০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`
সময়-অসময়

গায়েবি মামলা : ‘লেফট হ্যান্ড অব দ্য ল’

-

২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের কথিত ‘গণতন্ত্রে’ একটি নতুন বিষয় সংযোজন হয়েছে যা ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালেই জোর আকার ধারণ করেছিল, সাংবাদিকদের ভাষায় যা ‘গায়েবি মোকদ্দমা’, আইন-আদালতে গায়েবি মোকদ্দমা বললেই বিচারক/বিচারপতি মহোদয় সহজেই বুঝতে পারেন, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে (!) নির্বাচন কমিশন ঘোষিত হয়েছে যে, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন-২০২৪-এর প্রথম মাসেই অনুষ্ঠিত হবে। যদি দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হয় তবে ধারণা করা হচ্ছিল যে, ২০২৩-এর মাঝামাঝি সময় থেকেই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ গায়েবি মোকদ্দমার সূচনা করার জন্য জনগণের বন্ধু (!) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গায়েবি মামলার তৎপরতা শুরু করবে। বিভিন্ন বিভাগীয় সদরে বিএনপির সমাবেশের সফলতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে- জেলায় জেলায় গায়েবি দেবতার আশীর্বাদ যেন ততই শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, যে নাটকের সর্বশেষ দৃশ্য পুলিশ কর্তৃক মঞ্চস্থ হয়েছে গত ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে এবং তার যবনিকা কোথায় কিভাবে মঞ্চস্থ তা সময়ের ব্যাপার।

ব্রিটিশ শাসনের বহু আগেই তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে জমিদারি প্রথা চালু হয়েছিল। রাজা, বাদশাহ, সম্রাটদের চাহিদা মোতাবেক উপঢৌকন প্রদান করে অঞ্চলভিত্তিক খাজনা আদায়ের ক্ষমতা দিয়ে মনোনীত করা হতো সে অঞ্চলের ‘জমিদার’। জমিদারের ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। সৃষ্টিকর্তার পরের স্থানই ছিল জমিদারের, একজন ভাগ্যবিধাতা হিসেবে। প্রজাদের রক্ত নিংড়ানো খাজনা আদায় করার নিমিত্তে জমিদাররা সৃষ্টি করেছিল ‘লাঠিয়াল’ বাহিনী। ২২ মার্চ ১৮৬১ সালে অপরাধকে ‘প্রতিরোধ’ ও ‘চিহ্নিত’ (Prevention and Detection of Crime) করার জন্য The Police Act-1861 প্রণয়ন করা হয়। সে পুলিশ পর্যায়ক্রমে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ বাহিনীর সৃষ্টি সে উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা ভুক্তভোগী জনগণ ভালো বলতে পারবে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকার প্রতিপক্ষকে নির্যাতন করার জন্য এ বাহিনীকে যে পদ্ধতিতে ব্যবহার করেছে, বাংলাদেশ সরকার সেই একই পদ্ধতি থেকে একটুকুও সরে আসেনি; বরং পেশাদারিত্বের পরিবর্তে পুলিশকে কাল্পনিক মামলার রচয়িতা ও লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করে সরকার নির্লজ্জভাবে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যার গতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সর্বশেষ উদাহরণ হলো গায়েবি মোকদ্দমা। ‘সদা সত্য কথা বলার’ যে শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকে দেয়া হয়েছে- গায়েবি মোকদ্দমা তা উল্টো প্রমাণ করে মিথ্যাকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে আইনের কভারেজের মধ্য দিয়ে আদালতের আশীর্বাদে এবং এ বিষয়ে আদালতের চোখে ধুলা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষম হয়েছে বলে তারা মনে করছে।
এদিকে মামলা কাল্পনিক জেনেও আদালত রিমান্ড দিচ্ছে, চার্জশিট দিচ্ছে- পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে, হাইকোর্ট আগাম জামিন দেয়ার পরও নিন্ম আদালত জামিন বাতিল করে জেলে দিচ্ছেন। বিদেশে আছে, পঙ্গু, মৃত্যুবরণ করেছে- এমন লোকও গায়েবি মামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রধান বিচারপতি মামলার জট কমিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যার প্রশাসনিক বিভাগীয় পর্যায়ে তদারকিতে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক। দেশব্যাপী থানায় থানায় দায়েরকৃত গায়েবি মোকদ্দমা মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়াও জনগণের যে হয়রানি হচ্ছে এ মর্মে অসহায় জনগণ অবশ্যই প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করে। জনগণের সে প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না জানি না, সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। গায়েবি মোকদ্দমা রুজু হওয়ার দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে না পারার কারণে রাজধানীতে অবস্থান নিচ্ছে, ফলে সরকারের গায়েবি মোকদ্দমা হিতে বিপরীত হতেও পারে।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগাম জামিন নেয়ার জন্য প্রতিদিনই শত শত মানুষ হাইকোর্টে ভিড় জমাচ্ছে এবং এদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে জানা যায়, কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং তারা জানে না এমন কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে এসব গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। তারা বলল, ১০ ডিসেম্বর সমাবেশে অংশ নিয়েই বাড়ি ফিরব। বিভিন্ন জেলায় যাদের সাথে আমার পরিচয় রয়েছে, টেলিফোনিক আলোচনায় দেখলাম, যেহেতু তিন-চার দিন আগে থেকেই সরকার দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ করে দেয় সেহেতু আগে থেকেই তারা ঢাকা চলে আসে। এ দিকে বিভিন্ন জেলা ও বিএনপি পল্টন অফিস থেকে গ্রেফতারের সংবাদ প্রতিদিনই পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার থেকে বলা হচ্ছে, নির্দোষ কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করছে না। এ ধরনের বক্তব্য সরকারের মুখে অহরহ প্রকাশ পেলেও পুলিশের ভাবমর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নষ্ট হচ্ছে, তারা বিদেশী Sanction পাচ্ছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ।
পৃথিবীতে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য জাতিসঙ্ঘ ১০টি আন্তর্জাতিক সনদ ঘোষণা করেছে- যাতে জনগণকে তাদের পছন্দ মোতাবেক রাজনীতি করার অধিকার দেয়া হয়েছে। তা ছাড়াও সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে- ‘আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার’ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের ও সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’
সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে পাখির মতো গুলি করছে। অথচ সরকারের ইন্ধনে পুলিশ সাংবিধানিক অধিকারের কোনো তোয়াক্কাই করছে না। কারণ, এতে তাদের প্রমোশন ও লোভনীয় পোস্টিংয়ের বিষয় জড়িত।

খেলা হবে বলে সরকারি দলের মুখপাত্র প্রকাশ্যে বেশ কয়েক দিন যাবৎ ঘোষণা দিয়ে আসছে এবং এ জন্য পাড়া-মহল্লøায় নেতাকর্মীদের পাহারা দেয়ার জন্য উসকে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় চেয়ারে বসে এ ধরনের বক্তব্য কতটুকু শোভন তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। কিন্তু ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে পার্টি অফিসে যে খেলা হলো সে খেলা সরকারি দল নিজেরা না খেলে পুলিশ দিয়েই খেলেছে। পুলিশ ও তাদের অস্ত্র এখন সরকারের এই খেলার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
বিএনপি অফিস থেকে কথিত বোমা উদ্ধারের বিষয়টি গণমানুষ বিশ্বাস করছে না। গণমানুষের ধারণা, ইয়াবা পকেটে ঢুকিয়ে নিরীহ মানুষকে পুলিশ যেভাবে হয়রানি করে, বিএনপি অফিসে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কথিত বোমা উদ্ধারের ঘটনার সময় মিডিয়ার সাথে পুলিশের তর্কাতর্কিতেই প্রমাণ হয়েছে, ‘ডাল মে কুছ কালা হায়’। সরকারি নিবন্ধিত মিডিয়াকে সরকার ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে সবার হাতে হাতে ইন্টারনেট মোবাইল থাকার কারণে সব কিছুই নিয়মিতই সব প্রচার পাচ্ছে। সরকার সম্পূর্ণভাবে পুলিশনির্ভর হয়ে পড়েছে, তারপরও ৮ ডিসেম্বর পুলিশ পাহারায় থেকেও আলিয়া মাদরাসার মাঠ ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে ঢাকা দক্ষিণের প্রভাবশালী মেয়র উদ্বোধনে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন।
পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জনগণের আস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কতটুকু সফল হবে? শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধের জন্য জনগণের আইনগত অধিকারকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রবাদ রয়েছে- ‘আইন সবার প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য।’ এ প্রবাদ এখন সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা, বানোয়াট হয়ে গেছে। কারণ আইন চলে যিনি আইনকে প্রয়োগ করে তার ইচ্ছামতো। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। এখানে আইনের অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ হচ্ছে আইন রক্ষার নামে, ইংরেজিতে যাকে বলা হয়- ‘Left hand of the Law’ি অর্থাৎ- আইনের ‘বাঁ’ হাত। মানুষের দু’টি হাত রয়েছে। আমরা সবাই জানি, এর একটি ‘ডান’ হাত, অপরটি ‘বাঁ’ হাত। কোন হাত কোন কাজে ব্যবহার হয় তা-ও আমরা জানি। সরকার নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আইনের ‘বাঁ’ হাতকে (Left Hand) ব্যবহার করছে, যাতে পক্ষান্তরে সরকারের জনবিচ্ছিন্নতাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement
ঢাবির শিক্ষক রহমত উল্লাহর একাডেমিক কার্যক্রম চালাতে বাধা নেই শর্তসাপেক্ষে ‘ফারাজ’ চলচ্চিত্র মুক্তির অনুমতি দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট গাজায় ফের ইসরাইলি বিমান হামলা আশুগঞ্জে ঘরের সিঁধ কেটে মা ও ২ সন্তানকে কুপিয়ে জখম শেয়ার বাজারে শেষ ৯ দিনে একটানা দরপতন আদানি শেয়ারের ইউক্রেন পৌঁছেছেন ইইউ প্রধান এলপিজির দাম বাড়লো আরো ২৬৬ টাকা সামরিক ঘাঁটিতে আরো বেশি মার্কিন প্রবেশ দিতে সম্মত ফিলিপাইন বিভাগীয় সমাবেশ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির বর্ধিত সভা সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে : মির্জা ফখরুল ৮৫০ দিন পর মুক্তি পেলেন সেই ভারতীয় মুসলিম সাংবাদিক

সকল