০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটানোর চেষ্টা

-

মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক রিজার্ভ ঘাটতি, জ্বালানি মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতিতে অস্থির আমাদের অর্থনীতি। ভিন্ন মহাদেশের দুটি দেশের যুদ্ধ আমাদের দেশের ওপর একটি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বেশ আশ্চর্যজনক হলেও এটাই বাস্তবতা। যা এডওয়ার্ড লরেঞ্জের কেওয়াজ থিওরির অন্তর্নিহিত নীতি বাটারফ্লাই এফেক্ট। বাটারফ্লাই এফেক্ট হলো প্রাথমিক অবস্থার ওপর সংবেদনশীল নির্ভরতা যেখানে একটি নির্ধারক ননলিনিয়ার সিস্টেমের অবস্থার ছোট পরিবর্তন পরবর্তী আরেকটি অবস্থায় বড় পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে। ইউক্রেন-রাশিয়ার একটি ছোট রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যা যুদ্বের সৃষ্টি করল এবং এ যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্ব তথা অপরপ্রান্তের দূরের দেশটিও নেতিবাচক প্রভাবে পর্যুদস্ত। আমাদের তাই সহজে মুক্তি মিলছে না।
এর ফলাফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। কোভিড মহামারী-পরবর্তী বিভিন্ন পরিষেবা এবং পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়া আকাশচুম্বী শিপিং খরচ, জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী বাজার, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির বড় প্রভাব যোগ করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে ৪৬% পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে এবং রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। রিজার্ভ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে ঋণের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যমান রিজার্ভ সঙ্কট মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান সর্বকালের সর্বোচ্চ অবনমন করেছে, আগস্টে দেশের কার্ব মার্কেটে এক ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ১২০ টাকাতেও উঠতে দেখা গেছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এর একটি বড় কারণ। দেশের অর্থনীতির জন্য যা একটি বড় সঙ্কট।


পেট্রোলিয়াম অর্থনীতিবিদ Maciej Kolaczkowski বলেন, জালানির উচ্চমূল্য কার্যত সব পণ্য ও পরিষেবার মূল্যবৃদ্ধির মূল নিয়ামক। এটি মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা আরো বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানির উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি পরোক্ষভাবে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পরিবহন, পণ্যের উৎপাদন খরচসহ সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সরকার আগস্ট মাসে রাতারাতি জ্বালানির মূল্য প্রায় ৫০% বৃদ্ধির ঘোষণা করে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটা মনে করা হয় যে, এ ধরনের পদক্ষেপ আইএমএফের ঋণসংক্রান্ত শর্তের কারণে করা হয়েছিল। যা হোক, যখন দেশ ইতোমধ্যেই রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতির চাপ পর্যবেক্ষণ করছে, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বেশ বিরূপ প্রভাব তৈরি করেছে। যার কারণে পরিবহন খরচ, সেচ খরচ এবং দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচসহ সব ক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে আয়ের একটি বড় অংশ সমন্বয় করতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির হারের কথা বললে, বাংলাদেশ জুন মাসে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ শিখর প্রত্যক্ষ করেছে, যা নয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ ৭.৫৬ শতাংশ ছিল, কারো কারো মতে তা ১২ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের সাধারণ জনগণের জন্য এটি একটি উদ্বেগের বিষয় ছিল, এমনকি অনেকে এটিকে ‘পরবর্তী শ্রীলঙ্কা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। এত প্রতিকূলতার ভেতরেও বাংলাদেশ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ সফলতা দেখাচ্ছে। ডলার সঙ্কটের বিপরীতে আরএমজি সেক্টরে রফতানি শক্তিশালী হয়েছে, নতুন নতুন নীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে রেমিটারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা চলছে। সরকার এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক ফল পেতে শুরু করেছে। রিজার্ভের ওপর কিছুটা চাপ কমেছে এবং বাণিজ্য ঘাটতিও হ্রাস পাচ্ছে।


বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল এবং এবা পি লার্নার-এর ‘মার্শাল লার্নার কন্ডিশন’ দেখলে বুঝা যায় যে, একটি দেশের রফতানি ও আমদানির সম্মিলিত মূল্য স্থিতিস্থাপকতা একের বেশি হলে, মুদ্রার অবমূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যের ভারসাম্যকে উন্নত করে। ওই সূত্র অনুযায়ী সরকারের বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত নীতি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পাবার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়াও সরকার সম্প্রতি মুদ্রা বাজারে ডিমান্ড-সাপ্লাই নির্ভর আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে স্থিতিশীল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে সরকারের ঋণ পাবার প্রচেষ্টা সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে তা দেশের চলমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে ইতিবাচক ধারায় প্রভাবিত করবে।
সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভারসাম্য রক্ষা করতে ডলারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সঙ্কোচনের লক্ষ্যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়সংক্রান্ত কঠোর নীতি, সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফর বন্ধ, বিলাসবহুল পণ্যের আমদানির ওপর বিধিনিষেধ এবং এর ওপর উচ্চ আমদানি করসহ বিবিধ আইন বাস্তবায়ন করছে। আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমার কারণে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা কমেছে, ভবিষ্যতে তা আরো কমার সম্ভাবনা রয়েছে। অচিরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির হারও কমে আসবে, সামগ্রিকভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে। যদিও বৈশ্বিক সামগ্রিক ঝড় এখনো কাটেনি, তবুও বিশ্বের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ অনেক দেশের তুলনায় এখনো এগিয়ে রয়েছে।
শঙ্কার বিষয় বিশ্বব্যাংকের বিবৃতি অনুযায়ী আমরা একটি বৈশ্বিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে রয়েছি, তাই এখনই আমাদের মন্দা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যা যা করণীয় এর আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা দরকার। দেশের কল্যাণ সুরক্ষিত করার বিষয়গুলোকে নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। সমালোচনা এবং সংশয় চলমান, এগুলো সর্বদা অব্যাহত থাকবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে সরকারের চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে, অচিরেই এর সফলতা আসবে আশা করা যায়।
লেখক : এ লেভেল স্টুডেন্ট
এসএফএক্স গ্রিন হেরাল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ
ঢাকা, বাংলাদেশ
ই-মেইল: nafisuddin2910@gmail.com

 

 

 


আরো সংবাদ


premium cement