০৪ অক্টোবর ২০২৩, ১৯ আশ্বিন ১৪৩০, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিজরি
`

পাঠ্যপুস্তকে ভুল অমার্জনীয় অপরাধ

-

জন্তু-জানোয়ার বা পশুরাও মানবশিশুদের প্রতি দরদি থাকে। এ নিয়ে অনেক মিথ আছে। গল্প-কবিতাও আছে। চলচ্চিত্র-নাটকও হয়েছে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আদম সন্তানদের প্রতি বাঘ, সিংহ বা বিষাক্ত সাপের হিংস্র্র না হওয়ার ঘটনাকে বিষয়বস্তু করে। কিন্তু আমাদের শিশু-কিশোরদের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গত বছর কয়েক ধরে যে কাণ্ডকীর্তি ঘটানো হচ্ছে তার মধ্যে কেবল দুর্নীতি-অনিয়ম নয়, নিষ্ঠুরতা-হিংস্রতাও ব্যাপক। এবারের মাত্রা আরো ভয়াবহ। তার ওপর তামাশা। সেই সাথে নানান কথার বাহাদুরি।
এ নিয়ে কথা বলাকে সরকারবিরোধিতা, সরকারের বিরুদ্ধে ইস্যু তৈরি করা বলে বার্তা দেয়া হয়েছে। যারা সমালোচনা করছে তারা জামায়াত-শিবির; এমন হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে। একপর্যায়ে বলা হয়েছে, ভুল হতেই পারে। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। ভুল তো মানুষেরই হয়। এসব ভুল সংশোধন করা হবে। দুই দু’টি কমিটি পাঠ্যপুস্তকের বিকৃত-বিতর্কিত অংশগুলো শুধরে দেবে। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে যুক্ত ড. জাফর ইকবালসহ কয়েক শিক্ষাবিদ ভুল স্বীকারও করেছেন। এতে সব ল্যাঠা মিটে গেছে? ব্যাপারটি এত সাদামাটা?
গত বছর কয়েকটি পাঠ্যপুস্তককে এ ধাঁচের সাদামাটাতেই নিয়ে আসা হয়েছে। হতে হতে এবার একেবারে তলানিতে। অন্যের লেখা চুরি, ভুল তথ্য, মুসলমানদের ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপন, অশ্লীল-অশালীন ছবি ও শব্দ ব্যবহার, সমাজ ও ধর্মবিরোধী বিষয়বস্তু সংযোজনের মতো নোংরা কাজের কিছুই বাদ যায়নি। তা কি কেবলই ভুল? না কি কোমলমতি শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের কাল্পনিক তথ্য-গল্প শেখানো, কুশিক্ষা দেয়া, ধর্মীয় আচার-আচরণে বিরূপ মনোভাব তৈরির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত কাজ?

চতুর্থ শ্রেণীর বাংলা বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে- গ্রীষ্মকাল হলো মধুমাস। আদতে মধুমাস হলো চৈত্র মাস, যা বসন্তে। এমন ভুল করা কিভাবে সম্ভব? ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি, জীবন ও জীবিকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ইংরেজি বইয়ের দিকে তাকালে এ প্রশ্ন এসে যায়ই। শুধু লেখা চুরি করে ছাপানো নয়, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানকে আহত করার যাবতীয় ব্যবস্থা সেখানে রাখা হয়েছে। বিতর্কিত মতবাদ বিবর্তনবাদ, প্রাচীন সভ্যতার নামে উলঙ্গ, অর্ধ-উলঙ্গ মূর্তির ছবি, গান-বাজনা, হারমোনিয়াম, তবলা, গিটার, নগ্ন ও অশ্লীল প্রচুর ছবি-শব্দ ঢোকানো হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতার নাম এবং পদবি ভুল করা হয়েছে। ট্রান্সজেন্ডার নামে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নতুন একটি চ্যাপ্টার যুক্ত করা হয়েছে। প্রচ্ছদে ও লেখায় অলীক, আজগুবি গল্প তো যুক্ত করা হয়েছেই। এর মাধ্যমে কোমলমতিদের কী শেখানোর বিকৃত বুদ্ধি করা হয়েছে? ইতিহাস বিকৃতি, পক্ষপাতদুষ্ট, অন্যদের হিরো বানিয়ে, মুসলমানদের দখলদার হিসেবে দেখানো মতো কূটকৌশল পর্যন্ত আঁচ করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
পাঠ্যবই প্রকাশের আগে তা দেখভালের দায়িত্ব সেই লেখক-প্রকাশক, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তারা সেই দায় না নিয়ে বরং এসব ত্রুটি নিয়ে সরব মহলকেই দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। এটিকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী। অবস্থা বেগতিক দেখে ড. জাফর ইকবাল দায়সারা ভুল স্বীকার করেছেন। তবে ক্ষমা চাওয়ার পর্বে যাননি। নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে লেখা সপ্তম শ্রেণীর বিজ্ঞান ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বইয়ের একটি অংশে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এডুকেশনাল সাইট থেকে নিয়ে হুবহু অনুবাদ করে ব্যবহার করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছেন বইটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক হাসিনা খান।

এনসিটিবিতে বিজ্ঞ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও অনেকটা ঝিম মেরে আছেন। তাদের কাজ ভুল করা নয়, ভুল যেন না হয় তা নিশ্চিত করা। শুদ্ধাচারের উদ্দেশ্যে তাদের নিয়মিত ওয়ার্কশপ, সেমিনার ইত্যাদি করানো হয়। হাঁকডাকসহ বাজেটও বেশ বড়। এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মো: ফরহাদুল ইসলাম ভুল রুখতে না পারায় লজ্জিত হয়েছেন। সেই সাথে জানিয়েছেন, এনসিটিবির দায়িত্বরতদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হলেও লেখকদের শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার এনসিটিবির নেই। এটি পারে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাস্তবতাটা আসলে বিপরীত। আমাদের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, মুদ্রণসহ অনেক কিছুই বলতে গেলে একতরফা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা এর শিকার। সন্তানদের লেখাপড়া ও মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হয় সরকারের মর্জির ওপর। জাত আমলা এবং শিক্ষক-আমলারা যা বানিয়ে দেন, তা-ই গেলাতে হয় সন্তানদের।
এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, ধোলাই-মালাই হয়েছে যথেষ্ট। আধুনিক প্রজন্ম গড়ে তোলার উপাদান এই শিক্ষা পুস্তকগুলোতে আছে কিনা- সেই আলোচনাও চলছে। পরিকল্পনাহীন শিক্ষানীতি, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া, তার ওপর লেজেগোবরে পাঠ্যক্রম ক্ষেত্রবিশেষে উদ্ভটও। কোথাও কোথাও উৎকট। বছর শেষে তা সহ্য করা অনেকটা নিয়তির মতো। পুস্তক প্রণয়নের কাজে প্রতি বছর চিহ্নিত কয়েকজনকেই বেছে নেয় সরকার। তারা তাদের পছন্দের কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সাথে নিয়ে তৈরি করে দেন বিভিন্ন চোথা। এ বাবদ পান লাখ লাখ টাকার সম্মানী। সেসব পাঠ্যপুস্তক ভুল হলে বা বই-কারিকুলাম এক বছর চালিয়ে বাতিল করে দিলে মন্ত্রী, আমলা-কর্মকর্তা ও লেখকদের ক্ষতি হয় না; বরং আরো লাভ হয়। তাদের গড়লেও লাভ, ভাঙলেও লাভ। ভুলভাল হলে সেই তারাই আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আরেক প্রস্থ পুস্তক প্রণয়নের। আবার লাখ লাখ টাকা প্রাপ্তিসহ শাস্তির বদলে পুরস্কার।
এবার শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীরা পেয়েছে দুই ধরনের বই। প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা পেয়েছে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে। অন্যান্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা পুরনো শিক্ষাক্রমের আলোকে বই হাতে পেয়েছে। পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণয়ন করা বইগুলোর মধ্যে কোনো বইয়ে আগের ভুলভ্রান্তি রয়ে গেছে। নবম-দশম শ্রেণীর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও গণহত্যা-বিষয়ক অংশে প্রথম লাইনে বলা হয়েছে, ‘২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছিল।’ প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাত থেকেই নিরীহ বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। আরেক বাক্যে বলা আছে- ২৫ মার্চের রাতে অত্যাচারের কথা। প্রথম লাইনটি চরম বিভ্রান্তিকর।

নবম-দশম শ্রেণীর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ২০০ পৃষ্ঠায় একটি অংশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থার ধরন কী হবে, এ সম্পর্কে তখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিনই ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভায় দীর্ঘ আলোচনার পর ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারির মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত সায়েমের কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। একই দিনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।’
একেকটি বইয়ে লেখক-সম্পাদক হিসেবে ১০-১৫ জনের নাম পর্যন্ত দেখা যায়। প্রকাশের আগে তা দেখতে কয়েকজন বিষয়-বিশেষজ্ঞের কাছেও পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন উচ্চতর কর্তাব্যক্তির কাছে বই পৌঁছে দেয়ার একটি পর্বও আছে। এর পরও পাঠ্যবইয়ে ভুল থাকে। প্রতি বছর নতুন বই প্রকাশের সাথে সাথে এসব ভুল নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এবার তা মাত্রা ছাড়ানো। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে, বইয়ের তথ্য সব সময় প্রামাণ্য নয়। কবি জসিমউদ্দীনের জন্ম কত সালে কিংবা তার নাম কোন বানানে লিখতে হবে, এটি পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বই দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একেক শ্রেণীর বইয়ে তা একেকভাবে লেখা। তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়। এই দ্বিধা ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে। গুরুতর সমস্যা তথ্যগত ভুল নিয়ে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্যেও ভুল।
এবার পাঠ্যবইয়ের মানও আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, নানা জটিলতায় শেষ সময়ে বই পাওয়ার জন্য এবার মানে ছাড় দেয়া হয়েছে। বই ছাপার সাথে সম্পৃক্ত সূত্রগুলো বলছে, ভালো মানের গল্পের (কাগজ তৈরির মণ্ড) সঙ্কটের অজুহাতে বইয়ের উজ্জ্বলতার ক্ষেত্রে ‘অলিখিতভাবে’ ছাড় দেয়া হয়েছিল। কিছু কিছু মুদ্রণকারী ‘অতি নিম্নমানের নিউজপ্রিন্ট জাতীয় কাগজ’ দিয়ে বই ছাপিয়েছে। এগুলো আসলে এক ধরনের অজুহাত। ভেতরের খবর হচ্ছে- আসলে এবার মান দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে সংখ্যা। পাঠ্যপুস্তকের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে ভুলত্রুটি থাকা যে অমার্জনীয় অপরাধ সেটি যেন আমরা ভুলেই গেছি!
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com


আরো সংবাদ



premium cement