২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ৫ রজব ১৪৪৪
ads
`
সুশাসন

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল : প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইল

-

বাংলাদেশের সংবিধান যে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিতে রচিত প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন- এ বিষয়টি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(২) এ সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনার দফা (৩) এবং অনুচ্ছেদ ১১ অবলোকনে প্রতীয়মান হয় প্রজাতন্ত্রের মূল ভিত হলো গণতন্ত্র। প্রস্তাবনার দফা (৩) এ বলা হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার কারণে জন-অভিপ্রায়ের অবজ্ঞায় ও উপেক্ষায় ক্ষমতাসীন দলীয় সরকার ব্যতীত অন্য কোনো দলের বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের নজির না থাকায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জন-অভিপ্রায়ে গণদাবিতে পরিণত হয়।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়। এ ব্যবস্থাটি প্রবর্তন পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন যে পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর সবগুলোতে ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রহিত করা হয়। এ ব্যবস্থাটি রহিত পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন যে দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় উভয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়।
প্রতিটি দেশে সমাজ ও যুগ পরিবর্তনশীল। সমাজ ও যুগের পরিবর্তনের সাথে আইনের পরিবর্তনের আবশ্যকতা দেখা দেয়। গতিশীল সমাজে আইন স্থবির হলে তা সময় ও যুগের চাহিদা মেটাতে পারে না। সংবিধান দেশের প্রচলিত আইনের মতো একটি আইন। দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইনের সাথে সংবিধানের পার্থক্য হলো এর সংশোধন প্রক্রিয়া জটিলতর। আবার কখনো সংবিধান সংশোধনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে জন-আকাক্সক্ষা নিরূপণের ব্যবস্থা করা হয়। আইন প্রণয়ন ও এর সংশোধন সবসময় জন-অভিপ্রায়ে হয়ে থাকে। জনঅভিপ্রায়ের ব্যত্যয়ে কোনো আইন প্রণীত বা সংশোধিত বা বাতিল হলে তা দেশের জনগণের কল্যাণ ও মঙ্গল এবং দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকারক হয়।
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারবহির্ভূত প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয় সে অস্থায়ী সরকারটি জন-অভিপ্রায়ে দেশের তিনটি রাজনৈতিক জোটের সম্মিলিত ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল। এ অস্থায়ী সরকারটি সংবিধানসম্মত পন্থায় গঠিত না হলেও পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত দল জন-অভিপ্রায়ের বাস্তবায়নে সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ অস্থায়ী সরকারটিকে বৈধতা দান করে।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে সরকারি বা সম্মিলিতভাবে বিরোধী দলের সংবিধান সংশোধনের মতো প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। এ সংসদটি বহাল থাকাকালীন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সংসদ ও সংসদের বাইরে যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তীব্রতর করে এক পর্যায়ে সংসদ হতে পদত্যাগ করে। এমতাবস্থায়, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ হতে বিরত থাকে এবং সর্বতোভাবে নির্বাচনটি প্রতিহতের প্রয়াস নেয়। বৈরী পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জনঅভিপ্রায়ের বাস্তবায়নে একতরফা সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংবিধানে সন্নিবেশিত করে সংসদ অবলুপ্ত করে। সংসদের অবলুপ্তির পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীন পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম হয়। সব দলের অংশগ্রহণে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। সপ্তম সংসদ পূর্ববর্তী বাংলাদেশে কোনো সংসদ নির্ধারিত মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পারেনি। সপ্তম সংসদ মেয়াদ পূর্ণ পরবর্তী অবলুপ্ত হলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিএনপিভুক্ত জোট দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

সপ্তম সংসদের ন্যায় অষ্টম সংসদ মেয়াদ পূর্ণ পরবর্তী অবলুপ্ত হলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনবিষয়ক সব বিকল্প নিঃশেষিত না করে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি গঠিত হয়েছিল তা অংশীজনের মতভেদ ও কতিপয়ের পদত্যাগের কারণে কার্যকর না হতে পারায় অসাংবিধানিক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগমন ঘটে। এ সরকারটির অধীন অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও এর জোটভুক্ত দল দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। সরকার গঠন পরবর্তী আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিষয়ক স্বীয় অবস্থান হতে বিচ্যুত হয়ে জনঅভিপ্রায় ও জনআকাক্সক্ষার সম্পূর্ণ অবজ্ঞা ও উপেক্ষায় উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে সংসদে একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে।
সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী দলীয় সরকারের অধীন সংবিধান ও আইনের ব্যত্যয়ে অনুষ্ঠিত দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে নিজেদের বিজয় হাসিল করে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি অদ্যাবধি সংসদ কর্তৃক বৈধতাপ্রাপ্ত না হলেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতাবিষয়ক রিট মামলাটির আপিল শুনানি অন্তে প্রদত্ত রায়ে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় এ সরকারটির অধীন কৃত কার্যকে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়। প্রণিধানযোগ্য যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতাবিষয়ক রিট মামলাটি দায়েরের অর্ধ-যুগেরও অধিক সময়ের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব ঘটে। আর তাই স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয় এ মামলাটির আপিলের রায়ে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়ার অবকাশ কোথায়?
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক মামলাটির আপিল শুনানিকালে সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ হতে এতদবিষয়ে আটজন অ্যামিকাস কিউরির (আদালতের বন্ধু) মতামত চাওয়া হয়। এ আটজনের মধ্যে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সাতজনই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সপক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেন। আপিল রায়টি অবলোকনে দেখা যায় এটি ৪:৩ এ বিভক্ত রায়। রায় ঘোষণার ১৬ মাস পর রায় প্রদানকালীন প্রধান বিচারপতি পূর্ণাঙ্গ রায় লিখে তাতে স্বাক্ষর করেন। উচ্চ আদালতের রায় প্রদানের ব্যাপারে দেওয়ানি কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি এবং সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ রুলে যে বিধান রয়েছে তা হলো- প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করতে হবে এবং রায়ে স্বাক্ষর প্রদান করতে হবে। স্মর্তব্য যে, কর্মরত বিচারপতি বা বিচারকই কেবলমাত্র প্রকাশ্য আদালতে আসন গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত বা স্বাক্ষরিত ব্যতিরেকে প্রদত্ত রায়ের আইনগত অবস্থান কী তা অতি সহজেই অনুমেয়। রায় প্রদানকালীন প্রধান বিচারপতি অবসরজনিত কারণে রায়ে স্বাক্ষর করায় আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি ৩:৩ এ বিভক্ত রায়। এরূপ রায়ের ক্ষেত্রে আইনের বিধান বিষয়টি তৃতীয় বিচারপতি বা বিচারকের নিকট শুনানির জন্য উপস্থাপিত হবে এবং তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হবে। আলোচ্য রায়টির ক্ষেত্রে বিধানটি অদ্যাবধি প্রতিপালিত না হওয়ায় এটির অবস্থান সমভাবে বিভক্ত রায় হতে অভিন্ন কিছু নয়।

এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিএনপি কর্তৃক ষষ্ঠ সংসদে একতরফাভাবে কার্যকর করা হলেও এটি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের ফসল। আমাদের সংবিধানে একদা জনমত যাচাইয়ে গণভোট অনুষ্ঠানের বিধান ছিল। আদালত কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে এ বিধানটি অবলুপ্ত হয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনকালীন সংবিধানে গণভোটের বিধান বহাল থাকলেও সে সময়কার ক্ষমতাসীন বিএনপি জন-অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দিয়ে গণভোট ব্যতিরেকেই বিধানটি প্রবর্তন করেন। বর্তমানে সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলেও জন-অভিপ্রায়ে গণভোটের আয়োজন সংবিধান বা আইন দ্বারা বারিত নয়। এ ব্যবস্থাটি প্রবর্তনকালীন গণভোটের আয়োজন করা হলে অথবা বর্তমানে যদি এ বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করা হয় তাতে জনমানুষের অভিমত ফলাফলে ভিন্নতা দেখা দেবে না।
আওয়ামী লীগ কর্তৃক জনঅভিপ্রায়ের অবজ্ঞা ও উপেক্ষায় সংসদে নিরেট সংখ্যাগরিষ্ঠার জোরে একটি মীমাংসিত বিষয়কে বিতর্কের আবর্তে নিয়ে আসায় যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পুনঃআবির্ভাব ঘটেছে এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো অনুরূপ বা সহজাত ব্যবস্থায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন। বাতিল কার্যটি জনঅভিপ্রায় এবং আইন ও এর বিধিবিধানের অবজ্ঞা ও উপেক্ষায় সম্পন্ন হওয়ায় এর বৈধতা যে প্রশ্নের বেড়াজালে আবদ্ধ এতে কোনো সংশয় নেই। আর তাই সংশয় নিরসন করে এর থেকে উত্তরণ ব্যতীত বিকল্প কিছু নেই এমনটিই প্রতিভাত।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement