২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯, ৬ রজব ১৪৪৪
ads
`

বেগম রোকেয়ার রাজনৈতিক ভাবনা : একটি আলেখ্য

-

বেগম রোকেয়া! এ কোনো একজন ব্যক্তির নামমাত্র নয়। একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সফল বিপ্লব, একটি আলোকবর্তিকার নাম! এই প্রদীপের আলোতে আলোকিত হয়ে একটি জাতি অন্ধকার অমানিশা কাটিয়ে তার লক্ষ্যপানে কিভাবে বুক চিরিয়ে ধাবিত হয়েছে তা খুব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যখন তার কর্ম ও চিন্তা-চেতনা আমাদের সামনে থাকে। একটি দেশ তথা জাতির আত্মবিকাশের জন্য জাতীয়তাবাদ যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেই জাতীয়তাবাদের বীজকে রোপণ করা থেকে শুরু করে পরম যতœ আর পরিচর্যার মাধ্যমে পরিপূর্ণ মহীরুহে পরিণত করতে, নানাবিধ প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করতে, সেটিকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে ধাবিত করতে যারা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে জীবনের সবটুকু উজাড় করে দেন, তাদের অবদান স্মরণ করা অবশ্য কর্তব্য। বেগম রোকেয়া এমন একজন সমাজসংস্কারক ও রাষ্ট্রচিন্তক ছিলেন যাকে শুধু একজন নারী স্বাধীনতা কিংবা নারীমুক্তি আন্দোলনের কাণ্ডারি হিসেবে বিবেচনা করলে খানিকটা অন্যায়ই করা হয়।

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে এ উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক যে আলাপ শুরু হয় তা সময়ের ব্যবধানে ক্রমেই সমৃদ্ধি অর্জন করতে থাকে। এমনি এক সন্ধিক্ষণে বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলাধীন পায়রাবন্দ নামক গ্রামে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর ক্ষণজন্মা এই মহীয়সী নারীর জন্ম হয়। তার বাবার নাম ছিল জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের, যিনি একজন শিক্ষিত জমিদার ছিলেন। আর মায়ের নাম ছিল রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। জমিদার পরিবারে জন্মের সুবাদে ছোটবেলা থেকেই বেগম রোকেয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই অবলোকন করেছেন খুব কাছ থেকে, হৃদয় দিয়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনে নারী সমাজের প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাদেরকে সচেতন করে তোলার পাহাড়সম উঁচু, ইস্পাতকঠিন পথের কাণ্ডারি হিসেবে যাত্রা শুরু করেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে, নারী অধিকার নিশ্চিত করতে, তাদের সচেতন করে তুলতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯০৯ সালের ৩ মে স্বামী হারানো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিলেন ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে তার স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ দিয়ে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ চালু করার মধ্য দিয়ে; যদিও কিছু দিনের মধ্যে ভাগলপুর ছেড়ে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন এবং ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে নবউদ্যোমে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের কার্যক্রম আবার শুরু করেন।

সমাজের সমন্বিত সংহতি সাধনের সর্বোত্তম সোপানে সমাসীন হওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা, তার মধ্যে মেয়েদের বন্দিদশা অন্যতম বলে বেগম রোকেয়া মনে করতেন। তার অমর সৃষ্টি ’অবরোধবাসিনী’ কিংবা ’সুলতানার স্বপ্ন’ সেই কথারই প্রমাণ। কিন্তু নারীর ‘বন্দিদশা’ থেকে মুক্ত হওয়ার অর্থ কী? তিনি তার নিজের জীবনে ‘বন্দিত্ব’ থেকে মুক্ত হওয়ার প্রশ্নে কোন জিনিসটির ওপর আমল করেছেন? মুসলিম মেয়েদের পর্দা করা কিংবা ইসলামী পোশাক পরে ইসলামের সমস্ত নিয়ম-কানুন, প্রথা-পদ্ধতি মেনে চলেও যে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায়, জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঋদ্ধ হওয়া যায় তা তিনি নিজের জীবনে হাতে-কলমে দেখিয়ে গেছেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের সাবেক ছাত্রী রাবিয়া খাতুন তার ‘আমার দেখা বেগম রোকেয়া’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘বেগম রোকেয়া খুব পর্দা-পুশিদা মেনে চলতেন। কোনো মেয়ের গার্ডিয়ান দেখা করতে এলে তিনি পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতেন। এ ছাড়া নির্দেশ ছিল যে, বোর্ডার মেয়েদের সাথে বাবা-মা, আপন চাচা-মামা ছাড়া কেউ দেখা করতে পারবে না এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কথা বলতে পারবে না।’ ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনের পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ ও পরিপালন করে কেবল শিক্ষালাভের মাধ্যমে সচেতনতা অর্জন করেই নারী সমাজের বন্দিদশা ও যাবতীয় মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতাকে জয়লাভ করার প্রেরণার বাতিঘর হলেন বেগম রোকেয়া।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জোয়ার যখন আস্তে আস্তে উত্তাল ঢেউয়ে পরিণত হওয়ার পথ খুঁজছে সেই যুগ সন্ধিক্ষণে আবির্ভাব ঘটে রোকেয়া নামের এ বিপ্লবী সমাজসংস্কারকের। তিনি নারী সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তাদের কর্মঠ, আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ^াসী করে গড়ে তোলার যাবতীয় সরঞ্জামের আঞ্জাম দিয়েছিলেন অত্যন্ত সুচরুরূপে। এ জন্য তিনি তার স্কুলের মেয়েদের জন্য পাঠ্যপুস্তকের সাথে সাথে বাধ্যতামূলকভাবে সেলাই, মাটির কাজ, হাতের কাজ বিশেষ করে আলাদাভাবে চরকায় সুতা কাটার ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা সমসাময়িক সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরানো স্বদেশী আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। তিনি ১৯১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুসলিম নারীদের ঐক্যবদ্ধ করতে, সমাজে তাদের ন্যায্য হিস্যা প্রতিষ্ঠা করতে, সর্বোপরি দেশ ও জাতির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতাবোধ সৃষ্টির জন্য গঠন করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে নারীদের প্রথম সংগঠন।

জাতি গঠনের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের ছাত্রী জোগাড় করতে যেমন তিনি ঘরে ঘরে ঘুরতে কোনো ক্লেশ অনুভব করতেন না, তেমনি নানা রকম বিদ্রƒপ, সমালোচনা ও হাসি ঠাট্টার পাত্রী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম নারীদের সমিতির কার্যক্রমে শামিল করতে এক পা পিছু হটতেন না। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ধর্ম নারীদের অনেক সুবিধা দিয়েছে কিন্তু অজ্ঞতা, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার ও যুগ যুগ ধরে চলে আসা গোঁড়ামি ও অন্ধত্ব তাদেরকে শৃঙ্খলের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে। সমিতির মাসিক সভার মাধ্যমে মহিলাদের জড়ো করে রোকেয়া যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন তা ছিল এককথায় অকল্পনীয়।
এ অঞ্চলের মুসলিম জাতীয়তাবাদকে বিকশিত করে তা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ দিতে স্বদেশী কিংবা খেলাফত যে আন্দোলনের কথাই বলি না কেন, প্রত্যেকটিতে বেগম রোকেয়ার সরব উপস্থিতি ও মুসলিম মহিলাদের সে ব্যাপারে সচেতন করে গড়ে তোলাই ছিল তার মূল আরাধনা। মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুসলিম মেয়েদের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের ভাবধারা বুলন্দ করতে ‘চরকা’ আন্দোলনের ঢেউয়ে বাড়তি যে তরঙ্গমালা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও খদ্দর তৈরিতে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল যা স্পষ্টতই জাতীয়তাবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুসলিম নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন করে তুলতে তিনি তার লেখনীর পাশাপাশি সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বেড়াজাল ছিন্ন করতে স্বাধিকার আন্দোলনের অন্ধকার পথে আলোর মশাল জ্বালিয়েছেন। তিনি প্রথমত কংগ্রেস আন্দোলন তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের স্বার্থে কাজ করেন। কিন্তু তা পরবর্তীতে স্বতন্ত্র মুসলিম মানস তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যা ছিল অনিবার্যভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারক।
লেখক : শিক্ষক, নর্দার্ণ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
ইমেইল : rabiju80@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement
স্বল্প সময়ে বিচারকাজ সম্পন্ন করা বিচারক ও আইনজীবীদের দায়িত্ব : প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশ পুলিশ দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছে : প্রধানমন্ত্রী সিলেটের পরীক্ষা নিতে পারেনি চট্টগ্রাম শিপার্স কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি নজরুল সম্পাদক রিজভী ঢাকায় আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান সম্মেলন শুরু দক্ষিণখানে মটরসাইকেল নিয়ন্ত্রন হারিয়ে যুবক নিহত ডেনমার্কে কুরআন পোড়ানোর ঘটনায় ঢাকার নিন্দা যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যমাত্রা একটাই স্বৈরাচারী সরকারের পতন : আমীর খসরু মাশরাফীর অনন্য মাইলফলক চট্টগ্রামে চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

সকল