২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও গোপন কারাগারের বৈধতা

সুশাসন
-

অপরাধ বিষয়ে আমাদের দেশে মূল যে আইন সেটি দণ্ডবিধি নামে অভিহিত। এটি একটি সাধারণ আইন। দণ্ডবিধিতে অপরাধের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, অপরাধ বলতে এই বিধিবলে দণ্ডনীয় কোনো বিষয় বুঝাবে। দণ্ডবিধিতে প্রতিটি অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। একজন ব্যক্তি দণ্ডবিধিতে বর্ণিত কোনো অপরাধ সংঘটন করলে ফৌজদারি কার্যবিধিতে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী অপরাধ সংশ্লেষে তদণ্ড ও বিচারকার্য সমাধা করা হয়। দণ্ডবিধি ছাড়া অপর কিছু আইনেও অপরাধের সাজার বিধান রয়েছে। এসব আইনকে বিশেষ আইন বলা হয় যেমন- অস্ত্র আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রভৃতি।
যেকোনো ব্যক্তির সংঘটিত অপরাধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। আর এ কারণেই দেশের অভ্যন্তরে অথবা বিদেশে দেশ সম্পর্কে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দেশের প্রচলিত মূল দণ্ড আইন দণ্ডবিধি অথবা অপরাধবিষয়ক যেকোনো বিশেষ আইনের অধীনে বিচারকার্য সংঘটিত হয়।

সংবিধানে আদালতের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো আদালত। একজন ব্যক্তি দণ্ডবিধি বা অপর কোনো বিশেষ দণ্ড আইনের অধীন অপরাধ সংঘটন করলে তিনি ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হন। এরূপ ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে- ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকার রয়েছে।
কারাগার অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অথবা অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আবাসস্থল। অপরাধ সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিচারিক আদেশ ব্যতীত কারাগারে প্রবেশ অথবা কারাগার হতে বের হওয়ার অনুমোদন নেই; তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা সরকার কর্তৃক প্যারোলে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতের আদেশ ব্যতিরেকে কারাগার হতে বের হতে পারে।
দণ্ডবিধিতে আদালতকে পাঁচ ধরনের দণ্ডারোপের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ পাঁচ ধরনের দণ্ড হলো ১. মৃত্যুদণ্ড ২. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ৩. সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড ৪. সম্পত্তির বাজেয়াপ্তি ও ৫. অর্থদণ্ড।

বর্তমানে বলবৎ দণ্ডবিধিটি ১৮৬০ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত হয়। দণ্ডবিধি প্রণয়নকালে বেত্রাঘাত সাজা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল যা ১৯৪৯ সালে অবলুপ্ত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে প্রণীত জাতিসঙ্ঘ সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৫ আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) এর অনুরূপ। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদে যেসব দেশ স্বাক্ষর করেছে সেসব দেশ সনদের বিধানাবলির সাথে দেশে কার্যকর আইনকে সামঞ্জস্য করার অভিপ্রায়ে শারীরিক নির্যাতনকে দণ্ডের প্রকারভেদ হতে অবলুপ্ত করেছে।
আইনের বিধান অনুযায়ী আদালত ব্যতীত অপর কোনো কর্তৃপক্ষ দণ্ড প্রদানের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন। স্পষ্টত শারীরিক নির্যাতন দণ্ড নয়। শারীরিক নির্যাতন সংবিধানের ধারা ৩৫(৫) ও (৬) এর পরিপন্থী। আর পরিপন্থী হলে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নব সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ ৭ক (১)(খ) এর সাথে সাংঘর্ষিক।
একজন অপরাধীকে অপরাধের বিবেচনায় বিচার পরবর্তী যদি মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়ে তা কার্যকর করা হয় সে ক্ষেত্রে এটিকে বিচারিক হত্যাকাণ্ড বলা হয়। বিচারিক হত্যাকাণ্ড যেকোনো দেশের প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় অনুশাসনে স্বীকৃত ও সমর্থিত, যদিও বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ডের সাজা রহিত করা হয়েছে।
আমাদের দেশের লোকজন বিগত প্রায় দুই দশকের অধিক সময় ধরে ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু’ শব্দটির সাথে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিটি ক্রসফায়ারে মৃত্যুপরবর্তী শৃঙ্খলাবাহিনী অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হতে একই ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়। আর বক্তটি হলো আটক পরবর্তী পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলির কারণে মৃত্যু ঘটেছে অথবা আটক ব্যক্তিকে নিয়ে তার দেখানো মতে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে তার অনুগত বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হওয়া পরবর্তী আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়লে মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের মৃত্যুকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয় এবং যেকোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালানো অবমাননাকর।
পুলিশ, র‌্যাব, শৃঙ্খলাবাহিনী অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেকোনো সদস্য কোনো অপরাধী বা তার অনুগত বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার্থে কতটুকু শক্তি বা বল প্রয়োগ করতে পারবে তা আইনে নির্ধারিত। এ বিষয়ে দণ্ডবিধির ধারা ৯৭-এ মনুষ্য দেহ ক্ষুণœকারী যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে তার স্বীয় দেহ ও অন্য যেকোনো ব্যক্তির দেহের প্রতিরক্ষার অধিকার দেয়া থাকলেও সে অধিকারের ব্যাপ্তি এতটুকু বিস্তৃত নয় যে, এ যাবৎকাল ক্রসফায়ারের নামে যে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তাতে একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তিতে ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতার গ্রহণযোগ্যতার অবকাশ সৃষ্টি হয়।

পোশাকধারী বা পোশাকবিহীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য কর্তৃক বাড়ি অথবা যেকোনো স্থান থেকে তুলে নিয়ে হত্যাপূর্বক লাশ গুমের ঘটনা সাম্প্রতিককালে ক্রসফায়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। ক্রসফায়ারের সাথে এ হত্যাকাণ্ডের পার্থক্য হলো ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন লাশটি ফিরে পেয়ে ধর্মীয়ভাবে সৎকারের ব্যবস্থা করতে পারে যেটি শেষোক্তটির ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এমনকি তুলে নেয়া পরবর্তী লাশ ফেরত না পাওয়া গেলে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনদের দীর্ঘকাল এ ধারণাটি বদ্ধমূল থাকে যে, হয়তোবা তুলে নেয়া ব্যক্তি জীবিত রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যে কতটুকু মর্ম বেদনাদায়ক তা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ব্যতীত অপর কেউ অনুধাবন করতে পারবে না।
একজন ব্যক্তি অপরাধী গণ্যে পুলিশ বাহিনীসহ শৃঙ্খলাবাহিনী বা যেকোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকাকালীন ক্রসফায়ারসহ যেকোনো কারণে মৃত্যুবরণ করলে ওই বাহিনীকে মৃত্যুসংক্রান্ত সন্তোষজনক কারণ দেখাতে না পারলে অবশ্যই এর দায় বহন করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত বা বাহিনীটির তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যার নির্দেশে ক্রসফায়ার বা গুমের মাধ্যমে মৃত্যু কার্যকর হয়েছে সমরূপ দায় অবশ্যই তার। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও এ দায় থেকে নির্দেশ পালনকারী ও নির্দেশ প্রদানকারী উভয়ের কেউই অবমুক্ত নন।

১৯৮৪ সালে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে নিউ ইয়র্কে নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে সনদটিতে স্বাক্ষর দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৫(৫) এর বিধান অনুযায়ী নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ বিধায় জাতিসঙ্ঘ সনদ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে কার্যকর রূপ দেয়ার লক্ষ্যে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়।
২০১৩ সালে প্রণীত আইনটিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যুকে শাস্তিযাগ্য অপরাধ গণ্যে দণ্ড দেয়ার বিধান করা হয়েছে। আইনটিতে হেফাজতে মৃত্যুর যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘হেফাজতে মৃত্যু’ অর্থ সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু; এ ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বলতে অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেফতারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও নির্দেশ করবে; কোনো মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে। আইনটির ভাষ্য মতে, ‘সরকারি কর্মকর্তা’ অর্থ প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপর দিকে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অর্থ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী অথবা অপর কোনো রাষ্ট্রীয় ইউনিট যা বাংলাদেশ প্রতিরক্ষার জন্য গঠিত। আইনটিতে প্রদত্ত ‘হেফাজতে মৃত্যু’-এর সংজ্ঞা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় ওই সংজ্ঞায় সরকারি কর্মকর্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতকে আকৃষ্ট করলেও সশস্ত্রবাহিনীর হেফাজতকে আকৃষ্ট করে না।
রিমান্ডজনিত কারণে মৃত্যু ও নির্যাতন নিরোধকল্পে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ সালে প্রণীত হলেও এ আইনটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথে এখনো যে অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকি রয়েছে তা রিমান্ড সংশ্লেষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যু ও নির্যাতনের প্রকাশিত সংবাদ অনুধাবনে অতি সহজেই অনুমেয়।
পুলিশ, পুলিশের বিশেষ শাখা বা বিভাগ, দুদক বা অন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সশস্ত্রবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ বা এর কোনো শাখাকে দেশের প্রচলিত আইন কোনো ধরনের গোপন কারাগার রাখার অনুমোদন দেয় না। এরূপ গোপন কারাগারে রেখে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটন বা গুম করা মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। পুলিশ বা এর কোনো বিভাগ বা শাখা বা অপর কোনো বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ বা শাখার বেআইনি হেফাজত যেমন আইনের সুস্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন অনুরূপ এরূপ বেআইনি হেফাজতে থাকাকালীন যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের শিকার প্রভৃতি কোনোভাবেই কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। এরূপ কার্য সংঘটনের দায় থেকে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিরাসহ তাদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ন্যস্ত ব্যক্তিরাও অবমুক্ত নন। এ ধরনের অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় নিজেদের জীবদ্দশায় সময়ের পরিক্রমায় দেশের প্রচলিত আইনের বিচার অথবা প্রকৃতির বিচার এড়াতে পারেননি।
একজন ব্যক্তি যেকোনো অপরাধ সংঘটন করলে তাকে বিচারের মাধ্যমে আইন দ্বারা স্বীকৃত সাজা প্রদান পৃথিবীর সর্বত্র অনুসৃত হয়ে আসছে। এর ব্যত্যয়ে বিচারবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় গোপন কারাগারে দীর্ঘ দিন আটক রেখে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন অথবা গোপন কারাগার থেকে নিয়ে ক্রসফায়ার বা গুমের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানো অথবা বলপূর্বক আটকপরবর্তী ক্রসফায়ার বা গুমের মাধ্যমে মৃত্যু সংঘটন কোনোভাবেই আইনের অনুসরণে হয়েছে এমনটি দাবি করার সুযোগ নেই। তাই যে হত্যাকাণ্ড ও কার্যকলাপ আইনসিদ্ধ নয় তা থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত নয় কি? হ
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেøষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement