০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

নেইপিডোর ঔদ্ধত্য : বন্ধুত্রয়ের ঔদাসীন্য

-

প্রায় দুই মাস ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর আরাকান আর্মির সাথে জান্তাবাহিনী ‘তাতমাডা’র তুমুল যুদ্ধ চলছে। ফলে জান্তাবাহিনী বারবার বাংলাদেশের সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিবাদকে নেইপিডো সরকার আমলে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। অন্য দিকে বাংলাদেশের তিন বন্ধুপ্রতিম দেশ- চীন, ভারত ও রাশিয়া এ নিয়ে উদাসীন। এ জটিল পরিস্থিতিতে তাদের কাউকে আমাদের পাশে পাওয়া যাচ্ছে না।
১৪ আগস্ট ২০২২ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিয়ানমার জান্তাবাহিনীর হেলিকপ্টার বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সীমানা অতিক্রম করে। গত ২৮ আগস্ট তাদের নিক্ষিপ্ত মর্টার শেল ঘুমধুমের তুমব্রু এলাকায় এসে পড়ে, তবে সৌভাগ্যক্রমে বিস্ফোরিত হয়নি। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর জান্তাবাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া দু’টি গোলা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এলাকায় এসে পড়ে। ৯ সেপ্টেম্বর তুমব্রু এলাকায় আরো একটি গোলা এসে পড়ে। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের ছোড়া একটি মর্টার শেল বাংলাদেশের শূন্যরেখা বরাবর রোহিঙ্গা শিবিরে এসে পড়ে বিস্ফোরিত হয়ে ১৭ বছরের মো: ইকবাল নিহত হয় ও পাঁছজন আহত হন। ওই দিন একই এলাকায় সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে উইনু থোয়াইং তঞ্চঙ্গ্যা নামে একজনের পায়ের নিম্নাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরনের আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনে ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে চারবার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে নেপিডো আরকান আর্মির ওপর দোষ চাপিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের এ ধরনের উসকানিমূলক কার্যক্রমের পেছনে তাদের বহু ধরনের উদ্দেশ্য ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সেনা-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখল করেন। এ ক্ষমতা দখল ছিল মূলত সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের গোষ্ঠীগত ক্ষমতা এবং জাতীয় অর্থনীতি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য, স্বার্থ বহাল রাখার নিশ্চয়তা বিধানে। এরই মধ্যে জান্তাবাহিনীর সাথে সঙ্ঘাত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। কারেন, তোসাং ও কাচিন প্রদেশেও বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বিদ্রোহীরা জান্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। বর্তমানে ১৭ শতাংশ ভূমিতে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ৫২ শতাংশ জাতীয় ঐক্যের সরকারের (এনইউজি) নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি অঞ্চলে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর একক কর্তৃত্ব নেই (ডেইলি স্টার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২)। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৯ সালে গড়ে ওঠা আরাকানি বৌদ্ধদের সংগঠন ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) সামরিক শাখা ‘আরাকান আর্মি’ রাখাইনে তাদের আধিপত্য কায়েম করেছে। এদের প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। রাখাইনে তারা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় রাখাইন রাজ্যের আধিপত্য নিয়ে আরাকান আর্মি এবং জান্তাবাহিনীর মধ্যে মরণপণ লড়াই শুরু হয়েছে। গত দেড় মাসে আরাকান আর্মি জান্তা সরকারের দু’টি সেনাচৌকি দখল করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কৌশলগত স্থান পালেতোয়াতে আরাকান আর্মি নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন গোরিলা যুদ্ধোপযোগী পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ এলাকায় ‘আরাকান আর্মি’ শক্ত অবস্থান গড়তে পারলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সাথে তাদের যোগাযোগ জান্তা সরকারের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইনের দখল ধরে রাখতে মারিয়া হয়ে উঠেছে। মূলত এর ফলে এ ভয়ঙ্কর যুদ্ধের গোলাবারুদ সীমান্ত সন্নিকটের এলাকায় বাংলাদেশে এসে পড়ছে। তা ছাড়া জান্তা সরকারের একটি সন্দেহও থাকতে পারে যে, বাংলাদেশে আরাকান আর্মির কোনো ঘাঁটি আছে কি না। এসব এলোমেলো গোলা ছোড়া ও আকাশসীমা অতিক্রান্তের মাধ্যমে সেসব কাল্পনিক আরাকান আর্মির ঘাঁটি খোঁজা ও বাংলাদেশকে সরব বার্তা দেয়ার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। এমনকি আরেক দফা রোহিঙ্গাদের ঠেলে পাঠানোর পটভূমি তৈরিতে এমনটি হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। কেউ মিয়ানমারের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মতৎপরতাকে উসকানি হিসেবে দেখছেন যেন, বাংলাদেশকে সীমান্ত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বিশ্ববাসীকে বুঝানো যায়- রোহিঙ্গা সমস্যা তাদের অভ্যন্তরীণ নয়; বরং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় জটিল সমস্যা। এতে করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুটি অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়। জান্তা সরকারের আরো একটি উদ্দেশ্য এর মধ্যে লুক্কায়িত থাকতে পারে- মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধাবস্থা ও বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর বিদ্রোহী তৎপরতার সময় তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে সব বিদ্রোহীকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে চেষ্টা করা। তা ছাড়া চলমান গৃহযুদ্ধ ও করোনায় গত ২০ বছরের মধ্যে মিয়ানমারের দারিদ্র্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ সময় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে একটি যুদ্ধে দেশকে জড়াতে পারলে মানুষের মনোযোগ অন্য দিকে সরানো সম্ভব হতে পারে। এ দিকে ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বহির্বিশ্বের কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে জান্তা সরকার আরো মারিয়া হয়ে উঠেছে- কোনোভাবে যেন বাংলাদেশের সাথে ইউএলএ’র যোগাযোগ স্থাপিত হতে না পারে। ইতোমধ্যে আরাকান আর্মি রাখাইনের অনেকাংশে প্রশাসন কায়েম করতে সক্ষম হয়েছে। এখন তারা রাজ্যটির পুরো নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্য দিকে জান্তাবাহিনীও কিছুতে রাখাইনের দখল ছাড়তে রাজি নয়। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় রাখাইনের কৌশলগত অবস্থান দুই বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য রাখাইন অঞ্চলে ভূমির আধিপত্য হারিয়ে তারা এখন বিমান হামলার মাধ্যমে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। একই সাথে দূর থেকে নিক্ষেপযোগ্য মর্টার ও আর্টিলারির গোলা ছুড়ছে, যার ফলে এসব গোলা মাঝে মধ্যে আমাদের ভূমিতে এসে আছড়ে পড়ছে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কারণ ছাড়াও আর্থ-বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন। বর্তমান বাস্তবতায় ভারত, চীন ও রাশিয়া আমাদের সবচেয়ে বেশি বন্ধুপ্রতিম দেশ বলে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশের এমন দুর্দিনে এই তিন দেশ আমাদের থেকে দূরত্ব বজায়ে রাখছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ দেখা যাচ্ছে। রাখাইনে এসব দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিজেদের (চীন-ভারত) আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও বৈশ্বিক ক্যানভাসে ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে তিনটি দেশই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। লক্ষণীয় যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত ভারত সফর শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে নেইপিডোর সীমান্ত লঙ্ঘন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এটি কি কাকতালীয়, নাকি চীনের কোনো বার্তা ছিল? যুগ যুগ ধরে সামরিক শাসিত ও পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন মিয়ানমারকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছে বেইজিং। চীনের বিআরআই-এর ছয়টি করিডোরের একটি রাখাইন রাজ্য দিয়ে যাবে। এরই মধ্যে মিয়ানমারে ২১টি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগের এমওইউ স্বাক্ষর করেছে চীন। চীনের কুনমিং থেকে আরাকানের কাইয়াকপু পর্যন্ত পাইপলাইনের পাশাপাশি রেললাইন বসিয়ে ভারত মহাসাগরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে বেইজিং। রাখাইনের কয়াকপিউতে চীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছে। এটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও এ সময় আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দিল্লিও মিয়ানমারে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। ভারত রাখাইনের ‘সিত্তুইয়ে’ বন্দর পুননির্মাণ করে ‘কলাদান মাল্টিমোডাল হাইওয়ের’ মাধ্যমে সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত করবে। তা ছাড়া তারা মিয়ানমারে কিলোকাস সাবমেরিন, ব্রহ্ম মিসাইল, তেজশ জঙ্গিবিমান সরবরাহ করেছে। আরো লক্ষণীয়, ভারত এবার মিয়ানমারের চীনা নির্ভরতা কমানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে জান্তা সরকারকে জোড়ালো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আরেক বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়াও এ দুর্দিনে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে সহযোগিতা করছে। দেশটিকে বিপুল অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম সরবরাহ করছে। তাই মিয়ানমার জান্তাবাহিনী নিজ দেশে বিদ্রোহ দমাতে রাশিয়ার মিগ-২৯, ইয়াক-১৩০ ও চীনের এফ-৭ বিমান ব্যবহার করছে।

অন্যান্য কার্যকারণ ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমাদের এই বন্ধুরাষ্ট্র তিনটি নেইপিডোর সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে নীরব। ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখিত তিনটি দেশই মুসলিমবিরোধী। চীনের উইঘুরে চরম মুসলিম নির্যাতন চলছে। মিয়ানমার বৌদ্ধদের আবাসভূমি, আর চীনও মূলত বৌদ্ধ অধ্যুষিত রাষ্ট্র। আবার ভারতের সরকার বর্তমানে মুসলিম নির্যাতনের ওপর ভর করে রাজনীতি করছে। রাশিয়ার মুসলিম নির্যাতনের ইতিহাস বিশ্ববাসী এখনো ভুলেনি। চেচনিয়াকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার কথা আমাদের সবার জানা। কাজেই রাষ্ট্র তিনটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিপদে বিচলিত হবে, এমন ভাবার অবকাশ খুবই কম! ফলে মিয়ানমারের সাথে কোনো ধরনের সঙ্ঘাতে আমাদের এ তিন বন্ধুরাষ্ট্র ঢাকার পাশে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না! এরই মধ্যে আবার যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি আমাদের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে, যা তিনটি দেশের জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে।

নেইপিডোর এ ধরনের পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধানোর ঔদ্ধত্যে আমাদের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনার দাবি রাখে। আমরা দেশটির রাষ্ট্রদূতকে চারবার সতর্ক করেছি। জাতিসঙ্ঘে যাওয়ার হুমকি দিয়েছি। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে জানিয়েছি, যদিও সেখানে চীনের রাষ্ট্রদূত হাজির হননি। অবশ্য পরবর্তী সময়ে চীনের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানানো হয় মিয়ানমারকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত করতে। চীন কূটনৈতিক ভাষায় হ্যাঁসূচক জবাব দিয়েছে। এটি সত্যও হতে পারে যে, নেইপিডো বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ কারণে আমাদের যুদ্ধে জড়ানোর কূটচাল চালছে। কিন্তু বুঝতে হবে নেইপিডোর জান্তা সরকারের কি এখন ওই সামর্থ্য আছে? নিজের দেশ যে সামলাতে পারছে না তারা কিভাবে অন্য দেশের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে? এরই মধ্যে মিয়ানমারের ছায়া সরকার এনইউজি’র ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ জান্তাবাহিনী ‘তাতমাডা’র বিরুদ্ধে ব্যাপক সফলতা পাচ্ছে। দেশের প্রায় ৩৬টি বিদ্রোহী গোষ্ঠী-স্বায়ত্তশাসনের উদ্দেশ্যে সরকারবিরোধী যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছে এবং সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কাজেই জান্তা সরকারের এ মুহূর্তে তৃতীয় কোনো দেশের সাথে যুদ্ধ বাধানোর সাহস ও সামর্থ্য কোনোটি নেই। হ্যাঁ! নেইপিডো হয়তো বা যুদ্ধের পরিবর্তে হালকা সীমান্ত সংঘর্ষ বাধিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝামেলা বাধানোর বা সীমান্তে গোলা বিনিময়ের চোরাবালিতে বাংলাদেশকে আটকানোর ষড়যন্ত্র করতে পারে! কিন্তু আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর যথেষ্ট সক্ষমতা, মনোবল ও প্রশিক্ষণ রয়েছে। কাজেই কমপক্ষে একটি ভয় দেখানোর মতো ম্যানুভার মহড়ার পাশাপাশি জোড়ালো কূটনৈতিক তৎপরতা চলতে পারত। সামরিক শক্তির পটভূমির সামনের ভাগের কূটনৈতিক পদক্ষেপ খুব কার্যকর হতে পারত। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত দামি। ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, কোয়াড, অকাস ইত্যাদির ডাইনামিকসে কাজে লাগানো, ইন্দো-চীন দ্বন্দ্বের উপাদানগুলো সুযোগে পরিণত করে নেয়া, আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে ভারতের অতি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও সেভেন সিস্টারের নিশ্চিত নিরাপত্তা বিধান এবং বিশ্বদরবারে একঘরে হয়ে যাওয়া রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের হাতছানি ইত্যাদি যেকোনো ইস্যুকে সতর্কতার সাথে কাজে লাগিয়ে আমরা হয়তোবা মিয়ানমারের অগ্রহণযোগ্য আচরণকে দমন করতে পারতাম।

তবে আমাদের নিজেদের বিস্তর দুর্বলতা রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে আমরা এখন স্পষ্টত দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। শাসক ও শাসিতের মধ্যে অনৈক্য আমাদের প্রধান দুর্বলতা। দেশের চলমান রাজনীতির বিভাজন রেখা ওই দু’টি ভাগকে মুখোমুখি করে রেখেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে এ বিভাজন ও তার ভিত্তিতে হানাহানি তত তীব্রতর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা ও আঞ্চলিক গেম মেকার দেশগুলো আমাদের এসব গৃহবিবাদে জড়িত হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় আমাদের অনেক দরকষাকষির অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আমরা শক্ত সামরিক-কূটনীতির ভূমিতে দাঁড়াতে পারছি না! এটি শুধু সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার দুর্বলতা, জাতীয় দুর্বলতা! নইলে মিয়ানমারের মতো একটি দেশ আমাদের মাতৃভূমির বিরুদ্ধে এত আগ্রাসী কিভাবে হয়ে উঠতে পারে? যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে জাতির জন্ম সেই জাতির সামনে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত, শত গোষ্ঠীতে বিভক্ত একটি জাতি কিভাবে এ ধরনের ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে পারে? আমাদের আজ আত্মবিশ্লেষণ করে নিজেদের সংশোধন করতে হবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email : maksud2648@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement