০৭ মার্চ ২০২১
`

মৌসুমের আগেই আলুর দরপতন, লোকসানের আশঙ্কা

মৌসুমের আগেই আলুর দরপতন, লোকসানের আশঙ্কা - নয়া দিগন্ত

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দাম অর্ধেকে নেমেছে। এখন ১৫-২০ টাকায় আগাম জাতের নতুন আলু কেনা যাচ্ছে বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে। চাষি পর্যায়ে দাম নেমেছে ১০ টাকা। যদিও পুরোপুরি আলু ওঠার মৌসুম শুরু হবে আরো এক-দুই সপ্তাহ পর। বাজারে দ্রুত দাম কমায় চিন্তিত হয়ে পড়ছেন কৃষকরা। বিগত বছরগুলোর মতো এবারো আলু নিয়ে চরম লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।

গত দেড়-দুই মাস ভোক্তা পর্যায়ে আলুর দাম বেশি থাকলেও প্রকৃত কৃষকরা যখন বাজারে পণ্যটি আনছেন তখনই এ দরপতন হলো। এর দুটি প্রধান কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, গত মৌসুমের শেষ দিক থেকে বেশি দাম থাকার কারণে লাভের আশায় চলতি মৌসুমে আলুর চাষ বাড়িয়েছেন চাষিরা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, দেশে সার্বিক আলুর উৎপাদন চাহিদার বেশি। একই সময় মহামারি করোনার প্রার্দুভাবে রফতানিও কমেছে। ফলে বাড়তি আলু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যও বলছে এমনটাই। চলতি মৌসুমে দেশে ১ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার টন আলু উৎপাদনের ল্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা গত বছরের প্রকৃত উৎপাদনের থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন বেশি। গত অর্থ বছর (২০১৯-২০) দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৯ লাখ ১৭ হাজার টন।

অধিদফতরের হিসাব মতে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা মাত্র ৭৭ লাখ টন। অর্থাৎ বছরে ২৬ থেকে ৩৭ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। এ আলু কাজে লাগানোর একমাত্র উপায় রফতানি। আলু রফতানির চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বছরে রফতানি হচ্ছে বড়জোর ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টন।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতি বছর ভরা মৌসুম ও মৌসুমের শেষে আলু নিয়ে দারুন পীড়াপীড়ি শুরু হয় কৃষকের। তাদের ক্ষেত, মাঠ, উঠান, হাট সর্বত্রই আলুময় হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় সেই আলু ক্ষেতেই রেখে চলে যান তারা। আবার অনেকে মৌসুমে কোল্ডস্টোরে আলু রাখলেও দাম পান না তেমন। সবমিলে আলুই তখন কৃষকদের গলার ফাঁস হয়েই দাঁড়ায়। এ বছরও এমন শঙ্কা দেখছেন আলু চাষিরা।

শিবগঞ্জ কিচকের কৃষক ডা. মো. আব্দুল মোমেন বলেন, ক‘দিন আগে আলু কেজি দরে বিক্রি হয়েছে ২৬ টাকায়। এখন সেই আলু ১০টাকা। দুদিন পরে হবে ছয় টাকা, তারপর চার টাকায়ও আলু নেবে না ব্যাপারীরা। এখনও ক্ষেত থেকে ২০ শতাংশ আলু ওঠেনি এই অঞ্চলের। এর মধ্যেই পড়ে গেল দাম।

তিনি আরো বলেন, এত আলু খাবে কে? হুজুগে সবাই এবার আলু চাষ করেছে। কিন্তু এ সবজির তো চাহিদা থাকে না। শেষে কোল্ডস্টোরে রেখে জমি বেচে তিপূরণ দিতে হয়।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক আফাকু কোল্ডষ্টোরেজ’র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, গত ১০দিন আগে প্রতি মণ আলু ৭‘শ থেকে ৮‘শ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে সেই আলু হঠাৎ দাম কমে পাইকারিতে প্রতি মণ ৪০০ টাকায় নেমেছে।

বেশ কয়েকজন কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, এ মৌসুমে এক কেজি আলু উৎপাদনের খরচ পড়েছে ৮-৯ টাকা। কৃষক পর্যায়ে এর নিচে দাম নামলে লোকসান হবে চাষিদের। এছাড়া এবার আলু উৎপাদিত হচ্ছে এক কোটি ১৩ লাখ টনেরও বেশি।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আল মুজাহিদ সরকার জানান, এবছর উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্র ছিল সাড়ে ১৮ হাজার হেক্টর কিন্ত আলু চাষ হয়েছে ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে। এখানে ভরা মৌসুম আসতে আরো প্রায় এক মাস বাকি থাকলেও এরই মধ্যে জমি থেকে আগাম জাতের আলু উত্তোলন করছিলেন চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূল আর রোগ-বালাই কম হওয়ায় এবছর ক্ষেতের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে।

বগুড়া জেলা কৃষি অফিসের উপ সহকারি পরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এবছর জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্র ছিল ৫৭হাজার ৭০হেক্টর কিন্ত আলু চাষ হয়েছে ৫৮হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে। বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ করে উৎপাদন হয়েছে ৪৫-৫০ মণ আলু। কিন্তু হঠাৎ দাম কমে পাইকারিতে প্রতি মণ ৪০০ টাকায় নেমেছে। বাজারে আলুর দাম পড়ে যাওয়ায় চিন্তিত এ অঞ্চলের কৃষক। বছর মৌসুমের শুরুতে দাম না থাকায় আলুতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা ।



আরো সংবাদ