০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

‘ব্লু-ইকোনমি’ : বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বস্ত সহযোগী

-

ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কে বলার আগে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন বোধ করছি। বিশ্বের প্রায় সব নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ একমত যে, বেশির ভাগ দেশই মন্দার দিকে ধাবিত। এমনকি বিশ্বে ১৯৭০ দশকের সেই স্ট্যাগফ্লেশনও ফিরে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অনিশ্চিত। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে বিশ্ব মন্দার ঝুঁঁকি আরো গুরুতর হবে। ব্লুমবার্গের অর্থনৈতিক মডেল বলছে, ২০২৪ সালে মন্দা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।
উল্লেøখ্য, ২০১৯ সাল থেকে দুই বছরেরও অধিক সময় করোনা অতিমারী গোটা বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছিল। পৃথিবী এখনো তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বের অনেক দেশ জড়িত। ফলে জ্বালানি এবং গম ও বার্লির মতো অনেক জরুরি পণ্যের উৎপাদন এবং রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও হচ্ছে; অনেক দেশের সামনেই খাদ্যসঙ্কটের পরিস্থিতি। গোটা বিশ্ব কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি; মূলত উৎপাদন কমে যাওয়া, সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়া ও তথাকথিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা- ডলারের কারসাজির কারণে এটি হচ্ছে।
বিশ্বের এই বেসামাল অর্থনৈতিক দুরবস্থা শিগগিরই কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই; বরং আরো বেশি যুদ্ধবিগ্রহ, মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসছে। ফলে, অর্থনৈতিক দুরবস্থা আরো বাড়তে পারে এমনকি দীর্ঘমেয়াদে দুর্ভিক্ষও মোকাবেলা করতে হতে পারে। এমতাবস্থায় প্রস্তুতি নেয়ার এখনই সময় ও এর জন্য অন্যান্য সেক্টরের সাথে উল্লেøখ করার মতো সহযোগী হতে পারে ব্লু-ইকোনমি। পরবর্তী সেকশনগুলোতে আমরা ব্লু-ইকোনমি এবং বিশ্ব ও দেশের অর্থনীতিতে তার বর্তমান অবদান ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করব।

ব্লু-ইকোনমি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে তার অবদান
ব্লু-ইকোনমিকে (Blue Economy) নীল অর্থনীতি বা সুনীল অর্থনীতিও বলা হয় যা মূলত সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংকের মতে, নীল অর্থনীতি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নততর জীবিকার সংস্থান ও কাজের লক্ষ্যে সামুদ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে। তা ছাড়া সমুদ্রসম্পদ খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানিও সরবরাহ করে। সাগর ও মহাসাগর- প্রবাল দ্বীপ ও ডলফিন, তিমি মাছ আর মুক্তো ভরা ঝিনুক, জাহাজ চলাচলে মুখরিত। সমুদ্র চিরদিনই মানুষের কাছে অপার রহস্যে ভরা। এটি মাছ ধরা, খনিজ, শিপিং ও বন্দর অবকাঠামো, জৈবপ্রযুক্তি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, পর্যটন, সমুদ্র শাসন ও সামুদ্রিক এলাকায় শিক্ষাকে কভার করে। হালের দুনিয়ায় সাগর-মহাসাগরভিত্তিক অর্থনীতির ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বে এই অর্থনীতি ৩০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সম্পদ, ৯০ শতাংশ পণ্যের বাণিজ্য সমুদ্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা ৮০০ কোটি এবং ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা হবে ৯০০ কোটি। এখনই প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের খাদ্যের ঘাটতি রয়েছে বিশ্বে। বিশ্বের স্থলসম্পদ ব্যবহার করে এই ঘাটতি মোকাবেলা অসম্ভব প্রায়। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাবার জোগান দিতে সমুদ্রসম্পদ হতে পারে অন্যতম সহযোগী। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র অর্থনীতি বছরব্যাপী তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে যাচ্ছে যা প্রায় ৬০ মিলিয়ন লোককে মৎস্য ও জলজ কার্যক্রমে নিযুক্ত করে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিন জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও প্রাণী।
উল্লেখ্য, ‘মহাসাগর যদি একটি দেশ হতো, তবে সেটিই হতো পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি’। ২০৩০ সাল পর্যন্ত, নীল অর্থনীতির আনুমানিক সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হলো উপকূলীয় পর্যটনের দ্বিগুণ, শিপিংয়ের চারগুণ, তেল ও গ্যাসের দ্বিগুণ, মৎস্যচাষের দ্বিগুণ, উপকূলীয় বায়ুর ৪০ গুণ, জলের মধ্যে গাছপালা উৎপাদন বা জীবজন্তুর বংশবৃদ্ধির প্রচেষ্টার দ্বিগুণ ও বর্তমান সমুদ্রতল সম্পদের ১০ হাজার গুণেরও বেশি। এ ছাড়াও, ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য গাছপালা সমুদ্রের আবাসস্থলগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে অতিরিক্ত নির্গমিত ২৫ শতাংশ কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2) নিঃশেষ করবে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বন্যা ও ঝড় থেকে রক্ষা করবে।

বাংলাদেশে নীল অর্থনীতির অবদান ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশেও অপার সম্ভাবনা রয়েছে ব্লু-ইকোনমি কিংবা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির। সুন্দরবন থেকে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন অবধি আমাদের সমুদ্রতটরেখা প্রসারিত। চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকাজুড়ে ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ৭১০ কিলোমিটার সুদীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে এবং সমুদ্রতটের সার্বভৌম অধিকার জুড়ে মোট নিয়ন্ত্রণসহ দেশটির মোট প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের সামুদ্রিক অঞ্চল রয়েছে। এই সামুদ্রিক অঞ্চল বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় ৮১ শতাংশ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগরগুলোর মধ্যে একটি যেখানে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের উপকূলরেখা বরাবর ১.৪ বিলিয়ন মানুষ বাস করে।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি প্রধান কৌশলগত অবস্থানের মাঝখানে যেখান দিয়ে পশ্চিমারা এশিয়ায় প্রবেশ করে। যদিও এর কিছু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁঁকি রয়েছে তবে এখনো এর জন্য শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি ভূ-রাজনীতিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে তাহলে দেশটি সম্মিলিত সুবিধার জন্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি কৌশলগত সেতু হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বাংলাদেশের একটি অনন্য ব-দ্বীপ রয়েছে যার একটি সুন্দর সমুদ্রের আউটলেট রয়েছে যা জাতীয় অর্থনীতির একটি পাওয়ার হাউজ এবং যেখানে কমপক্ষে ২৬টি সামুদ্রিক কার্যক্রম হতে পারে।
যথাযথ গুরুত্ব দিলে ব্লু-ইকোনমি বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিপ্লøব ঘটিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। বিশ্লেøষকদের মতে, শুধু সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল রফতানি করেই বছরে আয় হতে পারে বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। সুতরাং বাংলাদেশ একটি সামুদ্রিক দেশ হওয়ায় আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্লু-ইকোনমিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ ও পশ্চিমে প্রবাল রয়েছে আর সেই সাথে রয়েছে কচ্ছপ প্রজননোপযোগী পরিবেশ। এ ছাড়া বিপুল সামুদ্রিক শৈবালও এখানে রয়েছে। সুন্দরবন আবার রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও কুমিরের লীলাভূমি। বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১৯ দশমিক ৪ শতাংশই আসে সামুদ্রিক মৎস্য থেকে। এটি পরিবহনেরও প্রধান মাধ্যম। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল এলাকায় বর্ধিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় পর্যটকদের মধ্যে গড়ে ৮১ শতাংশই কক্সবাজার ভ্রমণ করেন। এ উপাদানগুলো একসাথে নীল অর্থনীতি গঠন করে, যা বোঝায় যে, দেশটির অবস্থাকে শক্তিশালী করার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় ১.৮৫ মিলিয়ন মানুষ মৎস্য সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পূর্ণভাবে জড়িত, যেখানে সামুদ্রিক মাছের সাথে বিশ্বের ৩৫০ মিলিয়ন মানুষের কর্ম সংযোগ রয়েছে, যার ৯০ শতাংশ মৎস্যজীবী উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করে। বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর প্রায় ৮০ মিলিয়ন টন মাছ ধরা হয়, যার মধ্যে মাত্র সাত মিলিয়ন টন বাংলাদেশী জেলেদের হাতে ধরা পড়ে। বাকি পরিমাণ প্রতিবেশী দেশের জেলেদের হাতে ধরা পড়ে। এ কারণে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ। তাই দেশের মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের জন্য দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার ট্রলার এখন সময়ের দাবি। মেরিন বায়োটেকেরও খাদ্য, মানব স্বাস্থ্য, শক্তি, নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক প্রতিকারের মতো বৈশ্বিক সমস্যার মোকাবেলা করার সুযোগ রয়েছে।

শিপিং ও পোর্ট সুবিধার ব্যবহার ব্লু-ইকোনমির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত, যা পরিমাণের ভিত্তিতে বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ ও মূল্যের দিক থেকে ৭০ শতাংশেরও বেশি। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সম্ভাব্য মালামাল পরিবহনের ভাড়া হবে প্রায় ৪৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বন্দরগুলোর হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও আধুনিক হ্যান্ডলিং সরঞ্জামে সজ্জিত করে গভীর সমুদ্রবন্দর বিকাশের মাধ্যমে, বাংলাদেশ বন্দরশুল্ক হিসেবে অর্থ উপার্জনকে উল্লেøখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে।
বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ২৬টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে যেখানে সম্ভাব্য গ্যাসের পরিমাণ ২৭.১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, এই ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ‘গ্যাস প্রদেশ’ গঠন করতে পারে। এ ছাড়াও, এ দেশটি সমুদ্রের তলদেশে ও নিচে খনিজ ভাণ্ডার অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় সমুদ্রতল প্রায় ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয়ই দেখা যায়। এই এলাকায় অনেক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। গভীর সমুদ্রে ত্রুজ শিপের মাধ্যমে পর্যটনের ব্যবস্থা করা এবং দর্শনীয় সামুদ্রিক অ্যাকুরিয়াম গড়ে তুলে এসব এলাকায় পর্যটকদের আরো আকৃষ্ট করা যেতে পারে। এ ছাড়াও, বিনোদনমূলক বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি ও উপকূলীয় অঞ্চলে বিদেশী পর্যটকদের জন্য পৃথক পর্যটন অঞ্চল স্থাপন বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য অন্বেষণে অবকাশ যাপনকারীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে সহায়তা করবে।
একটি উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নীল অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্য দেশকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ উত্তরণ, যেমন- দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা, উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বজায় রাখা, ব্রুড-স্টক প্রজননের জন্য সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তিতে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভিনব স্বাস্থ্যকর জলজপণ্য উৎপাদন করা, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান পরিচালনার মতো কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, জীববৈচিত্র্যের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, ম্যানগ্রোভ ও সামুদ্রিক ঘাস সংরক্ষণ, প্রবাল ব্লিøচিং থেকে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ইকোসিস্টেম রক্ষা, কার্বন নিঃসরণ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্র এলাকাকে দূষণমুক্ত রাখা এবং বহুমুখী কারিগরি যোগ্যতাসম্পন্ন ডিগ্রিধারী লোক তৈরির পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল ম্যানেজ করা। স্বার্থান্বেষী দেশগুলোর দ্বারা তৈরি আন্তর্জাতিক আইন দেশগুলোর নীল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে অন্তরায় সৃষ্টি করে। ১০ বছর আগে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও এখন পর্যন্ত এ বিজয়কে কাজে লাগানো যায়নি। মেরিটাইম ল’ এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। দ্রুত এটি করা প্রয়োজন, তা না হলে সমুদ্রের গভীরে কেউ সীমানা মানবে না। ফলে সম্পদ চলে যেতে পারে অন্য দেশে।

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশ ইতোমধ্যে সাবমেরিনসহ নৌশক্তি বৃদ্ধি এবং আধুনিক ও পর্যাপ্ত অস্ত্রে সজ্জিত করার মতো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্লু-ইকোনমি ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিøষ্ট বিভাগ খুলে ছাত্রদের শিক্ষিত করা শুরু করেছে। এ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য ২০১৭ সালে কক্সবাজারে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হয়েছে। সমুদ্র অর্থনীতিতে আরো বিনিয়োগের দ্বার দ্রুত খুলে দেয়া উচিত বলে মনে করেন অনেকে।
বাংলাদেশের সমুদ্রে কী পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, খনিজসম্পদ, নৌ-চলাচলসহ কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে ১৯টি মন্ত্রণালয়। দেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মৎস্যচাষ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মানবসম্পদ, ট্রান্সশিপমেন্ট, পর্যটন ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ মোট ১২টি কার্যকলাপ সেখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে নীল অর্থনীতি সম্পর্কিত উদ্যোগগুলোর সাথে বিভাগীয় মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় সাধনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেল প্রতিষ্ঠা করা হয়। চিহ্নিত করা হয় নীল অর্থনীতির ২৬টি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু সমুদ্রের তলদেশের সৌন্দর্য দেখিয়ে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করে। বাংলাদেশেও এ ধরনের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। সঠিকভাবে মৎস্যসম্পদ, গ্যাসসম্পদ, খনিজসম্পদ ও স্কুবা ট্যুরিজম যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের প্রতি অর্থবছরে যে বাজেট হয়, তা নীল অর্থনীতি দিয়েই জোগান দেয়া সম্ভব।
টেকসই অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে নীল অর্থনীতি। এটি এসডিজির ১৪ নম্বর লক্ষ্য যা ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসমুদ্র, সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসইভাবে ব্যবহার করতে চায়।’ আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের সামুদ্রিক সেক্টরগুলো নাটকীয়ভাবে প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বেশির ভাগের আকার দ্বিগুণ থেকে চারগুণ হবে ও অনেকগুলো তাদের বর্তমান আকারের ১০ গুণ পর্যন্ত হবে।

বাংলাদেশকেও সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় টেকসই ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে নীল অর্থনীতির বিকাশে আরো নজর দিতে হবে। এ খাতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এ নীল অর্থনীতির ক্ষেত্র আরো বাড়ানো সম্ভব হলে ২০৪১ সালের আগেই আমাদের উন্নত দেশের তালিকায় পৌঁছানো সম্ভব বলেও অনেকে বলছেন।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায়, সারা বিশ্বে সমুদ্রসম্পদের যে বিশালতা, তার মাত্র ১ ভাগ এখন পর্যন্ত বিশ্ব ব্যবহার করতে পারছে। আগেই জেনেছি, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় শুধু মৎস্যসম্পদ আহরণ থেকেই বছরে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বছরে প্রায় ৪৭৫ জাতের ৮০ লাখ টন মাছ ধরা হয়; ঠিকমতো মৎস্যসম্পদ আহরণ সম্ভব হলে এর পরিমাণ ১ দশমিক ৫ কোটি টন পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব। এসব সামুদ্রিক মাছের তেল বিভিন্ন ধরনের উপাদেয় খাদ্যপণ্য ও জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয়। বিশ্বে ভারী শিল্পে ব্যবহৃত ম্যাগনেশিয়াম, কৃষিক্ষেত্রের সার তৈরিতে ব্যবহৃত পটাশিয়াম, প্রতিদিনের খাবার লবণ সোডিয়াম ক্লে¬ারাইড ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ব্রোমিনের প্রায় ৫০ শতাংশই আসে সমুদ্র থেকে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকেও এ ধরনের বিপুল সম্পদ আহরণ ও তা রফতানির সুযোগ রয়েছে। এ সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠারও সুযোগ আছে। আগামী এক দশকে জাহাজ নির্মাণ শিল্প বাংলাদেশে আরো বিকশিত হবে। সমুদ্রসংশ্লিষ্ট পর্যটন শিল্প আরো ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। এ ছাড়া ঝিনুক, সামুদ্রিক মুক্তাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদ সংশ্লিøষ্ট ব্যবসায়ও সামনে বৃদ্ধি পাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
এসডিজি অর্জন ও ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে নীল অর্থনীতিতে মনোনিবেশ করার কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য ইতোমধ্যে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। ইপিজেডের মতো সমুদ্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) নীল অর্থনীতিকে উন্নীত করার একটি চমৎকার উপায় হতে পারে এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই এসইজেডের পরিকল্পনা অনুযায়ী নীল অর্থনীতির সুফল পেতে পারে। বাংলাদেশ যদি এটি করতে পারে, তবেই ব্লু-ইকোনমির সুযোগ কাজে লাগবে এবং টেকসইভাবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে।

উপসংহারে বলা যায়, সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের আয়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য দরকার প্রণোদনা এবং বিনিয়োগ। দেশের বড় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা এত কঠিন ক্ষেত্রে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না হয়তো। তাই বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা দরকার। গবেষকরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন, সমুদ্রসম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো হলে দেশের অর্থনীতিতে মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি জোগান আসবে সমুদ্রসম্পদ থেকেই। সুতরাং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট দূরীকরণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য মহাসঙ্কট মোকাবেলার জন্য ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি হতে পারে অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতের অন্যতম সহযোগী। হ
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক
ইমেইল : mizan12bd@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement