়া অনিতা রানীর মোবাইল নাম্বারে ফোন করেন। ফোনে অনিতা রানী শিশু সামিউল ইসলামের মায়ের পরিচয় দিয়ে সামিউলকে ফজলুল হকের কাছে দিতে বলেন। ওই সময় মাদরাসাশিক্ষক অন্য ছাত্রদের সামনে শিশু সামিউলকে ফজলুল হকের সাথে দেন। এরপর ফজলুল হক মানিকদিপা উত্তরপাড়া টুখরনা না কলমাচাপড়গামী কাচা রাস্তার পাশের লাউয়ের জমিতে শিশু সামিউলকে নিয়ে গলায় সুতার রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

এ সময় শিশু সামিউলের লাশ গোপন করার জন্য ফজলুল হক লাউ ক্ষেতের উত্তর পশ্চিম কোনায় মাচার ঘুটির সাথে বেঁধে রেখে চলে যান। পরে ১৭ মে সকাল ৮টার দিকে পুলিশ সামিউলের লাশ উদ্ধার করে। এরপর ফেসবুকের মাধ্যমে শিশুর লাশের বিষয়ে লোকমুখে শুনে সালেহা ও তার স্বজনরা লাশ শনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ১৭ মে লাশ উদ্ধারের ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আসামিদের গ্রেফতার করে।

পুলিশ সুপার বলেন, এ ঘটনায় শিশু সামিউলের মা সালেহা আসামি ফজলুল হক ও অনিতা রানীর বিরুদ্ধে শাজাহানপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরাফত ইসলাম, ডিবির ওসি সাইহান ওলিউল্লাহ ও শাজাহানপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন উপস্থিত ছিলেন।

 


আরো সংবাদ


premium cement