১৬ জানুয়ারি ২০২১
`

রাজশাহীতে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় পরিচালকের ভাইসহ গ্রেফতার ২

ছাত্রীরাও মারধরের শিকার হন। - ছবি : সংগৃহীত

রাজশাহীর বেসরকারি শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় হাসপাতাল পরিচালকের ছোটভাই ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে একজনকে।

রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার ওসি সিরাজুম মুনির এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

হামলায় সংশ্লিষ্টদের বিচারের দাবিতে বেলা ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

এ সময় তারা মারধরের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালটির পরিচালক শিক্ষার্থীদের অন্য মেডিকেল কলেজে মাইগ্রেশন করতে দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে শনিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে যান।

এ সময় শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা দ্রুত মাইগ্রেশনের পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা হামলার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা।

নানা অনিয়মের অভিযোগে গত ২ নভেম্বর শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

মূলত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ওই হাসপাতালটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনার সংশোধিত নীতিমালা-২০১১ এর শর্ত অমান্য করায় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি না করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২ নভেম্বর এক চিঠিতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। তারপরই মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, যেন শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মাইগ্রেশন অর্থাৎ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।

মন্ত্রণালয় থেকে এমন নির্দেশনা আসায় শিক্ষার্থীরা একে সাধুবাদ জানায়।

ওই মেডিকেল কলেজটি নিবন্ধিত না হওয়া সেইসাথে যথাযথ মেডিকেল শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় অনেক আগে থেকেই মাইগ্রেশনের দাবিতে এই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছিল।

কিন্তু সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালটির পরিচালক নানা অজুহাতে মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া থামিয়ে রেখেছিল বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এমন অবস্থায় শনিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা হাসপাতাল পরিদর্শনে আসতে পারেন এমন খবর পেয়ে তাদের সামনে মেডিকেল কলেজের সব অনিয়মের কথা তুলে ধরার প্রস্তুতি নেয় শিক্ষার্থীরা।

এজন্য দূরবর্তী শহরে থাকা অনেক শিক্ষার্থী শুক্রবার রাজশাহীতে চলে আসেন।

তাদের মধ্যে কয়েকজন বিকেলে হোস্টেল থেকে তাদের শীতের কাপড় ও মালামাল নিতে গেলে হামলার শিকার হন।

মেডিকেল কলেজের পরিচালক ও তার ভাড়াটে লোকজন শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পেটায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের লাঠির আঘাতে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আহত হন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, নারী শিক্ষার্থীদেরও লাঠিপেটা করা হয়েছে।

পরে আহত শিক্ষার্থীরা চন্দ্রিমা থানায় গিয়ে মেডিকেল কলেজটির পরিচালক ও তার স্ত্রীসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় ১০-১২ জন অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে ‘শ্লীলতাহানি ও হত্যাচেষ্টার’ মামলা দায়ের করেন।

শুক্রবারই দুইজনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান চন্দ্রিমা থানার ওসি সিরাজুম মুনির। আজ শনিবার একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

অভিযুক্ত অন্যদের গ্রেফতারে প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সিরাজুম মুনির। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে মারধরের ওই ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মারধরে হাতে, পায়ে ও কোমরে বড় ধরণের আঘাত পেয়েছেন ছাত্রী জাকিয়া আফরিন জেবা।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘কলেজ যেহেতু বন্ধ হয়ে গেছে তাই আমরা ১৫-২০ জনের মতো স্টুডেন্ট হোস্টেলে গিয়েছিলাম শীতের কাপড় আনতে। ফেরার পথে দুই দিক থেকে পরিচালকের লোকজন আমাদের ঘিরে ধরে লাঠিপেটা করতে থাকে। যাতে আমরা পালাতে না পারি।’

‘মেয়েদের গায়ে পর্যন্ত তারা হাত দিয়েছে। পাশেই পরিচালক দাঁড়িয়ে ছিলেন। সব দেখেছেন, উনি কাউকে বাধা দেয়ার কোনো চেষ্টাই করেননি। আমরা তথ্য ফাঁস করে দিতে পারি এটা বুঝতে পেরেই পরিচালক আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে।’

‘মেডিকেল কলেজের অনিয়মের খবর ধামাচাপা দিতেই হামলা’
মেডিকেল কলেজের অনিয়মের খবর যেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানতে না পারেন সেসব তথ্য ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাজমুল হক।

এই হাসপাতালের ভর্তির সময় বলা হয়েছিল কয়েকদিনের মাথায় এই মেডিকেল কলেজের নিবন্ধন সম্পন্ন হবে। কিন্তু তিন বছরেও তিনি কোনো অগ্রগতি দেখেননি। এমন অবস্থায় নিজের ও সহপাঠীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রকার অনিশ্চয়তায় থাকার কথা জানান তিনি।

‘ভর্তির সময় তারা বলেছিল, এই হাসপাতাল বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত। দুয়েকদিনের মধ্যে নিবন্ধন হয়ে যাবে। অথচ এখনো নিবন্ধন হয়নি। এতে করে পাস করে আমরা কোথাও ইন্টার্নশিপ করতে পারবো না। কারণ এই মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ কর্তৃক নিবন্ধিত নয়। সবশেষ যে ব্যাচ পাস করেছে তাদেরকে দুই বছর বসে থাকতে হয়েছে। নিবন্ধন না থাকায় তারা কোথাও ইন্টার্নশিপের সুযোগ পায়নি।’

এদিকে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মতো মেডিকেলের কয়েকটি বিভাগে কোনো শিক্ষকই নেই বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন।

সেইসাথে মানসম্পন্ন ডাক্তার হতে যে ক্লিনিক্যাল রোগীদের পর্যবেক্ষণ করতে হয়, সেই সুযোগ নেই বলে জানান নাজমুল হক।

তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে কোনো রোগী নেই। ওয়ার্ডে রোগী না থাকলে আমরা কাদের নিয়ে কাজ করবো? কি শিখবো? অনেক বিভাগে কোনো ডাক্তার নেই। এভাবে তো একজন মানসম্মত ডাক্তার হওয়া সম্ভব না। এজন্যই আমরা মাইগ্রেশন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছি যেন আমরা ভালো ডাক্তার হতে পারি। কিন্তু পরিচালক নানা টালবাহানায় এই প্রক্রিয়া পিছিয়ে দিচ্ছে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এর আগে কয়েক দফা মেডিকেল কলেজটি পরিদর্শনে এলে, কলেজ কর্তৃপক্ষ বাইরে থেকে রোগী ও ডাক্তার ভাড়া করে নিয়ে আসে।

শনিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি দল কলেজ পরিদর্শনে আসছে জানতে পেরে শিক্ষার্থীরা সত্যতা তুলে ধরার উদ্যোগ নেন।

কিন্তু মেডিকেল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন।

নাজমুল হক বলেন, ‘তারা চেয়েছিল আমরা যেন ভয় পেয়ে শনিবার না আসি আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে সত্যিটা তুলে ধরতে না পারি।’

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ