০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯, ৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বনাম বাস্তবতা

সময়-অসময়
-


বাংলাদেশের সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিদায়ের প্রাক্কালে আদালতে বলেছিলেন যে, ‘আমরা কনটেম্পট করতে করতে হয়রান’, কথাটি জাতীয় পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতির আসনে থেকে ওই ছোট কথাটি খুবই প্রণিধানযোগ্য এবং আইনের শাসন বাস্তবায়নে বিচারিক ব্যর্থতার একটি সরল স্বীকারোক্তি মাত্র। এ সরল স্বীকারোক্তি করেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ ব্যক্তি বা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিজেদের দায়িত্বের দায় এড়াতে পারে কি?
প্রধানমন্ত্রী জোর গলায় বলছেন যে, তিন ফসলি জমিতে শিল্প, কারখানা বা স্থাপনা করা যাবে না, জমি ব্যবহারে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবাসন প্রকল্পের নামে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিন ফসলি জমিগুলো ভরাট করে ফেলেছে, অথচ জমির মালিককে কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ বা মূল্য পরিশোধ না করেই নিচু জমি ভরাট করে বিনা বাধায় পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে, অথচ ভূমিদস্যুদের টাকার কাছে পরিবেশ অধিদফতর অসহায়। অভিযোগ করলে তারা বলে, ‘আমাদের লোকবলের অভাব।’
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে কৃষিজমি, জলাভূমি, খাল, বিল, নদী প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে। জমির মালিক/কৃষকরা এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করলে প্রতিটি রিটেই উচ্চ আদালত ভূমিদস্যুদের কবল থেকে জমিগুলো রক্ষার জন্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করে যাচ্ছেন, কিন্তু হাইকোর্টের সে আদেশগুলোও কার্যকর হচ্ছে না। ফলে আইন আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের বড় একটা অংশ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। তাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, টাকাওয়ালা ও পুলিশ প্রশাসনের নিকট আইন আদালত সম্পূর্ণভাবে অসহায়।


পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নির্যাতন বন্ধ করার জন্য ২৭/১০/২০১৩ ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ ২০১৩ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও কার্যকর শুরু হয়, যা বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করার জন্য উচ্চ আদালত থেকে বারবার নির্দেশনা দেয়া হলেও পুলিশ তা অনুসরণ করে না।’ ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জাতিসঙ্ঘ একটি সনদ ঘোষণা করেছে। ওই সনদে ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সম্মতি প্রদান করার পর ওই সনদের সমর্থনে বাংলাদেশ সরকার ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ ২০১৩ পাস করে। অধিকন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) এ বলা হয়েছে যে, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’
পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ২৯ ধারাও যন্ত্রণা, নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ না করার জন্য পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের প্রথম মানবাধিকার দলিল Universal Declaration of Human Rights’ 1948’ ১৯৪৮ এর ৫ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “No one shall be subjected to tourture or to cruel, in human or degrading treatment or punishment.” অন্য দিকে International Covenant on Civil and Political Rights এর অনুচ্ছেদ ৭ এ বলা হয়েছে যে, “No one shall be subjected to torture or to cruel, in human or degrading treatment or punishment. In particular, no one shall be subjected without free consent to medical or scientific experimentation.” ”
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ১৬৭(২) ধারা মোতাবেক পুলিশের যুক্তিসঙ্গত আবেদনক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট যদি উপর্যুক্ত মনে করেন তবে গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে সর্বমোট ১৫ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। উক্ত আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাকে এখন ব্ল্যাংক চেক হিসেবে ব্যবহার করছে। মিডিয়ার ভাষায় এ রিমান্ড এখন ‘রিমান্ড বাণিজ্যে’ পরিণত হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৪) এ বলা হয়েছে যে, ‘কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।’ অথচ সাংবিধানিক ওই নির্দেশনাকে অমান্য করে রিমান্ডে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করছে যা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা হয় এবং বিচারিক আদালতে এ লিপিবদ্ধ স্বীকারোক্তি পুলিশ একটি বেদবাক্য হিসেবে ব্যবহার করছে।


অভিযুক্তকে রিমান্ডে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর উচ্চ আদালত কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক রিমান্ড মঞ্জুরে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব, পুলিশ হেফাজতে অভিযুক্ত ব্যক্তি থাকাবস্থায় পুলিশের আচরণ কি হবে এ মর্মে কিছু কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে। যা (১) ডিএলআর ৫৫ (হাইকোর্ট) ২০০৩, পৃষ্ঠা-৩৬৩ ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ, (২) ডিএলআর ৫৬ (হাইকোর্ট) ২০০৪, পৃষ্ঠা-৩২৪ সাইফুজ্জামান বনাম বাংলাদেশ, (৩) ডিএলআর ৬৯ (আপিল বিভাগ) ২০০৪ পৃষ্ঠা-৬৩ বাংলাদেশ বনাম ব্লাস্ট মামলাগুলো রিপোর্টিং হয়েছে। উচ্চ আদালত বর্ণিত মামলায় রিমান্ডসংক্রান্ত বিষয়ে যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন তার কিছু অংশ নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
(১) জেলখানায় একদিকে কাচের ও গ্রিলের দেয়া একটি কক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় বা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর দৃষ্টিগোচরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।
(২) রিমান্ডে আদেশ দেওয়ার পূর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার নিযুক্ত আইনজীবীর সাথে আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল মর্মে ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত হতে হবে।
(৩) গ্রেফতার করার সাথে সাথেই তারিখ ও সময় উল্লেখপূর্বক স্মারক তৈরি করে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর নিতে হবে।
(৪) গ্রেফতারের ৬ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার ব্যক্তির নিকটস্থ আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুকে অবগত করাতে হবে।
(৫) গ্রেফতারের কারণসহ বিস্তারিত তথ্য সম্মলিত একটি স্মারক প্রস্তুত এবং এর অনুলিপি নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দিতে হবে।
(৬) একজন নাগরিককে শুধু সম্মানই করবেন না, বরং সংবিধান একজন নাগরিককে যতটুকু অধিকার প্রদান করেছে, তা রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেষ্ট থাকবে।
পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল ১৯৪৩-এর ৩২৪ ধারায় পুলিশ কর্তৃক রিমান্ডে দেয়ার আবেদন এবং রিমান্ড মঞ্জুরের প্রশ্নে ম্যাজিস্ট্রেটকে কিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা সঠিকভাবে পালন না করার কারণে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে জবাবদিহি করতে হয় না, ফলে রিমান্ডের প্রশ্নে অনিয়ম বেড়েই চলেছে। বিচারিক ব্যবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট সর্বনিম্ন স্তর হলেও এ পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং বিচারিক পদ্ধতির ফাউন্ডেশন যেখান থেকেই শুরু। এ কারণেই ম্যাজিস্ট্রেসি যথেষ্ট সতর্কতার ও দায়িত্বশীল হওয়াই বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ ক তে বলা হয়েছে যে, ‘এই সংবিধানের বিধানবলি সাপেক্ষে বিচারকার্য বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ ফলে ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্বকে অনেক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। অথচ আদালত প্রাঙ্গণে এমন কথাও শোনা যায়, যা শুনলে ঘৃণা ও ক্ষোভ সমভাবে চলতে থাকে।
একটি রাষ্ট্রের বিচারিক ব্যবস্থার সন্তুষ্টির ওপরই সে রাষ্ট্রে মানুষ কতটুকু সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে তা নিরূপণ করা যায়। গ্রিকরা আধুনিক বিচারিক ব্যবস্থার প্রবর্তক। এরও আগে অর্থাৎ আজ থেকে ৪০০০ বছর আগে Sumerian King Hammurabe ২৮২টি আইন প্রণয়ন করে বিচারিক দলিল প্রণয়ন করেছিল। ইতিহাসের পাতায় উক্ত আইনকে যেভাবে মন্তব্য করা হয়েছে, তা হলো “This kind of precedent and legally binding document protects the people from Arbitrary procecution and punishment.” আমাদের রাষ্ট্রেও বিচারিক পদ্ধতিতে এমন পদ্ধতি হওয়া উচিত যাতে জনগণ একনায়ক সুলভ, স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary) শাস্তির বিধান থেকে মুক্তি পায়। উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্মের বিধান মতে ন্যায়পরায়ণ বিচারক রোজ হাসরের ময়দানে আল্লাহ পাকের পবিত্র আরশের নিচে আসন গ্রহণের প্রথম অগ্রাধিকারী হবেন।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

 

 

 

 


আরো সংবাদ


premium cement